কিশমিশের যাদু

বাঙালিদের কিশমিশপ্রেম নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিশমিশ যে শুকনা আঙুর, সেটা কারোই অজানা নয়। এর আবার রয়েছে অনেক রূপ।

default-image

কিশমিশের ইংরেজি হচ্ছে রেইজিন। তবে রেইজিন কিন্তু সব কিশমিশ নয়! এ নিয়ে নানা দেশে বিভ্রান্তির কোনো শেষ নেই। আমাদের দেশে যে সোনালি রঙের ছোট-বড় আকৃতির সুন্দর কিশমিশ পাওয়া যায়, তাকে ‘সুলতানা’ বলা হয়। বীজহীন সবুজ আঙুর থেকে হয় এটি। আর কালো আঙুর থেকে হয় ‘রেইজিন’। এটি দেখতে সুলতানা থেকে কালো বা একটু বেশি বাদামি রঙের হয়ে থাকে। এই দুটি ছাড়াও ‘কারেন্ট’ নামের কিশমিশ রয়েছে। কারেন্ট সুলতানা ও রেইজিনের চেয়ে আকৃতিতে ছোট ও স্বাদে একটু টক ধাঁচের হয়ে থাকে। এ জন্য ইউরোপ আমেরিকায় মিষ্টির পাশাপাশি ঝাল খাবারে এটি ব্যবহৃত হয়।

বিজ্ঞাপন

পুষ্টি উপাদান

যেহেতু আমাদের দেশে ‘সুলতানা’ বেশি পাওয়া যায়, সেহেতু এর গুণাগুণ সম্পর্কে বলা দরকার। এতে রয়েছে প্রচুর পুষ্টিগুণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আঙুরের চেয়ে বেশি। এ জন্য পুষ্টিবিদেরা প্রতিদিন অল্প পরিমাণে হলেও কিশমিশ খেতে বলেছেন।
এক আউন্স বা ২৮ গ্রাম সোনালি কিশমিশ বা সুলতানায় আছে ১০৬ ক্যালরি। এ ছাড়া আছে ২২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১ গ্রাম প্রোটিন, ২ গ্রাম আঁশ ও ২১ গ্রাম চিনি। এতে আরও রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, কপার ও পটাশিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদান।

default-image

হজমে সহায়তা করে

দেড় কাপ কিশমিশে আছে ৩.৩ গ্রাম ফাইবার বা আঁশ। বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী শরীরের এটি সারা দিনের ফাইবারের চাহিদার ১০ থেকে ২৪ শতাংশ পূরণ করে। আমরা মোটামুটি সবাই জানি, ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ভালো কাজ করে।

রক্তাস্বল্পতা কমায়

কিশমিশ অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এটি আয়রনের খুব ভালো উৎস। দেড় কাপ কিশমিশে ১.৩ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। এই পরিমাণ কিশমিশ একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর শরীরের দৈনিক আয়রনের চাহিদার ৭ শতাংশ এবং পুরুষের চাহিদার ১৬ শতাংশ পূরণ করতে পারে।

আয়রন ছাড়াও এতে রয়েছে কপার, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়াম। আয়রন শরীরের লোহিত রক্তকণিকা তৈরি ও কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর এই কাজে আয়রনকে সাহায্য করে কপার, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়াম। তাই আয়রনজনিত অ্যানিমিয়ার সমস্যা হলে খাদ্যতালিকায় রাখুন কিশমিশ।

বিজ্ঞাপন

হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য

মাত্র আধা কাপ কিশমিশে রয়েছে ৪৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, অর্থাৎ দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদার ৪ শতাংশ। পোস্ট মেনোপজের ভেতর দিয়ে যাওয়া নারীদের জন্য কিশমিশ হতে পারে একটি দুর্দান্ত নাশতা।

জানলে অবাক হবেন যে মাত্র আধা কাপ কিশমিশে রয়েছে ৪৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, অর্থাৎ দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদার ৪ শতাংশ। আর এ তো জানা কথা যে মজবুত হাড় ও দাঁতের জন্য ক্যালসিয়ামের বিকল্প কেবল ক্যালসিয়ামই। তাই পোস্ট মেনোপজের ভেতর দিয়ে যাওয়া নারীদের জন্য কিশমিশ হতে পারে একটি দুর্দান্ত নাশতা। এতে পেটও ভরবে, সঙ্গে অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট ক্যালসিয়ামও পাওয়া যাবে।

এতে আরও আছে বোরোন নামের একটি খনিজ। একে অনেকটা ক্যালসিয়ামের ‘সাইড কিক’ বলতে পারেন। কারণ, এরা একসঙ্গে হাড়ের গঠন মজবুত করতে পারে। অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওআরথ্রাইটিসের জন্য বোরোন খুবই ভালো একটি উপাদান।

আছে অপ্রত্যাশিত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট

অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট রক্ত থেকে ফ্রি র‍্যাডিক্যাল সরিয়ে ফেলে কোষ ও ডিএনএকে সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া এটি মস্তিষ্কের জন্য বিশেষ উপকারী।

কিশমিশ ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস, যেমন ফেনল, পলিফেনলসের মতো রাসায়নিক উপাদানের ব্যতিক্রম প্রাকৃতিক উৎস। ফাইটোনিউট্রিয়েন্টসগুলো একধরনের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট রক্ত থেকে ফ্রি র‍্যাডিক্যাল সরিয়ে ফেলে কোষ ও ডিএনএকে সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া এটি মস্তিষ্কের জন্য বিশেষ উপকারী। আলঝেইমার, ডিমেনশিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা আছে এই ফাইটোনিউট্রিয়েন্টসের।

ক্যাভিটি প্রতিরোধে

মিষ্টি হলেও দাঁতের সুরক্ষার জন্য অনায়াসে খেতে পারেন কিশমিশ। ২০০৯ সালে অক্সফোর্ড একাডেমিকের ‘দ্য জার্নাল অব নিউট্রিশন’–এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশমিশে রয়েছে বিশেষ ধরনের ফাইটোকেমিক্যাল, যা দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে। এই ফাইটোকেমিক্যাল, যেমন অলিনলিক অ্যাসিড, লিনোলেয়িক অ্যাসিড ও লিনোনেয়িক অ্যাসিড মুখের ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে লড়াই করে দাঁতকে ক্যাভিটি থেকে রক্ষা করে।

default-image

চোখের জন্য

কিশমিশের পলিফেনিল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। এ ছাড়া এতে আছে ভিটামিন এ, বিটাক্যারটিন ও ক্যারোটিনয়েড। এরা যে চোখের বিশেষ বন্ধু, তা কে না জানে!

ঘরেই বানাই কিশমিশ

ঘরে কিশমিশ বানানো কিন্তু বেশ সহজ! শুধু বাজার থেকে আঙুর কিনে আনবেন, বোঁটা ছাড়াবেন আর ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকাতে দেবেন। ব্যস! হয়ে গেল। এভাবে টানা এক মাস রোদে শুকালেই তৈরি আপনার সুস্বাদু ও পুষ্টিতে ভরপুর কিশমিশ।

তথ্যসূত্র: হেলথ লাইন, স্টাইল ক্রেজ, মেডিকেল নিউজ টুডে, ওয়েল অ্যান্ড গুড

পুষ্টি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন