বিবি খানুম মসজিদে দর্শনাথী
বিবি খানুম মসজিদে দর্শনাথীছবি: লেখক

সমরখন্দ শহরের বিবি খানুম মসজিদ। পৃথিবীর বৃহত্তম মসজিদগুলোর একটি। মসজিদ চত্বরে চিনারগাছের ছায়াতলে আছে প্রস্তরনির্মিত কোরানশরিফ। পুস্তকটি উন্মিলিত অবস্থায় আকাশের পানে চেয়ে, যেন মেঘকে ডেকে বলছে, ছুঁয়ে দাও আমার পবিত্র পাতাগুলো।

default-image

কিন্তু মেঘ নয়, বরং একে স্পর্শ করতে উদ্‌গ্রীব বিবাহিত নারীরা। উজবেকিস্তানের মরুময় প্রান্তরের ঝলসানো রোদ যাঁদের গালে রচনা করে উজ্জ্বল আভা, সেই সরলা নারীরা বিয়ের পর সন্তান লাভের বাসনায় ছুটে আসেন এই পুস্তকের কাছে। জনশ্রুতি আছে, প্রাণহীন এই স্থাপনার নিচে দিয়ে হাঁটু গেড়ে যে নারী পার হবেন, পূর্ণ হবে তাঁর মনোবাসনা।

default-image

সেই মোহে আকৃষ্ট হয়েই হয়তো এখানে ছুটে আসেন আশপাশের গাঁ-গ্রামের শত শত নারী। নিত্যদিন। শুধু যে সন্তানপ্রত্যাশী নারীদেরই ঢল নামে, তেমন নয়; বহু প্রৌঢ়াও আসেন। গেঁটেবাতের কারণে যাঁদের হাঁটতে হয় খানিকটা ঝুঁকে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

বিজ্ঞাপন

উজবেক এই নারীদের পোশাক হলো ঝলমলে লম্বা আলখাল্লা। অনেকে আবার লম্বা স্কার্টের সঙ্গে ওপরে পরেন কোট। মাথায় একফালি একরঙা কাপড় পেছনমোড়া করে বাঁধা। ওদিকে খানিকটা ভারিক্কি বয়সের যে পুরুষ, তাঁরা পরেন কোট-প্যান্ট। মাথায় জরির টুপি। এককালে হয়তো এই পুরুষেরা চোগা-চাপকান পরে ব্যাক্টেরিয়ান জাতের উঠের লোমশ পিঠে করে সমরখন্দ-বুখারার রেশমপথ ধরে আশপাশের শহরে যাত্রা করতেন; কিন্তু দিন তো বদলেছে; শুকিয়ে গেছে উজবেকিস্তানের গৌরব; আরাল সাগরের জল—সাদা সোনাতুল্য তুলো উৎপাদনের জন্য সেচের জল সরবরাহ করতে গিয়ে, শতাব্দীর ধুলোঝড়ে পুনর্নির্ণিত হয়েছে দেশের সীমানা, হারিয়ে গেছে বিশালবপু গুঁফো আমিরদের হম্বিতম্বি। পোশাকও তো তা-ই বদলে যেতে বাধ্য।

default-image

বিবি খানুম মসজিদে আগত এই পুণ্যার্থী নারী-পুরুষদের একটি ব্যাপার আমার দৃষ্টিকে রীতিমতো আলোড়িত করে। বলা চলে, সেটিই পরে আমার কাছে উজবেকিস্তানের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। আর সেটি হলো তাঁদের সোনাঝরা হাসি। প্রতীকী অর্থে নয়; বরং আক্ষরিক অর্থে।

মসজিদের এক প্রান্তে তুঁতগাছের নিচে পেতে রাখা বেঞ্চে বেশ কয়েক নারী সুখী আলাপে মত্ত। চোখের পাশটায় বলিরেখার সঙ্গে গণ্ডদেশে অসংখ্য কুঞ্চন। আমি তাঁদের কাছে গিয়ে ছবি তোলার অনুমতি চাইলে সবার কলস্রোতে ভেসে যায় সোনার রেণু। কী রহস্য এই হাসির পেছনে?

default-image

এ দেশে এই বুঝি এক অদ্ভুত ব্যাপার। দাঁতে ক্ষয় দেখা দিলে এখানকার খানিকটা অবস্থাপন্ন ঘরের নারী-পুরুষেরা সেটির স্থান ফাঁকা না রেখে সোনা দিয়ে গড়ে নেন কৃত্রিম দাঁত। এটাই তাঁদের কাছে আভিজাত্যের প্রতীক। অহংকার। তবে তাই বলে সোনায় বাঁধানো দাঁতের গর্বিত অধিকারীরা সবাই যে উজির-আমির বংশের, তা বোধ হয় নয়। অন্তত তাঁদের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে তেমনটাই মনে হয়। তাই ধারণা করি, এটা হয়তো এখানকার লোকেদের জীবনের অন্যতম স্বপ্নশখ। যে শখের কারণে তাঁরা ব্যয় করে ফেলেন নিজের মূল্যবান সঞ্চয়।

বিজ্ঞাপন

বুখারা থেকে তাসখন্দে চলেছি রাতের ট্রেনে। কামরায় টিমটিমে আলো। সহযাত্রী এক দম্পতি পাশ ফিরে বাঙ্কবেডে ঘুমাচ্ছেন। জানালার পাশটায় ভদ্রলোকের ক্রাচ ঠেস দিয়ে রাখা। সকালে ওপরের বাঙ্ক থেকে নিচে নামতেই এই ইনিও সেই সোনাঝরা হাসি উপহার দিয়ে বললেন, আমরা টমেটো খাচ্ছি, খাবে আমাদের সঙ্গে? যৌবনে ছিলেন তাসখন্দে অস্ত্র কারখানার তত্ত্বাবধায়ক। এখন অবসরভোগী। উচ্চবিত্ত যে নন, সেটি তাঁর সঙ্গে থাকা বোঁচকা-পোঁটলার দিকে তাকিয়েই অনুমান করে নেওয়া যায়। তাঁর সলজ্জ স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে অনুরোধের হস্ত প্রসারিত করলে দেখতে পাই, তাঁরও সামনের পাটির সব কটি দাঁত সোনায় মোড়া। তবে হ্যাঁ, গুলজাতীয় কিছু একটা সব সময়ে চিবানোয় সেই সোনার ওপর পড়েছে খানিকটা কালচে প্রলেপ।

default-image

দাঁতের মাঝে সোনার ঝকমকানির এই বিলাসিতাটুকু কিন্তু আবার শহুরে উচ্চশিক্ষিত উচ্চবিত্তদের মধ্যে খানিকটা অনুপস্থিত। অন্তত তাসখন্দে নেমে সেটাই মনে হলো। প্রকাণ্ড কয়েকটি ঝাড়বাতিকে নিজের ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখা পাতালস্টেশনে নেমে আমি এ শহরের নানা প্রান্তে ছুটে চলি। উদ্দেশ্য, বিশ্বযুদ্ধের পর নবরূপে গড়ে ওঠা শহরটির মূল আত্মা ও এর জনমানুষের খানিকটা রূপ কয়েক ঝলকে দেখে নেওয়া।

এখনকার সময়ে কংক্রিটের অরণ্যে বন্দী যে তাসখন্দকে আমরা দেখি, তার প্রায় পুরোটাই গড়ে উঠেছে ষাটের দশকের সময় থেকেই। যদিও সেই পত্তনের সূচনাটি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে। নাৎসি বাহিনী বেলারুশ আক্রমণের পরপরই ভারী শিল্পকারখানাগুলোকে সরিয়ে আনা হয়েছিল আরও ভেতরের দিকে, এই সুদূর মধ্য এশিয়ার তাসখন্দে। আর সেভাবেই এখানে এসে ঘাঁটি গাড়ে শত্রুর চিত্ত কাঁপিয়ে দেওয়া কাতিউশা রকেটের কারখানা।

default-image

ধীরে ধীরে তৈরি হয় যুদ্ধবিমানসহ আরও নানা ভারী শিল্প। কাজের সন্ধানে ছুটে আসেন রুশ কিংবা সুবিশাল সোভিয়েতের আরও নানান জাতিভুক্ত দেশের মানুষ। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সেসব সোনালি দিন হয়েছে গত। সেই রুশরা, বালটিক দেশের ইঞ্জিনিয়াররা অতীত সুখস্মৃতিকে মলিন সুটকেসের মধ্যে ভরে ফিরে গেছেন নিজ নিজ দেশে। রয়ে গেছে কেবল তাঁদের একাংশ। তাই তাসখন্দের পথে সোনালি চুলের কোনো শ্বেতাঙ্গিনীকে দেখলেই অনুমান করা যায়, তাঁর পিতৃপুরুষ হয়তো সেই কয়েক দশক আগে কর্মসূত্রে এ দেশে এসে পত্তনকারী নাগরিকদের কেউ। হয়তো বাকিরা চলে গেলেও এখানকার এই রুক্ষ মাটির মায়া ও মোহে তাঁরা দেশান্তরী হতে পারেননি। তাঁদের কাছে এই উজবেক দেশই আজ নিজের দেশ, নিজের পরিচয়।

রাজধানী তাসখন্দ শহরের প্রাচুর্যপূর্ণ মার্কেটে ঘুরে বেড়ালে তেমন কাউকে তাই খুব সহজে নজরে পড়ে না। তাঁদের খোঁজার জন্য হয়তো যাওয়া যেতে পারে মধ্যবিত্তের বারোয়ারি বাজার চরসু বাজারে। শহরের কেন্দ্রস্থলে হই-হট্টগোলে ভরপুর এক বাজার। কংক্রিটের ছাদের নিচে যার অধিষ্ঠান। গোটা বাজার ম-ম করছে লালচে মাংস, হরেক পদের মসলা আর শুকনো ফলফলাদির এক মিশ্রিত ঘ্রাণে।

default-image

এই তীব্র ঘ্রাণের তাড়া খেয়ে বাজারের বাইরে খোলা অংশে এসে দাঁড়ালে হঠাৎই দেখা হয়ে যায় ফিক করে হেসে ফেলা কয়েকজন বৃদ্ধার সঙ্গে। রুটির দোকান অস্থায়ী ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে দিব্যি জাঁকিয়ে ব্যবসা করছেন। খদ্দেরকে প্লাস্টিকের পাতলা ব্যাগে রুটি ভরে দেওয়ার ফাঁকে অনেকে আবার সস্তা নকিয়া ফোনে সেরে নিচ্ছেন দরকারি আলাপ।

আমরা যেমন মাছে-ভাতে বাঙালি, তেমনি উজবেকদের বলা চলে পিলাফ-রুটিতে উজবেক। পিলাফ একসময়ে ধনী উজবেকদের খাবার হলেও এখন সর্বশ্রেণির মধ্যে এই খাবারের ব্যাপক চাহিদা। রাস্তার পাশে সস্তা হোটেলগুলোয় বিশাল ডেকচিতে রান্না হয় এই পিলাফ। কখনো ভেড়ার মাংস, আবার কখনো ঘোড়ার মাংস পিলাফের সৌন্দর্য ও স্বাদ বর্ধন করে। খানিকটা দামি হোটেলে আবার পিলাফের মধ্যে গুঁজে দেওয়া হয় কোয়েল পাখির সেদ্ধ ডিম।

বিজ্ঞাপন

ওদিকে, এই যে রুটি, এটিকে ওরা ‘নন’ বললেও ভারতীয় উপমহাদেশের নান রুটির সঙ্গে এর কিঞ্চিৎ পার্থক্য আছে। গ্রামোফোনের ডিস্ক আকৃতির এই রুটির চারদিক কিঞ্চিৎ স্ফীত, আর মাঝের অংশটি যেন চারপাশে পাহাড় আবৃত মালভূমির মতো সমতল। এ রুটি কিঞ্চিৎ শুষ্ক। তাই লোকে সাধারণত ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাতলা চা কিংবা স্যুপে ভিজিয়ে খায়। নন রুটির প্রতি এ জাতি এমনই আসক্ত যে হোটেল-রেস্তোরাঁয় যে খাবারই অর্ডার করুন না কেন, সঙ্গে মুফতে মিলবে এই বিশেষ রুটি। আর শুধু হোটেলের কথাইবা বলছি কেন, পাড়ায় পাড়ায়, সড়কের মোড়ে মোড়ে ভ্যানগাড়িতে করে বিক্রি হয় এমন রুটি। অধিকাংশ বিক্রেতাই নারী।

default-image

দূর থেকে এমন কিছু দোকানের বেচাবিক্রির পালা অনুসরণ করে বুঝেছি, বাজারের বাকি পণ্যের চাহিদা খানিকটা ঘাটতি থাকলেও এ পণ্যের চাহিদা কিন্তু মন্দ নয়। খদ্দের আসছেন, আর বিক্রেতারা স্মিত হাসি উপহার দিয়ে ক্রেতার হাতে তুলে দিচ্ছেন শুকনো রুটি। মুহূর্তেই স্টক শেষ।

উজবেকদের এমন নানা চিত্র আর এই সোনাঝরা হাসিই আমাকে প্ররোচিত করে বুখারা থেকে তাসখন্দ, তারপর আরও দূরে সমরখন্দের ইতিহাসবিস্তৃত পথে পা রাখতে। আমি ছুটে চলি আর স্মৃতিপটে তুলে রাখি জীবনের এই অকিঞ্চিৎকর অভিজ্ঞতাগুলো।

লেখক: প্রকৌশলী ও পরিব্রাজক

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন