default-image
বিজ্ঞাপন

কিশোর বয়স ছেলে–মেয়ে উভয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শরীরের বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এ পরিবর্তনকে সুষ্ঠুভাবে হতে দেওয়ার জন্য খাবারদাবারের গুরুত্ব অপরিসীম।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের ক্যালরি, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রনসহ বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। কারণ, এই বয়সে শারীরিক বিকাশ ও বৃদ্ধি, পড়ালেখায় মনোনিবেশ, খেলাধুলা ও শরীরচর্চামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে হয় বলে কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিত করতে হয়।

এ ছাড়া টাইপ টু ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমাতেও কিশোর-কিশোরীদের জন্য একটি সুষম ও স্বাস্থ্যকর ডায়েট অত্যন্ত জরুরি।

যা খেতে হবে, যে কারণে খেতে হবে

ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধি

এ জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত ক্যালরি নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণত প্রতিদিন কিশোরীদের ১ হাজার ৬০০–২ হাজার ২০০ ক্যালরি এবং কিশোরদের ১ হাজার ৮০০-২ হাজার ৬০০ ক্যালরি প্রয়োজন হয়। এ পরিমাণ ক্যালরি তাদের শক্তি সরবরাহের পাশাপাশি উচ্চতা বৃদ্ধি ও শরীরে ওজন ঠিক রাখতে সহায়তা করবে। তবে এটি নির্ভর করে শারীরিক ক্রিয়াকলাপের হারের ওপর।

default-image

বর্তমানে কিশোরীরা নিজেকে ফিট রাখতে পর্যাপ্ত খাবার খায় না বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকে, যাকে বলে ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’। এ জন্য তাদের রক্তস্বল্পতা, হাড় দুর্বলতা ও অনিয়মিত ঋতুস্রাবের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব থেকে মুক্ত থাকতে মূল খাবারের ফাঁকে ফাঁকে পুষ্টিকর ও ক্যালরিযুক্ত হালকা খাবার বা নাশতা খেতে হবে। এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে গাজর বা ডালের হালুয়া, ডিমের পুডিং, মুড়ির মোয়া, চিনাবাদামের মুড়কি, ডালপুরি, নারকেল বরফি, খিচুড়ি ইত্যাদি। এসব খাবার ক্যালরি বৃদ্ধির পাশাপাশি থায়ামিন, রিবোফ্লোবিন ও নায়াসিনের চাহিদাও পূরণ করবে এবং খাওয়ার অরুচি দূর করবে। তবে আগে থেকে ওজন বেশি থাকলে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে খাবার খেতে হবে।

default-image

ত্বক ও চুল গঠনে

কিশোর–কিশোরীদের ত্বক ও চুল গঠনে স্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত খাবার গুরুত্বপূর্ণ। এ খাবারগুলো ফ্যাট হরমোন নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে থাকে। এ জন্য খাবারে অস্বাস্থ্যকর চর্বির পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নিতে হবে, যা প্রতিদিনের মোট ক্যালরির ২৫-৩৫ শতাংশ হবে। এর ভালো উত্স হলো বিভিন্ন প্রকার বাদাম ও মিষ্টিকুমড়ার বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, চিয়াবীজ, তিল ও তিসিবীজ, জলপাই তেল, অ্যাভোকাডো। এগুলোতে ভালো ফ্যাটের পাশাপাশি ভিটামিন ই এবং ওমেগা থ্রি ফ্যাটিঅ্যাসিডও থাকে, যা কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্ক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞাপন

পেশি বৃদ্ধি

প্রোটিন শরীরের পেশি বৃদ্ধি ও অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সহায়তা করে, যা সাধারণত ১১–১৮ বছর বয়সের মধ্যে দ্বিগুণ হয়। উভয় লিঙ্গের জন্য ১ দশমিক শূন্য থেকে ১ দশমিক ২ গ্রাম প্রোটিন যথেষ্ট। এ জন্য সপ্তাহে কমপক্ষে চার দিন মাছ, মাংস, দুধ, কলিজা, ডিম খেতে হবে। যারা নিরামিষভোজী, তারা বিভিন্ন প্রকার ডাল, শিমের বিচি, ছোলা, মটরশুঁটি, মাশরুম, সয়াবিন খেতে পারে।

default-image

হাড় ও দাঁত গঠন এবং অস্টিওপোরাসিসের ঝুঁকি রোধে

কিশোর-কিশোরীদের হাড় ও দাঁত গঠনে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি প্রয়োজন, যা ভবিষ্যতে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। এ জন্য সপ্তাহে কমপক্ষে তিন দিন দুধ ও দুধজাতীয় খাবার খেতে হবে। এ ছাড়া কিশোর-কিশোরীরা খেতে পারে ডিমের কুসুম, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি। যারা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু বা দুধে অ্যালার্জি আছে যাদের, তারা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেবে এসব খাওয়ার জন্য। এ ছাড়া ভিটামিন ডি পেতে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে ১৫-২০ মিনিট রোদে থাকতে হবে।

রক্তস্বল্পতা

১০-১৭ বছর বয়সে কিশোর–কিশোরীদের শরীরে নানা রকমের হরমোনজনিত পরিবর্তন দেখা দেয়, যেমন মেয়েদের পিরিয়ড হওয়া আর ছেলেদের মুখে লোম গজানো, কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। কিশোরীদের পিরিয়ডের সময় প্রায় ২০ শতাংশ রক্ত হারিয়ে যায়। এ সময় সঠিক পুষ্টি না পেলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেবে। এ থেকে রক্ষা পেতে শরীরে রক্ত তৈরির জন্য পর্যাপ্ত আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড দরকার। তাই মেয়েদের নিয়মিত ডিম, কলিজা, মাংস, খেজুর, কিশমিশ, বেদানা, আনার, সফেদা বিভিন্ন রকমের ফল, সবুজ শাকসবজি, কচুশাক, লালশাক, পালংশাক, পাতাযুক্ত সবজি, ডাল খেতে হবে। এসব আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডযুক্ত খাবার ভালোভাবে শরীরে শোষিত হওয়ার জন্য খেতে হবে ভিটামিন সি। ভিটামিন সির মধ্যে খেতে হবে লেবু, আমলকী, কাঁচা মরিচ, কমলালেবু ইত্যাদি যেকোনো টক ফল।

default-image

মস্তিষ্ক বিকাশে

কিশোর-কিশোরীদের এ সময় শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক বিকাশে সরাসরি প্রভাবিত করে আয়োডিন। এ আয়োডিনের ঘাটতিতে কিশোর-কিশোরীদের বুদ্ধিহীনতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিনের ঘাটতি হলে হতে পারে গলগণ্ড ও সন্তান ধারণে জটিলতা। তাই আয়োডিনসমৃদ্ধ খাবার, যেমন সামুদ্রিক মাছ সপ্তাহে অন্তত ২ দিন, খাবারে আয়োডিনযুক্ত লবণের ব্যবহার, সমুদ্রের কাছাকাছি মাটিতে জন্মানো শাকসবজি বা ফল খেতে হবে।

রোগ প্রতিরোধে

কিশোর-কিশোরীরা পর্যাপ্ত শাকসবজি খেতে চায় না। ফলে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণে ভোগে। বিভিন্ন রঙের শাকসবজি খেলে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারের পাশাপাশি ভালো মানের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। এগুলো বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। শাকসবজি খেলে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতাও কম হবে।

default-image

তরল খাবার

কিশোর-কিশোরীদের পর্যাপ্ত পানির চাহিদা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা, এ সময় তারা খেলাধুলা করে, পড়াশোনার চাপে থাকে। তবে সবার পানির চাহিদা আলাদা। ৯-১৩ বছর বয়সে কিশোরীদের জন্য ২ দশমিক ১ লিটার ও কিশোরদের জন্য ২ দশমিক ৪ লিটার পানি প্রয়োজন। ১৪-১৮ বছর বয়সে মেয়েদের ২ দশমিক ৩ লিটার ও ছেলেদের ৩ দশমিক ৩ লিটার পানির চাহিদা থাকে। এই পানির চাহিদা পূরণের জন্য পানি ছাড়াও তারা ফলের রস, দুধ, স্যুপ ইত্যাদি তরল খাবার খেতে পারে। আর বাইরের অস্বাস্থ্যকর কার্বোনেটেড ড্রিংকস, জুস, অ্যালকোহল গ্রহণ করা চলবে না।

মাইন্ডফুল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে

মাইন্ডফুল খাওয়ার অর্থ খাবারটি টেবিলে বসে আস্তে আস্তে চিবিয়ে পুরোপুরি মনোযোগের সঙ্গে খাওয়া। আজকাল কিশোর-কিশোরীরা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে বা টেলিভিশন দেখতে দেখতে খাবার খায়। ফলে খাবারে খুব মনোযোগ থাকে না। পেট ভরলেও তাই খাবার শরীরের জন্য খুব ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না। এ জন্য পিতা–মাতাদের ও পরিবারের সবাইকে মাইন্ডফুল খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

কিশোর-কিশোরীদের কিছু করণীয়

  • সকালের খাবার বাদ দেওয়া যাবে না। সকালের খাবার না খেলে সারা দিনের পর্যাপ্ত শক্তি পাওয়া যাবে না। প্রয়োজনে সকালে নিজের খাবার বানাতে পিতা–মাতাকে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি স্কুলের টিফিনে স্বাস্থ্যকর খাবার বহন করা শিখতে হবে। সহজ উপায়ে পাওয়া যায়, তেমন মৌসুমি তাজা ফল খেতে হবে নিয়মিত। এ ছাড়া কলা, শুকনা ফল, খেজুর, কিশমিশ, একটি সেদ্ধ ডিম, শসা রাখতে হবে স্কুল বা কলেজের ব্যাগে।

  • ফ্যাট ডায়েট অনুসরণ করা যাবে না। আজকাল কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে প্রচুর তথ্য পায়, যা দেখে তারা অনেক কিছু অনুকরণ করে। এটি ভবিষ্যতে তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

  • নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা থাকে কিশোর-কিশোরীদের। বিশেষ করে কিশোরীদের এ প্রবণতা থাকে বেশি। তারা নিজেকে শারীরিকভাবে ফিট দেখতে চায়। এ জন্য খাবারদাবারের প্রতি তাদের একধরনের উদাসীনতা তৈরি হয়। এভাবে দীর্ঘদিন চললে শরীরে বিভিন্ন ভিটমিন ও মিনারেলের অভাব হয়।

default-image
  • শরীরচর্চামূলক ক্রিয়াকলাপে যুক্ত থাকতে হবে। এ জন্য যে জিমে যেতে হবে, এমন নয়। বাড়িতে টিভি বা কম্পিউটারে বেশি সময় না দিয়ে প্রতিদিন নতুন একটি খেলা বা শক্তি ক্ষয় হয়, তেমন একটি কাজের চেষ্টা করতে হয়। যেমন হাঁটা, ব্যাডমিন্টন খেলা, নাচার চেষ্টা করা, সাঁতার কাটা, যোগব্যায়াম করা, বাস্কেটবল খেলা ইত্যাদি। এ ছাড়া বাড়িতে বাগান করার মতো শখের কোনো কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এসব কাজ শরীরকে গতিশীল রাখবে।

  • মিষ্টিজাতীয় খাবার সীমিত করতে হবে। কিশোর-কিশোরীরা ক্যান্ডি, চকলেট, কুকিজ ও চিনিযুক্ত খাবার বেশি খায়। এসব খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবার কম থাকায় ক্ষুধা ওঠানামা করতে পারে, স্থূলতাসহ নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া এ খাবারগুলো ঘুম ও কর্মদক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

  • ফাস্ট ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া বন্ধ করতে হবে। কারণ, এসব খাবারে প্রচুর ফ্যাট, সোডিয়াম ও শর্করা থাকে। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। ঘুম শরীর ও মনকে শিথিল করে, স্ট্রেস ফ্রি করে, যা কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক বৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য গঠনে সহায়তা করে।

লেখক: পুষ্টিবিদ, ঠাকুরগাঁও ডায়াবেটিক ও স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতাল

পুষ্টি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন