এক সকালে আইনস্টাইনের সঙ্গে

ইউরোপের এক বছরের শিক্ষাজীবনের প্রায় শেষ দিকে এসে পৌঁছেছি তখন। সবেমাত্র অভিসন্দর্ভ জমা দিয়েছি; দিন বিশেক হয়তো আরও থাকা যাবে বেলজিয়ামে। দেশে ফেরার আগে শেষ ভ্রমণ হিসেবে বেছে নিয়েছি সুইজারল্যান্ড ও পর্তুগাল। মাথায়, মনে কিংবা শরীরে কোনো বাড়তি চাপ নেই। লেখাপড়া সম্পর্কিত সব উদ্বিগ্নতার সমাপ্তি। আর কোনো অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার ডেডলাইন নেই। সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। আবহাওয়াটা বেশ আমুদে। তার ওপর এই জগতের ভূস্বর্গ সুইজারল্যান্ড গমন করব, কেবল ভাবছি আর শিহরিত হচ্ছি। আমার ভ্রমণসঙ্গী আমারই সহপাঠী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষক নিশাত আপা। আমার সুইজারল্যান্ডনিবাসী বন্ধু টিংকু বেশ কয় বছর ধরে তাগাদা দিয়েই যাচ্ছিল একবার সুইজারল্যান্ড ঘুরে যেতে। টিংকুর বাস সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্ন শহরে। তাই মনস্থির করলাম বার্নেই যাব।

default-image

ছোটবেলায় স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নানা বাড়ি যাওয়ার সময় যেমন একটা আয়েশি ভাব, ঠিক তেমন ভাবসাব আমার।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপে থাকাকালে একটা বিষয় বেশ রপ্ত হয়েছে, ইন্টারনেট ঘেঁটে কায়দা করে স্বল্পমূল্যের প্লেনের টিকিট কাটা। ব্রাসেলস থেকে প্রথমে সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহর পর্যন্ত গেলাম ইজিজেটে । প্রতিজনে ৩২ ইউরো করে পড়ল। প্লেন থেকে বাসেল শহরে নামি রাত সাড়ে ১০টায়। কোনো রকমে বাসেল থেকে কোনো একটা ট্রেন ধরে বার্ন পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার ধান্দা আমাদের দুজনের। যদি রাতে স্বল্পমূল্যের কোনো ট্রেন না–ও মেলে, তবে রাতটা বাসেল স্টেশনে কাটাব বলে মনস্থির করলাম। যেই না বিমানবন্দরের এক্সিট গেট দিয়ে বের হব, ওমা! একি! আমার বন্ধু টিংকু তার বন্ধু হানেসকে নিয়ে এয়ারপোর্টে হাজির আমাদের তুলে নিতে। ওদের দেখে আমরা ভারমুক্ত হলাম। রাজধানী বার্ন পর্যন্ত পৌঁছাতে আর কোনো ঝক্কি রইল না। হানেস গাড়ি চালাচ্ছে, বাইরে বেশ অন্ধকার।

default-image

সকালে একটু দেরিতে ঘুম ভাঙল। খেয়েদেয়ে আমি, টিংকু আর নিশাত আপা বের হলাম ‘আইনস্টাইন জাদুঘর’ দেখতে। টিংকুর বাসা থেকে হাঁটা দূরত্ব। বার্ন শহরের রাস্তাগুলো বেশ পাহাড়ি ঢঙের, উঁচু–নিচু। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম ‘ক্রমগাসে ৪৯’ বাড়িটিতে, যেটি ‘আইনস্টাইন মিউজিয়াম’ নামেই অফিশিয়ালি পরিচিত। দোতলার একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্ট। এটি সেই ঐতিহাসিক ঠিকানা, যেখানে বাস করতেন কালজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। ১৯০৩-১৯০৫—এই তিন বছর তিনি স্ত্রী মিলভা ম্যারিক এবং তাঁর ছেলে হান্স আলবার্টকে নিয়ে এখানেই কাটিয়েছেন। বার্নে সুইস পেটেন্ট অফিসে কেরানি হিসেবে কাজ করতেন সে সময়। পেটেন্ট ক্লার্ক হিসেবে সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতেন। ধারণা করা হয়, ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ বিষয়ে তাঁর ভাবনার প্রক্রিয়া এই সময় থেকেই শুরু। এটি এখন একটি ক্ষুদ্র জাদুঘর। এই বাড়ি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করছে।

আমার হাঁটার যে স্বাভাবিক গতি, টের পাচ্ছিলাম আমি সে গতিতে হাঁটতে পারছি না; আমি আইনস্টাইনের ঘরের সিঁড়িতে আলতো করে পা ফেলছি, এ বাড়ির পবিত্রতায় যেন একটুও আঘাত না আসে। আমার কৈশোর জীবন থেকে বয়ে বেড়ানো ভক্তি আমায় এমনটা ভাবাচ্ছে হয়তোবা। কালজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন জন্মেছিলেন জার্মানিতে। জীবদ্দশায় তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেছেন; ইতালিতে কাটিয়েছেন অনেকটা সময়, প্রাগে ছিলেন কয় বছর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁকে আমেরিকাতেও থাকতে হয়েছে। সে আরেক রাজনৈতিক কারণ। সে সময় রাজনীতি বিচ্ছিন্ন ছিল না কিছুই।

default-image

বাড়ির একতলায় উঠেই প্রথম কক্ষে প্রবেশ করলাম। দেখি বেশ কিছু ব্যবহৃত আসবাবপত্র। চোখে পড়ার মতো বড় আকারের একটি টেবিল। বুঝি এতে বসেই তিনি আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রাথমিক আঁকিবুঁকি করেছেন? আমি তো শুনেছি, তিনি সব সময় কাগজ আর কলম সঙ্গে রাখতেন, কেবল লিখতেন! টেবিলের পাশে দেয়াল ঘেঁষে একটি সোফা। সোফার ঠিক উল্টো দিকের দেয়াল ঘেঁষে একটি শোকেস। ঘরের কোনায় বিজ্ঞানীর একটি খুদে আবক্ষ মূর্তি; তার সঙ্গে ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারিনি। দেয়ালে টাঙানো পারিবারিক ছবি। রসবোধ ছিল দারুণ এ পদার্থবিদের।

বিজ্ঞাপন

আইনস্টাইনের ছবির দিকে তাকালেই মন উদাস হবে যেকোনো নারীর। কেমন ঢেউখেলানো চুল, ঠোঁটে হালকা দুষ্টু মিষ্টি হাসি, চওড়া কপাল, সম্মোহনী চোখ। যেন সর্বক্ষণ বেশ খোশমেজাজে আছেন, এই বোধ হয় কিছু একটা নিয়ে রসিকতা করবেন। দেয়ালে টাঙানো তাঁর ছবির ফ্রেম থেকে যেন পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন তিনি, এমন চাহনি চোখেমুখে। এই কক্ষের ঠিক পাশে আর একটি অতি ছোট কক্ষ, যেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে আইনস্টাইনের স্ত্রী এবং সন্তানদের পোশাক। হয়তো তা ১০০ বছর আগের নয়, কিন্তু সেই আদলে তৈরি করা। প্রায় সব পোশাকের রং শুভ্র।

default-image

বাড়ির দোতলায় উঠতেই দেখি ফিল্ম প্রদর্শনের ব্যবস্থা। কেবল আইনস্টাইনের আবিষ্কার সম্পর্কিত নয়, বরং সে সময়ের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়াও, যা আইনস্টাইনকে প্রভাবিত করেছে বা আইনস্টাইনের আবিষ্কার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, সে সম্পর্কিত ছবিও প্রদর্শিত হয়। ঝটপট একটা ফিল্মও দেখে নিলাম। আলবার্ট আইনস্টাইনের সৃষ্টি, জীবনকাল নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে এই জাদুঘরে। বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত এবং পেশাদার উভয় সম্পর্কিত প্রায় ৫৫০টি বিষয় স্থান পেয়েছে এই জাদুঘরে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব এবং আবিষ্কারগুলোকে অ্যানিমেটেড ফিল্মের মাধ্যমেও দেখানোর ব্যবস্থা আছে এখানে। বৈশ্বিক ইতিহাসের এক বৃহৎ প্রেক্ষাপটকে ধরে রাখার চেষ্টা।

দুটি বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী তিনি। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতাকে আমৃত্যু ঘৃণা করেছেন এই মহান ব্যক্তি। বিশ্বপ্রকৃতির স্থান ও সময় নিয়ে গবেষণা করেছেন। থিওরি অব রিলেটিভিটির তত্ত্বটি আইনস্টাইনকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে জনপ্রিয় চরিত্রে রূপায়িত করেছে। এ যেন কালের পদার্থবিজ্ঞানের মহানায়ক। বিজ্ঞানীর কালজয়ী চিন্তাগুলোর মধ্যে ছিল সময় ও আলো, আপেক্ষিকতা, ব্ল্যাকহোল ইত্যাদি। আমার মতো অল্পস্বল্প জ্ঞানের মানুষের কাছে এ দুর্বোধ্য। আমি কেবল এই মহান বিজ্ঞানী সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন নথি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি আমার কৈশোরে বারবার। তিনি বলতেন, ‘এই যে চোখের সামনে আমরা বস্তুর গতি ও শক্তি, সময় এবং স্থানকে দেখছি, কোনোটাই অপরিবর্তনীয় নয়, কোনোটাই ধ্রুব নয়, সবই আপেক্ষিক।’

default-image

আইনস্টাইন তাঁর তত্ত্বকে খুব সহজ করে বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, আলোর চেয়ে বেশি গতিতে আর কেউ ছোটে না পৃথিবীতে। এটিই ওনার আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মূলমন্ত্র। আরও সহজ করে বোঝাতে গিয়ে উনি রসিকতার আশ্রয় নিতেন। তিনি বলতেন, ‘তুমি যদি আগুনের পাশে এক মিনিট বসো, তাহলে মনে হবে এক ঘণ্টা ধরে বসে আছ, আর যদি সুন্দরী মেয়ের পাশে এক ঘণ্টা বসো, তাহলে মনে হবে মাত্র এক মিনিট ধরে বসে আছ। বাস্তবে এটাই আপেক্ষিকতা।’

default-image

একসময় জাদুঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। এবার আমরা যাব সুইস সংসদের দিকে। প্রাণে আইনস্টাইন, সম্মুখে সুইস সংসদ। আমরা হাঁটছি সংসদ অভিমুখে।

লেখক: গবেষক ও পরিব্রাজক এবং সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন