ভালো বাসা
default-image
বিজ্ঞাপন

১.
নোটিশের কাগজটা হাতে পেয়ে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। এক মাসের ভেতর হেল্মহোল্টজ রিসার্চ সেন্টারের গেস্ট ডরমেটরি ছেড়ে দিয়ে নতুন ডেরা খুঁজে উঠে যেতে হবে। তিন মাসের বেশি বিদেশি ছাত্রদের এখানে নাকি থাকতে দেওয়ার নিয়ম নেই। আমাকে দয়া করে আরেক মাস সময় বেশি দেওয়া হয়েছে। তারপর দয়ার ভান্ড সরিয়ে ফেলা হবে। তারপর, কোন চুলোয় গিয়ে পড়ি, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা থাকবে না। কপালের ভাঁজে রাজ্যের দুশ্চিন্তা এসে ভর করল।

গত মাসে তামিল ছেলে সুকুমারের তিন মাস ফুরিয়ে গেছে। ডর্মের স্টোরেজ রুমে সে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে ঠাসা স্যুটকেসটা জমা দিয়ে অর্ধেক রাত ম্যাকডোনাল্ডসে বার্গার চিবিয়ে কাটিয়েছে। আর বাকি রাতটা তাকে বাসস্টেশনের বেঞ্চিতে কাত হয়ে পার করতে হয়েছে। পরে অবশ্য এক বন্ধুর বাসায় গতি হয়েছিল।

জার্মানিতে আমার অমন বন্ধুও নেই যে বিপদে ঠাঁই দেবে। সুতরাং শীতের রাতে ভূতের মতো রাস্তায় শুয়েবসে কাটানো বোধ হয় আর ঠেকানো যাবে না। দৃশ্যটা ভাবতেই কলিজা শুকিয়ে এল। এ দেশে পড়তে এসেছিলাম। কিন্তু তার বদলে বোধ হয় অকূল পাথারে পড়তে যাচ্ছি। মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের কতগুলো ডর্ম আছে বটে, কিন্তু সেখানে জায়গা পেতে নাকি দু-তিন বছর লেগে যায়। তত দিনে তো পাস করে বেরিয়ে যাব। তখন আর বাসা দিয়ে হবেটা কী।

default-image

তবু এক কলিগের পাল্লায় পড়ে আবেদন একটা করেই ফেললাম। দুষ্টু কলিগ সামান্য অভিনয়ও শিখিয়ে দিয়েছে। ডর্ম অফিসে ডাক পড়লে একবারে বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে যেতে হবে। গিয়ে নাকি কেঁদে পড়ে বলতে হবে, ‘জায়গা না দিলে আমি তোমাদের অফিসেই থাকা শুরু করব। এই দেখো চাদর বিছিয়ে বিছানা পাতছি।’ এই হুমকিতেও কাজ না হলে মামলার ভয় দেখাতে হবে। ‘বাসা খুঁজতে গিয়ে না হক প্রচুর মানসিক ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে। বিরাট ডিপ্রেশন কাজ করছে। এখন তোমাদের নামে হয়রানির মামলা করে দেব ভাবছি’...ইত্যাদি।

দিন কয়েকের মাথায় ডাক পড়ল। কিন্তু ডাক সবারই পড়ে। খুব শিখেপড়ে গেলাম লাইনগুলো। কাঁধের ব্যাগটায় কাপড় পুরে বেশ ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে এনেছি। যেকোনো মুহূর্তে ভ্যাক কান্নাপূর্বক অভিনয় ঝেড়ে দেব। কিন্তু না, অবাক করে দিয়ে ১০ মিনিটের মাথায় হাতে একটা জ্বলজ্বলে ঠিকানা এসে পড়ল। এক মিনিটও সময় নষ্ট না করে ছুটলাম সেই ঠিকানা বরাবর।

২.
চার হাত বাই আট হাত আয়তাকার বাক্সটার ভেতর বসে ভাবছি, এই কফিনে থাকব কী করে। দেয়ালে চার কোনা একটা ঘুলঘুলির মতো আছে। ওটা নাকি জানালা। সেটা গলে এক রত্তি আলো ঘরে ঢোকার জো নেই। কবরের আঁধার বুঝি একেই বলে, বাবা রে...। আবার পাশের ঘরে কে যেন গলা ছেড়ে কার সঙ্গে চ্যাঁচাচ্ছে। ভয়ংকর জার্মান গালিগুলো পলকা দেয়াল টপকে এদিকে উড়ে আসছে। আরও উড়ে আসছে বিচিত্র একটা ধোঁয়াটে ঘ্রাণ।

মানুয়েলা নামের মেয়েটা, যে কিনা মাস্টার্সের পাট চুকিয়ে নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছে, আর যার ছেড়ে দেওয়া ঘরটাই আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছে, সে একগাল হেসে রহস্য করে বলল, ‘ঘ্রাণ নিয়ে ভাবছ? ছেলেপেলেরা মিলে একটু গাঁজা টানছে। নিত্যদিনের ব্যাপার। পার্ট অব ডর্ম কালচার, হাহা...’। বিটকেলে গঞ্জিকার যাচ্চলে গন্ধে অস্থির আমি সেই হা হায় অংশ নিতে পারলাম না। মানুয়েলা হঠাৎ গম্ভীর মুখে বলল, ‘খালি উইকএন্ডে চোখ কান খোলা রাখবে। কেউ কেউ খুব ড্রিংক করে দরজায় দমাদম ঘাই দেয়। মনের ভুলে কিংবা ইচ্ছা করেই। একবার দরজা খুলে দিয়েছি আর দোতলার স্প্যানিশ ছেলেটা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্নাকাটি জুড়ে দিল। পাড় মাতাল কাউকে ঘরে ঢুকতে দেবে না, কেমন?’

মানুয়েলার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। কফিন-বাসা আর গাঁজাখোর প্রতিবেশী, কোনোটাতেই মন সায় দিল না। এ দেশে দেখছি ভালো বাসার বড় অভাব।
দিন কতক পর। ইন্টারনেটে এলোমেলো ঘাঁটতে গিয়ে পাওয়া এক বিজ্ঞাপনের বনামে আজকে আরেক ঠিকানা খুঁজে বাসা দেখতে এসেছি। পুরোনো দালানটার বেশ বনেদি চেহারা। তিনতলার বারান্দা তো দেখছি রোদে ভেসে যাচ্ছে। নাহ্, আজকে কপালে একটা ভালো বাসা জুটেই যাবে মনে হচ্ছে। ষাট পেরোনো ভদ্রমহিলা অমায়িক হেসে দোর খুলে দিলেন।

জানালায় মোটা পর্দা ঝুলছে। ঘরের কোনায় ধীরলয়ে গান চলছে। জন লেনন নিচু স্বরে গেয়ে যাচ্ছে, ‘ইমাজিন দেয়ার ইজ নো হ্যাভেন...’। সুবিশাল বৈঠকখানার দেয়ালে জিম মরসনের পোস্টার। বেশ একটা সত্তরের দশকের আমেজ চারপাশে। ভালোই লাগছে এ পর্যন্ত।

অনেকগুলো ঘর। প্রতিটাই ছাত্রদের কাছে ভাড়া দেওয়া। ‘আর এই যে দেখো, কমন কিচেনটা কত বড়। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না।’ বাড়িওয়ালী ফ্রাউ রিটার সবকিছু দেখাতে দেখাতে বললেন। রান্নাঘরে ডিম ভাজতে থাকা জুলিয়ান নামের ছেলেটা বেমক্কা বলে বসল, ‘রান্নার আরও একটা জায়গা আছে। চলো দেখাই তোমাকে।’ বিনা বাক্য ব্যয়ে তার পিছু নিলাম।

বিকল্প রান্নাঘর কোথায়। এ যে দেখছি গোসলখানা। কিন্তু দরজা যে হাট করে খোলা। বাথটাবের পাশে ওয়াশিং মেশিনটা কাপড়সমেত সশব্দে ঘুরছে। তারই ওপর ছোট্ট একটা স্টোভ জ্বালানো। মেশিনের মৃদু কাঁপুনিতে সেটা ক্রমেই ডান দিকে সরে যাচ্ছে। সসপ্যানে চাপানো ইনস্ট্যান্ট নুডলস যেকোনো মুহূর্তে উল্টে পড়ে ইনস্ট্যান্ট অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে। থ মেরে গেলাম যখন অর্ধস্বচ্ছ প্লাস্টিকের পর্দার ওপাশ থেকে নুডলসের মালিক তাড়া লাগাল, ‘এ্যাই এ্যাই, চুলাটা নিভিয়ে দাও না, আমার লাঞ্চটা পুড়ে গেল তো...।’ জুলিয়ান ছেলেটা স্টোভ নিভিয়ে দিয়ে তাক থেকে একটা ধোয়া তোয়ালে ছুড়ে মারল বাথটাব বরাবর। আর গাঁক গাঁক করে খিঁচিয়ে উঠল, ‘দিয়েছি নিভিয়ে।

সেদিনের মতো আবার তোয়ালে ছাড়া বেরিয়ে এসো না।’
আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই জুলিয়ান জানাল, ‘এই কাজ সে প্রায়ই করে। সেদিন তো ইন্ডিয়ান মেয়ে পার্বতী ভয়ে চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল। কী এক কাণ্ড...।’ মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। তোয়ালেবিহীন দেবদাসকে নুডলসের সসপ্যান হাতে দৌড়াতে দেখলে পার্বতীর তো ভয় পাওয়ারই কথা।

কখন যে ফ্রাউ রিটার পিছে এসে দাঁড়িয়েছে। ‘চলো, তোমাকে তোমার ঘর দেখিয়ে দিই। একদম সাজিয়ে–গুছিয়ে রেখেছি।’ ভেজানো পাল্লা ঠেলে উঁকি দিতেই তাজ্জব বনে গেলাম। শ্বেতশুভ্র সফেদ বিছানাটায় রাজপুত্রের মতো ফুটফুটে চেহারার কে যেন জুতা-মোজা, স্যুট-টাইসুদ্ধ অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ফ্রাউ রিটারের হাঁক ডাকে সে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। তারপর অত্যন্ত অ-রাজপুত্রীয় ভঙ্গিতে ঘ্যাষঘ্যাষ করে পিঠ চুলকাতে চুলকাতে বিরাট এক হাই তুলে ফেলল। ফ্রাউ রিটার কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘ক্রিস, আবার যদি কারও রুমে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছ, তো দেখবে মজা।’ তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় আমাকে বলল, ‘আসলে এখানে আমরা সবাই মিলে ঝুলে থাকি। কার কোন ঘর, এত ভাগযোগে কী লাভ।’ বুঝলাম, এ বাড়িতে ‘প্রাইভেসি’ শব্দটা একেবারে অচল পয়সার মতোই অচল। হতাশ হয়ে ক্ষান্ত দিলাম। ভালো বাসার এত খরা এ দেশে, কে জানত।

বিজ্ঞাপন

৩.
ওবারশ্লাইসহাইম। পুরোপুরি ভূতের জায়গা। বাড়িঘর বড্ড কম। মাঠ আর জঙ্গল বেজায় বেশি। এমনি এক অদ্ভুতুড়ে এলাকায় ভাড়া বাড়ির খোঁজ পেলাম। বার দুই বাস বদলে আর অনেকখানি পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছে দেখা গেল এক পোড়ো বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে অতি কষ্টে। উঠানে এক হাঁটু জঙ্গল। কোনো এক কালে সেটা বাগান ছিল বোধ হয়। তার মাঝখানে ভয় ধরানো বদখত দেখতে এক কাকতাড়ুয়া হাত ছড়িয়ে ভেংচি কাটছে। সুড়ুৎ করে গিরগিটি না কী যেন একটা কোন গর্তে সেঁধিয়ে গেল হঠাৎ। সব মিলিয়ে হরর ছবির ছমছমে শুটিংবাড়ি বলে ভুল হতে চায়।

দোতলাটা ভাড়া দেওয়া হবে। কাঠের টেবিলে কাঁটাচামচ আর প্লেট সাজানো দেখে মনে হবে যেন এই বুঝি ডিনার খেতে বাড়ির লোকের টেবিলে চলে আসবে। কিন্তু ঘটনা হলো, এ বাড়ির একমাত্র বাসিন্দা ৯০ বছরের ভদ্রমহিলা গত সপ্তাহে মারা গিয়েছেন। তাঁর নাতিরা বাড়ি খালি না রেখে নতুন ভাড়াটে খুঁজছে।

default-image

‘কি, পছন্দ হয়েছে তোমার? পারবে না একা থাকতে? আমরা কাছেই থাকি। ভয় পেলেই ফোন দেবে। ১০ মিনিটে চলে আসব।’ কোনোমতে ঢোঁক গিলে দ্রুত হিসাব করতে লাগলাম। কোনো কারণে ভয় পেলে কিংবা ভূতে ধরলে ১০ মিনিট টিকব তো, নাকি তার আগেই মরে শক্ত হয়ে থাকব।

ভূতের কাছে ভবিষ্যৎ সঁপে দিতে পারলাম না। চলে এলাম। আগের দুটো দেখে আসা বাসা নাকচ করে দিয়ে বিরাট বোকামি হয়ে গেছে। হাতে আর মাত্র দিন ১৫ আছে। তারপরই পথে নামতে হবে। ভয়ে-আতঙ্কে ঘুম হারাম অবস্থা দাঁড়াল। চোখের সামনে এক টুকরা খড়কুটোও মিলল না, যেটা আঁকড়ে এই অকূল পাথারে ভেসে থাকা যায়।

৪.
এমনি সময়ে মুশকিল আসান হয়ে এল রিসার্চ সেন্টারের ক্যাফেটেরিয়ার দেয়ালে সাঁটানো ছোট্ট একটা টু-লেট নোটিশ। ‘ছাত্র বা ছাত্রীকে ঘর ভাড়া দেওয়া হবে। যোগাযোগের ঠিকানা: মারিয়ন বিটনার, ফোন ০১৭৬...’। পড়িমরি করে মুঠোফোনটা বের করে বোতাম চাপতে লাগলাম। যেইখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। সুতরাং প্রবল বেগে ছাই ওড়াতে লাগলাম।

default-image

শনিবার সকাল। শীতের মেঘ সরিয়ে এপ্রিলের কাঁচা রোদ উঁকি দিচ্ছে। বিপ বিপ শব্দে গাড়ির হর্ন বেজে উঠল। ফ্রাউ বিটনার চলে এসেছেন। পঁচাত্তরেও বেশ ঝরঝরে ফিট শরীর। আমার পেল্লায় দুটো স্যুটকেস একটার পর একটা অনায়াসে ব্যাক ডালায় পুরে ঝাঁপি ফেলে দিলেন। সঙ্গে আমাকেও সামনের সিটে পুরে একগাল চওড়া হাসিতে বললেন, ‘আর চিন্তা নেই, বিদেশি মেয়ে। চলো, যাওয়া যাক।’

আধা ঘণ্টা পর। নিখুঁত ছিমছাম ছোট্ট ঘরটায় বসে চিমটি কাটছি হাতে। আসবাব দেয়ালজোড়া। কিছুই কিনতে হবে না। ভাড়াটাও চলনসই। সবচেয়ে বড় কথা, জ্যান্ত কি ভূত, আর কোনো বাসিন্দা নেই এখানে। বিচিত্র সব আপদ ডিঙিয়ে নিরাপদ একটা ঠাঁই। ফ্রাউ বিটনার হাতে এক কাপ গরম কফি ধরিয়ে দিয়েছেন। উষ্ণতায় মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। নাহ্, ভালো বাসা তাহলে মিলল অবশেষে।

লেখক: পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক, ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, স্কুল অব মেডিসিন, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি

সম্পর্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন