ছবি: টিজানা দ্রেন্ডারস্কি, পেকজেলসডটকম
ছবি: টিজানা দ্রেন্ডারস্কি, পেকজেলসডটকম

কয়েক বছর ধরে ডায়েট ট্রেন্ডে বেশ আলোচিত একটি নাম ভেগানিজম। প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধের দাবি থেকে শুরু হওয়া ভেগান ডায়েট এখন পরিবেশবাদী ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে। সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে আমিষ খাবারের উদ্ভিজ্জ বিকল্প। আর এই তালিকার শীর্ষে আছে দুধ। বিভিন্ন দেশেই প্রাচীনকাল থেকে উদ্ভিজ্জ দুধ খাওয়া হচ্ছে। তবে ভেগানিজমের জন্যই গত কয়েক বছরে সারা বিশ্বে এর ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে।

বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রাণিজ দুধ ব্রণ, একজিমা, রোজেশিয়ার মতো ত্বকের সমস্যার জন্য কিছুটা হলেও দায়ী। অন্য আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, দুধের অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম প্রোস্টেট এবং এতে থাকা চিনি ডিম্বাশয় ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই শুধু ভেগান নন, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ প্রাণিজ দুধ ছেড়ে উদ্ভিজ্জ দুধের দিকে ঝুঁকছেন।  অন্যদিকে, যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের মতো সমস্যা আছে, তাঁরাও দুধের চাহিদা উদ্ভিজ্জ দুধ দিয়ে মেটাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

নারকেল দুধ

default-image

দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে খাদ্যসংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উপাদান নারকেল। এ অঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলোয় রান্নার বিভিন্ন পদে নারকেল দুধের ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নারকেলের ভেতরের সাদা অংশ থেকে দুধ বানানো হয়। ঘরেই এই দুধ বানানো যায়। এ ছাড়া প্যাকেটেও কিনতে পাওয়া যায়। ঝাল ও মিষ্টি খাবারের স্বাদ বাড়াতে নারকেলের দুধের জুড়ি মেলা ভার। ১ কাপ (২৪০ মিলি) নারকেলের দুধে রয়েছে ৪৬ ক্যালরি, ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ও ৪ গ্রাম চর্বি। প্রোটিন না থাকলেও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ দুধের চেয়ে এতে চর্বির পরিমাণ অনেক বেশি। তবে এর মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য খুবই উপকারী। এই মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড ফ্যাটি অ্যাসিড, রক্তে এইচডিএল, অর্থাৎ ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে।

সয়া দুধ

default-image

এটিকে গরুর দুধের সর্বোৎকৃষ্ট বিকল্প হিসেবে ধরা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যের চীন ও কোরিয়াতে অনেক আগে থেকেই এই দুধ খুব জনপ্রিয়। সয়াবিন থেকে সয়া দুধ তৈরি করা হয়। এতে রয়েছে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, চর্বি, ভিটামিন বি১২, ক্যালসিয়াম, রিবোফ্লোবিন, ভিটামিন ডি এবং ফসফরাস। ১ কাপ বা ২৪০ মিলি সয়া দুধে রয়েছে ১০৫ ক্যালরি, ৬ গ্রাম প্রোটিন, ১২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ও ৪ গ্রাম চর্বি। যাঁরা নানা কারণে গরুর দুধ খেতে চান না, তাঁদের জন্য প্রোটিনের একটি দুর্দান্ত উৎস হতে পারে সয়া দুধ। পুষ্টিকর এ দুধ সম্পর্কে লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক প্ল্যান্ট বেসড ফুড ডায়েটেশিয়ান এবং ‘দ্য ভেজিটারিয়ান ডায়েট’ বইয়ের লেখিকা জুলিয়ানা হিভার বলেন, সয়া দুধে আছে প্রয়োজনীয় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, ফ্ল্যাভোনয়েডসহ অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি এবং কার্ডিওপ্রোটেক্টিভ উপাদান। সয়া দুধ হৃদ্‌রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। এর আইসোফ্লাভোনস শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বাড়াতে পারে বলে, এটি মেনোপজের উপসর্গ কমাতে সহায়তা করে।

বিজ্ঞাপন

আমন্ড দুধ

default-image

উদ্ভিজ্জ দুধের ভেতর আমন্ড দুধের জনপ্রিয়তা গত চার পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্মুদি, চা-কফি ও ডেজার্ট আইটেমে গরুর দুধের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কিছু বড় বড় কফিশপে গরুর দুধের পাশাপাশি আমন্ড দুধের অপশন রাখা হচ্ছে। ১ কাপ বা ২৪০ মিলি চিনিবিহীন আমন্ড দুধে রয়েছে ৪১ ক্যালরি, ১ গ্রাম প্রোটিন, ২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ৩ গ্রাম চর্বি। গরুর দুধের চেয়ে পুষ্টির মান কম থাকা সত্ত্বেও এই দুধের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। কারণ, আমন্ড দুধ ভিটামিন ই–এর খুব ভালো একটি প্রাকৃতিক উৎস। ফ্রি র‍্যাডিকেলের জন্য শরীরে যেসব রোগ (পারকিনসন, ক্যানসার, আলঝেইমার ইত্যাদি) হয়ে থাকে, সেসব রোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষমতা রাখে এই দুধের ভিটামিন ই। অনেক সুপারশপেই আমন্ড দুধ কিনতে পাওয়া যায়। তবে তা অনেক ব্যয়বহুল। অবশ্য খুব সহজে ঘরেই আমন্ড দুধ বানানো যায়। এ জন্য ১৬০ গ্রাম আমন্ড প্রায় ৬ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর ৭৫০ মিলিলিটার কুসুম গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে ব্লেন্ড করে, মার্কিন বা সুতি কাপড় দিয়ে ভালো করে ছেঁকে নিলেই তৈরি সুস্বাদু আমন্ড দুধ। চাইলেই স্বাদ বাড়াতে এতে ২ টুকরা খেজুর ও ভ্যানিলা এসেন্স যোগ করা যেতে পারে। ফ্রিজে রেখে অনেক দিন ব্যবহার করা যাবে এই দুধ।

ওট দুধ

default-image

বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্যকর প্রাতরাশের তালিকার শীর্ষস্থানটি এখন ওটসের দখলে। এই ওট থেকেও দুধ তৈরি করা যায়। গত দুই-তিন বছরে ইউরোপ আমেরিকাতে ওট দুধের উৎপাদন ও বিক্রি অনেক বেড়েছে। অনেক হেলদি বেভারেজের প্রধান উপাদান হিসেবে এই দুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। ২৪০ মিলিলিটার ওট দুধে রয়েছে ১২০ ক্যালরি, ৩ গ্রাম প্রোটিন, ৫ গ্রাম চর্বি, ১৬ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ও ২ গ্রাম ডায়েট্রি ফাইবার। এ ছাড়া আরও আছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, রিবোফ্লোবিন, পটাশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন বি১২, ভিটামিন এ ও ডি। উদ্ভিজ্জ দুধের ভেতর পুষ্টিগত দিক দিয়ে সয়া দুধের পরই ওট দুধের অবস্থান। রিবোফ্লোবিন মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ত্বক, নখ, চুলের জন্য বিশেষ উপকারী। এটি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব মানুষ টানা পাঁচ সপ্তাহ প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ মিলিলিটার ওট দুধ পান করে, তাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমেছে ৩ শতাংশ এবং খারাপ কোলেস্টেরল, অর্থাৎ এলডিএলের মাত্রা কমেছে ৫ শতাংশ। ওট দুধে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, যা সুস্থ ও সুগঠিত হাড় গঠনে সহায়তা করে এবং অস্টিওপরোসিসের মতো হাড়ের রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।

তথ্যসূত্র: হেলথলাইন, প্রো ভেগ, এভরিডে হেলথ, বিবিসি গুডফুড, ইকো ওয়াচ, লাভিংইটভেগান

মন্তব্য পড়ুন 0