১৭৮৫ সালে অযোধ্যা। শিল্পী উইলিয়াম হজস
১৭৮৫ সালে অযোধ্যা। শিল্পী উইলিয়াম হজসছবি: উইকিপিডিয়া

দশরথমহল থেকে খানিক এগোলে কনকমহল। শ্রীরামচন্দ্রের মা কৌশল্যা নববধূ সীতার মুখ প্রথমবার দেখে ‘মুহ দিখাই কি রাসম’ অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন এই প্রাসাদ। ঘিয়ে রঙের এই বিশাল প্রাসাদে ঢোকার আগে শুধু মনে হচ্ছিল এমন আদলের প্রাসাদ আমি রাজস্থানে ঢের দেখেছি আর আগ্রা ফোর্টের ভেতরের কিছু কারুকাজ দেখতে এমনই। বিশাল উঁচু দেয়াল পেরিয়ে মূল অঙ্গন।

default-image

ভেতরে মন্দির। মন্দিরে পূজা হবে সন্ধ্যার সময়।

কিন্তু এখন মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে বেজায় লজ্জায় পড়লাম। হাতের লাড্ডুর বাক্স প্রায় খালি হতে চলেছে। এ দিয়ে পূজা দেওয়া চলে না। ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছাকৃতভাবে পূজা দিয়েছি। মন্দিরের ভেতরের পূজারিরা টানাহেঁচড়া করে পূজা দিতে বলেছে বা জোর করে ঠাকুরের সামনে বসিয়ে দিয়েছে। সে যা–ই হোক, এখানে সে রকম কিছু না করলেই হয়। দু-তিনটে লাড্ডুসমেত পাকড়াও হলে সোজা জেলে পুরে দেবে। আশপাশে পুলিশের যা সমারোহ!

বিজ্ঞাপন

বিশাল প্রসাদের প্রায় পুরোটা জুড়েই কয়েকটা মন্দির।

ভয়ে দায়সারাভাবে প্রাসাদ দেখে, হাতের বাক্স লুকাতে লুকাতে পা চালালাম, বাই চান্স যদি কোনো পূজারি ছোঁ মেরে বাক্স নিয়ে যায়, তাহলে প্রায় খালি বাক্স দেখলে আমার আর রক্ষে নেই। এমনিতেই করোনার প্রাদুর্ভাবের জন্য খুব বেশি ভক্ত নেই। হাঁটা দিলাম মূল রামমন্দিরের দিকে, যেখানে আগে বাবরি মসজিদ ছিল।

default-image

বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৫২৯ সালে মুঘল সম্রাট বাবরের নির্দেশে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লক্ষ্ণৌয়ের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের শাসনামলে একবার এই মসজিদ নিয়ে বিতর্ক হয় হিন্দু–মুসলমানদের মধ্যে এই বলে যে মসজিদ তৈরির আগে এখানে রামমন্দির ছিল। নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের পরিস্থিতি সামলানোর পারদর্শিতার কারণে তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা পায় অযোধ্যাবাসী।

১৯৪৯ সালে রামভক্তরা মসজিদে ভগবান শ্রীরামের মূর্তি রেখে যাওয়ার কারণে মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সে সময় দাঙ্গা এড়ানোর জন্য সরকার মসজিদটির সব কার্যক্রম বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেয়। একই সময় হিন্দু–মুসলমান উভয় সম্প্রদায় জমির মালিকানা ও ঐতিহাসিক সত্যতা দাবি করে মামলা দায়ের করে।

default-image

এরপরের ঘটনাগুলো আমাদের সবারই প্রায় জানা। ভয়াবহ সে ঘটনার কথা ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালির কথা, যিনি ১৯৯২ সালে অযোধ্যাতেই ছিলেন এবং লিখেছিলেন সে সময়ের ভয়াবহ সব কথা। সেসব বীভৎস মৃত্যুর কথা ভাবতে ভাবতে এগোচ্ছিলাম। খুব বেশি ভিড় নেই করোনা পরিস্থিতির জন্য।
খানিক এগোনোর পর পুলিশ মহোদয় বললেন, ‘এখানে ব্যাগ মোবাইল লকারে রেখে আগে বাঢ়ো।’

বিজ্ঞাপন

আমার সব উৎসাহ হঠাৎ সশব্দে বার্স্ট হয়ে যাওয়া চাকার মতো চুপসে গেল। অনেক মন্দিরের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ, কিন্তু বাইরে তো নয়। এখনো প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটতে হবে। রাগে গজগজ করতে করতে মোবাইল, ক্যামেরা ও ব্যাগ রেখে আরও বেশি শূন্য হাতে বাক্সের বাকি লাড্ডুগুলো কখন যে খেয়ে ফেলেছি বুঝতেও পারলাম না। এখন আমার হাতের রুপালি রঙের কাগজের খালি বাক্স ঠায় তাকিয়ে আছে আর বলছে,
‘পেটে তোমার পিলে হবে কুড়িকুষ্টি মুখে…’
এবার শ্রীরামচন্দ্র আমার খবর করবে।

পূজার পর প্রসাদ খাওয়ার নিয়ম থাকলেও পূজার আগে প্রসাদ সাবাড় একমাত্র আমার পক্ষেই সম্ভব।

default-image

লকারের বহর পার হয়ে দেখি এখানকার আশপাশের পুরোনো দালান আর মন্দিরের কারুকাজ ভাষায় বর্ণনার অতীত। এখানেই শ্রীরাম ও সীতা বসবাস করতেন। সীতার ঘর বা মন্দির যেন একেকটা রূপকথার আখ্যান। প্রতিটি মহলের আলাদা ঐশ্বর্য, আলাদা আভরণ। যেন সোনার পুরী রুপার পুরী, সেখান থেকে আবার রঙিন পুরী।

এক ফাঁকে যাতে কেউ না দেখে, সেভাবে হাতের খালি বাক্স রাস্তার কোনায় রাখা ট্র্যাশবিনে ফেলে দিলাম। এখন হাত খালি। নো ভয়ডর।

কিন্তু তা বললেই কি হয়! আশপাশ ফাঁকা হতে চলেছে। দোকানও নেই, শুধু পথ আর দুধারে প্রাচীন ঘরবাড়ি। মানুষের দেখা নেই। দেখা মিলল হনুমান দলের। এত হনুমানের মধ্যে একা মানুষ পেয়ে মাথায় না চড়ে বসে! এ জন্য ধীরে ধীরে পা চালালাম পথের অমূল্য দৃশ্য ডানে–বাঁয়ে দেখতে দেখতে মি. বিনের মতো।

default-image

সামনে চেকপোস্ট, যাক মানুষের দেখা পেলাম। পুরুষ ও নারীদের আলাদা আলাদা চেকিং করা হচ্ছে। মেয়েদের জন্য পর্দার ভেতরে ব্যবস্থা। সারা শরীর হাত বুলিয়ে তল্লাশি চালালেন এক নারী পুলিশ সদস্য। কিছুই পেলেন না। ভেবেছিলাম নাম জিজ্ঞেস করবেন, তা করেননি। ভারতের অনেক মন্দিরে হিন্দু ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ। এখানে তা নয়।

তবে হাত দিয়ে এত কাছে এসে আসামির মতো তল্লাশি করায় খুব রাগ হলো। বললাম, ‘এত পয়সা খরচ করে মন্দির নির্মাণ হচ্ছে, আর একটা স্ক্যানার বসাতে পারে না সরকার?’

নারী পুলিশ সদস্যটি বললেন, ‘ম্যাডাম, এই করোনার সময়ে আমাদেরও ভালো লাগে না কারও গায়ে হাত দিয়ে তল্লাশি চালাতে।’

default-image

আমি কথা না বাড়িয়ে এগোলাম। ভেবেছিলাম, যে জায়গায় আগে বাবরি মসজিদ ছিল, সে জায়গাটা হবে খোলা ফাঁকা মাঠের মতো। কিন্তু সরকার মন্দিরে যাওয়ার জন্য সরু ছাউনি দেওয়া টানেল করে দিয়েছে। একদিক থেকে প্রবেশ, অন্যদিক থেকে প্রস্থান। সামাজিক দূরত্ব বজায়ের জন্য পাকা মেঝেতে গোল গোল দাগ কাটা। প্রথমত, দুপাশে করোগেটেড শিটের বেড়া, মাথার ওপর ছাউনির জন্য আশপাশে কী আছে দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর আবারও দেহ তল্লাশি চালানো হলো। আরেকটু এগিয়ে আরও একবার। এরপর মিলল অস্থায়ীভাবে নির্মিত মন্দির। ছোট একটা ঘরে শ্রীরামচন্দ্রের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ৩০ ফুট দূর থেকে দেখার অনুমতি আছে। দড়ি বেঁধে দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা।

বিজ্ঞাপন

করোনার কারণে রাস্তায় বা মন্দিরের সামনে জুতো খোলার অনুমতি নেই। ভালোই হলো। জুতো খুলে বিভিন্ন মসজিদ, মন্দিরে ঘুরে এসে আমি বেশির ভাগ সময়ই ভুলে যাই কোন বক্সে বা র‍্যাকে জুতো রেখেছি। অর্ধেক সময় এতেই বেরিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে জুতো ব্যাগে পুরে ঘুরি। একবার জুতোর র‍্যাক খুঁজে না পেয়ে খালি পায়ে হাঁটা দিয়েছিলাম। ভারতে খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এত মতাবলম্বীর লোক, কেউ কেউ খালি পায়ে সারা বছর ঘোরে।

default-image

ভেবেছিলাম, অন্ততপক্ষে অস্থায়ী মন্দিরের সামনে উঠোন বা অন্য কিছু দেখতে পাব। কিন্তু সব করোগেটেড শিট দিয়ে ঢাকা। খুবই হতাশ হলাম। বিভিন্ন ডকুমেন্টারিতে যেমন দেখেছি বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার সময় এর আশপাশের উঠোন বা এরপর সেখানকার খালি বিরান ভূমি, সেসব কিছুই দেখতে পেলাম না। ভক্তের ভিড় নেই মন্দিরের সামনে। বলতে গেলে আমিই একমাত্র দর্শক। তাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মন্দিরে শ্রীরাম ও সীতার মূর্তি দেখতে শুরু করলাম।

মূর্তি দুটি আকারে খুবই ছোট, অন্যান্য মন্দিরের মূর্তির মতো বিশালাকার নয়। সাজপোশাক–গয়নায় ভূষিত। আগরবাতি আর তাজা ফুলের সুবাসে আপনা থেকেই মন অন্য জগতে চলে গেল। সে জগতে রামমন্দির আর বাবরি মসজিদের অবস্থান পাশাপাশি। মন্দির–মসজিদ নিয়ে নেই কোনো বিরোধ, সব সম্প্রদায়ের লোক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছে।

সেই মুহূর্তে আমার কাছে সব ধর্ম-বর্ণ-মত মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সেখানে ভাসে মানুষ আর তাদের সরল বিশ্বাস।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন