পেচ পর্বত যেটি ট্রাইপয়েন্ট নামে পরিচিত
পেচ পর্বত যেটি ট্রাইপয়েন্ট নামে পরিচিতছবি: লেখক

কল্পনা করুন এমন একটি জায়গা, যেখানে একই সঙ্গে আপনি তিনটি দেশে অবস্থান করতে পারেন, কেমনই–বা লাগত এ রকম একটি জায়গার স্বাদ নিতে? আপনার সে কল্পনা কিংবা স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য রয়েছে পেচ পর্বত; যেটি ট্রাইপয়েন্ট নামে পরিচিত। মূলত ট্রাইপয়েন্টটি অস্ট্রিয়া, ইতালি ও স্লোভেনিয়া—তিনটি দেশের সংযোগবিন্দু। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ স্থান তিন দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র।

মাসখানেক আগের কথা। করোনাভাইরাসের প্রভাবে এ বছর আমাদের সবার জন্য অন্য এক অনুভূতির। দীর্ঘদিন লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থার কারণে আমাদের অনেকের সেভাবে বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তাই বলে অচেনাকে জানার আগ্রহ কিংবা অদেখা কোনো জিনিসকে নতুন করে দেখার আগ্রহ থেমে থাকবে, এমন আশা করা যায় না।

বিজ্ঞাপন

তাই গ্রীষ্মের ছুটিতে আসা সুযোগকে কোনোভাবে হাতছাড়া হতে দিইনি। আগস্টের শেষের দিকে ইউরোপে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির পথে আসে। অনেক দেশ তত দিনে লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে। সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। প্রতিবছর চেষ্টা করি গ্রীষ্মের ছুটিতে শিকড়ের টানে মাতৃভূমিতে ছুটে যেতে, এ বছর সেটা হয়ে ওঠেনি। এবার দুই ঈদও কেটেছে অত্যন্ত ফ্যাকাশেভাবে।

default-image

ফলে একধরনের হতাশা বিরাজ করছে। ইতালির রাজধানী রোমে আমার এক পরিচিত ভাই আছেন। জমির হোসেন। আমার জীবনে মানুষটির উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ববহ। লেখালেখিও মূলত তাঁর হাত ধরে। আমাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করেন। আমার মানসিক অবস্থা শোনার পর তাই তিনি কোনো কিছু বিবেচনা না করে ছুটে আসেন স্লোভেনিয়ায়। আমাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি স্লোভেনিয়ার আকর্ষণীয় জায়গাগুলোয় ঘুরতে চান। তাঁর অভিপ্রায় জেনে আমার মাথায় আসে ক্রাইনস্কা গোরার কথা।

প্রায় দুই বছর স্লোভেনিয়াতে বসবাস করছি, অথচ এ ক্রাইনস্কা গোরাতে যাওয়া হয়নি কখনো। আমাকে অনেকেই এ স্থান ভ্রমণের পরামর্শ দিয়েছেন; স্লোভেনিয়াতে বেশির ভাগ পর্যটক আসেন লেক ব্লেড ও পোস্তোয়ানা কেভ পরিভ্রমণের জন্য, কিন্তু যাঁরা স্লোভেনিয়ার বাসিন্দা, তাঁদের যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন, স্লোভেনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনটি, তাহলে বেশির ভাগ মানুষ একবাক্যে বলবে ক্রাইনস্কা গোরার কথা।

default-image

জমির ভাইকে নিয়ে তাই বেরিয়ে পড়ি ক্রাইনস্কা গোরার উদ্দেশে। রাজধানী লুবলিয়ানা থেকে বাসে ক্রাইনস্কা গোরা যাওয়া যায়। সময় লাগে আড়াই ঘণ্টার মতো; লুবলিয়ানা থেকে ক্রাইনস্কা গোরা যেতে ১০ ইউরো লাগে। স্লোভেনিয়াতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পরিষেবা ততটা আশানুরূপ নয়। তাই ক্রাইনস্কা গোরায় নেমে আমরা স্থানীয় এক গাইডের শরণাপন্ন হই; তিনি মূলত আমাদের এ বিশেষ স্থান সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। তাঁর বর্ণনার ভঙ্গি শুনে আমাদের কেউই স্থানটি দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। ইউরোপের মজা এ জায়গায়, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কিংবা সেনজেনের অন্তর্ভুক্ত যেকোনো দেশের ভিসা কিংবা রেসিডেন্ট পারমিট থাকলে সহজে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কিংবা সেনজেনে থাকা অন্য দেশগুলো ভ্রমণ করা যায়।

বিজ্ঞাপন

ক্রাইনস্কা গোরা মূলত স্লোভেনিয়ার একটি জনপ্রিয় স্কি রিসোর্ট হিসেবে খ্যাত। শীতকালে ইউরোপসহ পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে স্কি–প্রেমীরা এখানে একত্র হন। স্লোভেনিয়ার বেশির ভাগ সুউচ্চ পর্বতমালার অবস্থান ক্রাইনস্কা গোরার আশপাশে।

পার্থিব সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন উত্তর-পশ্চিম স্লোভেনিয়াতে অবস্থিত পেচ পর্বত। প্রায় ১ হাজার ৫০৯ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট পর্বতটি লাইমস্টোন আল্পস পর্বতমালার অংশবিশেষ। চারদিক থেকে বিভিন্ন ধরনের সুউচ্চ পাহাড়বেষ্টিত জায়গাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যেনও এক অবারিত ভান্ডার। তবে ঐতিহাসিকভাবেও স্থানটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ একটি কারণে। অস্ট্রিয়া, ইতালি ও স্লোভেনিয়া—তিনটি দেশ মিলিত হয়েছে এ স্থানে। তাই এ তিন দেশের অধিবাসীদের কাছে স্থানটি যুগ যুগ ধরে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে আছে।

default-image

ক্রাইনস্কা গোরা থেকে সাত কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ট্রমেয়া নামক স্থানে কারাভান পর্বতমালার অভ্যন্তরে এ পেচ পর্বতের অবস্থান। তবে অস্ট্রিয়ান, তথা জার্মানদের কাছে এটি ড্রেইল্যানড্রেক এবং ইতালিয়ানদের কাছে এটি মন্তে ফোরনো নামে পরিচিত। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় রোববারে অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া ও ইতালি—তিনটি দেশের মানুষ একত্র হয়। উৎসবে মেতে ওঠে তিনটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা মানুষেরা। প্রায় ২০০ বছর ধরে এ উৎসব আয়োজিত হয়ে আসছে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন করে আবার করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এ বছর আর সেভাবে কোনো উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে না।

আমাদের ট্যুরিস্ট গাইডের নাম রোমান ব্রাঞ্চ। তিনি ক্রাইনস্কা গোরার স্থানীয় বাসিন্দা। বয়স প্রায় ৫০ ছুঁই ছুঁই; এ এলাকার প্রতিটি ধূলিকণা যেন তাঁর চেনা। তাঁর পরামর্শে মূলত আমরা স্থানটি ভ্রমণে আসি। তিনি আমাদের জানান, বর্তমানে স্লোভেনিয়ার সঙ্গে যে রকমভাবে অস্ট্রিয়া কিংবা ইতালির উন্মুক্ত বর্ডার সংযোগ রয়েছে, আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে তেমনটি কল্পনা করা যেত না। সে সময় স্লোভেনিয়া ছিল যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশনের অংশ। অস্ট্রিয়া ও ইতালির সীমানা সে সময় আজকের মতো অরক্ষিত থাকলেও অনেকটা কাঁটাতারের বেড়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল স্লোভেনিয়াসহ গোটা যুগোস্লাভিয়া।

default-image

রাজনৈতিক বেড়াজাল কীভাবে বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজনের সৃষ্টি করে, সেটিও তিনি বারবার তুলে ধরছিলেন। পাশাপাশি তিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, কেননা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইউরোপের অনেক দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সমস্যার নিষ্পত্তি সাধনের পাশাপাশি দেশগুলোকে একত্র করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সব ক্ষেত্রে যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আশানুরূপ পরিবর্তনে সমর্থ হয়েছে, তেমনটিও তিনি মনে করেন না।

আপনাদের মধ্যে যদি কারও ইউরোপ ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকে, অনায়াসে আপনার পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন স্থানটিকে। একই সঙ্গে তিনটি ভিন্ন দেশের আবহ এবং চারদিকের নয়নাভিরাম সুউচ্চ জুলিয়ান আল্পস ও কারাভান পর্বতমালার সৌন্দর্যে আপনি এতটা বিমোহিত হবেন যে বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছা করবে অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া ও ইতালির এই ট্রাইপয়েন্ট সীমানায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

মন্তব্য পড়ুন 0