কার্টুন: প্রথম আলো
কার্টুন: প্রথম আলো

রাহেলা বেগম (ছদ্মনাম) যখন আমার সঙ্গে প্রথম দেখা করতে আসেন তাঁর প্রধান অভিযোগ ছিল, কয়েক বছর ধরে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। খুব অল্পতেই স্বামীর সঙ্গে লেগে যাচ্ছে। স্বামী তাঁকে বোঝেন না, মাঝে মাঝে তাঁর নিজের কাছে এটাও মনে হয়, হয়তো তিনিও যেন তাঁর স্বামীকে বুঝতে পারেন না। কারণ, যখন তিনি ভালো মনে করে একটা কথা বলেন, তখনো দেখা যায় তাঁর স্বামী একে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছেন। এটা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েক দিন ধরে ঝগড়াঝাঁটি চলতে থাকে। ইদানীং বিষয়টা অনেক বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে যাচ্ছে। মাথার মধ্যে সারা দিন স্বামী সম্পর্কে শুধু নেতিবাচক চিন্তাই ঘোরাঘুরি করে।

default-image

জীবনে তো অনেক ভালো ভালো ব্যাপারও ঘটেছে। কিন্তু এখন শুধু না পাওয়ার ঘটনাগুলোর কথাই মনে পড়ে। আর মনে পড়ে কীভাবে, কতটা অশান্তিতে, কতটা অপমানে তাঁর বৈবাহিক জীবনটা কাটছে। যখন মন খারাপের পরিমাণটা অনেক বাড়াবাড়ি পর্যায়ের হয়ে যায়, রাহেলার ইচ্ছা হয় ঘর-সংসার ছেড়ে দুচোখ যেদিকে যায় চলে যেতে। যখন কেউই সংসারে তাঁকে ভালোবাসে না, শ্রদ্ধা করে না, তখন কেন এখানে থাকবে।

আগে মেয়ে দুটোকে কষ্টের কথা বলা যেত, এখন তাঁরাও আর শুনতে চান না। তাঁরা তাঁদের বাবার মতোই স্বার্থপর ও সুযোগসন্ধানী হয়েছেন। রাহেলা অনুভব করেন, পরিবারের কেউই তাঁকে ভালোবাসেন না। ব্যাপারটা এমন নয় যে মেয়েরা তাঁদের বাবাকে খুব ভালোবাসেন। আসলে পুরো সংসারটাই একটা অশান্তির আগুনে পরিণত হয়েছে। কেউই এখানে ভালো নেই।

বিজ্ঞাপন
প্রশংসা যে শুধু প্রশংসা করার জন্য করতে হবে তা নয়; অর্থাৎ, কেউ যদি আপনার জন্য একটি উপহার পাঠান, তা একেবারে পছন্দ না হলেও আপনি তাঁকে ধন্যবাদ দিতে পারেন।

স্বামী বলেন, অফিস শেষে তাঁর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করে না। মেয়েরা বলেন, এই সংসারে শান্তি নেই, তাই তাঁদের ভালো লাগে না, সারাক্ষণ ঝগড়া। সবার প্রতিই সবার ক্ষোভ, সবার প্রতিই সবার নালিশ। সবাই মনে করে, অন্যরা তাঁকে ভালোবাসেন না, বোঝেন না। কেউ–ই সন্তুষ্ট নন।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ রকম চিত্র কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি; হতে পারে এটা পারিবারিক সম্পর্ক, আবার হতে পারে এটা বন্ধুত্বের সম্পর্কও। এমনকি এটা অফিস সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কও হতে পারে। দেখা যায়, অনেক সময় অন্যদের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে যেমন প্রচুর নেতিবাচক ভাবনা কাজ করে, তেমনি তাঁরাও যে আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ভাবেন, আমাদের সম্পর্কে খারাপ বলেন, তা আমরা জানি, শুনতে পাই, বিশ্বাস করি। ফলে তাঁদের প্রতি আমরা ভালো অনুভব করি না, তাঁরাও আমাদের প্রতি ইতিবাচক অনুভব করেন না। কিন্তু আমরা তাঁদের সম্পর্কে যা ভাবি, আমাদের কাছে তো সেগুলো সঠিকই মনে হয়।

তবে লক্ষ করে দেখবেন, তাঁরাও যা ভাবেন, সেগুলো কিন্তু তাঁদের কাছেও সঠিক মনে হয় এবং এই কথাগুলোই উচ্চারিত হয়। আর এই যে তাঁরা আমাদের সম্পর্কে যা ভাবছেন এবং তা সঠিক ভাবছেন, তাঁদের এই মনোভাবও আমাদের অনেক কষ্ট দেয়, একই সঙ্গে আমরাও তাঁদের সম্পর্কে ও তাঁদের মনোভাব সম্পর্কে নেতিবাচকভাবে ভাবতে থাকি। আমরা যেহেতু একজন ব্যক্তিকে তাঁর চিন্তাভাবনা ও মনোভাব দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, ফলে সম্পূর্ণ মানুষটাই আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এতে পারস্পরিক কথাবার্তা, আচার-আচরণ এবং সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে যায়।

default-image

এটা অনেকটা এমন, আপনি যখন কাউকে দেখে হাসিমুখ করেন, ওই ব্যক্তির মুখটাও হাসিহাসি করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়, যা আপনাদের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক ভালো করতে সহায়ক হয়। উল্টো দিকে যদি আপনি তাঁকে দেখে মুখ কালো করেন, তবে তাঁরও মুখটা কালো করার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। ফলে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। যদি আমি চাই, কেউ আমার সম্পর্কে ভালো ভাবুক, ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করুক, তবে আমাকেও চেষ্টা করতে হবে তাঁর প্রশংসাসূচক ব্যাপারগুলো খুঁজে বের করতে এবং সেগুলো বলতে। এটা যে শুধু সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে তা নয়, এটা আপনার নিজের ভালো থাকার পরিমাণও বাড়াবে। যখন আপনি কারও নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ভাবেন, আপনি লক্ষ করে দেখবেন, আপনার মনটাও খুব অশান্তিতে থাকে; মেজাজটাও খারাপ থাকে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, ‘ও তো সত্যিই খারাপ কাজ করেছে, আমাকে কষ্ট দিয়েছে, তবে কীভাবে আমি তার প্রশংসা করব? তা ছাড়া এত দিনের খারাপ সম্পর্ক, এখন এত প্রশংসা করলে তা তো ও বিশ্বাসও করবে না। প্রশংসা করতে গিয়ে আমি কি মিথ্যা বলব?’

বিজ্ঞাপন

প্রশংসা যে শুধু প্রশংসা করার জন্য করতে হবে তা নয়; অর্থাৎ, কেউ যদি আপনার জন্য একটি উপহার পাঠান, তা একেবারেই পছন্দ না হলেও আপনি তাঁকে ধন্যবাদ দিতে পারেন। তিনি যে আপনার বিশেষ দিনটির কথা মনে রেখেছেন, এটা বলে তাঁর প্রশংসা করতে পারেন। আপনি আরও বলতে পারেন যে ‘আমি লক্ষ করে দেখেছি, তুমি মানুষকে তার বিশেষ দিনটিতে আনন্দ দিতে পছন্দ করো এবং অপরের আনন্দে তুমি আনন্দিত হও।’

default-image

ধরুন, কারও রান্না আপনার পছন্দ হয়নি, তবু তাঁকে আপনি বলতে পারেন, তিনি সবার জন্য অনেক কষ্ট করে রান্না করেছেন, তাই আমরা সবাই মিলে মজা করে খেতে পারছি। আসলে তিনি আমাদের সবার প্রতি খুব যত্নশীল এবং আমাদের সবাইকে নিয়ে ভাবেন। যদি আপনার স্বামী/ স্ত্রী আপনাকে সন্তানের অবাধ্যতার জন্য বা পরীক্ষায় খারাপ ফলের জন্য দোষারোপ করেন, তবু তাঁকে বলা যায় যে তিনি সন্তানদের অনেক ভালোবাসেন ও তাদের ভালো-মন্দ ব্যাপার নিয়ে খুব ভাবেন। প্রশংসাটা হতে হবে খাঁটি, সত্য এবং সামগ্রিক।

যখন সম্পর্ক ভালো হয়, তখন পরস্পর পরস্পরের ভালো লাগা, খারাপ লাগার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। একে অন্যের কথা শোনে। একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করে। ফলে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

এভাবে শুধু বলা নয়, এটা নিয়ে রীতিমতো আপনি গবেষণা করতে পারেন। আমি জানি, সম্পর্ক যখন খারাপ হয়ে যায়, সত্যিকারের প্রশংসা করার মতো বিষয় বের করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি আপনি চেষ্টা করেন, আপনার চোখ ও কানকে প্রশংসা করার জন্য প্রস্তুত করেন, আপনি দেখবেন, আপনিও পারছেন। অনেক সময় এমন হতে পারে যে আপনার ছেলের একটি কাজ আপনি পছন্দ করেননি এবং ওই কাজের জন্য আপনি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সে ক্ষেত্রেও তার ওই বৈশিষ্ট্যের জন্য আপনি তার প্রশংসা করতে পারেন। যেমন সে হয়তো তার বন্ধুদের বেশ কিছু টাকা খরচ করে উপহার দিয়েছে, তাকে এভাবে বলা যায় যে সে খুব বন্ধুবৎসল।

আপনার ছোট বোন হয়তো একটি চকলেট আপনাকে না দিয়ে আপনাদেরই অন্য বোনকে দিয়েছেন, আপনি বলতে পারেন যে তিনি ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতাসম্পন্ন, যা তাঁর এই শেয়ার করা থেকে বোঝা যাচ্ছে। এভাবে যখন আপনি কাউকে তাঁর সত্যিকারের গুণাগুণ নিয়ে প্রশংসা করেন, এটা কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে আপনার সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং একসময় তিনিও আপনার সম্পর্কে ভালো কথা বলা শুরু করবেন; তখন আপনার বেশ ভালো লাগবে। এভাবে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে একটা পরিবর্তন সূচিত হবে।

আপনি একবার ভাবুন তো, যখন আপনি শুনতে পান যে আপনারই একজন পরিচিত ব্যক্তি কারও কাছে আপনার অনেক প্রশংসা করেছেন, আপনার কেমন লাগে? আপনি তখন ওই ব্যক্তি সম্পর্কে কেমন অনুভব করেন? যদি আপনার মন থেকে তাঁর সম্পর্কে খারাপ লাগার অনুভূতিগুলো সরে যেতে থাকে, তবে মনে রাখবেন, একই ব্যাপার ঘটবে অন্যদের ক্ষেত্রেও।

আপনি হয়তো ভাবছেন, এভাবে কি কারও আচরণ পরিবর্তন করা যাবে? হয়তো যাবে, অথবা যাবে না। যখন সম্পর্ক ভালো হয়, তখন পরস্পর পরস্পরের ভালো লাগা, খারাপ লাগার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। একে অন্যের কথা শোনে। একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করে। ফলে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। আর যদি পরিবর্তন না–ও আসে, সম্পর্কের মধ্যে একটি পরিবর্তন আসবেই। এটা অপরের প্রতি আমাদের সহনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করবে, ফলে অপরকে আমরা যেমন গ্রহণ করতে পারি, তেমনি আমাদেরও অন্যরা ‘আমি যেমন আছি’ তেমনভাবে গ্রহণ করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তবে সম্পর্ক ভালো রাখার ক্ষেত্রে প্রশংসাই একমাত্র উপায় নয়, কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এখন আপনি কি একটু চেষ্টা করে দেখবেন?

লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, শামসুন্নাহার হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য পড়ুন 0