ছবি: পেকজেলসডটকম
ছবি: পেকজেলসডটকম

সারা দিন রোজা রাখার পর অনেকেই ইফতার কিংবা সাহ্‌রিতে অনেক বেশি খান। বিশেষ করে ভাজাভুজি খেয়ে থাকেন। এতে রোজা রাখার সুফল পেতে ব্যর্থ হন। এ জন্য জেনে নেওয়া যেতে পারে রমজানের কয়েকটি ভুল খাদ্যাভাস।

ভুল ১: ইফতারে বেশি ভাজাপোড়া ও তৈলাক্ত খাবার খাওয়া

default-image

রোজা রেখে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয়। তাই শরীর যেন পর্যাপ্ত ক্যালরি ও পানি পায়, সেদিকে লক্ষ রাখা উচিত। কারণ, অনেকে ইফতারে এত বেশি খাবার খেয়ে থাকেন যে পরে আর খেতে পারেন না। আবার এত বেশি ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার ফলে মাথাব্যাথা, পেটে জ্বালাপোড়া, আলসার, হজমের সমস্যা দেখা দেয়। আবার এসব অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবারে ক্যালরিও বেশি থাকে। দৈনন্দিন এসব ভাজাপোড়া খাবার খেলে শরীরে ক্লান্তি ও অবসাদ বেড়ে যেতে থাকে।

এসব খাবারের পরিবর্তে ইফতারে খেতে হবে সহজপাচ্য খাবার। এ জন্য ইফতারের শুরুতে ঘন শরবতের পরিবর্তে পাতলা শরবত খাওয়া উচিত। আবার ইফতারে তৃষ্ণা মেটানোর জন্য একেবারে অধিক বেশি পানি ও ঠান্ডা শরবত বা ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা পানীয় পান থেকে বিরত থাকতে হবে। ইফতার থেকে সাহ্‌রি পর্যন্ত অল্প অল্প করে পানি খেতে হবে। এ ছাড়া ইফতারে খাওয়া যেতে পারে নরম খিচুড়ি, চিড়া-দই–কলা, ডিম সেদ্ধ, খেজুর, হালিম, স্যুপ, সাগু, কম চিনি দিয়ে দুধ-সেমাই, সুজি, পায়েস, ফিরনি, ছোলা সেদ্ধ করে অল্প তেল দিয়ে ধনেপাতা, টমেটো, পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে মুড়ি মাখা ইত্যাদি। ইফতারে বড়াজাতীয় খাবার যেমন আলুবড়া, ডালবড়া, বেগুনি, ডিমের চপ ইত্যাদি খেতে চাইলে অল্প তেল দিয়ে ভাজা যেকোনো একটি পদের একটি বা দুটি খাওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ভুল ২: বেশি চিনিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত ফলের জুস পান

default-image

রোজা রেখে অনেকেই বেশি চিনিযুক্ত পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত ফলের জুস পান করেন, যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এর পরিবর্তে বাড়িতে তৈরি করা কম চিনি আর সামান্য লবণ দিয়ে তৈরি শরবত খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত। বাড়িতে তৈরি করা খাবার যেমন স্বাস্থ্যসম্মত, তেমনি সাশ্রয়ী। এ জন্য ডাবের পানি বা ঘরে তৈরি লেবুর শরবত, দই, ঘোল, ফলের সালাদ খেতে পারেন। এ ছাড়া খাওয়া যেতে পারে বিভিন্ন মৌসুমি ফল। রমজান ও গরমে পানিশূ্ন্যতা দূর করার পাশাপাশি এসব খাবারে থাকা পর্যাপ্ত ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও বৃদ্ধি করবে।

ভুল ৩: কোনো বেলার খাবার বাদ দেওয়া

default-image

স্বভাবতই কোনো বেলার খাবার বেশি খেলে পরের বেলায় খাবার খাওয়া যায় না। আরও যদি হয় বেশি ভাজাপোড়া, তাহলে অ্যাসিডিটি হয়ে যেতে পারে। তাই অনেকেই হয়তো রাতে কিংবা সাহ্‌রিতে খাবার বাদ দিয়ে থাকেন; যদিও সেটা ঠিক নয় বরং স্বাস্থ্যহানিকরও। তাই কোনো এক বেলার খাবার বাদ না দিয়ে পরিমিত পরিমাণে কম তেল–মসলা দিয়ে রান্না খাবার প্রতি বেলায়ই খেতে হবে। তাহলে শরীর থাকবে চাঙা, কষ্ট হবে না রোজা রাখতে।

বিজ্ঞাপন

ভুল ৪: অনেক বেশি মসলাদার খাবার খাওয়া

default-image

অনেকেই ইফতারিতে তেহারি, বিরিয়ানি খেয়ে থাকেন। এগুলো রোজা রেখে খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এর পরিবর্তে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট যেমন লাল আটার রুটি, লাল চালের ভাত, ওটস ইত্যাদি খাওয়া প্রয়োজন। এগুলো শরীরে আস্তে আস্তে হজম হবে এবং অধিক সময় ধরে ক্যালরির জোগান দেবে। বেশি মসলাদার আর কষানো খাবারের পরিবর্তে ঝোল করে রান্না খাবার খাওয়া উচিত।

ভুল ৫: সাহরিতে মাত্রাতিরিক্ত আমিষ রাখা

default-image

সাহ্‌রিতে মাত্রাতিরিক্ত আমিষ রাখলে দেহে পানিস্বল্পতা দেখা দিতে পারে, গলা শুকিয়ে যেতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় আমিষ রাখার পাশাপাশি এমন খাবার খেতে হবে, যাতে সারা দিনের পানির চাহিদা পূরণ হয়। যেমন ডিম, দুধ, ডাল, মুরগি, কলা, খেজুর, ফল ইত্যাদি।

ভুল ৬: খাবারে বয়সের দিকে লক্ষ না রাখা

default-image

পরিবারে বিভিন্ন বয়সের লোক থাকে। সেদিকে লক্ষ রেখে রান্নার পরিকল্পনা করা দরকার। বাচ্চারা রোজা রাখলে যেন পর্যাপ্ত প্রোটিন পায়। কারও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে খাবারে লবণ কম রাখতে হবে। হৃদ্‌রোগীদের পরিমাণমতো তেল খেতে হবে। কিডনি রোগীদের প্রোটিন ও পানি মেপে খেতে হবে। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে রোজা রাখার আগে একটি তালিকা করে নিতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

ভুল ৭: স্বাস্থ্যসম্মত রান্নার পদ্ধতি সম্পর্কে না জানা

default-image

সারা দিন রোজা রেখে ভাজাপোড়ার প্রতি বেশি আগ্রহ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এর পরিবর্তে গ্রিলড, বেকড ও ভাপা পদ্ধতির রান্না বেছে নেওয়া ভালো। এসব খাবার স্বাস্থ্যসম্মত এবং বানাতে সময়ও কম লাগে। চিনি বা চিনিজাতীয় খাবার কমিয়ে প্রাকৃতিক ফল খাওয়া উচিত। চিনিতে ক্যালরি ছাড়া কিছু নেই। বরং ফলে শর্করার পাশপাশি প্রাকৃতিক ভিটামিন ও মিনারেলস পাওয়া যায়। রান্না করা খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য হার্বস ব্যবহার করা যেতে পারে। শসা, গাজর, টমেটো, মটরশুঁটি, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ ও অল্প তেল দিয়ে বিভিন্ন প্রকার সবজির সালাদ করে খাওয়া যেতে পারে। এসব খাবারে রান্নার ঝামেলা নেই; কিন্তু আছে পুষ্টি।

ভুল ৮: পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের অভাব

default-image

অনেকেই আছেন গভীর রাতে উঠতে পারেন না। কিন্তু রোজা রাখার কারণে সাহ্‌রিতে উঠতে হয়। এ জন্য ঘুমের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে। ঘুম কম হলে হিটস্ট্রেস দেখা দিতে পারে এবং সারা দিন রোজা রাখতে কষ্ট হয়। তাই দিনের বেলায় কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বা ঘুমিয়ে পুষিয়ে দেওয়া যায়। তাই বলে সারা দিন ঘুম নয়। বিশ্রাম আমাদের দেহের প্রয়োজনীয় তরল ও পুষ্টির চাহিদা পুনরায় পূরণ করে যথেষ্ট জাগ্রত করে। তাই যাঁরা চাকরি করেন, কর্মস্থলে তাঁরা সময়ের ফাঁকে বিশ্রাম নিতে পারেন।

লেখক: পুষ্টিবিদ ঠাকুরগাঁও ডায়াবেটিক ও স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতাল

পুষ্টি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন