অন্নপূর্ণার পিছনে আদিগন্ত অন্নপূর্ণা
অন্নপূর্ণার পিছনে আদিগন্ত অন্নপূর্ণাছবি: লেখক

চোখ বুজলেই ফ্লাশব্যাকের মতো ঝকঝকে সাদা বরফের পাহাড়ের ছবি ভেসে উঠছে মনে। অনেক দিন ধরে শুধু নেপালের বরফের পাহাড় অন্নর্পূণার সৌন্দর্যের গল্প শুনেছি। হিমালয় পর্বতমালার মাছাপুচ্ছুরে পর্বতের ওপর সূর্যোদয় সকাল–বিকেল একই মুগ্ধতা নিয়ে শুনেছি এসব কথা। গল্প শুনে, ছবি দেখে দেখে মনে মনে আমিও যাব বলে ঠিক করে ফেলি।

default-image

হিমালয়কন্যা নেপাল দেখব। কিন্তু সেই ঠিক করার প্রায় ঠিকঠাক দুই বছর পর যাওয়া হলো নেপাল। ২৬ অক্টোবর ২০১৯। সকালে নেপালে পৌঁছাই আমরা।
প্রতিবেশী দেশ নেপালের প্রাকৃতিক রূপ বর্ণনা করা বেশ কঠিন। বাংলাদেশ বিমানেই প্রথমবারের মতো হিমালয়ে চোখ আটকায়। দুপুরে ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে নেমেই বছরের প্রথম শীত অনুভব করি। যদিও খুব বেশি ঠান্ডা ছিল না।

বিজ্ঞাপন

এয়ারপোর্ট থেকে আমরা সোজা চলে আসি থামেলে। সেখানে আগে থেকে ঠিক করে রাখা হোটেলে উঠি। আমাদের তিনজনের দল। বলে রাখি, তিনজনের পারিবারিক ভ্রমণ এই প্রথম। মাত্র সাত দিনের ট্যুর, তাই চটজলদি সব ঘুরে দেখতে হবে।

default-image

এ জন্য বিকেলেই চলে যাই থামেলের অলিগলি ঘুরতে। সবকিছু দারুণ লাগে। অন্য ভাষা, অন্য দেশ, বিদেশি পর্যটক—সবকিছুই গভীর বিস্ময়ে অনুধাবন করি। থামেলের আশপাশ হেঁটে ঘোরা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যায় থামেলের গলিগুলো জমে ওঠে পর্যটকদের পদচারণে। রেস্তোরাঁর গানের আওয়াজ আর বাতাসে প্রেয়ার ফ্ল্যাগের আলোড়ন আমাকে উৎফুল্ল করে। হালকা নাশতার জন্য রাস্তার পাশে ছোট ছোট খাবারের দোকানে মোমো আর চাওমিন খেয়ে নিই আমরা। রাত ১০টার দিকে রাস্তাগুলো খালি হতে থাকে। এ সময় হেঁটে ঘোরাঘুরি করতে বেশ স্বস্তি মেলে।

কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ার আমরা হেঁটে হেঁটে ঘুরলাম। শয়ম্ভুনাথ মন্দির, বৌদ্ধনাথ মন্দির, পশুপতিনাথ মন্দির ও প্রাচীন ভক্তপুর শহর। কাঠমান্ডু এমন একটি শহর, যেখানে ইতিহাস মিশে রয়েছে প্রতিটি ইঞ্চিতে, প্রতিটি কোনায়। ললিতপুর পাঠান মিউজিয়াম দেখে সেটা বেশ অনুধাবন করা গেল। ভক্তপুর থেকে অন্নপূর্ণা চূড়া প্রথম দেখলাম। বিকেলের গোলাপি আলোয় বাড়ি ফিরছে কিছু পাখি। সে দৃশ্য জটজলদি ক্যামেরাবন্দী করি।

default-image

নেপালকে নিরাপদ শহর মনে হয়েছে। এবং হর্ন না দিয়ে শত শত মোটরবাইক চলছে, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। নিজে একজন সাংবাদিক হওয়ায় সবকিছুর ছবি তুলে রাখার চেষ্টা করেছি।

এক দিন পর ২৮ তারিখ খুব ভোরে আমরা পোখরার পথ ধরি। থামেল বাজার থেকে ছয়টায় বাস ছাড়ে। বিকেল পাঁচটায় গিয়ে পৌঁছাই পোখরায়। সেখানে পূর্বপরিচিত বন্ধু হোটেলে নিয়ে গেল। হোটেলে উঠতেই দেখি সঙ্গে আনা বড় ব্যাগ বাসে রেখেই চলে এসেছি। এরপর বন্ধু রণজিতের সহায়তায় আমরা ব্যাগ পেয়ে যাই। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ঘুরে বাসযাত্রায় বেশ আনন্দ অনুভব করেছি।

বিজ্ঞাপন

পোখরা শহরটা বেশ গোছানো। প্রাকৃতিক দৃশ্য মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেয়। হোটেলে ব্যাগ-বোঁচকা রেখে চলে যাই লেকের ধারে। পোখরার ফেওয়া লেক দমবন্ধ করা সৌন্দর্য দেখে মনে মনে বলি, আমরা আগে এইখানে কেন এলাম না।

default-image

পোখরার খাবারের স্বাদ দারুণ। লেকপাড়ের ৭ নম্বার সড়কে একটি ঘরোয়া হোটেলে প্রথমবার নেপালের দুধ–চা খেলাম তারিয়ে তারিয়ে।

তিন দিনের পোখরার সকাল বিকেল চা-নাশতা, দুপুরের খাবার এই হোটেলেই খেয়েছি।
হ্রদের পাশ দিয়ে যাওয়া সড়কের পাশে পুরোটাই ট্যুরিস্ট জোন এবং হোটেল ও দোকানপাট। মূল শহরে তখন বেশ একটা ঈদ ঈদ ভাব। কারণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান তিহার চলছে। কালীপূজার পর ভাইফোঁটা অনুষ্ঠান। ভাইফোঁটাকে তিহার বলে। এই দিনে সব দোকান, রাস্তা, বাড়ি ফুল দিয়ে সাজানো হয়। আমরা ভক্তপুর ও থামেলে সেই আয়োজন দেখে এসেছিলাম। একটানা পাঁচ দিন ছুটির আমেজে ছিল নেপাল।

পোখরা থেকে কালিকাস্থান নামে একটি গ্রামে আমাদের পরের গন্তব্য। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা আক্কু চৌধুরী সেখানে একটি রিসোর্ট বানিয়েছেন। রিট্রিট। সেখান থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে হিমালয়ের অন্নপূর্ণা রেঞ্জ। দুপুরের হালকা রোদেই প্রথমবারের মতো খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো অন্নপূর্ণাকে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি প্রকৃতির এই বিশালত্বের দিকে। নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে অন্নপূর্ণা পর্বতকে ঘিরে এত উন্মাদনা, বীরত্ব, সাহসিকতা আর ট্র্যাজেডির গল্প রয়েছে, যে পর্বত এখনো প্রায় সব পর্বতারোহীর পরম আরাধ্য, সেই পর্বতের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি!
খানিক বাদেই মেঘে ঢেকে গেল হিমালয় পর্বতমালা।

default-image

আক্কু সাহেব আমাদের জানালেন খুব ভোরের অরুণিমা অন্নপূর্ণা দেখার জন্য ঘুম থেকে উঠতে হবে ভোর চারটায়। টানা চার দিন পর দেশীয় স্বাদের ভাত, ডাল, আলুভর্তা ও মুরগির মাংস পেলাম। যা প্রাণ ভরে খাওয়া হলো। এরপর আর কেউ আটকাতে পারেনি ঘুমকে। আমি তো ঘুমে বিভোর। এদিকে ভোরে অন্নপূর্ণাকে নিয়ে অন্নপূর্ণা দেখতে সারা রাত জেগে বসে থাকলেন আমার প্রিয় সাথি মিনহাজ-উল ইসলাম। বলে রাখি, অন্নপূর্ণাকে নিয়ে মানে আমাদের ছোট্ট ১৬ মাসের মেয়ে, যার নাম অরুণিমা অন্নপূর্ণা। অন্নপূর্ণাকে নিয়ে অন্নপূর্ণা দেখব।

আমাকে ভোরের আলো ফোটার আগেই জাগিয়ে দিলেন। ধড়মড় করে চোখ কচলে রিট্রিটের রুম থেকে পর্দা সরিয়ে সে কী দেখলাম! হিমালয়। আহা, এত সুন্দর ভাবিনি। ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পুরোটা দেখা যায়। লামঝুম, মাছাপুচ্ছরি, অণ্নপূর্ণা।

default-image

অদ্ভুত সুন্দর নীলচে রংমাখা আকাশের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিলাম আমরা দুজন। কারও মুখে কোনো কথা ছিল না। সেদিন ওখানে আমরা প্রকৃতির এই আশ্চর্য রূপ দেখার সৌভাগ্য পেয়ে মনে মনে বারবার বলেছিলাম, জীবন কী সুন্দর!

পরের দিন আমরা আবার বাসে চেপে কাঠমান্ডু পৌঁছাই। এরপর এক দিন পর দুপুরে বাংলাদেশ বিমানে চেপে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই। বলে রাখা ভালো, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার—এই কথা আমার জীবনে দারুণ প্রভাব ফেলে। সেদিন বিমানে বাঁ পাশে সিট ছিল। বিকেলের আলোয় দেখলাম বিশাল হিমালয়। সত্যি সত্যি হিমালয় দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল আমার। আর সেই একি কাজ আমার প্রিয় ক্যামেরায় ধরে স্মৃতিময় করে রাখি পাখির চোখে দেখা হিমালয়কে। স্মৃতিময় হয়ে থাকে এই নেপাল ভ্রমণ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন