অলংকরণ: এসএম রাকিবুর রহমান
অলংকরণ: এসএম রাকিবুর রহমান

বাসুদেব রাজবংশীর একটা গান আছে: কলিজাতে গো/ কলিজাতে দাগ লেগেছে হাজার হাজার আমার/ ভালোবাসার ময়না পাখি এখন জানি কার

ভালোবাসার ময়না পাখি চলে যাওয়া দুঃখে যেমন দাগ লাগে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত কিংবা অসচেতন যাপনও আপনার কলিজায় দাগ ফেলতে পারে। সেই দাগ কখনো কখনো অমোচনীয় হয়ে জীবনহন্তারক হয়ে ওঠে। এ জন্যই প্রয়োজন কলিজাকে ঠিকঠাক রাখা। সুস্থ ও প্রাণবন্ত। কারণ, আমাদের শরীরের ভেতরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ এই কলিজা বা যকৃৎ। আমরা যা খাই, তাকে পুষ্টিতে রূপান্তর করে যকৃৎ। পাশাপাশি, টক্সিনকে ছেঁকে নিয়ে ভেঙে ফেলে শরীর থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে

default-image

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে যকৃতের কাজকে আমরা সহজ করে দিতে পারি। যকৃৎকে সুস্থ রেখে পরোক্ষে আমরাও ‍সুস্থ থাকতে পারি। এ জন্য আমাদের রসনায় একটু লাগাম টানতে হবে। সঠিক খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। আহারে ভারসাম্য বজায় রাখতে হোল গ্রেন, ফলমূল, শাকসবজি আর প্রোটিনের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

শাকসবজি

default-image

ফ্রি র‌্যাডিক্যাল আর মলিকিউল নানান সমস্যা সৃষ্টি করে লিভারকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। এর হাত থেকে রক্ষা পেতে বর্ম হিসেবে কাজ করে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, যা মেলে শাকসবজিতে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে এমন সব উপাদান। এগুলো আবার আঁশের ভালো উৎসও। ফলে, আঁশও লিভারকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু যাদের গাউট রয়েছে, তাদের জন্য অনেক শাকসবজি গ্রহণ করা নিষেধ। ফলে, একটির ভালো করতে গিয়ে অন্যটির মন্দ করা যাবে না।

লেবু/কমলালেবু

default-image

সাইট্রাস হলো দারুণ শক্তিশালী অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, যা যকৃৎকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। তবে অন্য কোনো ধরনের ওষুধ সেবন করতে থাকলে লেবু খাওয়ার ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া একান্ত জরুরি।

বিজ্ঞাপন

ওট

default-image

ওটে ভরপুর ফাইবার। নাশতায় অনেকেরই বেশ প্রিয়। লিভারের প্রদাহ রোধেও ওট কার্যকর। রক্তে শর্করর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ ও ইলেক্ট্রোলাইটসের ভারসাম্য বজায় রাখতেও উচ্চ আঁশযুক্ত ওট বিশেষ ভূমিকা রাখে।

লাল চাল/লাল আটা
এই দুটোতেও মেলে যথেষ্ট পরিমাণে আঁশ, যা লিভারকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

লাল আপেল

default-image

যাঁরা ফ্যাটি লিভার ও ওবেসের সমস্যায় আছেন, তাঁদের জন্য লাল আপেল যথেষ্ট উপকারী। আর এটা খেতে হবে খোসাসহ। এতে যথেষ্ট পরিমাণে ফাইবার আছে। আছে ভিটামিন ও মিনারেল। আর এই তালিকায় আরও রাখতে পারেন কলা, স্ট্রবেরি ও কিশমিশ।

মুরগির ব্রেস্ট

default-image

শরীরের জন্য প্রয়োজন প্রোটিন। কারণ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পুষ্টি নিশ্চিত করতেই প্রোটিন একান্ত আবশ্যক। যকৃতের ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য, তবে ফ্যাট নয়। এ জন্য চামড়া ছাড়ানো মুরগির মাংস। বিশেষ করে বুকের মাংস গ্রিল বা বেক করে খেতে হবে, ভেজে নয়।

বিজ্ঞাপন

স্যামন/ইলিশ

default-image

প্রোটিনে ভরপুর এই মাছ। আরও পাওয়া যায় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, যা কোলেস্টেরল কমায়। প্রদাহ দূর করে আর শরীরের ওজন ঠিক রাখে। লিভারের জন্যও কার্যকর। এ জন্য সপ্তাহে দুই থেকে চার টুকরো খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু কথা হলো, এই মাছ তো এখানে তেমন ‍সুলভ নয়। আর যাও মেলে, দাম বেশ চড়া। সে জন্য সামনের দারুণ বিকল্প হতে পারে ইলিশ। এখানে মাথায় রাখতে হবে কিডনির কোনো জটিলতা থাকলে লিভারের ভালো করতে গিয়ে কিডনির মন্দ করা যাবে না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেই হবে।

আখরোট

default-image

লিভারের জন্য যেকোনো বাদাম বেশ কাজের। বিশেষ করে আখরোট। এতেও আছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। তবে দিনে ১০টির বেশি খাওয়া যাবে না। কারণ, বেশি ভালো নয়, তাহলে আবার ফ্যাট আর ক্যালোরি বেড়ে যাবে।

লেনটিল স্যুপ

default-image

সোজার বাংলায় আমাদের ডাল। মাংস না খেয়ে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে ডালের বিকল্প নেই। সঙ্গে মিলবে প্রচুর আঁশ। এতে নেই মন্দ স্যাচুরেটেড ফ্যাট। ফলে, ডাল হতে পারে দারুণ উপকারী। কিন্তু এখানেও কথা আছে; গাউট থাকলে ডাল খাওয়া যাবে না।

স্বাস্থ্যকর তেল

default-image

খাদ্যতালিকা থেকে অস্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যেমন: মাখন আর মার্জারিন বাদ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে এক্সট্রা-ভার্জিন অলিভ অয়েল আর ক্যানোলা অয়েল। তা সে আপনি রান্নাই করে কিংবা বেকিং। এই তেল সামান্য হলেই হবে।

গরম কফি

default-image

সকালে কফি পানের অভ্যাস অনেকেরই আছে। আর এখন তো বাংলাদেশে কফি পানের প্রবণতা বাড়ছে। দিনে এক কাপ কফি কিন্তু লিভারকে চাঙা রাখে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত না করলেও গবেষণায় উঠে এসেছে, দিনে এক কাপ কফি লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। এমনকি আরও জানা গেছে, কফিতে থাকা বিভিন্ন উপাদান সিরোসিস, লিভার ফাইবোসিসসহ লিভারের নানা জটিল রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।

গ্রিন টি

default-image

গ্রিন টি তো এখন ট্রেন্ড। কারণ, এতে আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। সঙ্গে মেলে আরও নানা উপাদান, যা লিভারকে সুস্থ রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এমনকি নিয়মিত সবুজ চা সেবনে ফ্যাটি লিভার, হেপাটাইটিস, সিরোসিসসহ লিভারের নানা জটিল রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।

পানি

default-image

লিভারের জন্য পানি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিয়মিত এবং যথেষ্ট পরিমাণে পানি খেতে হবে। কেবল লিভার কেন, কিডনির জন্যও তো প্রয়োজন।

না বলুন

default-image

লিভারকে সুস্থ রাখার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের পাশাপাশি এমন কোনো খাবার খাওয়া যাবে না, যা হিতে বিপরীত করতে পারে। তাই বাদ দিতে হবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট আছে, এমন সব খাবার, যেমন: ফ্রাই, প্রক্রিয়াজাত খাবার আর অবশ্যই মদ। কারণ, এসবই লিভারের জন্য দারুণ হানিকারক। এ ছাড়া ডিটক্স করা যাবে না। সাফসুতরা করা করার বিষয়টি শুনতে ভালো লাগলেও সেটা কাজের কথা নয়; কারণ এখনো কোনো গবেষণায় প্রমাণিত হয়নি, নির্দিষ্ট কোনো ডায়েট যকৃতের টক্সিন পরিষ্কার করতে ভূমিকা রাখে। কারণ, লিভার নিজেই এ কাজ করতে পারঙ্গম। এ ছাড়া ডিটক্সের সাইড এফেক্টও হয়ে থাকে।

শেষ কথা, কোনো কিছু করার আগে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে করাই শ্রেয়। কারণ, ভালো করতে গিয়ে মন্দ করার কোনো কারণ নেই। তাহলে কলিজার দাগ দূর করতে গিয়ে দাগ পড়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: ওয়েবএমডি

পুষ্টি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন