default-image
বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো অনলাইনের উদ্যোগে এবং লিনা’স থাউজেন্ড থিংসের নিবেদনে আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান ‘তাহার কথা’। অনুষ্ঠানে তৃতীয় ও শেষ পর্বে অতিথি হিসেবে ছিলেন বরেণ্য অভিনয়ব্যক্তিত্ব দিলারা জামান। সঞ্চালনায় ছিলেন খায়রুল বাসার। অনুষ্ঠানটি ৮ মার্চ প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

default-image

প্রথমেই ৮ মার্চ নারী দিবস নিয়ে দিলারা জামানের ভাবনার কথা জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘একটা বিশেষ দিনে সবাইকে একটু সজাগ করে দেওয়া, সচেতন করা, নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া, এর একটা বিশেষ দিক আছে, প্রয়োজন আছে। তবে আমি মনে করি, নারী দিবস যে উদ্দেশ্য নিয়ে পালিত হয় বা হয়েছে, সেখানে আমরা এখনো সেই ন্যায্য অধিকার, সমমর্যাদা ঠিকমতো পাইনি। সমাজের কিছু অংশ হয়তো আলোকিত হয়েছে, কিন্তু যতটুকু পাওয়ার কথা, ততটুকু অনেকেই পায়নি বা পাননি। আর এ নিয়ে আমার কষ্টেরও শেষ নেই।’

এখন দিলারা জামান শুধু একজন অভিনয়শিল্পীই নন, একজন সুপার মডেলও বটে। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে তাঁর উপস্থিতি সবাইকে নাড়া দিয়েছে। তাঁর এই নতুন রূপ সত্যি সবাইকে মুগ্ধ করেছে এবং বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এ নিয়ে দিলারা জামান বলেন, ‘যে সময় ও রকম সুপার মডেল হওয়ার কথা ছিল বা হওয়া উচিত ছিল, তখন সুযোগ হয়নি, করতে পারিনি। এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন এ রকম লোভনীয় প্রস্তাব আসে, তখন স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, লুফে নিতে ইচ্ছা করে। এটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিই। দেখাই যে “তোমাদের চেয়ে আমি কম পারব না”। চেষ্টা করি অনেক। কারণ, এটা কোনো হেলাফেলার ব্যাপার নয়। এটার জন্য পরিশ্রম, মেধার দরকার হয়। জানি না এসব পরীক্ষায় কতটুকু উত্তীর্ণ হতে পেরেছি।’

default-image

তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে এখনো শুনতে হয়, অভিনয়, মডেলিং করা কোনো কাজ নয়। হাঁটতে গেলে, বাজার করতে গেলে, প্রায়ই আমাকে লোকে বলে, “এখনো অভিনয় করছেন? ছেড়ে দিলেই তো পারেন। বয়স হয়েছে। এখন হজ করলে হয়।” আমার কথা হচ্ছে, এটা তো আমার কাজ, পেশা। আমি ছাড়ব কেন? আর ধর্মের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। একজন উকিল যেমন হজ করে এসে তাঁর কাজ করছেন, তো আমার কাজে বাধা কোথায়? যাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন, তাঁরা শিক্ষিত হলেও মানসিকতার দিক দিয়ে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি। এসব শুনে কষ্ট পাই। আবার ভাবি, একটা সময় সব ঠিক হয়ে যাবে। পথ তো দেখাই।’

বিজ্ঞাপন

ছোটবেলায় দিলারা জামান আর অন্য সবার মতো চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন। অবশ্য অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বান্ধবীর ডাক্তারি পড়ুয়া মামার সঙ্গে মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে ঘুরতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের লাশ কেটে পড়াশোনা করার কথা শুনে বেশ ভয় পেয়েছিলেন তিনি। সেদিনই বিদায় হয়েছিল চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা। এরপর শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন এবং দীর্ঘ ২৬ বছর বেশ সফলতার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। আর অভিনয় করার একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল ছোটবেলায়। ক্লাস সেভেনে থাকতে তাঁর সুযোগ হয়েছিল ডাকসু আয়োজিত একটা নাটক দেখার। সেখানে সবার অভিনয় দেখে খুব মুগ্ধ হয়েছিলেন। এরপর আস্তে আস্তে সুযোগ হয়। দিলারা জামান এ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের সময় অভিনয় নিয়ে পড়াশোনার কোনো সুযোগ ছিল না। অনেক কিছু জানতে পারিনি, শিখতে পারিনি। দেখে দেখে শেখা, কাজ করা। অনেক অপূর্ণতাও রয়ে গেছে।’

default-image

কাজ করতে গিয়ে কখনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কি না, বা সহযোগিতার অভাব হয়েছে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর বেশ কয়েক বছর আমি কোনো কাজ করিনি। আমার স্বামী ফখরুজ্জামান চৌধুরী একজন লেখক, অনুবাদক এবং অত্যন্ত সংস্কৃতিমান ব্যক্তি। তাঁর তরফ থেকে কখনো বাধা আসেনি। কিন্তু আমার বিয়ে হয়েছিল খুব রক্ষণশীল পরিবারে। আমার শ্বশুর পছন্দ করতেন না দেখে তাঁর প্রতি সম্মান রেখে আমি অনেক দিন কাজ করিনি। এরপর আবার শুরু করেছিলাম এবং এখনো করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি দ্বিধাহীনভাবে বলব, আমার স্বামীর সহযোগিতা না পেলে আমি শুরু করতে পারতাম না। তখন প্রথম টেলিভিশন চালু হয় ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। সে সময় প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। তখন নাটকের শুটিং হতো পুরান ঢাকার কোনো বাড়িতে। সারা দিন লোকের ভিড় থাকার পর যখন সবাই চলে যেত, তখন আস্তে আস্তে রাত ১০টা-১১টার পর শুটিং শুরু হতো। বাসায় ফিরতে ভোর হয়ে গেছে। আমার স্বামী গেট খুলে দিতেন। ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে আবার সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় ঘুম থেকে তুলে দিতেন। এই যে আমার স্বামী আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, তা না হলে আমি দিলারা জামান আমার এত দূর আসা সম্ভবই ছিল না।’

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাঁর কখনো মনে হয়েছে কি না, যা প্রাপ্য তা তাঁকে দেওয়া হয়নি? তিনি বলেন, ‘যতটুকু পেয়েছি এ জীবনে অনেক পাওয়া। কিন্তু যারা এখন কাজ করতে আসছে, তাদের অনেক বাধা আছে। যেমন অনেক মেয়ে রাত হলে বাড়ি যেতে পারছে না, গেট বন্ধ করে দিয়েছে বাড়িওয়ালা। তখন আমি তাদের বাসায় নিয়ে যাই। আবার তাদের যেটুকু পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা, সেটুকু তারা পাচ্ছে না। সমাজের সব পর্যায়ে এমন হচ্ছে। বৈষম্য দূরীকরণে সমাজের নীতিনির্ধারকেরা আইন প্রয়োগ বা নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সজাগ বা সোচ্চার নয়।’

দিলারা জামান এখন অনেকের অনুপ্রেরণা। তাঁর অনুপ্রেরণা কে? তিনি বলেন, ‘আমাদের সময়ে ছিলেন শামসুর নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামাল, মাহমুদা খানম সিদ্দিকা, জোবেদা খানম—ওঁনারা সবাই লেখালেখি করতেন। তখন যাঁরা অভিনয় করতেন, তাঁরাও ছিলেন।

default-image

তাঁদের দেখে প্রতিজ্ঞা ছিল, ওঁনারা যে পথে গেছেন, সেই আলোর পথ ধরে চেষ্টা করব যত দূর এগোতে পারি। বাধা-বিপত্তি যে আসেনি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য যে করা হয়নি, তা নয়। কষ্ট হয়েছে। এখন মনে হয়, সেগুলোই আমাকে প্রেরণা দিয়েছে আরও যোদ্ধা হয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।’

বিজ্ঞাপন
সম্পর্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন