default-image
বিজ্ঞাপন

১৯৬০ সালে ময়েজউদ্দিন হাইস্কুলের গণিতের মাস্টার জগদীশ চন্দ্র ঘোষ যখন ফরিদপুর হাইস্কুলের শিক্ষক হয়ে এলেন, তখন আমি হাইস্কুলের ক্লাস সিক্সের ছাত্র। তখন থেকেই তাঁর কাছে অঙ্ক শেখার সুযোগ পেয়ে গেলাম।

সাইডে পকেটওয়ালা, বোতাম না লাগানো সাদা শার্ট আর সাদা পায়জামা পরা ৩৩ বছর বয়সী এই সুঠামদেহী যুবক শিক্ষককে আরও কাছে থেকে জানার সুযোগ হয় ক্লাস নাইনে ইলেকটিভ ম্যাথস নেওয়ার ফলে।

তিনি আমাদের সাধারণ গণিত ও নৈর্বাচনিক গণিত—দুটোই পড়াতেন।

হাইস্কুলে তখন বিজ্ঞান ছিল না। কলেজে বিজ্ঞান পড়ার ইচ্ছা থাকলে স্কুলে ইলেকটিভ ম্যাথস পড়তে হতো। ভালো ছাত্ররা সবাই পড়ত জেলা স্কুলে। হাইস্কুলে ইলেকটিভ ম্যাথ পড়ার ছাত্র ছিল কম। সেই সুবাদে ইলেকটিভ ম্যাথ ক্লাসের সব ছাত্রকে তিনি কাছ থেকে চিনতেন এবং নাম ধরে ডাকতেন।

ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ইলেকটিভ ম্যাথসে ৮৫ নম্বর পেয়ে স্যারের নজরে পড়ে গেলাম। তিনি আমাকে শিক্ষকদের বসার ঘরে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ১৫ নম্বর কম পেলে কেন?’

default-image

৩৩ নম্বর পেলে পাস, আর ৮০ নম্বর পেলে লেটার। আমি ৮৫ নম্বর পেয়েছি, তাতে স্যারের মন ওঠেনি! আমি কী বলব, তা চিন্তা করার আগেই স্যার বললেন, ‘এখন থেকে ১০০ পাওয়ার চেষ্টা করবে। মেট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন পেতে হবে।’ ব্যস, ওই পর্যন্তই কথা।

প্রাইমারি স্কুলে অঙ্কে ১০০ পেয়েছি, তাতে বিরাট কিছু মনে হয়নি। কিন্তু ক্লাস নাইন-টেনে যে ১০০ পাওয়া যায়, সে কথা কোনো দিন চিন্তা করিনি। কেউ কোনো দিন বলেনি বিষয়টি।

স্যারের কথায় আমার সাহস বাড়ল। নিজের সামর্থ্য সম্বন্ধে আস্থা এল। বড় হওয়ার শখ জাগল।

বিজ্ঞাপন

ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার পর স্যার আবার আমাকে শিক্ষকদের বসার ঘরে ডেকে নিলেন। এবার বললেন, ‘তোমার খাতার নম্বরগুলো যোগ করে দেখতে ১২০ হয় কেন?’

এবার সাহসের সঙ্গেই বললাম, ‘স্যার, আপনি যেকোনো ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেছিলেন, আমি ১২টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি।’

স্যার রাগ করতে পারেন, তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু তিনি রাগ করলেন না। তিনি হেসে দিয়ে বললেন, ‘তুমি আমাকে খাটিয়েছ, তোমাকে ১০০ দেব না, ৯৯ দেব।’

আমি বললাম, ‘স্যার এখন আপনি ৩৩ দিলেও আমার কোনো অসুবিধা নাই।’

স্যার বললেন, ‘এই দেখ, ছয় মাসের মধ্যই তোমার কত উন্নতি হয়েছে! অঙ্ক করতে শিখেছ, কথাও বলতে শিখেছ। মানুষের জন্য কিছুই অসম্ভব নয়। তোমার বাবা গরিব মানুষ, তোমাকে বড় হতে হবে।’

১৪ বছর বয়সী ছাত্র আর ৩৬ বছর বয়সী শিক্ষকের মধ্যে এমন কথোপকথন অন্য কোথাও, অন্য কোনো দিন হয়েছে কি না, আমি জানি না। তবে স্যারের এই কথাগুলো আমার মনে যে গভীর দাগ কেটেছিল, তা মুছে না গিয়ে এখনো আমার গর্ব, প্রত্যয় এবং আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হয়ে আমাকে শক্ত রাখছে।

default-image

বড় হওয়ার অর্থ কী? আমি কতটুকু বড় হয়েছি, তা জানি না। আমি ইংল্যান্ডের ইংরেজদের ভারতীয় পদ্ধতিতে বড় বড় সংখ্যার বর্গমূল নির্ণয় করা শিখিয়েছি, বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের মধ্যের সম্পর্ক নির্ণয় করা শিখিয়েছি এবং এই যে বিদেশ বিভুঁইয়ে মাথা উঁচু করে, আত্মপরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে বেঁচে আছি, তা যদি বড় হওয়ার পরিমাপ হয়, তবে তাতে আমার অঙ্ক শিক্ষকের অনুদান অনেক।

জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, আমাদের কাছে তাঁর ডাক নাম তারাপদ ঘোষ দিয়েই বেশি পরিচিত ছিলেন। শিক্ষকতার বাইরে তিনি প্রথমে ‘পাকিস্তান অবজারভার’ এবং পরে ‘বাংলাদেশ অবজারভার’ কাগজের মফস্বল সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কোনো দর্শনের প্রতি পক্ষপাত থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন শতভাগ নিরপেক্ষ, এ কথা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে হলফ করে বলতে পারি। তিনি হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের ছাত্রদের সমানভাবে শিখিয়েছেন। তিনি নারায়ণ চন্দ্র সাহা এবং মোহাম্মদ ইদ্রিসকে সমান যত্ন দিয়েই অঙ্ক শিখিয়েছেন।

আমি জানি, তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির বিপক্ষে ছিলেন। ধর্মের নামে রাষ্ট্র হলে পরিশেষে মানুষের ভালো হবে, না মন্দ হবে এই বিতর্কে তিনি মৌলানা আবুল কালাম আযাদ এবং হুমায়ূন কবীরের যুক্তিতে বিশ্বাস করতেন। ‘India wins freedom’ বইখানা তিনি পড়েছেন এবং অন্যদের পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন।

default-image

তবে সৃষ্টির পর তিনি পাকিস্তানের আনুগত্য স্বীকার করে, পাকিস্তানের আইন মেনেই এ দেশে থেকেছেন। তবুও হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করার একমাত্র অপরাধে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁর পিতা, ভাইসহ পরিবারের ছয়জন সদস্যকে হত্যা করেছে।
জীবনের চেয়ে বড় এই মহান শিক্ষকের ৯৩ বছরের কর্মময় এবং বর্ণাঢ্য জীবন ফরিদপুরের অনেক মানুষকে স্পর্শ করেছে। আশা করি সবাই না হলেও কিছু মানুষ তাঁদের স্মৃতিচারণায় এই মহান মানুষটিকে স্মরণ করবেন।

ঘোষ বংশের লোক হলেও তাঁর পূর্বপুরুষেরা কেউ মিষ্টি তৈরি করেছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে জগদীশ চন্দ্র ঘোষ প্রচুর মিষ্টি খেতে পারতেন। স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে তিনি স্টেশন রোডে সাদীর দোকানে বসে একের পর এক রাজভোগ খেয়ে যেতেন। আমার বন্ধু মিলন এবং আমি মাঝেমধ্যে স্যারকে দেখেও না দেখার ভান করে সাদীর দোকানে ঢুকে যেতাম, ভাবে মনে হতো যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমরা কাউকে খুঁজছি। যতক্ষণ না আমরা স্যারের চোখে পড়তাম ততক্ষণ ঘোরাঘুরি করতাম। অবশেষে স্যার ডাক দিয়ে একটা রাজভোগ খাওয়ালে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ হয়ে যেত।

বিজ্ঞাপন

পাঁচ বছর আগে একদিন স্যারকে জিজ্ঞেস করায় তিন জবাব দেন, ‘আমার কোনো ডায়াবেটিক-টেটিক নাই। ওরা অযথাই আমার বাড়ির পাশে ডায়াবেটিক হাসপাতাল করছে। আমি এখনো দুই-চারটা রাজভোগ খাই, আমার কোনো অসুবিধা হয় না। তবে আমি কিন্তু রাজভোগ ছাড়া অন্য কোনো মিষ্টি খাই না। করণ রসের নিচে ডুবে থাকে বলে রাস্তার ধূলি বালি একে স্পর্শ করতে পারে না।’

একদিন স্যারকে আমার বাড়ি নিয়ে এলাম। প্লেট ভরে রাজভোগ দিলাম। শিশুর মতো পুলকিত হয়ে স্যার মিষ্টি খেলেন। আমি প্রাণভরে ছবি তুললাম। স্যারের চলে যাওয়াতে, ডায়াবেটিসের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আমার ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ করার মারাত্মক অস্ত্র এই ছবিগুলোর উপযোগিতা এখন কমে গেল।

স্যারের বয়স হয়েছিল, যে বয়সে শরৎ ও হেমন্তকালের তফাৎ বুঝতে অসুবিধা হয়। মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলি যখন সহানুভূতিতে পরিণত হয়, তখন বেঁচে থাকার সুখ কমে আসে। তবুও জগদীশ চন্দ্র ঘোষ বেঁচে ছিলেন জীবনের যা কিছু ভালো তার প্রতীক হয়ে, আমাদের শিক্ষক, নির্ভীক সাংবাদিক, সততা আর নিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি হিসেবে।

অতিথি গল্পে রবীন্দ্রনাথের কথা সত্য, ‘তারাপদ চলে গেছে।’ নৈতিক দুর্ভিক্ষের দেশে সততার দুধভাত বলে একটি কথা আছে। আমার শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র ঘোষ ওরফে তারাপদ ঘোষ ছিলেন এ দেশের সততার দুধভাত। এক বিশ্ববিধ্বংসী ভাইরাস স্যারকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি অসুখের কাছে পরাজিত হয়েছেন, মৃত্যুর কাছে নয়। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী।

লেখক: পরিচালক, বার্মিংহাম এশিয়ান রিসোর্স সেন্টার, ইংল্যান্ড ।

সম্পর্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন