বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জায়া, কন্যা, পুত্র এবং আমিসহ আমরা চারজন, নগরী থেকে দূরে, আমাদের এবারের গন্তব্য কোতোরে শহরে। পিরেনিজ পর্বতমালার পায়ের কাছে ১০০০ মিটার (প্রায় ৩৩০০ ফুট) উচ্চতায় ছবির চেয়ে সুন্দর ফ্রান্সের একটি শহর এই কোতোরে। তুলুজ থেকে ২১৮ কিলোমিটার (১৩৫ মাইল)।

default-image

সকালে খানিকটা শীতের আমেজ। গ্রীষ্ম এবার প্রসন্ন। দাক্ষিণ্যে ভরা ঝকঝকে রোদে উজ্জ্বল চারদিক। প্রশস্ত মহাসড়কে তেমন ভিড় নেই। এ দেশে এসব রাস্তায় সাধারণত সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মা) গতি নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। তবে ট্রাক, লরি বা ভারী গাড়ির জন্য আরও কম গতি ছাড়া গতি নেই। মহাসড়কে রাডার বসানো আছে। গতিসীমা না মানলেই ক্যামেরার মতো ফ্লাশ ঝিলিক দিলেই বুঝতে হবে যে দুদিনের মাথায় চিঠি আসবে, ঠিকানা মোটেও ভুল করবে না। গুনতে হবে জরিমানা এবং সেই সঙ্গে হারাতে হবে ড্রাইভিং পয়েন্ট। তাই স্পিডের দিকে খেয়াল রাখলে ছুটির আনন্দে ঘাটতি পড়বে না। বরং নিজের এবং অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তা ছাড়া বিমা, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট অবশ্যই সঙ্গে থাকতে হবে।

আরেকটি কথা মাথায় রাখতে হবে, তা হলো গাড়িতে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকতে হবে। হাইওয়েতে কিছু পথ পরপর আছে টেলিফোন বুথ। জ্বালানির অভাবে বা অন্য কোনো সমস্যায় গাড়ি বিগড়ে গেলে কমলা রঙের বাক্সের গায়ে বোতাম টিপলেই উত্তর দেয় হাইওয়ে পুলিশ। তারা সঙ্গে করে জ্বালানি নিয়ে এসে উদ্ধার করলেও দ্বিগুণ মূল্য পরিশোধ করতে হবে জ্বালানি তেলের। অনেকটা নির্বুদ্ধিতার খেসারত। তবে স্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে প্রায়ই কুড়ি কিলোমিটার পরপর মহাসড়কের দুই পাশে বিশ্রাম করার জন্য ব্যবস্থা আছে। সেখানে খাবারদাবারের দোকান আছে, গাড়ির জ্বালানি নেওয়ার ব্যবস্থা আছে।

default-image

আমরা দুই ঘণ্টার একটু কম সময়ে পাহাড়ের ঢালে চলে আসি। এরপর শুরু হয় পাহাড়ি রাস্তা। সাপের মতো এঁকেবেঁকে ঘুরে ঘুরে মেঘের কাছাকাছি উঠে যাচ্ছে। এখানে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার কিংবা কখনো কখনো গতি আরও কমিয়ে আনতে হয়। পাহাড় কেটে রাস্তা করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি গাড়ি চলার মতো প্রশস্ত। দুদিক থেকেই গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। সবাই বেশ সতর্ক। পথের দুই পাশে খাড়া পাহাড়ের শিলার কঠিন প্রাচীর, মাঝেমধ্যে খোলা জায়গায় গহিন অরণ্যের মতো, কানে আসে ঝরনা থেকে পাহাড়ি নদীর পানির শব্দ।

দুপুরের আগেই পৌঁছে গেলাম সুন্দর ছিমছাম পাহাড়ি শহর কোতোরেতে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহরে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিভিন্ন স্থানে ফুলে ফুলে ভরা ফুলের গাছ, যেন হালকা হিমেল বাতাসে ফুলেল অভ্যর্থনা। এ শহরে গ্রীষ্মে এবং শীতে সমান পর্যটক। শীতে স্কিসহ শীতের সব খেলাধুলার জন্য চমৎকার সব ব্যবস্থা রয়েছে। তা ছাড়া অনেকে আসেন প্রাকৃতিক ভূগর্ভের অনেক গভীর থেকে উঠে আসা খনিজ জলের উষ্ণ প্রস্রবণের সুখ–উত্তাপে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং প্রকৃতির রূপে, রসে, বর্ণে স্নান করে সব ক্লান্তি দূর করতে।

default-image

আগে থেকেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটি ছোট্ট রান্নাঘরসহ দুই রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া করে রাখা হয়েছিল। চারজনের জন্য একটু ছোট হলেও বেশ সাজানো–গোছানো। এক সপ্তাহের জন্য এমন কিচেনসহ দুই রুমের ফ্ল্যাটের জন্য গুনতে হবে ৪০০ ইউরো।
সন্ধ্যা হতেই পাহাড়ে বাধা পেয়ে মেজাজি মেঘ প্রায় মাথার ওপরে নেমে এল, ভরা গ্রীষ্মে গায়ে গরম জামা চড়াতে হলো।

যারা পাহাড়ে হাঁটা পথে বেড়াতে পছন্দ করে, তাদের জন্য পাহাড়ে ওঠার এবং নেমে আসার অনেক পথ আছে। পথে পথে দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। এ জন্য পাহাড়ে হাঁটার জুতা থাকতে হবে। হাতে লাঠি রাখতে হবে। কারণ, পাহাড়ি পাথুরে পথে ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা আছে। ঘোড়ার পিঠে, পায়ে হেঁটে বনে-পাহাড়ে ঘোরা যা ফরাসি ভাষায় পরিচিত রাঁদোনেঁ শব্দে। যাঁরা পাহাড়ে সাইকেল চালাতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য পিরেনিজের সর্পিল পথ একই সঙ্গে খুবই কষ্টের, তবে অনেক বেশি আনন্দের।

default-image

পর্বতারোহণ, ট্রেকিংয়ের স্বর্গরাজ্যে এসে পাহাড়ি নদীতে সাঁতার, নৌকা চালানোর স্বাদ নিতে দূর দেশ থেকেও আসেন অনেকে। রজ্জু বেঁধে গাছ থেকে গাছে করে একালের টারজান হওয়ারও সুযোগ আছে। পাহাড় থেকে পাহাড়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে উড়ে বেড়াতে ব্যবস্থা আছে প্যারাসেইলিং এবং প্যারাগ্লাইডিংয়ের। তবে যাঁরা হাঁটতে গিয়ে গায়ের ঘাম ঝরাতে পছন্দ করেন না, তাঁদের জন্য আছে গাড়ি, কেবল কেবিন, কেবল চেয়ার। সব বয়সের সবাইকে অমন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে সব ব্যবস্থাই আছে। আর তাই কোতোরো শহরে এসে এখন থেকে অল্প দূরে ১ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় ‘পোঁ দ্য স্পা ইন’ অর্থাৎ স্পেনের সেতু এবং ১ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতায় পর্বতের বুকে হ্রদ ‘গোবে’ না দেখে ফিরে গেলে তা হবে অনেকটাই অদেখা। গভীর গিরিখাতের ওপর এই সেতু নির্মাণ করা হয় ১৮৮৬ সালে।

তখন থেকেই ফ্রান্সের এই পাহাড়ি অঞ্চল থেকে স্পেনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের জন্য সেতুটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে। এখানে আশপাশে আছে ছোট–বড় অনেক ঝরনা। বরফগলা জলের ধারা সৃষ্টি করেছে এক অপার্থিব আবহ। আরও ৩০০ মিটার উঠে গেলেই দেখা পাওয়া যাবে পর্বতের কোলে চোখ জুড়ানো নীল জলরাশির বিস্ময়কর সুন্দর হ্রদ ‘গোবে’। অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেবে মনে। এই পর্বতমালার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে স্বচ্ছ জলাধার, ছোট-বড় বহু হ্রদ আর ঝরনা।

default-image

নানা বৈচিত্র্যে ভরপুর, সুউচ্চ শৃঙ্গ সব মেঘ ছাড়িয়ে উঠে গেছে আকাশের কাছাকাছি, দেখলেই মনে হবে যেন আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে এক প্রকৃতির এক বিশাল বিস্ময়। কোতোরে শহরে এলে বিশাল, বিস্তীর্ণ পিরেনিজ পর্বতমালার খানিকটা দেখা হবে, অন্তত একটা ধারণা পাওয়া যাবে। আর তা স্মৃতিতে স্থায়ী হতে যথেষ্ট।

লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী

ছবি: লেখক

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন