বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাসের প্রকোপে দীর্ঘদিন ধরে ঘরবন্দী যাপিত জীবনের আগল থেকে মুক্ত হওয়ার আকুতিগুলোর ঘনত্ব বাড়ছিল। ইত্যবসরে ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ নেওয়া হয়ে গেছে। উঠে গেছে লকডাউনও। ব্যস, প্ল্যান হলো আমরা দুই সাবেক সহকর্মী পরিবারসহ ছুটি কাটাতে যাব অক্সফোর্ডে। যেখানে থাকেন আমাদের আরও এক সাবেক সহকর্মী। গবেষণার কাজ করেন জেনার ইনস্টিটিউটের একই ভবনে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে অক্সফোর্ড-আস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের গোড়াপত্তনকারী জেনার ইনস্টিটিউটের কথা।

default-image

অক্সফোর্ড স্টেশন থেকে গ্রেট ওয়েস্টার্ন রেলের সবুজ কামরা থেকে নেমে কিছু দূর এগোনোর পরেই মনে হলো লুইস ক্যারোলের এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের মতো আমরাও ঢুকে পড়েছি হাজার বছরের পুরোনো কোনো ওয়ান্ডারল্যান্ডে। চারপাশে দাম্ভিক সিংহের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লাইম স্টোনের প্রাচীন প্রাসাদোপম ভবন। আর ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের বিবিধ রতন। লজে পৌঁছে ব্যাকপ্যাক রেখে হাত–মুখ ধুয়ে প্রথম কাজ ছিল খিদে পেটে চরে বেড়ানো ইঁদুরগুলোকে বশে আনা। এরপর খানিক বিশ্রামের পরেই শুরু হলো অক্সফোর্ড চষে বেড়ানোর কাজ।

লজ থেকে বেরিয়েই নজরে এল ফলি ব্রিজের নিচে টেমস নদীর স্বচ্ছ জল। ছলাৎ করেই জেগে উঠল বুকের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা মাতৃসম নদী দেওরভাগা, সুরমা, কুশিয়ারার বান। দীর্ঘ অনাবাসী জীবনে অসংখ্য ভিনদেশি নদীসঙ্গ করেছি। কখনো চেলমার, কখনো এভন, কখনো কেম, আবার কখনো কো অথবা ক্লাইড। তবে লন্ডন শহরের ভেতরের টেমস দেখলে মনে হয় এ যেন খাঁচায় বন্দী এক সিংহ, যে প্রতিটি ভরা কটালে মুহুর্মুহু হুংকারে চেষ্টা করে চলেছে নাগরিকায়নের বাঁধ ভাঙার। অথচ অক্সফোর্ড শহরে এসে দেখা পেলাম আমার বুকের ভেতরের সেই স্বচ্ছ, শান্ত, গাঢ় নদীটির। পাড় দিয়ে হাঁটছিলাম আর স্মৃতিতে ভেসে উঠছিল আষাঢ়-শ্রাবণে মেঘালয়ের খাসি পাহাড় থেকে পাহাড়ি ঢলে ছুটে আসা তীব্র স্রোতে সীমান্তবর্তী কানাইঘাটে মামাবাড়ির অদূরে কূলে বসে দেখা উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি যৌবনা সুরমার উত্তালময় বিকেলগুলোর কথা।

default-image

ডুবোপ্রায় পাথরবোঝাই নৌকাগুলোর স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলা দেখলে একধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। সেই সাথে পালতোলা নৌকা, ট্রলার আর হাতে বাওয়া বারকি নৌকার অক্লান্ত বেয়ে চলার দৃশ্য অপার্থিব নয়নে উপভোগ করতাম দুরন্ত বিকেলগুলোতে। অক্সফোর্ডের টেমসে নানা ধরনের হাতে বাওয়া নৌযানগুলো ধরা দিল টাইমমেশিন হয়ে। টেনে নিয়ে গেল রঙিন শৈশবের বানভাসি দিনগুলোতে। বলাই বাহুল্য, অক্সফোর্ডের এই টেমসে রোয়িং অথবা নৌকা চালানোর অনুশীলনকারীরা কিংবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রতিবার অলিম্পিক থেকে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ জয় করে আসেন ব্রিটেনের প্রতিযোগীরা।

ফলি ব্রিজ থেকে টেমসের তীর ঘেঁষে একটু এগোলেই ইতিহাসের বিখ্যাত ক্রাইস্টচার্চ কলেজ। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫টি কলেজের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত এই কলেজ। গ্রেট কোয়ার্ডএঙ্গেল অব অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ভবনটি ঘিরে এই কলেজে রয়েছে পৃথিবীর মূল্যবান প্রাচীন চিত্রকলার সংগ্রহ। পড়াশোনা এবং গবেষণা করেছেন জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিরা। ক্রাইস্টচার্চ কলেজের ঠিক বিপরীতে রয়েছে বিশাল এক উদ্যান। যেখানে মনের আনন্দের চরে বেড়াচ্ছে অক্স অব অক্সফোর্ড অর্থাৎ অক্সফোর্ডের ষাঁড় এবং গরু। মজার কথা হলো মানসিক অবসাদ দূর করতে সে সময়ে নাকি এই কলেজের ছাত্ররা তাঁদের শিক্ষাকালে নিজেদের পোষা গরু সঙ্গে করে নিয়ে আসার অনুমতি পেত। আমি মনে মনে বলি, গরু আসলেই একটি উপকারী প্রাণী। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে কখনো গরুর রচনায়, কখনো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কৃষ্ণের বাহন—সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে যার অবাধ বিচরণ।

default-image

হ্যাঁ, বলছিলাম ক্রাইস্টচার্চ কলেজের কথা। ১৫০০ শতকের মাঝামাঝি ক্রাইস্টচার্চ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন রাজা অষ্টম হেনরি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই কলেজের অগুনতি শিক্ষার্থী হয়েছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী, অর্জন করেছেন নোবেল পুরস্কার অথবা রাষ্ট্রনায়ক হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের। এই কলেজে গবেষণা করেছেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রদূত আলবার্ট আইনস্টাইন। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, ১৯৩১ সালে গ্রেট ব্রিটেনে এসেছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। এরপর মাত্র চার শ পাউন্ড বার্ষিক উপবৃত্তিতে তিনি সহযোগী গবেষক বা রিসার্চ স্টুডেন্ট নির্বাচিত হন, যা চলে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত। তবে জার্মান নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচতে শরণার্থী হয়ে চিরতরে জার্মানি ত্যাগ করে চলে আসেন ব্রিটেনে।

বিশ্বজুড়ে ১৫০ বছরের পুরোনো ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ নামক পরাবাস্তব গল্পের জয়জয়কার। অথচ অনেকেই জানেন না সেই গল্পের মূলস্থান হলো এই ক্রাইস্টচার্চ কলেজ। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে এই কলেজেরই গণিতবিদ চার্লস ডগসন একদিন কলেজের ডিন হেনরি লিডলের শিশুকন্যা এলিস লিডেলকে কলেজের সামনেই বহমান টেমস নদীতে নৌভ্রমণ করতে করতে এই গল্পটি শোনান। এর ঠিক ১০ বছর পরে এলিস ডগসনকে বারবার বিরক্ত করতে থাকে এই গল্পটির লিখিত রূপ প্রকাশ করার জন্য।

default-image

অবশেষে গণিতবিদ ডগসন লুইস ক্যারোল ছদ্মনামে ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ গল্পটি লিখলেন। প্রকাশের সাথে সাথে গগনচুম্বি জনপ্রিয়তা পেল গল্পট। তৈরি হলো চলচ্চিত্র। তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী কুইন ভিক্টোরিয়াও মজেছিলেন এই পরাবাস্তব গল্পে। ডগসন তথা লুইস ক্যারোলের সঙ্গে দেখাও করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন এর পরে ডগসন যত বই লিখবেন, সব বই যেন রানিকে পাঠানো হয়। কিন্তু এরপর ডগসন যত বই লিখেছেন, সবই ছিল কঠিন গাণিতিক তত্ত্ব আর গবেষণালব্ধ বই। জানি না পরাবাস্তব কাহিনির ভক্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রানি ভিক্টোরিয়ার গণিতপ্রীতি কতটুকু ছিল।

ঘুরে দেখলাম জে কে রাউলিংয়ের লেখা গল্প অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘হ্যারি পটার’ সিনেমার সেই বিখ্যাত ডাইনিং হল, যা হগওয়ার্টস ডাইনিং হলের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। সেখান থেকে সোজা ক্রাইস্টচার্চ পেইন্টিং গ্যালারি। তিন শ বছরের পুরোনো প্রায় দুই হাজার পেইন্টিংসমৃদ্ধ এই গ্যালারিতে ঢুকলেই অনায়াসে বেড়িয়ে আসা যায় প্রাচীন শিল্পকলার নান্দনিক জগৎ থেকে। ঘুরতে ঘুরতে আমি আর মৌনী দাঁড়িয়ে পড়লাম পনের শ শতকের শেষের দিকে ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী এনিবল কারাচ্চির আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘দ্য বুচার শপ’-এর সামনে। হ্যাঁ, এটাই সেই বিখ্যাত চিত্রকর্ম, যা দিয়েই শুরু হয়েছিল মডেস্ট (Modest genre-subject) বিষয় নিয়ে ছবি আঁকার চর্চা।

default-image

আলবার্ট আইনস্টাইন কিংবা চার্লস ডগসনের স্মৃতিধন্য ক্রাইস্টচার্চ কলেজের প্রতিটি আনাচে-কানাচে হাঁটছিলাম আর গণিতের ছাত্র হিসেবে রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম বারবার। মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন শামিল হলাম জ্ঞান–বিজ্ঞানের পথে, জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের কাফেলায়। বাংলার শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দের কবিতার পঙ্‌ক্তির মতো হাজার বছর ধরে যে পথে হেঁটে চলেছেন মানবসভ্যতায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা গবেষক, দার্শনিক কিংবা রাজনীতিকেরা। ক্রাইস্টচার্চ কলেজের বিশাল ফটক দিয়ে যখন বেরিয়ে আসছিলাম, তখন ঢং ঢং করে বেজে উঠল সাত শ বছরের পুরোনো গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। আমরা ধীর লয়ে হেঁটেই চলেছি। পরবর্তী গন্তব্য ঐতিহাসিক বোডলিয়ান লাইব্রেরি, যেখানে রয়েছে ষোলশ শতক থেকে আজতক গ্রেট ব্রিটেনে প্রকাশিত সব বই। আছে প্রাচীন আমলের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার গবেষণাপত্র উপস্থাপন এবং পর্যালোচনার কেন্দ্র ডিভাইনিটি হল। আর দরজার ওপারে ব্রিজ অব শাই (Bridge of sigh) হিসেবে বিখ্যাত হার্টফোর্ড কলেজ আর রেডক্লিফ ক্যামেরা।

লেখক: পিএইচডি গবেষক ও প্রভাষক, ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, এংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটি, কেমব্রিজ

ছবি: লেখক

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন