ইউরোপ ট্রিপ

সময় মেলে না আমাদের! যখন আমার ছুটি, তখন কর্তার ছুটি নেই অথবা বাচ্চাদের। কিছুদিন থেকেই ভাবছি, ইউরোপে যাব একটু সময় নিয়ে। সপ্তাহখানেক খুব কম হয়ে যায়। ইচ্ছা ব্যাকপ্যাক করব। নরমালি কোথাও গেলে আমার হোটেলে বসে থাকতে বিরক্ত লাগে। কীভাবে যেন ব্যাটে-বলে আমাদের দুজনের দুই সপ্তাহের ছুটি একসঙ্গে পড়ে গেল—সেটাও সামারে! অবশ্যই ইউরোপে উইন্টারে যাব না। বরফের নেশা অনেক আগেই কেটে গেছে। কর্তা চাচ্ছে একটি বা দুটি জায়গায়, লেজি ভ্যাকেশন—আমি ফুল ফ্লেজ ব্যাকপ্যাক। রাতের ট্রিপ, যাতে দিনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায় ঘোরাঘুরি করে। দিনের ট্রিপে সময় নষ্ট করার মতো ধৈর্য আমার একদম নেই।

বিজ্ঞাপন

তো কী আর করা, ট্রিপ চেঞ্জ। বেশির ভাগ ট্রাভেল সন্ধ্যায়, আমরা শহরে কাটাব দিনগুলো যতটা সম্ভব। ট্রিপ হবে পাঁচটা দেশ মিলিয়ে! আবারও সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে আইটেনারি, হোটেল ইত্যাদি ঠিক করতে। যেহেতু ব্যাক প্যাকিং, বাচ্চাদের নেব না এবারও। ওরা গরমে এত হাঁটাহাঁটিও করতে পারবে না, নতুন জায়গা, খাবারদাবার তাদের মর্জিমতো। চলতে গেলে অবশ্যই সময় নষ্ট হবে। তো তারা নানা-নানির কাছেই থাকবে। আমরা টেনশন ছাড়াই ঘুরব।

হোটেল ঠিক করে জানাচ্ছে, কোথায় কয় দিন—সেগুলো আবার দেখে নিয়ে ঠিক করছি। তবে আমার ভয়ও লাগছে—অপরিচিত কন্টিনেন্টে যদি অসুবিধা হয়?
ফাইনালি সেই দিন, লাইট প্যাক, আমাদের যাত্রা শুরু হলো। ট্রেনে ট্রাভেল ইউরোপ, কয়েকটা কান্ট্রি। যদি পারতাম, তবে মাসখানেকের জন্য যেতাম। দুই সপ্তাহ খুব স্ট্রেস হয়ে যায়! তারপরও কত কাটছাঁট!

প্রথম ডেস্টিনেশন ইতালি—রোম, পিৎজা, ফ্লোরেন্স, ভ্যাটিকান সিটি, ব্যাসিলিকা, সুইজারল্যান্ড হয়ে প্যারিস, লন্ডন, প্যারিস টু স্পেন। স্পেনে কর্ডোবা, গ্রানাডা, বার্সেলোনা হয়ে রোম। তারপর ব্যাক টু হোম।

সে যা-ই হোক, রোমে নেমে ট্রেনে সিটিতে! আমি ইউরোপের ট্রেন রাইডের জন্য উত্তেজিত! ৩০০ মাইল পার হাওয়ার গতিতে ছোটার উত্তেজনায় আটকে আছি। অবশ্যই ট্রেন মিস করে হারানোর কোনো শখ আমার নেই।

default-image

সিটিতে গিয়ে হোটেলের রুম পেতে প্রায় দুপুর! সব অ্যাট্রাকশন কাছেই। ফ্রেশ হয়েই হাঁটতে বেরোলাম সবার পিছে পিছে! হোটেল সেভাবেই নেওয়া, স্টেশনের কাছে, হাঁটার রাস্তা। হাঁটতে হাঁটতেই ইতালির পাথুরে রাস্তায় কতশত স্যুভেনিরের দোকান পেরোতেই দেখি, আসল স্যুভেনির—বিশাল ধ্বংসস্তূপ! ঠিক ধ্বংসস্তূপ নয়, হিস্ট্রি! মার্বেলের টাওয়ার রাস্তার পাশে পাশে, সবার পিছু পিছুই পৌঁছে গেলাম সেই পুরোনো প্রাসাদে, হাজারো ধ্বংসস্তূপে! সামনেই পাঁচ-সাততলা ইটের টাওয়ার কত হাজার বছরের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! দু-একজনকে দেখলাম তার মাথায়, গন্তব্য সেটাই। রোমান ফোরাম। একেকটা টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ, প্রাচীন জেল, বাগান—কী নেই? হাঁটতে হাঁটতে ওপরে যেতেই দেখি এক পাশে কলোসিয়াম। কাল যাব ভাবছি। ঘুরত ঘুরতে কয়েক ঘণ্টা কীভাবে চল গেল, বুঝিনি।

বিজ্ঞাপন

এবার ফিরতে হবে পেটপূজা করতে। পেটে ছুঁচো নাচছে। হাঁটার রাস্তা ধরে এবার রেলস্টেশনের অন্য পারে গেলাম, এপারে খাবারের দোকান দেখিনি। শপিং মল পেলাম, স্টেশনেই গ্রোসারি দোকান দেখলাম। কিন্তু ওপারে যেতেই যেন জ্যাকপট। সারি সারি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট। দেশি আবহ দেখেই ঢুঁ মারলাম। খাবার? অসাধারণ! দেশি স্টাইল চিংড়ি দোপেঁয়াজি, ডাল, সবজি, চিকেন। উদরপূর্তি করে হোটেলে ফিরলাম।

default-image

সন্ধ্যায় আবারও বের হলাম। এবার ট্রেন নিয়ে কলোসিয়ামের সামনে নামলাম। হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করলাম, এটা যেন একটা স্ট্রিপ, একটার পর একটা স্থাপনা। এরই মাঝে লোকজন ছবি আঁকছে, সুভ্যেনির বিক্রি করছে, সঙ সেজে লোকের মনোরঞ্জন করছে। কলোসিয়াম পেরোলে রোমান ফোরাম, সেখান থেকে হাঁটতে শুরু করলে অনেক কিছু দেখা যায়। তবে প্রথম দিন, সঙ্গে কিছু চিনি না। ভাবলাম, বাসে করে ট্রেভি ফাউন্টেন দেখতে যাব। বাসে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় নামব। বলে দিল কোথায় কীভাবে যেতে হবে। দেখি সে আমাদের সঙ্গেই নেমে এক কোনায় সানগ্লাস নিয়ে বসে পড়েছে বিক্রি করতে। অন্যদের সঙ্গে কথোপকথনে বুঝলাম সে আমার দেশি ভাই।

আমরা হেঁটে বেড়াচ্ছি। ফাউন্টেনের সামনে বিশাল জটলা। পাশেই বেশ বড় আইসক্রিম জেলাটো দোকান। আমরা পিসটাচিও আইসক্রিম নিয়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছি। প্রচুর বাঙালি দোকানি চোখে পড়ল। মনে হচ্ছে এখানে কাউকে কিছু বাংলায় জিজ্ঞেস করলেই চলবে।

default-image

হাঁটতে হাঁটতে প্যানথিয়ন পার হয়ে রাস্তায় হাজারো রেস্টুরেন্টের একটায় বসে পড়লাম—ডিনার, ইতালিয়ান স্টাইল পিৎজা এবং সে রকম আরও কিছু। ডিনার শেষে হাঁটতে হাঁটতে এবার আর বাসের দেখা পাই না! ঘণ্টার ওপর দাঁড়িয়ে শেষে বাস পেলাম, হোটেলে ফিরতে মাঝরাত।

কাল কলোসিয়াম!

কলোসিয়ামের ভেতরটা আজকালকার স্টেডিয়ামের মতো। হাজার হাজার বছর আগে এরা কীভাবে এটা বানিয়েছিল, সেটাও অবাক করা ব্যাপার। এখানে নাকি পানি ছেড়ে নৌকাও চালাত। বিশাল স্থাপনা।

মন্তব্য পড়ুন 0