লুভর
লুভর ছবি: লেখক

ভালোবাসার শহরে

default-image

সন্ধ্যায় পৌঁছালাম প্যারিসে। স্টেশন থেকে ট্যাক্সি করে হোটেল। প্রাচীন শহর দেখে মুগ্ধ আমি। এখানেও স্থাপনাগুলো অনেক পুরোনো।

হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে গেলাম আরেক আশ্চর্য দেখতে। আইফেল টাওয়ার! নদীর পাশ দিয়ে ট্যাক্সি যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত, আলো-ঝলমলে আইফেল টাওয়ারে পৌঁছে যেন শান্তি।

টিকিট নেওয়াই ছিল, তবু সেই লাইনে দাঁড়ানো টাওয়ারের ওপরে যাওয়ার জন্য। একদম ওপর পর্যন্ত যাওয়ার সিঁড়ি। ভাবিনি সেখানে স্যুভেনির শপ এবং খাবারের দোকানও থাকবে। এই লোহার স্থাপনা প্যারিসের আইকন! আইফেল টাওয়ারের ওপর থেকে প্যারিস এক স্বপ্নের নগরী। চারপাশের স্থাপনা, নদীতে নৌকাভ্রমণ দেখতে দেখতে মন স্বপ্নবিলাসী হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

সেখান থেকে নামতে নামতে অনেক রাত। নিচে তখনো জাগ্রত প্যারিস। দেখি দেশের মতো হাজারো হকার স্যুভেনির বিক্রি করছে টাওয়ারের নিচে। আমরা টাওয়ারের সামনের ব্রিজ পার হলাম হাঁটতে হাঁটতে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে ফিরতে মাঝরাত। প্যারিস তখনো ঘুমায়নি। রেস্টুরেন্ট খোলা। সেসব রেস্টুরেন্টের একটির প্যাটিওতে বসে খাবারের অর্ডার দিলাম। পাস্তা! এরা আলডেন্টে বানায়, মানে খাবার সময়ও কিছুটা শক্ত থাকে। বাঙালির গলা দিয়ে সে খাবার নামানো কষ্ট। জামাইয়ের প্লেটে হামলে পড়ে ক্ষুধা নিবারণ করে হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম।

হাঁটতে হাঁটতে ফেরার পথে গ্রোসারি চোখে পড়ে। ছোট ছোট দেশি স্টাইলের দোকান। এক দোকানি দেখি দুজনকে ধাওয়া করছে। দুজন লোক জানপ্রাণ বাজি রেখে দৌড়াচ্ছে; আমাদের পাশ কাটিয়ে ছুটে বের হয়ে গেল। আমরা ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। পরে দোকানে ঢুঁ মেরে জানতে পারি ওরা খাবার চুরি করছিল।

পরদিন সকালে বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ ব্রেকফাস্ট ক্রঁসে ও কফি! আমি অতটা ফ্যান নই তার।

দিনপঞ্জিতে লুভর

default-image

লুভর মিউজিয়াম। একনামেই চেনে সবাই! লুভর আসলে আদতে ছিল একটি রাজপ্রাসাদ। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ওঠাতেই মিউজিয়াম বানানো। বিশাল কোর্টইয়ার্ডের মাঝে কাচের পিরামিডসদৃশ স্থাপনা। সেটাই মূল এন্ট্রান্স। লুভরের দুটো সাইড। দুপাশে দুটোই ঘুরে দেখবেন। সারা দিন এখানে কাটানোর পরিকল্পনা নিয়েই আসবেন।

দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, ম্যুরাল, রাজা–মহারাজাদের বিখ্যাত গয়না, সারা পৃথিবীর ইতিহাসের সংগ্রহ এখানে! কী নেই। এর একেকটি কর্নার বা কক্ষ একেক দেশ, মহাদেশ বা ইতিহাসের ওপর সাজানো। এখানেই কাচের ঘরে আবদ্ধ সেই লেওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত মোনালিসা, যা জনগণের ভিড় ঠেলে দেখতে হয়।

বিজ্ঞাপন

মিথ্যা বলব না, মোনালিসার ইতিহাস আর মূল্যমান আকাশচুম্বী হলেও তার চেয়েও হাজারো গুণে সুন্দর পেইন্টিংস এখানে আছে। এটা নিতান্তই আমার মতামত।
হাজার হাজার চিত্রকলা, ভাস্কর্য, দেয়ালচিত্র একটার চেয়ে আরেকটা দৃষ্টিনন্দন। কোনোটাই মিস করার উপায় নেই। সঙ্গে তো আছেই রাজপ্রাসাদের সৌন্দর্য! সারাটা দিন সেখানে কাটিয়েও আশা মেটে না। আমরা ফ্রান্সে ফিরে আসব, কিন্তু সময় হবে না দ্বিতীয়বার লুভরে ফিরে আসার।

default-image

হোটেলের আশপাশে

আরও কতক্ষণ ঢুঁ মেরে, মানে পাড়া বেড়িয়ে পাশের ক্রঁসে শপে কিছু স্ন্যাক্স কিনে হাঁটতে হাঁটতে লেট লাঞ্চ করার জন্য যে খাবারের দোকানে ঢুঁ মারলাম, তার সার্ভার বাঙালি। কথায় কথায় তাদের সঙ্গে ভূরিভোজন শেষে চেক আউট করে নেক্সট ট্রেন।

গন্তব্য এবার লন্ডন।

default-image

গোটা ইউরোপে এই প্রথম রেলস্টেশনে অনেকক্ষণ অপেক্ষা, সঙ্গে ইমিগ্রেশন চেক। আমি এক্সাইটেড; কারণ ঘোরাঘুরির বাইরেও আমার জন্য চমক অপেক্ষা করছে। বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে!

দশকের ওপরে কোনো যোগাযোগ নেই আমাদের। তবে ও যেহেতু তখন লন্ডনে ভাগ্যক্রমে, আর আমি পরিবারের সঙ্গে প্রথম লন্ডন যাচ্ছি, কথা দিয়েছে আসবে দেখা করতে। আমাদের গ্রহ–নক্ষত্র–তিথি মিলেছে শেষ পর্যন্ত। এক যুগের পর দেখা হবে। লন্ডন দেখার এক্সাইটমেন্টের চেয়ে সপরিবারে বন্ধু সন্দর্শনের এক্সাইটমেন্ট কম নয়! বউ-বাচ্চাসহ দেখা করতে আসবে। সে গল্পে পরে যাব। আগে ইমিগ্রেশন শেষ করি।

default-image

ফ্রান্সে ইমিগ্রেশন শেষ করে ট্রেনে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই লন্ডনে পৌঁছালাম রাতে! সেখান থেকে লোকাল ট্রেন নিয়ে হোটেল। শুধু ঘুমানোর জন্যই। হোটেলে হট ইংলিশ ব্রেকফাস্ট সেরে হাঁটতে হাঁটতে নিচে স্টেশনের দিকে এদিয়ে অপেক্ষা করতেই সেই পরিচিত মুখ, পাশে বন্ধুপত্নী এবং তাদের সন্তান। ওর ভাইয়ের বিয়ের কাজ ফেলে আমাদের সঙ্গে সারাটা দিন কাটাবে আর লন্ডন ঘুরে দেখাবে বলে চলে এসেছে! আমাদের দুজনের জন্য ট্যুরের টিকিটও নিয়ে এসেছে। আমরা দুজনেই হতবাক ওদের আতিথেয়তায়।

প্রথমেই ট্রেনে গেলাম লন্ডন মিউজিয়াম। ঘুরতে ঘুরতে আমরা স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম। নিজেদের পরিবারের সঙ্গে পরিচয় সেরে নেওয়ার পর সবাই সবার বন্ধু হয়ে গেলাম সহজেই। তারপর সারা দিন লন্ডনের সিটি বাস ট্যুর! সিটির প্রতিটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে বাসযাত্রা শেষই যেন হয় না। তার ফাঁকেই একবার বেশ বিকেলের দিকে লাঞ্চ করতে বাস থেকে নেমে গেলাম। লাঞ্চ শেষে টেমসে নৌভ্রমণ করার কথা। তাই আবারও বাসে উঠে পড়লাম। ওদিকে বন্ধুর এত্তটুকু ছেলেও ঘুমিয়ে পড়েছে। সন্ধ্যাও হয়ে গেছে, ওদেরও ফিরে যেতে হবে।

default-image

হাতে টিকিট দিয়ে বলে, আমাদের তো যেতে হবে। দূরের রাস্তা, তবে যদি পারো তোমরা বোট রাইডটা মিস কোরো না। ওরা চলে যেতেই আমরাও ঠিক করলাম আমরাও হোটেলে ফিরে যাব। স্টেশনে নেমে ট্রেনে চেপে ফিরে এলাম হোটেলে।
পরদিন দুপুরের পর ট্রেন টু নেক্সট স্টপ। ডিনার সেরে সিদ্ধান্ত নিলাম নৌভ্রমণ সেরেই নেব যদি সকালে ঘুম ভাঙে।

বিজ্ঞাপন

সকালে ইংলিশ ব্রেকফাস্ট করে ফের ট্রেন নিয়ে বাস টু টেমস। কিছুটা মেঘলা দিন, দু–এক ফোঁটা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি সঙ্গে। আবার রোদের খেলা! বিখ্যাত টেমস নদী। বইয়ে পড়েছি টেমসের গল্প ছোটবেলা থেকে। তার ওপর বিখ্যাত লন্ডন ব্রিজ! নৌবিহার পুরোটা সকাল।

default-image

নদী থেকেই দেখা যায় বাকিংহাম প্যালেস, টাওয়ার অব লন্ডন, লন্ডন আই, শেক্‌সপিয়ারের ঘরবাড়ি, আর পুরো লন্ডন শহর। আমার বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। ওর জন্যই আমাদের লন্ডন ভ্রমণটা আরও স্মরণীয় হয়ে রইল।
ফিরে লন্ডনের ফেমাস ইন্ডিয়ান দোকানে (আদতে বাঙালি দোকান) বিরিয়ানি খেয়ে বিগ ট্রেন রাইড!

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান হিসেবে কর্মরত, সাবেক রেসিডেন্ট, ইমোরি ইউনিভার্সিটি, আটলান্টা, জর্জিয়া এবং প্রাক্তন ছাত্র, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন