প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবিঅ্যান্ড্রু নিল, পেকজেলসডটকম

অতনু অফিস থেকে ঘরে ঢুকে দেখলেন নীরা টিভির সামনে বসে গভীর মনোযোগে সিরিয়াল নাটক দেখছেন। কোলে মাত্র দেড় মাসের শিশু অর্ঘ্য ঘুমাচ্ছে। নীরাকে বিরক্ত না করে শুধু মাথায় একটু হাত বুলিয়ে অতনু কাঁধ থেকে অফিস ব্যাগটা নামালেন এবং খুব দ্রুত চলে গেলেন বাথরুমে পরিচ্ছন্ন হওয়ার উদ্দেশ্যে।

নীরার হঠাৎ খেয়াল হলো, ঘণ্টাখানেকের ওপরে হয়ে গেছে অতনু এখনো বাথরুম থেকে বের হননি। সিরিয়াল নাটকের গভীরতায় ডুবে ছিলেন তিনি। বাথরুমের দরজায় টোকা দেন, কয়েকবার অতনুর নাম ধরে ডাকাডাকি করেন, কোনো শব্দ নেই। তারপর আরও সময় চলে যায়, নীরা অস্থির ও অধৈর্য হয়ে কয়েকজন আত্মীয়কে ফোন দেন। দৌড়ে চলেও আসেন কয়েকজন। দরজা ভেঙে বের করা হয় অতনুর নিথর দেহ এবং একটি ইনজেকশনের সিরিঞ্জ পাওয়া যায়—যাতে অনিবার্য মৃত্যুসম্ভব কিছু ওষুধ ছিল, যা এখন নেই। পুরোটা ওষুধ অতনুর শরীরে, তাঁর রক্তের শিরায় শিরায় মিশে গেছে আর অতনুকে দিয়ে গেছে তাঁর প্রত্যাশিত মৃত্যু।
পাঠক হয়তো পরিষ্কার বুঝতে পারছেন, এটি একটি ঠান্ডা মাথায়, নিজের হাতে এবং নিজ পরিকল্পনায় করা আত্মহত্যা। আমাদের দেশে যেকোনো আত্মহত্যা ঘটলেই আমরা কারণ হিসেবে সেই মানুষটির সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষগুলোর দিকে সন্দেহের দৃষ্টি দিই। সব আত্মহত্যার পেছনেই কি সম্পর্কের টানাপোড়েন দায়ী থাকে? থাকলে কতটুকু বা কেন দায়ী থাকে?

বিজ্ঞাপন

আসুন তার আগে আমাদের দেশে আত্মহত্যার পেছনের কিছু কারণ এবং পরিসংখ্যানের ওপর একটু চোখ বুলিয়ে নিই।

পুলিশ হেডকোয়ার্টারের রেকর্ড অনুযায়ী শুধু ২০১৭ সালে আত্মহত্যা করেছেন ১১ হাজার ৯৫ জন। ২০১৫, ২০১৬ এবং এর কাছাকাছি বছরগুলোতে ১০০ জনে ৭-৮ জন প্রতিবছর আত্মহত্যার রেকর্ড পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে শুধু এপ্রিল মাসে সাতজন আত্মহত্যা করেছেন। যা জানা গেছে, অর্থাৎ রেকর্ডেড। আর অজানা কতজন করেছেন, তার পরিষ্কার হিসাব এখনো সেভাবে জানা যায়নি; (সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশন, ২০২০, মামুন অ্যান্ড গ্রিফিথ ২০২০।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর ওপর কোভিড-১৯-এর প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আছে, তা অনস্বীকার্য।

কেননা, আমাদের দেশে কোভিড-পূর্ব আত্মহত্যাগুলোর পেছনে সর্বোচ্চ কারণ হিসেবে যা পাওয়া গেছে তা হলো অর্থনৈতিক কারণ ও দারিদ্র্য, অর্থাৎ কোভিডে অসংখ্য মানুষের কর্মহীনতা, আয়-রোজগার কমে যাওয়া, খাদ্যের অভাব ইত্যাদি। সেই আগের কারণ আরও বিস্তৃত ও গভীর করে তুলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ সবকিছুর সঙ্গে মানব সম্পর্কগুলোর কি কোনো সংযোগ আছে? অবশ্যই আছে, যেখানে দারিদ্র্য, সেখানে সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়। দারিদ্র্যের সঙ্গে ভালোবাসা, সম্মান, মায়া ইত্যাদি যুদ্ধে হেরে যায়। এসব ঘটনারই একটি ভয়ংকর রূপ আত্মহত্যা।

প্রায় ৯৫ ভাগ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কিন্তু একই রকম বিষয় থাকে। শ্রেইডমান ১৯৯৬-এ পর্যালোচনা করে এই একীভূত বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত, যাঁরা আত্মহত্যা করে থাকেন, তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে সমাধান করা; অর্থাৎ সবকিছুর একটা ইতি টানা। তাঁদের আবেগীয় অবস্থা খুবই হতাশাব্যঞ্জক এবং অসহায় পরিস্থিতিতে পৌঁছে যায়। তাঁদের চিন্তাধারা একধরনের পরস্পরবিরোধী অবস্থায় (ভালোবাসা, না ঘৃণা) দাঁড়ায়, কোনো রকম বিকল্প বা ব্যতিক্রম চিন্তা করতে অক্ষমতায় পৌঁছে যায় এবং একমাত্র পালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পদক্ষেপ আর ভাবতে পারেন না। অন্যান্য মানুষ বা কাছের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিপ্রায় থেকে আত্মহত্যার আচরণ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে; অর্থাৎ এঁরা যেতে যেতে সবাইকে একটি কথা বলে যান বা বার্তা দিয়ে যান। যেমন তোমরা আমায় বুঝলে না, আমি কষ্ট নিয়ে চলে গেলাম, তোমরা ভালো থেকো—এই ধরনের।

যারা একটু কম বয়স বা টিনএজে আত্মহত্যা করে থাকে, তারা সাধারণত ইভ টিজিং, হেনস্থার স্বীকার, মা-বাবা বা শিক্ষকের বকুনি, ফাঁদে বা প্যাঁচে পড়ে যাওয়া, প্রেম এবং এ-জাতীয় জটিলতা, সম্পর্কের ভাঙন, পড়াশোনার চাপ নিতে না পারা, মা-বাবাকে বলতে না পারা অথবা বিভিন্ন রকম আত্মহত্যার পেছনে কিছু কারণ আছে, যা সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত নয়। অর্থাৎ কিছু আত্মহত্যা ঘটে একেবারেই কোনো রকম মানবিক সম্পর্কের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব ক্ষেত্রে তার সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষগুলো একধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে পড়ে যান। কিছুতেই বুঝতে পারেন না কেন এই আত্মহত্যা।

বিজ্ঞাপন
আত্মহত্যাপ্রবণ অথবা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছুক, এ ধরনের অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি যে কারণটা পাওয়া যায়, তা হলো কাছের মানুষ বা মানুষদের তাঁর প্রতি অবহেলা, অশ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অভাব।

অতিরিক্ত মাত্রায় নেশা গ্রহণের ফলে কিছু মৃত্যু হয়। নেশা গ্রহণ একধরনের আত্মহননকারী আচরণ। তাই একে আত্মহত্যা ধরা হয়। এ ছাড়া কিছু মানসিক রোগ আছে, যেগুলোতে ব্যক্তি নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেরই বোধ বা ধারণা থাকে না। যেমন সিজোফ্রেনিয়া। আবার কিছু মানসিক রোগে ব্যক্তি বেঁচে থাকার কারণ বা অর্থ খুঁজে পান না। হাজার সম্পর্কের টান, ভালোবাসা, সম্মান তাঁকে সেই স্বাদ দিতে পারে না, যা তিনি মৃত্যুর মধ্যে আছে বলে মনে করেন—ডিপ্রেশন (ক্রনিক) রোগে এমনটা হতে দেখা যায়। এ ছাড়া আরও কিছু মানসিক রোগের কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে।

আত্মহত্যাপ্রবণ অথবা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছুক, এ ধরনের অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি যে কারণটা পাওয়া যায়, তা হলো কাছের মানুষ বা মানুষদের তাঁর প্রতি অবহেলা, অশ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অভাব।

এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, সম্পর্কের মধ্যে মানুষ অনেক কিছু সহ্য করে নিতে পারলেও নিজের প্রতি অন্যের নেতিবাচক মানবিক আচরণগুলো মেনে নিতে পারেন না। তাঁদের আত্মসম্মান একেবারে ধুলায় মিশে যাওয়ার কষ্ট তাঁরা অনুভব করেন। দ্বন্দ্বে পড়ে ইমপালসিভিটি বা অতি আবেগীয় অবস্থা থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। উল্লেখ্য, বেশির ভাগ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে মারা যাওয়ার পুরো ইচ্ছা থেকে শুরু না হলেও প্রথম চেষ্টাতেই মৃত্যু হয়।

অল্প হলেও মারা যাওয়ার ইচ্ছা বা অভিপ্রায় নিয়ে তীব্রভাবে ইচ্ছাকৃত নিজের ক্ষতি করা। যার ফলে মৃত্যু হয়, একেই আত্মহত্যা বলা হয়।

আত্মহত্যার কোনো চিকিৎসা নেই, তবে এর প্রতিরোধ সম্ভব। সমাজের প্রতিটি ধাপেই সম্ভব। সমাজ বা রাষ্ট্র আমাদের দেশের প্রত্যেক মানুষকে নিয়ে গঠিত। তাই ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, আশপাশের সবার সহযোগিতায় আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব।

যদিও আমাদের দেশের সর্বাধিক আত্মহত্যার মূল কারণ হিসেবে দারিদ্র্য বা অর্থনৈতিক কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে তাহলে কোনো আত্মহত্যাই থাকত না বা অনেক কম থাকত। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, সমাজে আরও অনেক কারণ বা বিষয় আছে, যেগুলোর কারণে মানুষ এই পথ বেছে নেন। সম্পর্কের টানাপোড়েন এ ক্ষেত্রে অনেক বড় একটি কারণ।

স্বামীর পরকীয়ার কারণে স্ত্রীর আত্মহত্যা কিংবা উল্টোটা, দাম্পত্য জীবনে সম্পর্কের মূল্যায়ন না করা, তালাক বা বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব বা বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক ইত্যাদি পারিবারিক জীবনে মানুষকে আত্মহত্যার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। সাধারণত অত্যন্ত আবেগপ্রবণ (দুঃখী, উদ্বেগপূর্ণ, রাগী) এবং নেতিবাচক মনোগঠনের মানুষ যখন তাঁর পরিপন্থী কোনো পারিবারিক বা সামগ্রিক চাপে পড়েন, তখনই আত্মহননের পথ বেছে নেন।

প্রতিরোধের জন্য দুটি কথা

পারিবারিক ক্ষেত্রে অবশ্যই মা-বাবা এবং সন্তানদের মধ্যে সহজ সম্পর্ক থাকলে যেকোনো সমস্যা সমাধান সম্ভব। সম্পর্কের প্রতি মূল্য দিতে হবে সবার আগে এবং সবার ঊর্ধ্বে। সন্তানরা যেকোনো সমস্যা যেন মা-বাবাকে বলতে দ্বিধা না করে। অন্যদিকে মা-বাবাও সন্তানদের নিয়ে কোনো কষ্ট বা জটিলতায় পড়লে যেন কথা বলার সুযোগ থাকে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে যত যা-ই ঘটুক, কথা বলার মাধ্যমে তার সমাধান করা সম্ভব। সমাধান সম্ভব না হলেও অন্তত অনেক কথা মনের মধ্যে চেপে রেখে আত্মহত্যা করাকে হয়তো ঠেকানো যেতে পারে।

একটি পরিবারের সব মানুষ যেমন এক রকম হয় না, তেমনি সবার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা, চাপ নেওয়ার শক্তি, সমস্যা সমাধানের বুদ্ধিমত্তা, দায়িত্ব নেওয়ার বা পালন করার মতো মানসিক গঠনগুলোও এক রকম হয় না। সবার যে শক্তিগুলো থাকতেই হবে, তা-ও নয়। আসলে আমরা কাছের মানুষগুলোর কাছ থেকে কষ্ট পাই, যন্ত্রণায় ছটফট করি, হতাশায় ডুবে যাই।

আমাদের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সক্রিয় থাকে। তাতে আমাদের সন্তানদের নিয়ে প্রতিক্ষণ বিভিন্ন রকম তুলনামূলক চিন্তা ও আচরণ প্রকাশ পেতে থাকে। কারও সন্তান একটু দুর্বল হলে আমরা তাতে খুশি হই, স্বস্তি বোধ করি আর নিজের সন্তানকে চাপের মুখে রাখি। সব বাচ্চাই যে মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী, বুদ্ধিমান বা সক্ষম হবে, তাই কি? যদি আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশীদের কারও সন্তান মানসিকভাবে দুর্বল হয়, কোনো প্রকার অসুস্থতা থাকে, আমাদের সামান্যতম ভালো আচরণ পাশে থাকা সেই সন্তানটির জন্য অনেক বড় উপকার।

বিজ্ঞাপন

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এ রকম কোনো না কোনো মামা, চাচা, খালাদের মতো আত্মীয় আছেন; যাঁর আদর-যত্ন আর স্নেহের ছায়ায় আমরা শক্তি পাই, বেড়ে উঠি। আমাদের প্রতিবেশীরাই বিপদের সময় সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসেন। কোনো পরিবারের একজন সদস্য মানসিকভাবে অসুস্থ কিংবা দুর্বল হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকলে কি ভালো? নাকি তার পাশে দাঁড়ানো, চিকিত্সার সুযোগ তৈরি করা ভালো। নাকি তাকে নিয়ে পেছনে কথা বলা, ঠাট্টা করা, ওই পরিবারকে একা করে দিয়ে আত্মহত্যার সুযোগ করে দেওয়া ভালো?

লেখার শুরুতে যে ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে, তা একটি বাস্তব ঘটনা। অতনুর বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই এই ঘটনা ঘটে। তাঁর স্ত্রী নীরা জানেনও না তাঁর স্বামী কেন এ রকম একটা পথ বেছে নিয়েছেন। কেন স্ত্রী, ছোট শিশুর মায়া তাঁর বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট কারণ ছিল না। অতনু মানসিকভাবে বিয়ের আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন এবং বিয়ের আগেও তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর মা ও ভাইবোনদের কাছ থেকে জানা যায়। তাঁরা তাঁদের ছেলের চিকিত্সার ব্যবস্থা না করে বিয়ে দেন।

একা হয়ে গেল নীরা ও তাঁদের একমাত্র সন্তান অর্ঘ্য। এই দুটো মানুষ একাকিত্ব, শূন্যতা আর আত্মহত্যার দায়ভার নিয়ে চলতে থাকবে। একদিন হয়তো এদেরও মনে হতে পারে কেন এত শূন্যতা, এই একাকিত্ব? কেন বেঁচে থাকা?

লেখক: চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী, রোকেয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য পড়ুন 0