প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবিছবি: প্রথম আলো

নতুন অফিসে যোগ দেওয়ার পর থেকেই আসিফ অস্থিরতায় ভুগছে। কারও সঙ্গেই অ্যাডজাস্ট হচ্ছে না। অফিসের বস থেকে শুরু করে অন্যান্য সহকর্মী, সবার সঙ্গেই কেমন একটা বৈরী সম্পর্ক মনে হচ্ছে। এই অফিসে ওর আগমনটা কেউ যেন মেনে নিতে পারছে না। সারাক্ষণ যেন সবাই পিছু লেগে আছে কীভাবে তাকে হেয় করা যায় এবং এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। হেড অফিসে তার নামে অভিযোগ উঠেছে। অথচ সে বরাবরই একজন কাজপাগল মানুষ, নিরলসভাবে অফিসের কাজ করে যায়। এটাই হয়তোবা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, অফিসের পুরোনো লোকজন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। বেশ কয়েকবার হুমকির সম্মুখীনও হতে হয়েছে তাকে। বিষয়টা আসিফের মনের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে। ইদানীং ভয়ও লাগছে, কেমন একটা অনিরাপত্তায় ভুগছে, ঘুমের সমস্যা হচ্ছে, মেজাজটাও ভালো যাচ্ছে না, বেশির ভাগ সময়ই মনটা খারাপ থাকছে এবং নিজেকে খুব একা লাগছে। বিষয়টা কাউকে শেয়ারও করতে পারছে না।

default-image

এদিকে পারিবারিক সম্পর্কটাও ভালো যাচ্ছে না। অফিসে সময় দিতে গিয়ে পরিবার থেকে কখন যে দূরে সরে গিয়েছে টেরই পায়নি আসিফ। তার স্ত্রী মিলির সঙ্গে দূরত্বটা যেন ক্রমে বেড়েই চলেছে। ইদানীং প্রায়ই মিলিকে অফিস টাইমের পরও অনেকটা সময় বাইরে থাকতে হচ্ছে। বাড়িতে এসেও পরিবারের নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে ব্যালেন্স করতে পারছে না। সারাক্ষণ মেজাজ তিক্ত হয়ে থাকে, আসিফের কথাবার্তা শুনলেই রেগে যায় মিলি। ফোনে কথা বলতে দেখলেই আসিফ যেন কেমন সন্দেহ করে। আসিফের এমন আচরণ অসহ্য লাগে মিলির।

নিজেদের মধ্যে শেষ কবে সুন্দর সময় কেটেছে, তা তাদের মনে নেই। কেউ কারও সঙ্গে কিছু আলোচনা করার দরকারও মনে করে না এখন। যা কিছু কথা হয়, তা কথা-কাটাকাটি বা ঝগড়া ছাড়া আর কিছু না। মা–বাবার এই ঝগড়া, পারিবারিক অশান্তি তাদের একমাত্র সন্তান আলিফের মনের ওপর ভীষণ রকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। স্কুল থেকে প্রায়ই অভিযোগ আসছে তার নামে, পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে যাচ্ছে, ক্লাসে মারামারি করছে, শিক্ষকদের আদেশ মানছে না। এমনকি বাড়িতেও সে কোনো নিয়ম-নীতি মানছে না, অল্পতেই রেগে যাচ্ছে, মা–বাবাকে অসম্মান করছে, বেশির ভাগ সময় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকছে এবং এটা-সেটা চাহিদা বেড়েই যাচ্ছে। পরিবারের কারও সঙ্গেই ঠিকমতো কথাবার্তা বা দেখা-সাক্ষাৎও হয় না আর।
 

বিজ্ঞাপন
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে ব্যক্তির এমন একটা মানসিক অবস্থাকে বোঝায়, যখন ব্যক্তি সুস্থ–স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারে, সঠিকভাবে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, নিজের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে বুঝতে পারে এবং তা কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে।

এই গল্পে এক ব্যক্তির পেশাগত ও পারিবারিক জীবনের একটা অসুস্থ সম্পর্কের চিত্র দেখা যাচ্ছে, যা ওই ব্যক্তির পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আসলে মানসিক স্বাস্থ্য কী, পারস্পরিক সম্পর্ক বলতে কী বোঝায়, আর মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে জড়িয়ে আছে আর কীভাবেই–বা এর যত্ন নেওয়া যাবে, এসব বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে ব্যক্তির এমন একটা মানসিক অবস্থাকে বোঝায়, যখন ব্যক্তি সুস্থ–স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারে, সঠিকভাবে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, নিজের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে বুঝতে পারে এবং তা কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারা এবং সবার সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারাকেও সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য বোঝায়। সুতরাং মানসিক স্বাস্থ্য মানে কেবল মানসিক রোগের অনুপস্থিতিই নয়, সর্বক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাভাবিক কার্যক্ষমও।
মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।

ব্যক্তির মধ্যে নানা ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়, যেমন: পারিবারিক সম্পর্ক, দাম্পত্য সম্পর্ক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক, পেশাগত সম্পর্ক, আবেগপ্রবণ সম্পর্ক ইত্যাদি। মানুষের জীবনে প্রতিটি সম্পর্কেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

জীবনযাপনের জন্য মানুষকে প্রতিনিয়ত নানা রকম কাজ করতে হয় এবং নানা রকম সম্পর্কের মধ্যে থাকতে হয়। দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক যে সংযোগ, মিথস্ক্রিয়া বা বন্ধন তৈরি হয়, তাকেই পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝায়। ব্যক্তির কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় জন্মগতভাবে আর কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে বৈবাহিক সূত্রে ও সামাজিকভাবে। ব্যক্তির মধ্যে নানা ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়, যেমন: পারিবারিক সম্পর্ক, দাম্পত্য সম্পর্ক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক, পেশাগত সম্পর্ক, আবেগপ্রবণ সম্পর্ক ইত্যাদি। মানুষের জীবনে প্রতিটি সম্পর্কেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

যদিও একেক বয়সে একেকটা সম্পর্ক বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু পারিবারিক সম্পর্ক ব্যক্তির জন্মের পর থেকে সারা জীবন বিশাল অবদান রেখে থাকে। ব্যক্তির জীবনে পরিবার সর্বময় সহযোগিতার উৎস। সে ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুসম্পর্ক অবশ্যই কাম্য। পরিবারের বাইরের অন্যান্য সম্পর্ক, যেমন: বন্ধুত্ব, পেশাগত ও অন্যান্য সামাজিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক জোরালো ভূমিকা রাখে।

শিশু ও কিশোর বয়সে পরিবারের বাইরে যে সম্পর্কটা অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করে, তা হলো বন্ধু ও সমবয়সী দলের সঙ্গে সম্পর্ক। সম্পর্ক তৈরি করা ও মানিয়ে চলার প্রক্রিয়াটা মূলত এখান থেকেই শুরু হয়। পরিণত বয়সে আরও বেশ কিছু নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেমন: পেশাগত সম্পর্ক, দাম্পত্য সম্পর্ক, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি। এ বয়সে আবার সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও পড়তে হয় বেশি। মা–বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ বা আলাদা হয়ে যাওয়া, সন্তানের সঙ্গে বিচ্ছেদ, পেশাগত জীবন ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে ব্যালেন্স করা, কর্মজীবনের অবসর, কাছের মানুষের মৃত্যুশোক ইত্যাদি অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

বিজ্ঞাপন
যেসব ব্যক্তি পরিবার, বন্ধু বা সমাজের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে অনেক বেশি সংযুক্ত, তারা মানসিক ও শারীরিকভাবে অনেকটাই সুস্থ থাকে অন্যদের তুলনায়।

মানসিক স্বাস্থ্যে সম্পর্কের ভূমিকা

মানসিক স্বাস্থ্য ও সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ওপরের গল্পটিতে দেখা গিয়েছে, সুস্থ সম্পর্কের অভাবে পেশাগত ও পারিবারিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে, যা ব্যক্তিকে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করছে। মানসিকভাবে ভালো থাকার ক্ষেত্রে সুস্থ সম্পর্ক একমাত্র কারণ না হলেও এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ধারক। আমাদের চারপাশের সব মানুষই কোনো না কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। পারস্পরিক এই সম্পর্কই আমাদেরকে ভালো রাখে আবার কখনো খারাপ রাখে। সুতরাং বলা যেতে পারে, সম্পর্ক আমাদের মানসিকভাবে ভালো বা খারাপ রাখার ক্ষেত্রে একটা শক্তিশালী মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে।

যেসব ব্যক্তি পরিবার, বন্ধু বা সমাজের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে অনেক বেশি সংযুক্ত, তারা মানসিক ও শারীরিকভাবে অনেকটাই সুস্থ থাকে অন্যদের তুলনায়। তারা একে অপরের সঙ্গে সুখ-দুঃখ শেয়ার করার মাধ্যমে হালকা হতে পারে, আলোচনার মাধ্যমে বাস্তব চিন্তা করতে পারে, আবার অনেক সমস্যার সমাধানও খুঁজে পেতে পারে। শুধু অনেক বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেই যে ব্যক্তি মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে তা নয়, বরং কতটা সুস্থ সম্পর্কের মধ্যে আছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ সম্পর্ক ব্যক্তিকে একা থাকার থেকেও অনেক বেশি একাকী করে দেয় অনেক মানুষের মধ্যে থাকার পরও। সুস্থ সম্পর্ক বেঁচে থাকার পথ দেখায়। পক্ষান্তরে, অসুস্থ সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই বিষণ্নতা তৈরি করে ব্যক্তিকে মৃত্যুর দিকেও ঠেলে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ ও সুখী জীবনের জন্য সম্পদ নয় বরং সুস্থ সম্পর্কের অবদান রয়েছে। সুস্থ সম্পর্কের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মাত্রা কম এবং সহমর্মিতা, বিশ্বস্ততা ও আত্মসম্মানবোধ বেশি দেখা যায়।

একটা শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশ অনেক বেশি নির্ভরশীল তার পারিবারিক সম্পর্ক ও সুখ-সাচ্ছন্দ্যের ওপর। কিশোর বয়সের মানসিক সমস্যা বিশেষ করে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উচ্চমাত্রার সংযোগ আছে একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে।

একটা শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশ অনেক বেশি নির্ভরশীল তার পারিবারিক সম্পর্ক ও সুখ-সাচ্ছন্দ্যের ওপর। কিশোর বয়সের মানসিক সমস্যা বিশেষ করে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উচ্চমাত্রার সংযোগ আছে একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে। একাকিত্ব অ্যান্টিসোশ্যাল বিহেভিয়ার, বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

পরিণত বয়সে নানা রকম মানসিক সমস্যা তৈরি হয় মানসিক চাপ, পেশাগত কাজের প্রভাব ও পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির কারণে। অসুস্থ সম্পর্ক দাম্পত্য বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে, যা ব্যক্তির পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও নানা রকম মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অসুস্থ সম্পর্ক শারীরিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে থাকে। যেমন মানসিক চাপের কারণে হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের রোগ তৈরি হয়। এটা অনস্বীকার্য, আন্তব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যক্তির মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা ও সুখী হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানসিকভাবে সুস্থ থাকা ছাড়াও সুস্থ সম্পর্ক ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সুস্থ জীবনযাপনে সহযোগিতা করে।

সুস্থ ও অসুস্থ সম্পর্ক বোঝার উপায়

সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণগুলো হলো—
১. একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা
২. ভালো কাজের প্রশংসা করা
৩. একে অপরের সাফল্যে আনন্দিত হওয়া
৪. পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া
৫. ব্যক্তিকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে তার আচরণ শোধরাতে সহযোগিতা করা
৬. বিচারের দৃষ্টিতে না দেখে নিরপেক্ষ আচরণ করা
৭. একে অপরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা
৮. কাউকে হুমকি না দেওয়া
৯. মানসিক বা শারীরিকভাবে অত্যাচার না করা
১০. দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতিতে যৌথ কাজ করা
১১. তদন্ত বা খবরদারি করার পরিবর্তে সমবেদনার সঙ্গে কোনো কিছু জানতে চাওয়া ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন

অসুস্থ সম্পর্কের লক্ষণগুলো হলো

১. কাউকে অসম্মান প্রদর্শন করা
২. ভালো কাজের প্রশংসা না করে ভুল কাজের তিরস্কার করা
৩. একে অপরের উন্নতিতে ঈর্ষা করা
৪. নিজের সুবিধামতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা
৫. জোর করে কারও আচরণ শুধরানোর চেষ্টা করা
৬. একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস ও সন্দেহ পোষণ করা
৭. হুমকি দেওয়া বা ভয় পাওয়া
৮. খবরদারি করা ও মনে আঘাত দেওয়া
৯. দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে জোর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া
১০. কারও সমস্যা জানার পরিবর্তে অভিযোগ করা
১১. সব সময় অতীতের নেতিবাচক কাজের উদাহরণ টেনে আনা ইত্যাদি।

সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন

ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক যেমন মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, মানসিক স্বাস্থ্যও আবার ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে; অর্থাৎ এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির সম্পর্ক কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার মানসিক অবস্থার ওপর। যেমন অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার ইত্যাদি মানসিক রোগের কারণেও সম্পর্কের ওপর ভীষণ রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সুতরাং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা ও মানসিক রোগ সারিয়ে তোলার জন্য সুস্থ সম্পর্ক প্রয়োজন এবং সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্যও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

শৈশব ও কৈশোরের সম্পর্কগুলো ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। সুতরাং ছোটবেলা থেকেই সম্পর্কগুলোর প্রতি যত্ন নিলে এর সুফল অবশ্যই পাওয়া যাবে। পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে অনেকের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ একাকিত্বে ভোগে; অথচ চাইলেই এই একাকিত্বকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়। এ জন্য নিজের চেষ্টা থাকাটা জরুরি। প্রথম বিষয় হলো ব্যক্তি কী ধরনের সম্পর্কের মধ্যে আছে এবং সে কী ধরনের সম্পর্কের মধ্যে থাকতে চায়, তা খুঁজে বের করা। নানা উপায়ে সামাজিক সংযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে একাকিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে, যেমন: নতুন নতুন সম্পর্ক তৈরি করা, সাংস্কৃতিক ক্লাবের সদস্য হওয়া, খেলাধুলায় অংশ নেওয়া, সমাজসেবামূলক কাজ করা, আত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা বা যোগাযোগ রাখা, প্রতিবেশীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং যাদের সঙ্গে আগে থেকেই কোনো না কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে আছে, তা দৃঢ় করা।

সর্বোপরি সুস্থ থাকতে হলে শরীরের মতো মন ও সম্পর্কের যত্ন নিতে হবে। একটা চারাগাছকে যত্ন দিয়ে বড় করলে তবেই সেটা ফল দেয়; অন্যদিকে অযত্নে–অবহেলায় সেটা মরেও যায়। তেমনি সম্পর্কের বেলায়ও যত্ন নিলেই সুস্থ সম্পর্ক তৈরি হয় আর অবহেলায় ও অযত্নে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়; এতে করে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।

পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর উন্নতি করা যায় সচেতনতা ও যত্নের মাধ্যমে। যেমন: সম্পর্কের মধ্যে জটিলতা থাকলে তা খুঁজে বের করা এবং তিরস্কার না করে, কারও ক্ষতি না করে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে তা সঠিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা, যাতে করে উভয় ব্যক্তি স্বস্তি অনুভব করতে পারে। একে অন্যের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ করা, বিশ্বস্ত থাকা, ভালো কাজের প্রশংসা করা ও সঠিক ভাষার ব্যবহার করা। সম্পর্কের দৃঢ়তা বাড়ানোর জন্য কোয়ালিটি টাইম দেওয়া, খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে সাহায্য করা, সহমর্মিতা ও সহানুভূতি প্রকাশ করা, কোনো ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করার প্র্যাকটিস করা। কাজ, পরিবার ও অন্য সম্পর্কগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দরকারি আলোচনা করা, একসঙ্গে খাওয়া, টিভি দেখা ও গল্প করার মাধ্যমে সময় কাটানো, মনোযোগের সঙ্গে তাদের কথা শোনা। আবেগপ্রবণ সম্পর্কগুলোর প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া, সহকর্মী ও অন্যদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি। মূলত পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সম্পর্কের দৃঢ়তা বাড়ানো যায়।

সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য নিজের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার মানে যে খুব বিলাসিতা করা, তা নয়। দৈনন্দিন ছোট ছোট বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়ার মাধ্যমেও নিজের মনের প্রতি যত্ন নেওয়া যেতে পারে। যেমন: হতে পারে মনের মতো করে একটা বিকেল কাটানো, কোনো বন্ধুর সঙ্গে চায়ের মগ হাতে আড্ডা, পছন্দের কোনো বই পড়া, মুভি দেখা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, হাঁটতে যাওয়া, ব্যায়াম করা, পরিমিত খাবার খাওয়া ও ঘুমানো, বাগান করা বা শখের কোনো কিছু করা, প্রতিদিন কিছু না কিছু ইতিবাচক কাজ করা, নিজের দক্ষতাগুলো খুঁজে বের করা, নিজেকে প্রশংসা করা, বাজে অভ্যাস দূর করা ইত্যাদি। রিলাক্সেশন ও মাইন্ডফুলনেস থেরাপি (মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল) অনুশীলনের মাধ্যমেও মনের যত্ন নেওয়া যায়; যা মনকে শান্ত রাখে, উদ্বেগ কমায়, বর্তমানের প্রতি মনকে নিবদ্ধ করে এবং কাজের প্রতি মনোযোগী হতে সহযোগিতা করে। সুস্থ সম্পর্ক ও নিজের মনের যত্ন একত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে, যা ব্যক্তির মানসিক ও শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

পরিশেষে বলতে হয়, সর্বোপরি সুস্থ থাকতে হলে শরীরের মতো মন ও সম্পর্কের যত্ন নিতে হবে। একটা চারাগাছকে যত্ন দিয়ে বড় করলে তবেই সেটা ফল দেয়; অন্যদিকে অযত্নে–অবহেলায় সেটা মরেও যায়। তেমনি সম্পর্কের বেলায়ও যত্ন নিলেই সুস্থ সম্পর্ক তৈরি হয় আর অবহেলায় ও অযত্নে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়; এতে করে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। যদি কারও পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক বেশি অবনতি হয়, যা তাদের পক্ষে ঠিক করা সম্ভব নয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের (যেমন: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট) সহযোগিতা নিতে হবে; যারা নিরপেক্ষভাবে সমস্যা সমাধান করতে ও সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করতে নির্দেশনা ও পরামর্শ দিতে পারবেন। এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা, মানসিক রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিতে হবে। সাইকিয়াট্রিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট এবং আরও অনেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার ব্যক্তি বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন।

লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, নাসিরুললাহ সাইকোথেরাপি ইউনিট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন