৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস

কোলাজ: রজত কান্তি রায়
কোলাজ: রজত কান্তি রায়
বিজ্ঞাপন

৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বের প্রায় ১২১টি দেশে একযোগে ফিজিওথেরাপি দিবস পালন করা হয়। এবার দিবসটির ২৪তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ১৯৫১ সালের ৮ সেপ্টেম্বরে ‘ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন ফর ফিজিক্যাল থেরাপি’ তাদের যাত্রা শুরু করে। ধীরে ধীরে তা আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি লাভ করে এবং বিভিন্ন দেশে তাদের সদস্য হিসেবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত সংস্থার পাশে থেকে পেশার উন্নয়নে সক্রিয় হয়ে আছে। ১৯৯৬ সালে ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন ফর ফিজিক্যাল থেরাপি ৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালন করে আসছে।

default-image

গত বছর ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন ফর ফিজিক্যাল থেরাপি তাদের নাম পরিবর্তন করে ‘ওয়ার্ল্ড ফিজিওথেরাপি’ নামকরণ করে। ওয়ার্ল্ড ফিজিওথেরাপি একটি বিশ্বব্যাপী সংস্থা এবং এটি আন্তর্জাতিক স্তরে সদস্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করে পেশার উন্নয়নে পরামর্শ দিয়ে থাকে। এ সংস্থার মূল লক্ষ্য হলো: সবার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সর্বাধিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক ফিজিওথেরাপি অনুশীলন, প্রচার ও সমর্থন করা এবং ফিজিওথেরাপি শিক্ষার সর্বোচ্চ সম্ভাব্য মান বিকাশ ও বিতরণ করা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০২০ সালে ফিজিওথেরাপি দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘কোভিড-১৯-পরবর্তী পুনর্বাসন চিকিৎসা এবং কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় ফিজিওথেরাপিস্টদের ভূমিকা’। এ বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্য হচ্ছে কোভিড-১৯ থেকে মুক্তি পেতে বা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা এবং ফিজিওথেরাপিস্টদের প্রদত্ত এক্সারসাইজ অনন্য ভূমিকা পালন করে।

২০২০ সালে ফিজিওথেরাপি দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘কোভিড-১৯-পরবর্তী পুনর্বাসন চিকিৎসা এবং কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় ফিজিওথেরাপিস্টদের ভূমিকা’।

এক্সারসাইজের মাধ্যমে কীভাবে একজন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ব্যক্তি আরোগ্য পেতে পারেন, সে সম্পর্কে শরীরে অঙ্গসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফিজিওথেরাপিস্টরা দিকনির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করতে পারেন। আবার কোভিড-১৯ রোগে গুরুতর আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে পরিত্রাণ পেতে পুনর্বাসন এবং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন।

default-image

ফিজিওথেরাপি

ফিজিও (শারীরিক) এবং থেরাপি (চিকিৎসা) শব্দ দুটি মিলে ফিজিওথেরাপি বা শারীরিক চিকিৎসার সৃষ্টি। ফিজিওথেরাপি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অন্যতম এবং অপরিহার্য শাখা। একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক স্বাধীনভাবে রোগীর বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা (প্রধানত বাতব্যথা, আঘাতজনিত ব্যথা, প্যারালাইসিস প্রভৃতি) নির্ণয়সহ পরিপূর্ণ চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফিজিওথেরাপির সূচনা

default-image

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নতুন কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি নয়। প্রাচীন গ্রিসে হিপোক্রেটিস ম্যাসাজ ও ম্যানুয়াল থেরাপির মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার সূচনা করেছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০ সালে হেক্টর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার একটি শাখা ব্যবহার করতেন, যাকে বর্তমানে হাইড্রোথেরাপি বলা হয়। তথ্য-উপাত্ত অনুসারে ১৮৯৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার বর্তমান ধারা অর্থাৎ ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি, এক্সারসাইজ থেরাপি, হাইড্রোথেরাপি, ইলেকট্রোথেরাপি প্রভৃতি প্রবর্তন করা হয়। নিউজিল্যান্ডে ১৯১৩ এবং আমেরিকায় ১৯১৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শুরু হয়।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্বঅনুধাবন করে ১৯৭৩ সালে আরআইএইচডি (বর্তমানে নিটোর) ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের (এমবিবিএস ও বিডিএস একই অনুষদের অধিভুক্ত) অধীন স্নাতক ডিগ্রি চালু করা হয়। বর্তমানে নিটোর, সিআরপি, পিপলস ইউনিভার্সিটি, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট কলেজ অব হেলথ সায়েন্সসহ ৭টি ইনস্টিটিউটে ফিজিওথেরাপি গ্র্যাজুয়েশন কোর্স চালু রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কেন এই ফিজিওথেরাপি

আমরা যদি আমাদের শরীরের বিভিন্ন রোগের কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব শুধু ওষুধ সব রোগের পরিপূর্ণ সুস্থতা দিতে পারে না। বিশেষ করে যেসব রোগের উৎস বিভিন্ন মেকানিক্যাল সমস্যা, সেসব ক্ষেত্রে ওষুধের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম। যেমন বাতব্যথা, স্পোর্টস ইনজুরি, হাড় ক্ষয়জনিত রোগ, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস প্রভৃতি। তাহলে এসব রোগ থেকে পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভের উপায় কী?

মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিম

বর্তমানে উন্নত বিশ্বে সব ধরনের শারীরিক সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন ধারার প্রবর্তন হয়েছে, যাকে বলা হয় মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিম। এই টিমে থাকেন সার্জন, মেডিসিন স্পেশালিস্ট, জেনারেল ফিজিশিয়ান, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, নার্স ও সোশ্যাল ওয়ার্কার। রোগীর শারীরিক সমস্যা দূর করে কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টের ভূমিকা অপরিসীম।

default-image

ফিজিওথেরাপিস্ট কে

ফিজিওথেরাপিতে শুধু ব্যাচেলর অথবা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রিধারীকেই ফিজিওথেরাপিস্ট বলা যাবে। বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন মানের ফিজিওথেরাপিস্ট আছেন। কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট: যিনি কমপক্ষে ফিজিওথেরাপি ব্যাচেলর ডিগ্রি (৪ বছর কোর্স এবং ১ বছর ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন) নিয়েছেন। এ ছাড়া ফিজিওথেরাপির মাস্টার্স প্রোগ্রাম রয়েছে এমএসসি ইন ফিজিওথেরাপি কোর্স, সাভার, সিআরপি, বিএইচপিআইতে (২ বছর কোর্স) একজন কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর রোগনির্ণয়সহ চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।

ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্ট

যিনি ফিজিওথেরাপি ডিপ্লোমা (৩ বছর কোর্স ) ডিগ্রি নিয়েছেন। একজন কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।

ফিজিওথেরাপি অ্যাসিস্ট্যান্ট

যিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপি (১ বছর) কোর্স করেছেন। একজন কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা সেবায় সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারবেন। এ ছাড়া অন্যান্য কিছু চিকিৎসক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার কিছু পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্টের কাছ থেকে চিকিৎসা ও পরামর্শ নেওয়াটাই উত্তম।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যেসব ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যাবশ্যক

বাতব্যথা, কোমরব্যথা, ঘাড়ব্যথা, হাঁটু অথবা গোড়ালির ব্যথা, আঘাতজনিত ব্যথা, হাড় ক্ষয়জনিত রোগ, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, স্ট্রোক, প্যারালাইসিসজনিত সমস্যা, মুখ বেঁকে যাওয়া বা ফেসিয়াল পালসি, বিভিন্ন ধরনের অপারেশন-পরবর্তী সমস্যায়, আইসিইউ (ICU) তে অবস্থানকারী রোগীর জন্য পা বাঁকা (ক্লাবফিট), গাইনোকলজিক্যাল সমস্যায়, সেরিব্রাল পলসি (প্রতিবন্ধী শিশু), বার্ধক্যজনিত সমস্যা প্রভৃতি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ও পুনর্বাসন সেবায় ফিজিওথেরাপির ভূমিকা অপরিসীম।

default-image

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাপদ্ধতি

একজন ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর রোগ বর্ণনা, ফিজিক্যাল টেস্ট, ফিজিওথেরাপিউটিক স্পেশাল টেস্ট, প্রয়োজন সাপেক্ষে বিভিন্ন রেডিওলজিক্যাল টেস্ট এবং প্যাথলজিক্যাল টেস্টের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় বা ডায়াগ্নোসিস করে থাকেন। অতঃপর রোগীর সমস্যানুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা অথবা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান করেন এবং সেই অনুযায়ী নিচের পদ্ধতিতে ফিজিওথেরাপি সেবা প্রদান করে থাকেন। ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি, মোবিলাইজেশন, মুভমেন্ট উইথ মোবিলাইজেশন, থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, ইনফিলট্রেশন বা জয়েন্ট ইনজেকশন, পশ্চারাল এডুকেশন, আরগোনমিক্যাল কনসালটেন্সি, হাইড্রোথেরাপি, ইলেকট্রোথেরাপি বা অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে চিকিৎসা (যেমন: TENS, IRR, Traction প্রভৃতি)। তবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় মেশিনের ব্যবহার অত্যন্ত নগণ্য।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কোথায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সেবা পাওয়া যাবে

সিআরপির শাখাসমূহ: ঢাকার সাভার, মিরপুর ১৪, সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রামের কালুরঘাট, বরিশাল, রাজশাহীতে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে, প্রাইভেট ক্লিনিক ও চেম্বারে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায়। তবে মানসম্পন্ন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার জন্য সিআরপি অন্যতম।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এবং সিআরপি

default-image

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা একটি বিজ্ঞানসম্মত ও সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাপদ্ধতি, যা আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। আমাদের দেশসহ বিভিন্ন দেশে ফিজিওথেরাপিস্টরা ফার্স্ট কনট্যাক প্রাকটিশনার হিসেবে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। তবে আমারদের দেশে এই চিকিৎসা সেবাটি বিভিন্ন মহলের অপপ্রচার (ব্যায়াম ও সেক) ও অপব্যবহারের (কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি পরামর্শ দেওয়া) কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এর মধ্যে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পায় না এবং অপচিকিৎসার শিকার হন (বিপিএ-২০০৯)। তবে আশার বিষয় হলো, মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন, তাই তারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও পরামর্শ নেওয়ার জন্য সিআরপির কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট এবং সিআরপিকেই বেছে নিচ্ছেন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট, সিআরপি, সাভার, ঢাকা। প্রকাশনা সম্পাদক: বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন