সাগরের আকাশে অপার্থিব রং
সাগরের আকাশে অপার্থিব রংছবি: লেখক

দুঃখের পর যে সুখ আসে আর বেদনার পর আনন্দ এবং অসহ্য যন্ত্রণার পর যে অসহ্য সুখও জীবনে আসে, তার প্রমাণ এবার পেয়েছি কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার সময় জাহাজে। আবার ফেরার সময় সেন্ট মার্টিন থেকে কক্সবাজার আসার সময় সেই একই জাহাজ।

default-image

যাওয়ার সময় যতটা কষ্ট, খারাপ লাগা, অসহ্য যন্ত্রণা, গা ঘিনঘিনে ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বারবার মনে হচ্ছিল, হায় খোদা, এই যাত্রা কেন শেষ হয় না! আসার সময় তার ঠিক উল্টো অনুভূতি হয়েছিল নিজের মধ্যে। দিয়েছিল জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমুদ্রযাত্রার অপার্থিব সুখ আর প্রকৃতির দেওয়া সব রকম সুখের অনুভূতি, যা আমাদের আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে! আর তাই, ফিরে আসার সময় ঠিক উল্টো ভাবনা ভাবতে বাধ্য করেছিল আমাদের। এমন অপরূপ, অদ্ভুত আর অপার্থিব যাত্রা কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল!

বিজ্ঞাপন

বিকেল প্রায় পাঁচটায় সেন্ট মার্টিন থেকে আমাদের কক্সবাজার ফিরে আসার জাহাজ যাত্রা শুরু করল। আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম একটা অসহ্য যন্ত্রণাময় সমুদ্রযাত্রার জন্য। কিন্তু বেশ ঢেউ আর জাহাজের একই রকম দুলুনি থাকার পরও কেউই সে রকম অনুভূতির মুখোমুখি হলাম না। ভাবলাম একটু পর হয়তো আরও গভীর সমুদ্রে গেলে সমুদ্রযাত্রার যন্ত্রণাটা পাওয়া যাবে।

default-image

আমাদের জাহাজ আগের মতোই দুপাশে দুলে দুলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকল। আর সেই সঙ্গে একটা সময় ঝিরঝিরে বাতাসে ভর করে পশ্চিমের অপূর্ব রং–বেরঙের এক বর্ণিল গোধূলি আমাদের কাছে এসে ধরা দিল। আকাশের এমন রং, এত রঙের খেলা, এমন বর্ণিল সমুদ্র, এত অপার্থিব গোধূলি আগে কোনোদিন দেখিনি সত্যি।
এই অবাক, অদ্ভুত আর অপার্থিব গোধূলি, নীল সমুদ্রে দূরের আকাশে যখন শত রঙের খেলা উপভোগ করছিলাম জাহাজের মাস্তুলের কাছে বসে, তখন মনে হচ্ছিল, নাহ! ভ্রমণের যন্ত্রণা অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছে এই অপার্থিব প্রকৃতি, অদ্ভুত আকাশ, অপরূপ সমুদ্র আর তার উত্তাল ঢেউ। কিন্তু প্রকৃতি তার রূপের আগুন থেকে এত সহজেই আমাদের মুক্তি দেবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল বোধ হয়।

গোধূলি শেষ হয়ে চারদিকে যখন সন্ধ্যা নামল, লাল, নীল, বেগুনি, গোলাপি আকাশ যখন ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে গিয়ে কালো হতে শুরু করল, তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আকাশ যেন তার সব তারা জ্বেলে আমাদের নতুন কিছু উপহার দিতে চাইল। অন্ধকার আকাশ কোথা থেকে যেন লাখো–কোটি ঝিলমিলে তারায় ভরে গেল, মিটমিটে হাসি দিয়ে আকাশ আর তারকাদের সম্মিলিত রূপের মাধুরী দিয়ে আমাদের মাতাল করে তুলছিল। এইটুকু সময় সমুদ্র ভুলে, ঢেউয়ের দোলা ভুলে গিয়ে শুধু আকাশের দিকেই অপলক তাকিয়ে ছিলাম।

default-image

এমন অপূর্ব একটা অনুভূতিতে যখন আমরা আচ্ছন্ন, তখন হুট করে একটা সময় মনে হলো যেন তারাদের আলো একটু কমে এসেছে, ওরা বোধ হয় কিছুটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে! এই ভেবে কিছুটা মন খারাপ নিয়েই টেকনাফের হালকা আলোময় তীরের দিকে তাকালাম। আর তাকিয়েই অবাক বিস্ময়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হলাম।

অবাক এ জন্য যে একটু আগেই তো নিজের চোখে দেখলাম সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবে গেল, তাহলে পুবের আকাশে লাল টকটকে ওটা কী দেখা যাচ্ছে? নাহ, চাঁদ তো এমন টকটকে হওয়ার কথা নয়! আর এই সময় তো সূর্যও ওদিক দিয়ে ওঠার কথা নয়। তাহলে কি পৃথিবীতে এমন কিছু ঘটতে চলেছে, আমরাই যার প্রথম সাক্ষী হব? এমন অদ্ভুত ভাবনা নিয়েই পুবের আকাশে একচোখে তাকিয়ে ছিলাম পলকহীন। কিন্তু কী দেখলাম?

বিজ্ঞাপন

অবিরত তাকিয়ে থেকে থেকে যে মুহূর্তের সাক্ষী হলাম নিজেই নিজের কাছে, পৃথিবীর কাছে নতুন, অভিনব আর অপার্থিব কিছু না হলেও আমার কাছে তা–ই। আমি আমার এই জীবনে কোনো দিন এমন কিছু দেখিনি। একটু একটু করে লাল টকটকে আকাশ, মেঘ আর সমুদ্রের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে যাওয়া সেই বিস্ময়বস্তু ধীরে ধীরে পাহাড়, সমুদ্র আর মেঘের বাধা পেরিয়ে কিছুটা ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ হয়ে আমার চোখের সামনে ধরা দিল।

default-image

মাত্র তিন দিন আগে পূর্ণিমা চলে গেছে বলে, কিছুটা ক্ষয়ে গেলেও সেই চাঁদ তার রূপের আগুন দিয়ে আমাকে ঝলসাতে শুরু করল একটু একটু করে। অবাক আর বিস্ময়ভরা টকটকে লাল চাঁদ কিছু সময় পর তার রুপালি আলোয় ভরে দিল পুরো সমুদ্র, আকাশ, বাতাস। আর আমাদের ভাসিয়ে নিতে চাইল তার অপার্থিব রূপের স্রোতে। সমুদ্র চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করতে লাগল, ঢেউগুলো তার আলোয় রুপালি হয়ে গেল, চারপাশ চাঁদের আলো মেখে হাসতে শুরু করল। এমন এক অপার্থিব রাতে, রুপালি ঢেউ আর আলো ঝলমলে সমুদ্রে সবাই যখন বিমোহিত, ঠিক তখনই আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল মুহূর্তেই!

কারণ আর কিছু নয়, দূরে ঝলমলে আলোর খেলা, বড় বড় ভবনের জৌলুশে আমাদের চোখ পড়ে মনে পড়ে গেল, আমরা কক্সবাজারে পৌঁছে গেছি! কেমন একটা মন খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে আজ কেন এত দ্রুত জাহাজ কক্সবাজারে পৌঁছে গেল! আজ কেন আগের দিনের মতো সাত ঘণ্টা সময় লাগল না, আজ কেন এই সমুদ্রযাত্রা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল!

default-image

এত মধুর, এত অবাক করা, এত প্রাপ্তিতে ভরপুর, এত এত বিস্ময় উপহার দেওয়া, এত অপার্থিব সুখের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া মুহূর্ত, সময়, ক্ষণ কেই–বা শেষ হতে দিতে চায়? জাহাজটি যখন সমুদ্রের বাঁক ঘুরে চ্যানেলে ঢুকে পড়ছিল, তখন আমাদের মন খারাপ হলো। কিন্তু আজকের এই ভ্রমণ, কিছু সময় আগপর্যন্ত পাওয়া অদ্ভুত, অবাক করা, বিস্ময়ে হাঁ করে দেওয়া সব প্রাকৃতিক উপহার আমাদের জীবনের এক অন্যতম পাওয়া হয়ে গেছে।

সেন্ট মার্টিন থেকে জাহাজে করে কক্সবাজার ফেরার সেই বিকেল, সন্ধ্যা, রাত আমাদের সবার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আর সুখের একটা রাত হয়ে রয়ে যাবে স্মৃতির অ্যালবামে।

মন্তব্য পড়ুন 0