default-image
বিজ্ঞাপন

বিগত এক দশকে বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন বিশেষায়িত সুপারফুড, হেলথ ফুড–জাতীয় খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। আবার খাদ্যে কিনোয়ার মতো বিকল্প খাদ্যশস্য অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারেও অসম্ভব রকমের আগ্রহ বাড়ছে সারা দুনিয়ায়। মহাকাশবিজ্ঞানীরা তো এমনও ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে অন্য গ্রহে ফলানো প্রথম ফসলগুলোর একটি হবে এই কিনোয়া! কী আছে এই কিনোয়ায় যে দুনিয়াজুড়ে এর জয়জয়কার, তা সত্যিই আগ্রহ জাগায় মনে।

কিনোয়া কী

চাল, গম বা আলুর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন হোল গ্রেইন খাদ্য, যেমন ওটস বা যব, ফক্স টেল মিলেট (কাউন), বার্লি, কিনোয়া ইত্যাদির প্রচলিত করার ব্যাপারে যুগ যুগ ধরেই তাগিদ রয়েছে পুষ্টিবিদের তরফ থেকে। আবার এসব বিকল্প শর্করা খাদ্যের মধ্যে কিনোয়া কিন্তু একেবারেই আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এর কারণ হচ্ছে এটি আসলে বিট–জাতীয় এক গাছের বীজ। এটি প্রকৃতপক্ষে খাদ্যশস্য নয় বলে একে সিউডোসিরিয়াল বা ‘মিছামিছি শস্য’ বলা হয়। রান্না করলে এই কিনোয়াবীজ প্রায় চারগুণ ফুলে–ফেঁপে ওঠে এবং কিছুটা স্বচ্ছ দানাদার আকৃতি ধারণ করে। মৃদু স্বাদের কিনোয়া একেবারে গলে যায় না এবং কিছুটা চিবিয়ে খেতে হয়।

default-image

কিনোয়ার সেকাল–একাল

কিনোয়া কিন্তু খাদ্য হিসেবে অত্যন্ত প্রাচীন। উৎপত্তিগত দিক থেকে দক্ষিণ আমেরিকার এই ফসলের নিদর্শন ও বর্ণনা পাওয়া যায় প্রাচীন ইনকা সভ্যতার সাক্ষী সব পুরাকীর্তি খুঁজতে গিয়ে। নৃতত্ত্ববিদেরা জানিয়েছেন, সেই সাত হাজার বছর আগেই দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেস অঞ্চলে কিনোয়া ফলানো হতো। ইনকা ভাষায় একে কিনোয়া বা খাদ্যশস্যের জননী বলা হতো। একে পবিত্রও মনে করা হতো। এর কারণ, ইনকা যোদ্ধারা অমিত শক্তির অধিকারী হতেন কিনোয়া খেয়ে, এমনটাই বিশ্বাস ছিল প্রাচীন ইনকাদের মধ্যে। পরবর্তী সময়ে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা কিনোয়ার পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রীতিমতো অবাক হয়ে গেছেন। আধুনিক যুগে এই সুপারফুডের প্রচলন এতটাই সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় মনে করা হয় যে ২০১৩ সালটিকে আন্তর্জাতিক কিনোয়া বর্ষ ঘোষণা করা হয়েছিল জাতিসংঘের পক্ষ থেকে।

বিজ্ঞাপন
কিনোয়া হচ্ছে একমাত্র উদ্ভিজ্জ প্রোটিন উৎস, যাতে ৯ ধরনের এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড উপস্থিত আছে। বিশেষত লাইসিন নামের অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড আর কোনো উদ্ভিজ্জ আমিষ খাদ্য থেকে সেভাবে পাওয়া যায় না।

উচ্চমানের প্রোটিন–জাতীয় খাদ্য কিনোয়া

কিনোয়ার পুষ্টিমান আসলে বলে শেষ করার নয়। যে ব্যাপারটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, কিনোয়া একটি অত্যন্ত উচ্চ প্রোটিনসম্পন্ন খাবার। এক কাপ কিনোয়ায় ৮ থেকে ১০ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন পাওয়া যায়। তার চেয়েও বড় ব্যাপার, কিনোয়া হচ্ছে একমাত্র উদ্ভিজ্জ প্রোটিন উৎস, যাতে ৯ ধরনের এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড উপস্থিত আছে। বিশেষত লাইসিন নামের অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড আর কোনো উদ্ভিজ্জ আমিষ খাদ্য থেকে সেভাবে পাওয়া যায় না। উল্লেখ্য, অ্যামিনো অ্যাসিডই হচ্ছে প্রোটিন গঠনকারী রাসায়নিক উপাদান। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে কিনোয়া একটি অত্যন্ত উচ্চমানের ও সম্পূর্ণ আমিষজাতীয় খাদ্য। তাই আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের অপুষ্টি ও প্রোটিনের অভাব দূর করতে কিনোয়া অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

কিনোয়ায় আছে প্রচুর খাদ্য আঁশ

default-image

কিনোয়া আবার ডায়েটারি ফাইবারের অন্যতম ভালো উৎসও বটে। এক কাপ রান্না করা কিনোয়া দৈনিক খাদ্য আঁশের চাহিদার ২১ শতাংশ মেটাতে পারে। তাই এই খাদ্য গ্রহণ করলে পরিপাকতন্ত্র ভালো থাকে। সেই সঙ্গে আঁশ বেশি থাকায় কিনোয়া খাওয়ার পর অনেকক্ষণ ক্ষুধা পায় না। এ ছাড়া প্রচুর আঁশযুক্ত কিনোয়া খেলে হজম ভালো হয় বলে কিনোয়া খেলে যকৃতের উদ্দীপনায় বেশি বেশি পিত্তরস তৈরি হয়, যার একটি মূল উপাদানই হচ্ছে কোলেস্টেরল। ফলে রক্ত থেকে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেশ খানিকটা দূরীভূত হয়, এমনটাই এসেছে অনেক গবেষণাকর্মের ফলাফলে। গবেষণায় এমনটাও দেখা গেছে যে যাঁরা কিনোয়ার মতো উচ্চ পরিমাণ আঁশযুক্ত খাবার খেয়ে থাকেন, তাঁদের এলডিএল কোলেস্টেরলের সঙ্গে সঙ্গে দেহের অব্যবহৃত শর্করাজনিত চর্বি ট্রাই গ্লিসারাইডও কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা তাই মনে করেন, কিনোয়া নিয়মিত খেলে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের কোলেস্টেরল বা হৃদ্‌রোগের প্রকোপ অনেকটাই কমে যেতে পারে।

খনিজ পদার্থ ও ফাইটোনিউট্রিয়েন্টসের খনি কিনোয়া

কিনোয়ায় আমাদের দেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সব খনিজ খাদ্য উপাদান আছে খুব ভালো পরিমাণে। এক কাপ রান্না করা কিনোয়ায় আছে দৈনিক চাহিদার ৫৮ শতাংশ ম্যাঙ্গানিজ, ৩৯ শতাংশ ম্যাগনেশিয়াম, ১৯ শতাংশ ফোলেট, ১৫ শতাংশ আয়রন ও ৯ শতাংশ পটাশিয়াম। এ ছাড়া এসব মোটা দাগের পুষ্টি উপাদান ছাড়াও এখন পুষ্টিবিদেরা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টযুক্ত খাবার খাওয়ার ওপর জোর দেন। কিনোয়া কিন্তু এ ধরনের ফাইটোনিউট্রিয়েন্টসে ভরপুর।

এতে আছে কোয়েরসেটিন (Quercetin) ও ক্যাম্পফেরল (Kaempferol) নামের এ দুই ধরনের অত্যন্ত উপকারী অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট বা ফ্ল্যাভেনয়েড। এদের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাই মহামারির এই ভয়াবহ সময়ে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম গড়তে কিনোয়া ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।

এতে আছে কোয়েরসেটিন (Quercetin) ও ক্যাম্পফেরল (Kaempferol) নামের এ দুই ধরনের অত্যন্ত উপকারী অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট বা ফ্ল্যাভেনয়েড। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গবেষণাপত্রে প্রমাণ মিলেছে, এই ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট দুটি খুবই কার্যকর প্রদাহবিরোধী বা অ্যান্টি–ইনফ্ল্যামেটরি ভূমিকা রাখতে পারে। এদের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাই মহামারির এই ভয়াবহ সময়ে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম গড়তে কিনোয়া ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন ভেটেরিনারি গবেষণায় ক্যানসার প্রতিরোধেও আশা জাগানিয়া ফল দিচ্ছে কিনোয়া। তাই মানবদেহের ক্যানসার গবেষণায়ও কিনোয়াকে এগিতে রাখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিনোয়া

default-image

কিনোয়া আসলেই সত্যিকারের সুপারফুড। গ্লুটেন ফ্রি, লো-কার্ব, উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ কিনোয়ায় ক্যালরি একেবারে কম না হলেও (১ কাপে ২২০ কেক্যাল) এই ক্যালরি উপকারী বিভিন্নভাবে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণ করতেও কিনোয়া অত্যন্ত কার্যকর। আবার প্রচুর আঁশযুক্ত কিনোয়া খুবই নিম্ন গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত। অর্থাৎ এটি রক্তে দ্রুত শর্করা শোষণ ঘটায় না। এ কারণে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিনোয়া খুব ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, কিনোয়ার বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ এনজাইমও ডায়াবেটিস কমিয়ে আনতে পারে।

কীভাবে কিনোয়া খাবেন

default-image

অন্যান্য অনেক সুপারফুডের চেয়ে কিনোয়া আরেকটি কারণে অনন্য, তা হলো এটি খেতে বেশ সুস্বাদু। দ্বিগুণ পানিতে ২০ মিনিট রান্না করে নিলেই ঝরঝরে দানাদার কিনোয়া খাওয়ার জন্য উপযোগী হয়ে যায়। ঝাল, নোনতা, মিষ্টি যেকোনো স্বাদই এতে সহজে মানিয়ে যায়। দেশি কায়দায় কিনোয়ার খিচুড়ি, পায়েস করা যায়। পাশ্চাত্য কায়দায় সালাদ, পিলাফ, পুডিংও বানানো যায়। কিনোয়া চূর্ণ করে সেই আটা দিয়েও সাধারণ আটা–ময়দার মতো সবকিছুই বানানো যায়। আবার একটু সৃজনশীলতা খাটিয়ে লবণ, পেঁয়াজ, মরিচ ও শর্ষের তেলে মেখে খেলেও মন্দ হবে না সেদ্ধ কিনোয়া।
আমাদের দেশে বিভিন্ন সুপারশপ ও স্বাস্থ্যকর খাবারের বিশেষায়িত দোকান বা হেলথ ফুড স্টোরে সহজেই কিনোয়া পাওয়া যায়। অনেক অনলাইন শপও কিনোয়া বিক্রি করে। তবে সত্যি বলতে আমদানি করা কিনোয়ার দাম এ দেশে এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, কেজি প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। তবে অত্যন্ত আশার কথা হচ্ছে, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছর গবেষণার পর বাংলাদেশের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও পটুয়াখালীতে অতি সম্প্রতি কিনোয়া চাষের শুভ সূচনা হয়েছে।

অন্যান্য অনেক সুপারফুডের চেয়ে কিনোয়া আরেকটি কারণে অনন্য, তা হলো এটি খেতে বেশ সুস্বাদু। দ্বিগুণ পানিতে ২০ মিনিট রান্না করে নিলেই ঝরঝরে দানাদার কিনোয়া খাওয়ার জন্য উপযোগী হয়ে যায়। ঝাল, নোনতা, মিষ্টি যেকোনো স্বাদই এতে সহজে মানিয়ে যায়। দেশি কায়দায় কিনোয়ার খিচুড়ি, পায়েস করা যায়। পাশ্চাত্য কায়দায় সালাদ, পিলাফ, পুডিংও বানানো যায়।

ব্যাপকভাবে প্রচলন করা গেলে যেকোনো প্রতিকূল ভূমিতে ভালো ফলন দেওয়া সুপারফুড কিনোয়া দেশে আনতে পারে পুষ্টিবিপ্লব। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যথেষ্ট উচ্চ তাপে রান্না করলেও কিনোয়ার পুষ্টিগুণ তেমন নষ্ট হয় না, যেমনটি হয় বেশির ভাগ হেলথ ফুডের ক্ষেত্রে। অদূর ভবিষ্যতে সুস্বাদু কিনোয়ার সবজি খিচুড়িতেই হয়তো একসময় আমরা বৃষ্টি–বাদলের দিন উদ্‌যাপন করব অথবা কিনোয়ার পায়েসেই মিষ্টিমুখ করব পারিবারিক বা সামাজিক উৎসবের দিনে।

পুষ্টি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন