অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

শরীরের সুস্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে হার্ট বা হৃৎপিণ্ডের সুস্থতার ওপর। অথচ এ ব্যাপারে উদাসীনতা সবচেয়ে বেশি। ফলে বিশ্বব্যাপী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর বিশ্বে অন্তত পৌনে দুই কোটি মানুষ এ রোগে প্রাণ হারাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখে ছাড়িয়ে যেতে পারে। হৃদরোগ থেকে বাঁচতে প্রতিরোধই সবচেয়ে উত্তম উপায়। তাই এ বছরে বিশ্ব হার্ট দিবসের স্লোগান ‘ইউজ হার্ট টু বিট কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ’, অর্থাৎ হৃদয় দিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ।

default-image

২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে ‘হৃদয়ের সুরক্ষা হোক হৃদয় থেকে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান এসকেএফ নিবেদিত ‘হৃদয়ের সুরক্ষা’র তৃতীয় পর্ব। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব কার্ডিওভাসকুলার ইন্টারভেনশনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন। সঞ্চালনায় ছিলেন ডা. ফাইজা রাহলা। অনুষ্ঠানটি প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল এবং এসকেএফের ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

শুরুতেই ডা. মীর জামাল উদ্দিন হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করেন। হৃদরোগ নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের উদ্যোগে ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর নতুন নতুন থিম নিয়ে পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব হার্ট দিবস। হৃৎপিণ্ড শরীরের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। আমাদের সবার দুটি কিডনি, দুটি চোখ, দুটি হাত, দুটি পা আছে। কিন্তু হৃৎপিণ্ড আছে একটিই। কারও যদি একটি কিডনি বিকল হয়ে যায়, তাহলে অন্য একটি কিডনির সাহায্যে ভালোভাবেই বেঁচে থাকা সম্ভব। কিন্তু হৃৎস্পন্দন যদি এক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়, তাহলে মানুষ মারা যায়। এ জন্য আমাদের সবারই নিজের হার্টের যত্ন নিতে হবে। সেই সঙ্গে নিজের প্রিয় মানুষ ও সমাজের সবাইকে নিজেদের হার্টের যত্ন নিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো প্রতিবছর বাংলাদেশেও বেশ ঘটা করে বিশ্ব হার্ট দিবস উদযাপন করা হয়। তবে এ বছর মহামারি পরিস্থিতির জন্য কোনো রকম জনসমাবেশ হয়নি। উদযাপন সীমাবদ্ধ ছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নানা ধরণের সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের মধ্যে।

বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বিভিন্ন রকমের হৃদরোগ সম্পর্কে জানা গেল। হৃদরোগ মূলত দুই ধরনের। জন্মগত হৃদরোগ ও অর্জিত হৃদরোগ। জন্মগত হৃদরোগ হলে রোগীকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করা যায়। কিন্তু অর্জিত হৃদরোগ হওয়ার আগেই ঠেকানো সম্ভব।

হৃদরোগের ভেতর হার্টের রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়া বা চেপে যাওয়া বা এস্কেমিক হার্ট ডিজিজ এবং রক্তনালিতে কোলেস্টেরল জমে যাওয়ার সমস্যা বেশি দেখা যায়। রক্তনালিতে কোলেস্টেরল জমে গেলে ধমনির প্রবাহ ব্যাহত হয়। এতে রক্তনালির ভেতর রক্ত জমাট বেঁধে যেয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়। হার্ট অ্যাটাক হলে ১০০ জনের ভেতর ৩০ জনই হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না। তার আগেই মারা যায়। আর যারা হাসপাতালে পৌঁছায়, তাদের ভেতর ১০ শতাংশ রোগী যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুবরণ করে।

default-image

হার্ট অ্যাটাকের রোগীকে ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার ভেতর হাসপাতালে আনতে হবে। এ ধরনের রোগীকে হাসপাতালে আনার পর প্রথমে তার এনজিওগ্রাম করে দেখা হয় হার্টের কোথায় ব্লক বা রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধা আছে। সেই অনুযায়ী যদি হার্টে স্টেন্ট বা রিং পরানো যায় বা সার্জারি করা হয়, তাহলে রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠবে। ফলে মৃত্যুর হার ৩ শতাংশে কমে আসবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় রোগী বুঝতে পারে না যে তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। আবার অনেকেই সামান্য বুকে ব্যথা হলেই হার্টের সমস্যা বলে ঘাবড়ে যায়। হার্ট অ্যাটাক হলে, বুকের মাঝখানে প্রচণ্ড ব্যথা হবে। কখনো কখনো সেই ব্যথা হাতে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া বুক ভার বা গলায় চাপ অনুভূত হয়ে থাকে। এর সঙ্গে যদি বমি বা প্রচণ্ড ঘাম হতে থাকে, তাহলে দেরি না করে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
ছোটবেলা থেকে হৃদরোগ প্রতিরোধের প্রতি জোর দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে অল্প বয়সীদের ভেতরে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে তারা সারা দিন কম্পিউটারে বসে কাজ করে বা পড়াশোনা করে নয়তো গেমস খেলে সময় কাটায়। শরীরচর্চা বা খেলাধুলা করে না তারা। আর তাদের ভেতর ফাস্টফুড খাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। এসব হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য হৃদযন্ত্রের সুস্থতায় অল্প বয়স থেকেই ফাস্টফুড ও চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়া কমাতে হবে, নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। লিপিড প্রোফাইল বা শরীরে চর্বির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

default-image

আর ধূমপান ও অ্যালকোহল উভয়ই হার্টের জন্য ক্ষতিকর। তাই এসব থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। এ ছাড়া ডায়াবেটিসের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞ। কারণ, একে ‘মাল্টি অরগ্যান ডিজিজ’ বলা হয়। স্ট্রোক, কিডনি ড্যামেজ, চোখের অন্ধত্ব, হাতে পায়ে গ্যাংগ্রিন, হার্ট অ্যাটাকসহ শরীরের আরও অনেক জটিল সমস্যার জন্য দায়ী এই ডায়াবেটিস। তাই হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতে এবং সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের করতেই হবে।

ডা. জামাল উদ্দিনের কাছ থেকেই জানা গেল, এখন বাংলাদেশেই দক্ষ চিকিৎসকের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি উদ্যোগে খুব শীঘ্রই বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের মতো জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের শয্যাসংখ্যা তিন গুণ বাড়ানো হবে।

আমাদের দেশে হৃদরোগে মৃত্যুর হার বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সচেতনতার অভাব। ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা নিতে কখন কোথায় যেতে হবে, এ সম্পর্কে এ দেশের মানুষের জ্ঞান অনেক কম। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সচেতনতা ও সঠিক তথ্য জানার কোনো বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন