আন্দামানের চার দ্বীপে

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ নিয়ে আগ্রহটা আমাদের একটু বেশিই ছিল। আগ্রহের কারণটা ইতিহাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় উপমহাদেশের সূর্যসন্তানদের আন্দামানে দ্বীপান্তরের কাহিনি ছোটবেলা থেকে জানা। সে সময়ের ‘কালাপানি’ খ্যাত ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এ দ্বীপের ঐতিহাসিক সেলুলার জেল স্বচক্ষে দেখার সে ইচ্ছাতেই আন্দামান ভ্রমণ নিশ্চিত হলো। সব মিলিয়ে ১৬ জনের দল। সহকর্মীদের মধ্যে দুজন সস্ত্রীক, তাঁদের স্কুলপড়ুয়া দুই শিশুও আছে দলটিতে।

default-image

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, আমরা ঢাকা থেকে রওনা হলাম আন্দামানের পথে। প্রথমে আকাশপথে কলকাতা। কলকাতা থেকে আন্দামানের প্রধান শহর পোর্ট ব্লেয়ারের নির্ধারিত ফ্লাইটে। প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। দুই ঘণ্টা পর দৃশ্যমান হলো আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ। বিমানের জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম চারদিকে সাগরের গাঢ় নীল জলরাশি আর তার মধ্যে ছোট-বড় সবুজ দ্বীপ।

বিজ্ঞাপন

আন্দামান দীপপুঞ্জ ভারতের অন্যতম সংরক্ষিত এলাকা। বিমানবন্দরে তাই আবারও ইমিগ্রেশনের সম্মুখীন হতে হলো। তেমন ঝামেলা নয়। একজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা সবার পাসপোর্ট-ভিসা দেখে দিকনির্দেশনা-সংবলিত একটা নির্দেশিকা ধরিয়ে দিলেন। বিমানবন্দরের বাইরে আমাদের জন্য বাস প্রস্তুত ছিল। যে ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে আমাদের যাওয়া, বের হতেই তাদের একজন প্রতিনিধি স্বাগত জানালেন।

default-image

আমরা রওনা দিলাম হোটেলের দিকে। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো ছোট্ট একটা শহর। প্রায় সবাই বাংলায় কথা বলছে। বাস থেকে যতটা বুঝলাম, পুরো বাঙালি সংস্কৃতি এখানে। হোটেলে পৌঁছে বিষয়টা পরিষ্কার হলো। হোটেলমালিকও একজন বাঙালি। তিনি জানালেন, পুরো আন্দামানের ৭০-৮০ শতাংশ অধিবাসী বাঙালি। এদের বেশির ভাগ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময়ে বসতি গড়েছে।

যা হোক, খিদেয় আমাদের পেট চোঁ চোঁ করছে। দুপুর প্রায় ১২টা বাজে। চটজলদি আমরা যে যার রুমে গেলাম। কোনো রকম হাতমুখ ধুয়ে পেট ভরে ভাত খেলাম। পাতে পরেছিল ডিম ভাজি, আলু ভর্তা আর ডাল। ফেব্রুয়ারি মাস বলে আমরা কিছু শীতের কাপড় সঙ্গে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি পুরো গরম। শীতের কোনো কাপড়ই লাগছে না। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, সারা বছরই এখানে গরমকাল। এ সময়টায় যা একটু গরম কম।

সেলুলার জেল

default-image

সেলুলার জেল শহরটির সবচেয়ে উঁচুতে। প্রবেশপথের দুধারে কালো ফলকে লেখা রয়েছে জেলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। জেলটি তৈরি হয়েছিল ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে। এর আগে আন্দামানের বিভিন্ন দ্বীপে ছোট ছোট জেল থাকলেও ১৮৫৭ সালের পর সিপাহি বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী অভিযুক্ত সিপাইদের প্রায় খোলা অবস্থায় এখানে এনে রাখা হতো। পরে অনেককে এখানে স্থানান্তর করা হয়। যে কারণে এটির নাম সেলুলার জেল, তা হলো এর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য।

default-image

মাঝখানে সুউচ্চ একটা টাওয়ার থেকে শুরু হয়ে ৭টি লম্বা উইং চারদিকে বিস্তৃত হয়ে একটি চাকার মতো আকার ধারণ করেছে। মোট ৬৯৬টি কক্ষ ছিল সেলুলার জেলে। প্রতিটি কক্ষের মাপ সাড়ে তেরো বাই সাড়ে সাত ফুট। সামনে লোহার দরজা আর প্রায় ৯ ফুট ওপরে ছোট একটা ভেন্টিলেটর। প্রতিটি উইং এমনভাবে তৈরি, যাতে এক উইংয়ের কয়েদি অন্য উইংয়ের কয়েদিদের দেখতে না পারেন।

পুরো চত্বর ঘুরে দেখতে আমাদের ঘণ্টাখানেক লাগল। বের হলেই সামনে ছোট পার্কের মতো একটা জায়গা। ভেতরে ঢুকলাম। এক সারিতে সোনালি রঙের কয়েকজনের প্রতিকৃতি দৃষ্টি কাড়ল। এরা সবাই বিপ্লবী, যাঁদের বেশির ভাগ বন্দিদশায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন অনশনে।

বিজ্ঞাপন

জেল থেকে সৈকতে

default-image

সেলুলার জেল দেখা শেষে বাস তৈরি চার কিলোমিটার দূরের করভিনস কোভ সৈকতে যাওয়ার জন্য। উঁচুনিচু রাস্তা বেয়ে গাঢ় নীল জলরাশির পাড় ধরে ছুটে চলেছে আমাদের বহনকারী বাস। চারপাশে চমৎকার সাজানো-গোছানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছোট শহর পোর্ট ব্লেয়ার। সৈকতে পৌঁছে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। তারপর সোজা চলে গেলাম মারিনা পার্কে। সুবিশাল লম্বা সৈকতজোড়া একটা দৃষ্টিনন্দন পার্ক। আলো-আঁধারিতে হাঁটতে হাঁটতে গলা ছেড়ে গান ধরলাম সবাই মিলে। কখন যে সময় কেটে গেল, টেরই পাইনি।

সারা দিনের ক্লান্তি কিছুটা ভর করেছে। হোটেলে ফিরলাম। আগামীকাল আমরা যাব রস আর ভাইপার দ্বীপে। উত্তর-দক্ষিণে মোট ৫৭২টি দ্বীপ নিয়ে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। এর মধ্যে ৩৮টি দ্বীপে কেবল জনবসতি। অনেক দ্বীপে পর্যটকদের যাওয়ারও অনুমতি দেওয়া হয় না।

ভাইপার দ্বীপে

default-image

সকালে আমরা সময়মতো জেটিঘাটে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছে জানতে পারলাম আজ রস দ্বীপে যাওয়া যাবে না। আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে একেক দ্বীপে যাওয়া। কী আর করা! আমরা বোটে করে রওনা হলাম ভাইপার দ্বীপ দেখতে। চারদিকে বিশাল সমুদ্রের নীল জলরাশি আর তার মাঝে বড় বড় ঢেউয়ের তালে ছুটে চলেছে আমাদের বোট। আমরা সবাই লাইফ জ্যাকেট পরা। দূরে দূরে সবুজ দ্বীপ, যার বেশির ভাগই নারকেলগাছে ভরা। যাওয়ার পথে একজনকে পেলাম যে গতকাল রস দ্বীপ দেখতে গিয়েছিল। তার কাছেই শুনে নিলাম রস দ্বীপের কথা।

ছোট একটা দ্বীপ রস দ্বীপ। এ দ্বীপে এখন জনবসতি নেই। তবে সেলুলার জেলের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্রিটিশ অফিসার ও তাঁদের পরিবারের বিলাসী জীবনযাপনের নিদর্শন এখনো মেলে। সুইমিং পুল, পানি শোধনাগার, ডিজেল জেনারেটর, ছাপাখানা, চিত্রশালা, উন্মুক্ত মঞ্চ ইত্যাদির উপস্থিতি দেখে নাকি সে রকমই আন্দাজ করা যায়।
এ দ্বীপটি তখন পরিচিত ছিল ‘প্যারিস অব ইস্ট’ নামে। গল্প করতে করতে আমরা পৌঁছে গেলাম ভাইপার দ্বীপে।

default-image

উঁচু পাহাড়ের ওপর একটা ফাঁসি ঘর। এখানেই ফাঁসি হয়েছিল পেশোয়ারি পাঠান শের আলির। আসলে পোর্ট ব্লেয়ার আর তার আশপাশের ছোট ছোট দ্বীপগুলোজুড়ে রয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলের দ্বীপান্তরিত বিপ্লবী সন্তানদের বীরত্বগাথা, দুঃখকথা। বেশিক্ষণ আর এ দ্বীপে থাকতে মন চাইল না। বোটে করে ফিরে এলাম পোর্ট ব্লেয়ারে। আমাদের পরের দিনের গন্তব্য হ্যাভলক দ্বীপ। স্টিমারের টিকিট আগেই করা ছিল। এই স্টিমারগুলোর স্থানীয় নাম ফেরি। আমাদের ফেরির নাম গ্রিন ওশান-২।

গ্রিন ওশান-২

default-image

হ্যাভলকের পথে আমাদের যাত্রা শুরু হলো সকাল ১০টায়। সম্পূর্ণ সুরক্ষিত বিশাল জাহাজ। চা-নাশতা-কফি খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। আমাদের দল বসে গেল কার্ড খেলতে—দুটো গ্রুপে। আমরা কেউ কেউ সময় কাটালাম শুধু সাগরের নীল জল আর ঢেউয়ের খেলা দেখে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর আমরা হ্যাভলক দ্বীপে নামলাম।

হোটেল ঠিক করাই ছিল। জিনিসপত্র রেখেই চলে গেলাম রাধানগর সৈকতে। ২০০৪ সালের ‘টাইম’ পত্রিকার মতে, রাধানগর সৈকত ছিল এশিয়ার শ্রেষ্ঠতম সৈকত। অর্ধচন্দ্রাকার এই সৈকতে টলটলে স্বচ্ছ গাঢ় নীল জলরাশির পাড়ে রুপালি বালি চিক চিক করছে দুপুরের রোদে। তীরে ঘন নারকেলের বন নেমে গেছে দূর সমুদ্রে।

ইচ্ছেমতো সাগর স্নানে মেতে উঠলাম আমরা। বহু পর্যটকের ভিড় এখানে। দেখলে বোঝা যায়, মধুচন্দ্রিমা উদযাপনে নববিবাহিতদের অনেকেই বেছে নিয়েছেন আন্দামানের রাধানগর সৈকত।

বিজ্ঞাপন

দুপুরের খাওয়া সারলাম একটা সাধারণ মানের হোটেলে। ছোট চিংড়ির ভুনা আর সবজি-ভাজি দিয়ে খেতে গিয়ে অবাক হলাম, একেবারে বাঙালিয়ানা। হোটেলে যারা কাজ করছে, তারা সবাই নারী। একজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, হ্যাভলক দ্বীপের ৯৫ শতাংশই বাংলা ভাষাভাষী এবং সিংহভাগই ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ এর দিকের উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি মূলের বাঙালি। জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের বাংলাদেশে যেতে ইচ্ছে করে না? সবার মধ্যে প্রবল ইচ্ছার প্রকাশভঙ্গি। একজন বলল, ‘আমাদের তো পাসপোর্টই নেই।’

default-image

বুঝলাম, শিকড়ের টান অনুভব করে সবাই। আমরা রাত কাটালাম হ্যাভলকের আরেক সৈকত বিজয়নগর সৈকতসংলগ্ন হোটেলে। শান্ত জলরাশির সৈকতে ছোট ছোট ঢেউ মাঝেমধ্যে নীরবতা ভাঙে এখানে। মাঝরাত পর্যন্ত সৈকতে আড্ডা হলো।

সকালে সূর্যোদয় দেখতে হবে এখানে। ভোরবেলা আমরা এখানে এক অপরূপ সূর্যোদয় দেখলাম। হাতে বেশি সময় নেই। সকালের নাশতা সেরেই যেতে হবে জেটিতে। স্টিমারে করে আমরা রওনা হব আরেক দ্বীপে।

নীল দ্বীপে

default-image

আমাদের গ্রিন ওশান-২ যাত্রা শুরু করল নীল দ্বীপের উদ্দেশে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ছোট্ট নীল দ্বীপে। ১৮ বর্গ কিলোমিটারের এই কোরাল দ্বীপটিতে মাত্র ৩ হাজার লোকের বাস।

দ্বীপটি যেন পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য। জীবন্ত প্রবালের জন্য বিখ্যাত এই নীল দ্বীপ। আমরা জীবন্ত প্রবাল দেখতে প্রথমে গেলাম কোরাল সৈকতে। সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র প্রবাল। জীবন্ত প্রবাল আর নানা রকম মাছের লুকোচুরি আমাদের স্বপ্নকেও যেন হার মানাল।

default-image

এখানে দেখলাম প্রাকৃতিক ব্রিজ। ঠিক করা ছিল, আমরা নীলদ্বীপে যাত্রাবিরতির মতোই বেড়াব। তাই জিনিসপত্র সব আমাদের সঙ্গেই। বাসে রাখা। কোরাল সৈকত দেখা শেষে আমরা গেলাম ভরতপুর সৈকতে। দুপুরের রোদে তখন নীলের মাটি উত্তপ্ত। আর ভরতপুর সৈকতে নেমে নীল-সবুজের রং মেশানো বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখে আমরা আর থাকতে পারলাম না। সৈকতেই সব জিনিসপত্র রেখে নেমে গেলাম সমুদ্রস্নানে। এখানে গ্লাসবোটিং করা যায়। স্পিডবোটের নিচে ম্যাগনিফাইং গ্লাস। বোটিং করতে করতে গ্লাসের ভেতর দিয়ে দেখা যায় জীবন্ত প্রবাল আর অজস্র মাছের খেলা। মনে হবে সমুদ্রের তলদেশ ঘুরে দেখছি।

বিকেল সাড়ে তিনটায় আমাদের পোর্ট ব্লেয়ারে ফেরার স্টিমার। তার আগেই আমরা চেঞ্জিং রুমে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। নির্দিষ্ট সময়ে জাহাজ ঘাটে এল। আমরা সবাই এক জায়গাতেই বসলাম।

default-image

দুই ঘণ্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে যাব পোর্ট ব্লেয়ারে। কদিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে থাকি। নীল-সবুজের দ্বীপ আন্দামান যে এত সুন্দর, না এলে কখনো বিশ্বাসই হতো না। শুধু ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে নয়, মধুচন্দ্রিমা কাটানোর জন্যও জায়গা হিসেবে আন্দামান চমৎকার। অন্তত হ্যাভলক আর নীল দ্বীপ ঘুরে সেটাও মনে হলো। এ যাত্রায় আমরা যারা পরিবার ছাড়া এসেছি, ঠিক করলাম পরিবারসহ অন্তত আরেকবার আমরা যে যার মতো বেড়াতে আসব আন্দামানের এই নিভৃত দ্বীপপুঞ্জে।

পোর্ট ব্লেয়ারের কাছাকাছি এসে গেছি। বন্দরের আলো দেখা যাচ্ছে। যেন ঘোর কাটল সবার। সবার মন এখন বাড়ির পানে। শুধু রাতটুকু অপেক্ষা। সকালেই কলকাতার ফ্লাইট। সেখান থেকে ঢাকা।

লেখক: চিকিৎসক

মন্তব্য পড়ুন 0