বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে স্লোভেনিয়ার কোনো দূতাবাস নেই। আমাকে তাই ভিসার জন্য দিল্লিতে যেতে হয়েছিল। ইন্টারভিউয়ের সময় ভিসা অফিসার আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, স্লোভেনিয়ার রাজধানী সম্পর্কে আমি কিছু জানি কি না। তখনো আমার জানা ছিল না উচ্চারণটা লুবলিয়ানা, লুবজানা নয়। তাই তিনি একটু অবাক হয়ে জোরে হেসে উঠেছিলেন। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে ‘এই ভুল তুমি কেবল নও, অনেকেই করে থাকে।’

স্লোভেনিয়ার অনেক স্থানীয় মানুষ শহরটির প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রকাশ করতে লুবলিয়ানাকে ইংরেজিতে বলে ‘দ্য লাভড ওয়ান’।

default-image

ঠিক কবে লুবলিয়ানাতে মানুষ বসতি স্থাপন করেছিল, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। তবে যিশুখ্রিষ্টের জন্মের দুই হাজার বছর আগেও এ অঞ্চলে জনবসতি ছিল বলেই অভিমত প্রত্নতত্ত্ববিদদের। সে সময় লুবলিয়ানাসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় জলাভূমির অস্তিত্ব ছিল। এসব জলাভূমিকে সমন্বিতভাবে ‘লুবলিয়ানা মার্শেজ’ বলা হয়ে থাকে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে লুবলিয়ানাসহ আশপাশের অঞ্চলগুলোর মানুষের জীবনধারা ছিল এসব জলাভূমিকেন্দ্রিক। তাদের তৈরি নিদর্শনগুলো আজও প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে পুরোনো চাকার নাম ‘লুবলিয়ানা মার্শেজ হুইল’। রেডিও ডেটিংয়ের সাহায্যে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাঠের তৈরি এই চাকার বয়স পাঁচ হাজার বছর। বর্তমানে লুবলিয়ানার সিটি মিউজিয়ামে চাকাটি সংরক্ষিত আছে।

আনুমানিক পঞ্চাশ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে লুবলিয়ানাতে রোমানদের পদচারণ ঘটে। রোমানরা লুবলিয়ানাতে একটি সেনাছাউনি তৈরি করে। ৪৫২ খ্রিষ্টাব্দে আটিলার নেতৃত্বে একদল হান সেনা লুবলিয়ানাসহ আশপাশের অঞ্চলগুলোর ওপর তাণ্ডব চালায়। আটিলার দেখাদেখি অস্ট্রোগথ ও লোম্বার্ডরাও এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে।
আজকের দিনে আমরা যাদের স্লোভেনিয়ান হিসেবে জানি, ধারণা করা হয়, ষষ্ঠ শতাব্দীতে লুবলিয়ানায় প্রথম তাদের আগমন ঘটে। জাতিগতভাবে স্লোভেনিয়ানরা স্লাভিক হিসেবে পরিচিত, অবশ্য ঠিক কবে থেকে স্লোভেনিয়াতে স্লাভিকদের পদচারণ ঘটেছিল, সে বিষয়ে এখনো ঐতিহাসিকেরা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি।

তবে আধুনিক লুবলিয়ানার গোড়াপত্তন মধ্যযুগে। বিশেষত, পঞ্চদশ শতাব্দীতে লুবলিয়ানা চিত্রকলা ও ভাস্কর্যশিল্পে মধ্য ইউরোপে আলাদাভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১২৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ক্যারিন্থিয়ার রাজা তৃতীয় উলরিখ কামনিক থেকে কার্নিওলার প্রাদেশিক রাজধানী লুবলিয়ানাতে স্থানান্তরিত করলে শহরটি স্থানীয় রাজনীতিতে আলাদাভাবে গুরুত্ব পেতে থাকে। ১২৭০ সালে বোহেমিয়ার শাসক দ্বিতীয় অটোকার লুবলিয়ানা দখল করেন, কিন্তু ১২৭৮ সালে তাঁর পতনের সঙ্গে সঙ্গে লুবলিয়ানা রুডলফ অব হাবসবুর্গের অধীনে চলে আসে।

অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান শাসনামলে অস্ট্রিয়া ও বর্তমান ইতালির বিভিন্ন অংশের মধ্যে বাণিজ্য পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে লুবলিয়ানা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এই সময়ে সার্বিয়ার নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, মেসিডোনিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা ও মন্টিনিগ্রো সম্মিলিতভাবে যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশন গঠন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবশ্য মুসোলিনির সেনাবাহিনী লুবলিয়ানা দখল করে এবং তারা লুবলিয়ানাকে ইতালির অংশ হিসেবে দাবি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ও ইতালির নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তির পরাজয় ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে স্লোভেনিয়া পুনরায় যুগোস্লাভিয়া জোটে ফিরে যায়। যুগোস্লাভিয়া শাসনামলে স্লোভেনিয়াকে সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক অব স্লোভেনিয়া বলা হতো, যার রাজধানী ছিল লুবলিয়ানা।

১৯৯১ সালের ২৫ জুন যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশনের প্রথম কোনো দেশ হিসেবে স্লোভেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তবে সার্বিয়াসহ যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশনের অন্য দেশগুলো স্লোভেনিয়ার এ স্বাধীনতার ঘোষণাকে অস্বীকৃতি জানায়। শুরু হয় যুদ্ধ, যা ১০ দিন স্থায়ী ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি ছিল ইউরোপ মহাদেশের ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধ, যেখানে ৭৬ জন প্রাণ হারিয়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে লুবলিয়ানাকে মধ্য ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা আজও চলমান। ২০০৪ সালে স্লোভেনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করে। সেই থেকে লুবলিয়ানা ধীরে ধীরে মধ্য ইউরোপের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। লুবলিয়ানার ইতিহাসে একজন মানুষকে বিশেষভাবে স্মরণ না করলে নয়, তিনি হলেন ইয়োজে প্লেচনিক। লুবলিয়ানা শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নকশা তিনি প্রণয়ন করেছিলেন।

ইউরোপের অন্যান্য রাজধানীর তুলনায় লুবলিয়ানা আয়তনে তেমন একটা বড় নয়। শহরটিতে আজও কমিউনিজমের ছাপ পাওয়া যায়, বিশেষত কেন্দ্রস্থল থেকে যত বাইরে যাওয়া যায়, ততই চোখে পড়ে কমিউনিস্ট শাসনামলে নির্মিত হালকা হলুদ বর্ণের আবাসিক ভবনগুলো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব আবাসিক ভবন অনেকটা জৌলুশ হারিয়ে বিবর্ণ রূপ ধারণ করেছে, তাই আমাদের মতো বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রথম দর্শনে এগুলো ততটা গুরুত্ব পায় না। এমনকি দেশটির গণপরিবহন পরিষেবাও ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতো নয়। স্লোভেনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ যাতায়াতের জন্য নিজস্ব গাড়ির ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য দেশটির সরকার সেভাবে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের প্রতি গুরত্বারোপ করে না। তবে এটা ঠিক যে ইউরোপের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে লুবলিয়ানা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বাস-সংযোগ রয়েছে।

default-image

ইউরোপের বেশির ভাগ শহরে যাতায়াতের জন্য ট্রাম কিংবা মেট্রো রয়েছে, লুবলিয়ানাতে এখনো ট্রাম কিংবা মেট্রো পরিষেবা গড়ে ওঠেনি। তাই এখানকার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বলতে মূলত বাস। তবে শহরের মধ্যে বাস ব্যবহার করত হলে বিশেষ কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। আলাদাভাবে আপনাকে বাস কার্ড কিনতে হবে এবং নিয়মিত আপনাকে বাস কার্ড রিচার্জ করতে হবে। লুবলিয়ানার ভেতরে বাসে ভ্রমণ করতে চাইলে প্রতি রাইডে আপনাকে ১ দশমিক ৩০ ইউরো গুনতে হবে। তবে মোটামুটিভাবে লুবলিয়ানায় ২৪ ঘণ্টাই ইন্টারসিটি বাস চলাচল করে।

আবার ‘মাল্টিকালচারাল’ শব্দটিও লুবলিয়ানার ক্ষেত্রে তেমন খাটে না। বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, কসোভো, ক্রোয়েশিয়া ও মন্টিনিগ্রো ছাড়া স্লোভেনিয়াতে অন্যান্য দেশের ইমিগ্র্যান্টদের তেমন একটা আনাগোনা নেই। আর নাইট লাইফের প্রতি যাঁদের আসক্তি রয়েছে, লুবলিয়ানাকে তাঁদের কাছে অনেকটা মৃতদের শহর মনে হবে। বার্সেলোনা, আমস্টারডাম, লিসবন কিংবা মাদ্রিদের মতো লুবলিয়ানার রাত প্রাণবন্ত নয়। মাঝেমধ্যে আচমকা দুই-একবার পানশালা কিংবা নাইট ক্লাবের দেখা মেলে, তবে সেখানে কেবল তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতিই চোখে পড়বে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় স্লোভেনিয়াতে বিবাহবিচ্ছেদের হার অনেক কম, এমনকি আজও স্লোভেনিয়ায় যৌথ পরিবারের দেখা মেলে। অবসর সময়ে বেশির ভাগ স্লোভেনিয়ান তাঁদের পরিবারের সঙ্গ উপভোগ করতে ভালোবাসেন। তাই নাইট লাইফের সংস্কৃতি দেশটিতে তেমন একটা প্রবল নয়। তবে পিটারের বক্তব্যের সঙ্গে একটি অংশে আমি একমত, লুবলিয়ানা সত্যি অত্যন্ত গোছালো এবং পরিচ্ছন্ন এক শহর। লুবলিয়ানার রাস্তাঘাট বেশ অপ্রশস্ত, তবে সেখানে তেমন একটা যানজট নেই।
পশ্চিম ইউরোপের শহরগুলোর তুলনায় লুবলিয়ানায় জীবনযাত্রার মান এখনো অনেকাংশে কম। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লুবলিয়ানায় বাসাভাড়া লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।

প্রায়ই সব শহরের মতোই লুবলিয়ানার প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে প্রেশেরেন স্কয়ার। এই নামকরণ করা হয়েছে স্লোভেনিয়ার জাতীয় কবি ফ্রান্স প্রেশেরেনের নামে।

লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশন থেকে পশ্চিম দিক বরাবর ১০ মিনিট হাঁটলে দেখা মিলবে এ প্রেশেরেন স্কয়ারের। যেকোনো জাতীয় উৎসব থেকে আন্দোলন কিংবা কর্মসূচিতে সবাই জড়ো হন এখানে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে প্রেশেরেন স্কয়ারের আশপাশে ছোট আকৃতির বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী দোকান বসে। পুরোনোর প্রতি যাঁদের আকর্ষণ, তাঁরা মূলত অস্থায়ী দোকানগুলোতে জড়ো হন। বেশির ভাগ দোকানি অত্যন্ত বয়স্ক। যুগোস্লাভিয়া শাসনামলে ব্যবহৃত মুদ্রা ও বিভিন্ন ধরনের স্ট্যাম্প থেকে শুরু করে অ্যান্টিকের খোঁজে এখানে দূরদূরান্ত থেকে অনেক লোক জড়ো হন।

default-image

লুবলিয়ানার অন্যান্য অংশের তুলনায় প্রেশেরেন স্কয়ারের অংশটি অপেক্ষাকৃত পুরোনো। লুবলিয়ানার বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থান এই প্রেশেরেন স্কয়ারের আশপাশে। প্রেশেরেন স্কয়ারে ঢোকার মুখে সবার আগে চোখে পড়ে পুব দিকে থাকা ব্রোঞ্জের দুটি ভাস্কর্য, যার একটি স্লোভেনিয়ার জাতীয় কবি ফ্রান্স প্রেশেরেনের ও অন্যটি গ্রিক দেবী মুজেসের। বিখ্যাত স্লোভেনিয়ান ভাস্কর ইভান জাইস এ দুটি ভাস্কর্যের নির্মাণ করেন।
প্রেশেরেন স্কয়ারের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে বারোক স্থাপত্যশৈলীর আদলে সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত ফ্রান্সিসকান চার্চ। লুবলিয়ানায় বেড়াতে আসা বেশির ভাগ দর্শনার্থী লাল রঙের এই চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ভালোবাসেন। মধ্যযুগে ক্যাথলিক খ্রিশ্চিয়ানিটির বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে প্রেশেরেন স্কয়ার জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠে।

প্রেশেরেন স্কয়ার থেকে সামান্য পা বাড়ালে চপ স্ট্রিট, নাজোর স্ট্রিট ও মিকলোসিচ স্ট্রিটের মিলনস্থলে রয়েছে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত ফ্রান্সিসকান মনাস্টারি। মধ্যযুগে এ অঞ্চলে জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিতি পায় এটি। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় জোসেফাইনের অবশ্য এ মনাস্টারিকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করেন। তবে এখানে এখন একটি লাইব্রেরি রয়েছে, যেখানে সত্তর হাজারের কাছাকাছি বিভিন্ন ধরনের বই ও পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ রয়েছে।

default-image

সন্ধ্যার সময় প্রেশেরেন স্কয়ার বাড়তি মাত্রা লাভ করে। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে দুদণ্ড প্রশান্তির খোঁজে অনেকে হাজির হন প্রেশেরেন স্কয়ারের আশপাশের কফি ও পেস্ট্রির দোকানগুলোতে। সেই সঙ্গে পথচারীদের বিনোদনের জন্য রয়েছে স্ট্রিট মিউজিক। বিভিন্ন ধরনের গান ও বাদ্যযন্ত্রের সুরে সন্ধ্যাটা মুখর হয়ে ওঠে। এক কাপ কফির সঙ্গে সুর, মন নিমেষে চাঙা করে তোলে।

ফ্রান্সিসকান চার্চের ঠিক উল্টো দিকে সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর রয়েছে ট্রিপল ব্রিজ অব লুবলিয়ানা। এটি আসলে তিনটি ভিন্ন সেতুর সমন্বয়। ঐতিহাসিকভাবে ট্রিপল ব্রিজ অব লুবলিয়ানার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে; কেননা, আধুনিক লুবলিয়ানার সঙ্গে মধ্যযুগীয় লুবলিয়ানার সংযোগস্থল হিসেবে ট্রিপল ব্রিজ অব লুবলিয়ানাকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। রাতের বেলায় বর্ণময় আলোকসজ্জায় ব্রিজ পায় অন্য মাত্রা। ব্রিজের অপর পাশের অংশকে লুবলিয়ানার ওল্ড টাউন হিসেবে আখ্যা দিলেও ভুল হবে না। অবশ্য লুবলিয়ানার ওল্ড টাউন যে আয়তনে খুব বেশি বড়, সেটা বলা যাবে না। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীর অনন্য এক নিদর্শন হচ্ছে লুবলিয়ানার এই ওল্ড টাউন। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে নানা সাজে সজ্জিত পুরোনো শহরের ঘরবাড়িগুলো আলাদা মাত্রা পায়।

default-image
default-image

আঙুরসহ বিভিন্ন ফল থেকে তৈরি ওয়াইনের জন্য স্লোভেনিয়ার কদর বিশ্বব্যাপী। তাই ঐতিহ্যের সঙ্গে স্লোভেনিয়ার ওয়াইনের স্বাদ নিতে পুরোনো শহরের পানশালাগুলোতে বছরের বেশির ভাগ সময় দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। আবার তুলনামূলকভাবে ভালো মানের স্যুভেনির কিনতে এই এলাকার স্যুভেনির শপগুলোর জুড়ি নেই। দাম অবশ্য খানিকটা চড়া, তারপরও ঐতিহ্যের আকর্ষণ বলে একটা কথা আছে না?

default-image
default-image

লুবলিয়ানার পুরোনো শহরের অন্যতম আকর্ষণ লুবলিয়ানা ক্যাথেড্রাল। এর আনুষ্ঠানিক নাম সেন্ট নিকোলাস ক্যাথিড্রাল। অনুমানিক ১২৬২ সালের দিকে প্রথম ক্যাথিড্রালটি নির্মাণ করা হয়, সে সময় ক্যাথিড্রালটি গোথিক দর্শনের অন্যতম পাদপীঠ হিসেবে পরিচিত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ক্যাথিড্রালটিকে বারোক স্থাপত্যশৈলীর আদলে পুনর্নির্মাণ করা হয়। সত্যি কথা বলতে, ইতিহাসের অংশ ছাড়া লুবলিয়ানা কিংবা জাগরেবের মতো শহরগুলোকে সেভাবে ব্যাখ্যা করার মতো কিছু নেই।

‘ড্রাগন’ শব্দটি শুনলে সবার আগে মাথায় আসে চীনের কথা। প্রকৃতপক্ষে চীনের বিভিন্ন চলচ্চিত্র, অ্যানিমেশন ছবি কিংবা রূপকথার গল্পে চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে ড্রাগনকে আলাদাভাবে যুক্ত করেছে। তবে আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, চীনের মতো লুবলিয়ানার স্থানীয় জনসাধারণও মনে করে, ড্রাগন তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ড্রাগনকে লুবলিয়ানা শহরের প্রতীক হিসেবে সাব্যস্ত করলেও ভুল হবে না, খ্রিষ্টধর্মের প্রসারের আগে স্লোভেনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ প্যাগান ধর্মের অনুসারী ছিল।

default-image
default-image

লুবলিয়ানিসা, সাভা, গ্রাদাশচিচা, ইশকা ও ইশচিসার মতো ছয়টি নদী লুবলিয়ানা শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও লুবলিয়ানিসা নামের নদীটিকে স্থানীয় অধিবাসীরা আলাদাভাবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের নদীগুলোর মতো এগুলো তেমন খরস্রোতা নয়। অনেক সময় এসব নদীকে ছোট খালের মতো মনে হয়। প্যাগানরা বিশ্বাস করত, লুবলিয়ানিসা নদীতে ড্রাগনের বিচরণ রয়েছে। তাই প্রেশেরেন স্কয়ার থেকে আধা কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে হাঁটলে লুবলিয়ানিসা নদীর ওপরে দেখা মেলে বিখ্যাত ড্রাগন ব্রিজের। ব্রিজে চার কোনায় চারটি পিলারের ওপর ড্রাগনের ভাস্কর্য চোখে পড়বে। গ্রীষ্মকালে লুবলিয়ানিসা নদীর ওপর বোট রাইডিং খুবই জনপ্রিয়।

ফ্রান্সিসকান চার্চের মতো পর্যটকদের কাছে লুবলিয়ানার আরেকটি আকর্ষণীয় স্থানের নাম লুবলিয়ানা ক্যাসেল। লুবলিয়ানার ডাউনটাউনে ক্যাসেল হিল পাহাড়ের উপরিভাগে এর অবস্থান। লুবলিয়ানা ক্যাসেল সমগ্র লুবলিয়ানার মধ্যে সবচেয়ে উচ্চতম পয়েন্টগুলোর একটি। তাই ক্যাসেল থেকে লুবলিয়ানাকে দেখা যায় অন্য আলোয়। ধারণা করা হয়, দ্বাদশ শতাব্দীতে দুর্গটি নির্মিত। প্রাথমিকভাবে রোমান সেনারা একে প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহার করত। তবে ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী দুর্গের ভেতর জনবসতি ছিল। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যে এটা কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
স্লোভেনিয়ার মূল সৌন্দর্য ছোট-বড় বিভিন্ন উচ্চতার আল্পস ও ডিনারাইডস পর্বতমালা।

default-image

হাঙ্গেরির সীমানা পেরিয়ে যখন স্লোভেনিয়াতে প্রবেশ করা হয়, তখন রাস্তার দুই ধারে সারি সারি পর্বতমালার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এমনকি লুবলিয়ানাকে ঘিরেও রয়েছে নানা পাহাড়ের উপস্থিতি। এগুলো মূলত আল্পস পর্বতমালার অংশ। কেবল শহর নয়, দুর্গে দাঁড়িয়ে দৃষ্টিগোচর হয় আল্পস পর্বতমালার এক অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য। নদী, পাহাড় ও মানুষের তৈরি ইট-পাথরের সৌন্দর্য—কী নেই লুবলিয়ানায়? ক্যাসেলের প্রবেশমূল্য ১৩ ইউরো। তবে শিক্ষার্থী মাত্র ৯ ইউরো লাগে।

default-image

শপিংয়ের আগ্রহ থাকলে তাঁকে একটু কষ্ট করে লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল বাসস্টেশন থেকে বাস ধরে এগোতে হবে রুডিনিকের দিকে। লুবলিয়ানার মূল শহর থেকে রুডিনিক কিছুটা বাইরে। লেকলার্ক, স্পার, টেসকো, হোফার কিংবা অ্যালডির মতো নামকরা শপিং মলের দেখা মিলবে রুডিনিকে। স্লোভেনিয়ার জনসাধারণের কাছে শপিংয়ের ক্ষেত্রে ভরসার নাম তাই রুডিনিক। অবশ্য যাঁরা অর্গানিক খাবার পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে লুবলিয়ানা সেন্ট্রাল মার্কেটের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। অনেকটা খোলা আকাশের নিচে বসে এই বাজার। রোববার ছাড়া সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনই বাজার খোলা থাকে। ড্রাগন ব্রিজ থেকে একটু সামনে হাঁটলে দেখা মেলে লুবলিয়ানা সেন্ট্রাল মার্কেটের।

ট্রিপল ব্রিজ ও ড্রাগন ব্রিজের পাশাপাশি লুবলিয়ানিসা নদীর ওপর আরও একটি বিখ্যাত ব্রিজ রয়েছে, যার নাম মেসারস্কি মস্ট। ইংরেজিতে একে বাচার’স ব্রিজ বলা হয়। নামটা শুনতে যতটা কঠিন হয়, বাস্তবতা তার থেকে একেবারে ভিন্ন। প্রেমিক-প্রেমিকারা তাঁদের ভালোবাসার স্মৃতিকে সাত রঙে রাঙাতে এ ব্রিজের ওপর তালা ঝুলিয়ে রাখেন।

লুবলিয়ানা ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বিশ্রামের জন্য আছে টিভোলি পার্ক। সবুজ গাছপালা ও ছোট ছোট লতাগুল্ম শহরবাসীকে দেয় অনাবিল প্রশান্তি। পার্কের ভেতর প্রায়ই কাঠবিড়ালির ঝাঁক দেখা যায়, আদর করে অনেকে তাদের খাওয়াতে ভালোবাসেন। রোজেনিক পাহাড়ের ঢাল থেকে শুরু করে আশপাশের পাঁচ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে পার্কটি বিস্তৃত।

default-image

১৮১৩ সালে ফরাসি স্থপতি জিন ব্লানচার্ড পার্কটির নকশা করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে পার্কটি সম্প্রসারণ করা হয়। বিশেষত, ১৮৮০ সালে পার্কটির দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি পুকুর খনন করা হয়। বর্তমানে বারিয়ে নামের একটি সংঘ পুকুরটির দেখভাল করে থাকে। লুবলিয়ানার শহরতলির ভেতর পুকুরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিশিং স্পট। ইউরোপের অন্যান্য পার্কের মতো টিভোলি পার্কের ভেতরেও বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য দেখা যায়।

এমনকি এই পার্কের ভেতরে রয়েছে সপ্তদশ শতকে নির্মিত ছোট একটি দুর্গ; ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এটা সংস্কারও করা হয়। স্থানীয় ব্যক্তিরা একে টিভোলি ক্যাসেল বলে থাকে। বর্তমানে টিভোলি ক্যাসেলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় থাকে। দুর্গের বাইরে কাস্ট আয়রনের চারটি কুকুর যেন রয়েছে সার্বক্ষণিক প্রহরায়। চারটি ভাস্কর্যের কোনটিতেই জিব নেই। স্থানীয় জনশ্রুতি হলো, ভাস্কর্য নির্মাণের পর বিষয়টি নজরে এলে ভাস্কর অ্যান্থোন ডমিনিক ফার্নকর্ন রাগে ও ক্ষোভে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন। অবশ্য অনেকে এ ঘটনাকে স্রেফ গুজব হিসেবে উড়িয়ে দেয়। টিভোলি ক্যাসেলের ঠিক সামনে থাকায় ফোয়ারায় রয়েছে ছোট একটি ছেলের ভাস্কর্য। টিভোলি পার্কের ঠিক উত্তর পাশে আছে চেকিন ম্যানশন, যেটি এখন মিউজিয়াম অব কনটেম্পোরারি হিস্ট্রি অব স্লোভেনিয়া।

default-image
default-image

ভোজনরসিকেরা হয়তো ভাবতে পারেন, লুবলিয়ানায় এলে কী কী খাবারের স্বাদ নেওয়া যাবে। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, স্লোভেনিয়ার খাদ্যসংস্কৃতি তেমন একটা সমৃদ্ধ নয়। ম্যাকডোলান্ডস ছাড়া আন্তর্জাতিক ফাস্ট ফুড চেইনের উপস্থিতি তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। স্লোভেনিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে পছন্দের ফাস্ট ফুড হচ্ছে বুরেক কিংবা ইয়ুকফা কাবাব। বুরেক হচ্ছে একধরনের বিশেষ পাই। বিভিন্ন ধরনের বুরেক রয়েছে, যেমন: মিট বুরেক, চিজ বুরেক, আলু-পালংশাকের বুরেক ইত্যাদি। আমাদের দেশে প্রচলিত শর্মার আদলে তৈরি হয় ইয়ুকফা কাবাব। বুরেক ও ইয়ুকফা কাবারের উৎপত্তি তুরস্কে তবে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান দেশগুলোর খাদ্যসংস্কৃতিতে এ দুই খাবারের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। স্লোভেনিয়ার ফাস্ট ফুড ব্যবসার বড় অংশ আলবেনিয়ান ও বসনিয়ানদের দখলে। আলবেনিয়ান ও বসনিয়ানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মুসলমান। তাই যাঁরা হালাল কিংবা হারামের প্রতি অধিক সংবেদনশীল, তাঁদেরকে অন্তত খাবারের ক্ষেত্রে এ শহরে তেমন একটা ঝামেলা পোহাতে হবে না।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে লুবলিয়ানার বেজিগ্রাডে সরকারিভাবে মসজিদের উদ্বোধন করা হয়েছে। এ মসজিদের নাম রাখা হয়েছে লুবলিয়ানা মস্ক। স্লোভেনিয়ান ভাষায় জামিয়া বললে যে কেউ এ মসজিদ দেখিয়ে দেবে। প্রায় অর্ধশতাব্দীর প্রচেষ্টার পর কাতারের অর্থায়নে নির্মিত এ মসজিদ দেখতেও অনেক দর্শনার্থী ভিড় করেন। লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল বাসস্টেশন থেকে এ মসজিদের দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার।
আসলে পৃথিবীতে এমন কিছু শহর আছে, যেগুলো সে অর্থে বিশেষ না হলেও ঐতিহাসিক কারণে দেশটির সাধারণ মানুষের কাছে আলাদাভাবে সমাদৃত হয়।

default-image
default-image

লুবলিয়ানাও ঠিক সে রকম। সাধারণ দর্শনার্থীরা লুবলিয়ানায় হয়তো বিশেষ খুঁজে পাবেন না। লুবলিয়ানাকে তাই উপভোগ করতে হলে অনেকটা স্লোভেনিয়ানদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। সে জন্য একটু অতীতাশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজন। ১৯৯১ সালে স্লোভেনিয়া স্বাধীনতা অর্জন করলেও একটি পৃথক জাতিসত্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠন করার ধারণাটি স্লোভেনিয়ানদের মধ্যে নতুন কোনো বিষয় ছিল না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের শাসকগোষ্ঠী দেশটিকে ভিন্ন ভিন্ন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তাদের জাতিসত্তা ও ভাষার ওপর বড় আঘাত হেনেছিল। লুবলিয়ানা আজকের দিনে যদিও স্লোভেনিয়ার রাজধানী, তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগপর্যন্ত ত্রিয়েস্তে ছিল এমন এক শহর, যেখানে সবচেয়ে বেশি স্লোভেনিয়ানদের বসবাস ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ত্রিয়েস্তে ইতালির সঙ্গে সংযুক্ত হয়। স্লোভেনিয়ানরা আজও এ ঘটনাকে তাদের ইতিহাসের বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখে। ফরাসি বিপ্লবের সূতিকাগার হিসেবে যেমন প্যারিসকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, ঠিক একইভাবে আজকের দিনে বিশ্বমানচিত্রে স্লোভেনিয়া নামের রাষ্ট্রটির সৃষ্টির পেছনে লুবলিয়ানাকে বিশেষভাবে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। আমার সতীর্থের ভাষায়: লুবলিয়ানা শহর আমাদের সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেছে। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্র গঠনে আমাদের পূর্বপুরুষদের যে দীর্ঘলালিত স্বপ্ন ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়েছে এ লুবলিয়ানার কারণে। তাই যেকোনো কিছুর চেয়ে এ শহরকে আমরা অনেক বেশি ভালোবাসি।

লেখক: শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

ছবি: লেখক

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন