অলংকরণ: আরাফাত করিম
অলংকরণ: আরাফাত করিম

যুগ যুগ ধরে পৃথিবীজুড়ে এক দেশ আরেক দেশকে দখল, প্রতিশোধ এবং তাদের ক্ষমতা দেখানোর উদ্দেশ্যে অনেক আগ্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে ধর্ষণ একধরনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আমাদের দেশেও একাত্তরের যুদ্ধে হানাদার বাহিনীদের হাতে অগণিত নারী ধর্ষিত হয়েছে। কিন্তু আজ তো আমরা স্বাধীন। তবে কেন আমাদের সমাজে এর সংক্রমণ বেড়েই চলছে, যা থেকে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখায়।

একজন খুনি যেমন জন্ম থেকে খুনি হয়ে জন্মায় না তেমনি একজন ধর্ষণকারীও জন্ম থেকে ধর্ষণকারী হয়ে ওঠে না। যেকোনো অপরাধপ্রবণতা গড়ে ওঠার পেছনে অনেক পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা থাকে। ধর্ষণও এর ব্যতিক্রম নয়। ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পেছনে অনেক কারণের মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোকপাত করা হলো।

বিজ্ঞাপন

পারিবারিক সুসম্পর্ক

default-image

মা–বাবার মধ্যে সুসম্পর্ক এবং তাঁদের সঙ্গে সন্তানের সুন্দর সম্পর্ক দুটিই একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিসীম ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে কোনো সন্তান যদি ছোটবেলায় প্রতিনিয়ত মা–বাবার মধ্যে ঝগড়া, মারামারি ইত্যাদি আগ্রাসী আচরণ দেখে এবং নিজেও মা–বাবার দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় অথবা যেকোনো একটির অভিজ্ঞতা তার থাকে, তখন সে ভীষণ অসহায় বোধ করতে পারে। তার মধ্যে প্রবল রাগ, ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে, যা হয়তো সে ছোটবেলায় মনের মধ্যে দমিয়ে রাখে, কিন্তু বড় হয়ে সে বিভিন্ন ধরনের আক্রমণাত্মক ও আগ্রাসী কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে তার অবদমিত রাগকে প্রকাশ করে। অনেকে এসব কার্যকলাপের সঙ্গে ধর্ষণকেও বেছে নিতে পারে তার রাগ এবং ক্ষমতা দেখানোর জন্য।

লালন-পালনের প্রক্রিয়া

বেশির ভাগ পরিবারেই দেখা যায় যে মা–বাবা ছেলে ও মেয়েকে আলাদা মূল্যবোধ দিয়ে বড় করে, যেমন মেয়েদের ধৈর্যধারণ, নিজের রাগ, জেদ নিয়ন্ত্রণ করা, সবকিছু মেনে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। ছেলেদের ছোট থেকেই তাদের মতামত প্রকাশে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও পুরুষত্ব প্রদর্শনের ওপর জোর দেওয়া হয়। তাই তাদের আবেগ প্রকাশ, সংবেদনশীলতা ও কান্না করাকে কম উৎসাহিত করা হয়। অনেক পরিবারে মেয়েদের একেবারেই সম্মান প্রদর্শন করা হয় না বরং শুধু সন্তান লালন–পালন ও ভোগের পণ্য হিসেবে দেখা হয়। আবার ছেলেদের অনেক বেশি প্রশ্রয় দিয়ে বড় করা হয়। একদিকে মেয়েদের সম্মান প্রদর্শন করার শিক্ষা না পাওয়া অন্যদিকে নিজে ছেলে বলে যেকোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখে এ ধারণা নিয়ে বড় হতে থাকে, যা অনেক সময় অনেক ছেলেদের ধর্ষণ করার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। অনেক গবেষণায় ধর্ষণকারীর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, যেমন তারা অন্যের কষ্টকে বুঝতে পারে না, বেশি মাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক হয়, মেয়েদের প্রতি একটি আক্রমণাত্মক মনোভাব থাকে, তার ক্ষমতা বা পুরুষত্ব জাহির করার প্রবণতা বেশি থাকে।

যৌনশিক্ষা

আমাদের পারিবারিক কাঠামো অনেক রক্ষণশীল হওয়ায় আমাদের পরিবারের মধ্যে যৌন বিষয়ে কথা বলা প্রায় নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে আলোচনা না করায় আমাদের সঠিক জ্ঞানের অনেক অভাব থাকে। একজন মেয়ে কিশোর বয়সে পদার্পণ করলে তার শারীরিক অনেক পরিবর্তনের কথা যেমন সে তার মায়ের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে তেমনি একজন ছেলে কিশোর অবস্থায় তার বাবার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলতে পারে না এবং বাবা-মাও উদ্যোগী হয়ে এ ব্যাপারে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। যেহেতু নিষিদ্ধ জিনিসে আগ্রহ বেশি তাই কিশোর বয়সে যৌন বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা বন্ধুদের থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, যা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক না–ও হতে পারে। আবার অনেকে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে যৌনসম্পর্কিত কল্পনায় বিভোর থাকতে পারে। অনেক সময় বন্ধুদের প্ররোচনায়, যৌনসম্পর্কিত অভিজ্ঞতা লাভের আশায় এবং নিজেকে পুরুষ প্রমাণের চেষ্টায় অনেকে ধর্ষণ করে।

বিজ্ঞাপন

ভ্রান্ত বিশ্বাস

সমাজে ধর্ষণ করার প্রবণতা থাকার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো ধর্ষণ সম্পর্কে ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ধারণা, যা সারা বিশ্বেই কমবেশি বিদ্যমান। ১৯৭০ সালে প্রথম ধর্ষণসম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে গবেষণা শুরু হলেও আজ তার ৫০ বছর পরও সেসব ধারণা থেকে মানুষ তেমন একটা বের হয়ে আসতে পারেনি। এসব ভ্রান্ত ধারণার অজুহাতে প্রকৃত দোষীরা আড়ালেই থেকে যায় এবং অনেকে দোষীর বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস পায় না, যা তাকে আরও ধর্ষণ করতে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে ভিকটিমকেই দায়ী করা হয়, ফলে সে এবং তার পরিবার একটি ভয়ংকর লজ্জাকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। যার ফলে সে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যা যেমন তীব্র হতাশা, রাগ, ঘুমের সমস্যা ক্ষোভ ও পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি), আত্মহত্যার প্রবণতা এবং অনেকে আত্মহত্যা করে থাকে।

সমাজে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা

default-image

১. সব দেশেই কমবেশি এ ধারণা প্রচলিত যে মেয়েদের জামাকাপড় ছেলেদের ধর্ষণে প্ররোচিত করে। সত্যিকার অর্থে মেয়েরা যে জামাকাপড় পরে, তার সঙ্গে ধর্ষণের কোনো সম্পর্ক নেই।
২. আরেকটি ভুল ধারণা হচ্ছে যৌনতা বা ধর্ষণ সম্পর্কে বেশি কথা বলে ধর্ষণকে আরও প্ররোচিত করা হয়। পরিবার বা সমাজে যৌনতা নিয়ে কথা বলার অভ্যাস না থাকার ফলে আমাদের মধ্যে সঠিক যৌন আচরণ নিয়ে সচেতনতা গড়ে উঠছে না, যা ধর্ষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৩. ছেলেরা যৌন আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, এ ধরনের অজুহাতও ধর্ষণ করাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই কারও যৌনসন্তুষ্টির জন্য ধর্ষণ হতে পারে না। মেয়েরা যেমন যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তেমনি ছেলেরাও চাইলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
৪. আমরা অপরিচিত মানুষের বেলায় সতর্ক থাকি। কিন্তু বেশির ভাগ ধর্ষণ হয় পরিবারের লোকজন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কারও দ্বারা।

৫. আমাদের ভ্রান্ত ধারণা আছে যে নিজের স্ত্রী বা সঙ্গীকে ধর্ষণ করা সম্ভব নয়। একজন অন্যজনকে যেকোনো সময় সেক্সের ব্যাপারে না বলার অধিকার রাখে, পূর্বসম্মতিতে তা হয়ে থাকলেও কোনো একদিন স্ত্রীর সঙ্গে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামী জোর করে শারীরিক সম্পর্ক করলে তা ধর্ষণ হিসেবে বিবেচ্য হয়।
আমাদের সমাজে স্ত্রী ধর্ষিত হয় অনেক; কিন্তু সেটা রিপোর্ট হয় না গুরুতর আহত না হলে বা মারা না গেলে।
৬. আবার আমরা ভাবতেই পারি না যে একটি ছেলেও ধর্ষিত হতে পারে। যদিও বেশির ভাগ ধর্ষণ ছেলেরাই করে, তবে সংখ্যায় খুব কম হলেও মেয়েরাও ধর্ষণ করে, এ ক্ষেত্রে ভিকটিম ছেলেটিও বিভিন্ন মানসিক সমস্যা ভোগ করতে পারে।
৭. প্রচলিত আছে যে মেয়েরা সাধারণত ধর্ষণ নিয়ে মিথ্যা কথা বলে এবং ‘সত্যিকারের’ ধর্ষণ হওয়ার পরপরই রিপোর্ট করা হয়। প্রকৃত অর্থে মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ খুবই কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সত্যিকার ধর্ষণই রিপোর্ট করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণকে না মানতে পারা, লজ্জা ও অপরাধবোধ, পরিবার ও সমাজের চাপ, ধর্ষণজনিত বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা ইত্যাদি কারণে ধর্ষণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক রিপোর্ট করা হয়ে ওঠে না এবং অনেকেই একদমই রিপোর্ট করে না।
৮. বলা হয়ে থাকে যে চিৎকার না করলে কিংবা শারীরিকভাবে আহত না হলে তাকে ধর্ষণ বলা যাবে না এবং ভিকটিমের উচিত ধর্ষণকারীকে পাল্টা আক্রমণ করে নিজেকে রক্ষা করা। যেকোনো নির্যাতন বা ধর্ষণের সময় ভিকটিম চিৎকার করতে পারে, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু অনেক সময় ধর্ষণকারী ভিকটিমকে বেঁধে বা অচেতন করে বা বিভিন্নভাবে ভয় দেখিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত করে ফেলে, তাই সে চিৎকার বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। তাই ধর্ষণ চিৎকার করা, ক্ষতবিক্ষত হওয়া বা পাল্টা আক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দুজনের ইচ্ছায় সেক্স না হলে তা ধর্ষণ।

বিজ্ঞাপন

ছেলে-মেয়েদের আমাদের দেশের পরিবার ও সামাজিক কাঠামো অনুযায়ী ঘরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌনশিক্ষা’ দেওয়া, তাদের ‘গুড টাচ’, ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে অবহিত করা দরকার। একজন মেয়েকে যেভাবে বাবা, ভাই, স্বামীকে সম্মান করতে শেখানো হয় তেমনি একজন ছেলেকেও তার আশপাশের নারীদের সম্মান করতে শেখানো উচিত। তাদের সংবেদনশীল ও আবেগ প্রকাশের জায়গাগুলোতে উৎসাহিত করা উচিত; অন্যদিকে আক্রমণাত্মক কিংবা ক্ষমতা দেখানো নয়, পুরুষত্বের সঠিক সংজ্ঞা শেখানো উচিত, যা পরিবার ও সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত।

ধর্ষণ প্রকৃতপক্ষে একটি জঘন্য অপরাধ এবং এটি একজন ব্যক্তির বিকৃতি চিন্তাভাবনার ফল। ধর্ষণ ভিকটিমের লজ্জা বা দোষ কোনোটিই নয়; তাই তাকে এ নিয়ে দোষারোপ করার প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে আসতে হবে। সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেও সমাজ থেকে ধর্ষণ নির্মূল হয়ে যাবে না; শাস্তির পাশাপাশি আমাদের সমাজের প্রতি স্তরে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিবার ও সামাজিক কাঠমোর পরিবর্তন, মা–বাবার সঠিক লালন-পালন ও পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক, ধর্ষণ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা চিহ্নিত করে সঠিক ধারণার চর্চা করা, যৌন বিষয়ে কথা বলা এবং সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই সামাজিক ব্যাধিকে অনেকটা নির্মূল করা যাবে।

লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজিস্ট, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস, যুক্তরাজ্য

মন্তব্য করুন