করোনাকালে বরেণ্য মানুষদের দেশে

পরের দিন অর্থাৎ শনিবার সকালে বেরিয়ে পড়ি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন নগরী এথেন্স ঘুরে দেখার জন্য। ফেসবুকের কল্যাণে আগে থেকেই আমার সঙ্গে গাজী সাদ্দাম ভাইয়ের পরিচয় ছিল। নোয়াখালীর মানুষ। বছর খানেক ধরে এথেন্সে আছেন

আখারনুনেই থাকেন আর চাচার ব্যবসা দেখাশোনা করেন। এথেন্সে এসেছি শুনে বারবার অনুরোধ করেন তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য। তাই আমিও যাই। কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির হয়ে যান তাঁর বন্ধু সাইফুল ইসলাম। রংপুরে বাড়ি। তিনি গ্রিসে আছেন প্রায় সতেরো বছর।

default-image

আমরা সেদিন সিনতাগমা স্কয়ারের দিকে গেলাম। এটা এথেন্সের সিটি সেন্টার। গ্রিসের ন্যাশনাল পার্লামেন্ট এখানে। এমনকি গ্রিসের জাতীয় উদ্যান থেকে শুরু করে জিউসের মন্দিরসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানের অবস্থান এই সিনতাগমা স্কয়ারের আশপাশে। সিনতাগমা স্কয়ারের মূল ভবনটি একসময় আধুনিক গ্রিক সাম্রাজ্যের রাজপ্রাসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এ রাজপ্রাসাদের সামনে গ্রিসের ইতিহাসে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতদের স্মরণে একটি প্রতিমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অলিম্পিয়ান জিউস মন্দিরটি জিউসের কলাম হিসেবেও পরিচিত। প্রাচীন গ্রিক পুরাণে উল্লেখিত সব দেব-দেবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন জিউস। তাঁর স্মরণে এটি নির্মিত। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এ সময় থেকে শুরু করে ৬৩৮ বছরেও পরিপূর্ণভাবে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৬ সালে রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে গ্রিস। রোমান সম্রাট হাদ্রিয়ানের শাসনামলে এ মন্দিরকে পরিপূর্ণ রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। রোমান শাসনামলে প্রায় ১৪০টি সুউচ্চ কলামবিশিষ্ট এক সুবিশাল মন্দির হিসেবে এ স্থাপনাকে গড়ে তোলা হয়। সে সময় গ্রিসের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বড় মন্দির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব কলামের অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল বিভিন্ন সময়ের বহিঃশত্রুর আক্রমণ। বর্তমানে তাই কেবল ১৫টি কলামের দেখা মেলে। আরও একটি কলাম মাটিতে পড়ে ভূমি স্পর্শ করে রয়েছে। মূলত ১৮৫২ সালে এক ঝড়ের কবলে পড়ে কলামটি ভেঙে মাটিতে পড়ে যায়।

default-image

বিকেলের দিকে জুয়েল মামা আমাদেরকে পিরাউসে নিয়ে যান। পিরাউস মূলত এথেন্সের নিকটবর্তী সামুদ্রিক এলাকাগুলোর একটি। ছুটির দিন হওয়ায় বিকেলের দিকে সেখানে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রিকরা তাদের জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসে, ছুটির দিনগুলোতে দেশটির তরুণ প্রজন্মের অনেকে পার্টিতে মেতে ওঠে। আর পার্টি কিংবা যেকোনো উৎসব আয়োজনের জন্য এ রকম এলাকার জুড়ি নেই। আমাদেরকে গাড়ি পার্ক করার জন্য ফাঁকা জায়গা পেতে এক ঘণ্টার মতো ছোটাছুটি করতে হয়েছিল, করোনার প্রভাবে অন্যান্য জায়গায় তেমন মানুষের সমাগম চোখে না পড়লেও এই এলাকা ছিল একেবারে ব্যতিক্রম। আশপাশের রেস্টুরেন্টগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কেউ এসেছে বান্ধবীকে নিয়ে, কেউবা বন্ধুদের নিয়ে, কেউবা আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। সামুদ্রিক মাছের গ্রিল ও ওয়াইনের গন্ধে আশপাশের রেস্টুরেন্টগুলো ম–ম করছে।

পিরাউস এথেন্সের অন্যতম প্রসিদ্ধ পোতাশ্রয়। তাই পুরো এলাকায় যে দিকে চোখ যায়, সেদিকে জাহাজ, রিভার ক্রুজ কিংবা মাছ ধরার নৌকা ছাড়া আর কিছু চোখে পড়বে না। কিছু কিছু রিভার ক্রুজ আছে যেগুলো কেবল শৌখিন মানুষদের জন্য। যাঁরা বিত্তবান তাঁদের অনেকে এসব রিভার ক্রুজে রাত কাটাতে সেখানে একত্র হন। কোনো কোনো রিভার ক্রুজে বিভিন্ন গ্রিক আইল্যান্ডে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে সে জন্য পয়সা খরচ করতে হবে বেশ। সান্তোরিনি, মিকোনোস, করফুসহ বিভিন্ন দ্বীপে যাওয়ার জন্য পিরাউস থেকে ফেরি ছাড়ে।

default-image

রাতের বেলা জুয়েল মামা আমাদের নিয়ে গেলেন মাউন্ট লিকাবেটোস। মাউন্ট লিকাবেটোস এথেন্সের সবচেয়ে উঁচু জায়গা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চুনাপাথরের এ পাহাড়ের ওপর থেকে পুরো এথেন্সকে অবলোকন করা যায়। কারও যদি টেলিফেরিক কিংবা কেব্‌ল কারের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা থাকে, তাহলে মাউন্ট লিকাবেটোস হতে পারে একটি আদর্শ জায়গা। পাহাড়ের সর্বোচ্চ পয়েন্টে সাদা রঙের একটি অর্থোডক্স চার্চ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে আরও একটি রেস্টুরেন্ট।

জুয়েল মামার মতে, দিনের তুলনায় রাতের বেলায় মাউন্ট লিকাবেটোস পরিভ্রমণ করা অধিকতর প্রশান্তির। এ সময় থাকে না রৌদ্রের উত্তাপ, রাতের মেঘমন্দ্র বাতাসে কৃত্রিম আলোয় উদ্ভাসিত এথেন্সের চারদিকের দৃশ্য আপনি অবলোকন করতে পারবেন। তখন অন্য রকম এক পরিতৃপ্তিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাইবেন। এ রকম সুখকর অনুভূতি হয়তোবা জীবনে সচরাচর পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

পরদিন সকালে আবার গেলাম আখারনুনে। জুয়েল মামা সেদিন ব্যস্ততার কারণে প্রথম দিকে আমাদের সময় দিতে পারেননি। তাই সাইফুল ভাই আর গাজী সাদ্দাম ভাইকে নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। অনেক দিন ধরেই আমারও ইচ্ছা ছিল অলিম্পিক স্টেডিয়ামটি দেখার।

default-image

অলিম্পিক স্টেডিয়ামটি গ্রিসের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শ্বেতহস্তীর একটি। এথেন্সের উপকণ্ঠে অবস্থিত মারুসিতে ১৯৮২ সালে এথেন্সে আয়োজিত ইউরোপিয়ান অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্ট ঘিরে এ স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৮৯৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম আধুনিক অলিম্পিক টুর্নামেন্টের ম্যারাথন গোল্ড মেডেলিস্ট স্পাইরোস লুইসের নাম অনুসারে স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৮৩ সালের ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালসহ ১৯৯৪ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল ম্যাচটিও আয়োজিত হয়েছিল এ স্টেডিয়ামে।

বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক কিংবা জাতীয় পর্যায়ের অনেক ইভেন্টের আয়োজন করা হয় এ স্টেডিয়ামে। এমনকি গ্রিসের ঘরোয়া ফুটবলের অন্যতম প্রধান দুটি দল এইকে এথেন্স এবং প্যানাথিনাইকোস তাদের হোম গ্রাউন্ড হিসেবে এ স্টেডিয়াম ব্যবহার করে।
২০০৪ সালে এথেন্স অলিম্পিকের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই স্টেডিয়াম এবং এই অলিম্পিক টুর্নামেন্ট ঘিরে স্টেডিয়ামটির ব্যাপক সংস্কার করা হয়। অলিম্পিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে গ্রিসের পুরো অবকাঠামো ঢেলে সাজানো হয়। এরই প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করা হয় এথেন্সের বর্তমান এয়ারপোর্টটি। পাশাপাশি নতুন করে অসংখ্য রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয় এবং এথেন্সে মেট্রো পরিষেবারও উদ্বোধন করা হয়েছিল।

অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, গ্রিসের অর্থনীতির এ দুর্দশার অন্যতম কারণ হচ্ছে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া ২০০৪ সালে অলিম্পিক আয়োজনের মতো একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া। অলিম্পিক উৎসব ঘিরে গ্রিসে যেসব অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল, নতুন করে অলিম্পিক টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক অবকাঠামো সেভাবে কাজে আসেনি; বরং সেগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে গ্রিস সরকারকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এমনকি এই স্টেডিয়াম বছরের নির্দিষ্ট দিন ছাড়া তেমন ব্যবহৃত হয় না বললেই চলে।

default-image

অলিম্পিক স্টেডিয়ামের পরিদর্শন শেষে আমদের গন্তব্য হয় অ্যাক্রোপোলিস।
বলা হয়ে থাকে, যেসব পর্যটক গ্রিস ভ্রমণে আসেন, তাঁদের কেউই অন্ততপক্ষে অ্যাক্রোপোলিস না ঘুরে গ্রিস ত্যাগ করেন না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাচীন এক সভ্যতার ধারক ও বাহক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই অ্যাক্রোপোলিস। এখানকার প্রতিটি বালুকণা যেনও সেই কয়েক হাজার বছর আগের ইতিহাসেরই সাক্ষী। আজকের দিনের গোটা পশ্চিমা বিশ্ব যেনও সে ইতিহাসের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে।

অ্যাক্রোপোলিস হচ্ছে মূলত একটি সিটাডেল বা দুর্গ, যা একটি পাথরের টিলার ওপর অবস্থিত। ‘অ্যাক্রোপোলিস’ শব্দটি মূলত প্রাচীন গ্রিক শব্দ অ্যাক্রোন এবং পোলিস এ দুটি শব্দের সমন্বয়, যার বাংলা অর্থ যথাক্রমে সর্বোচ্চ বিন্দু ও শহর। গ্রিসে এ রকম অনেক অ্যাক্রোপোলিসের অস্তিত্ব থাকলেও এথেন্সের এই অ্যাক্রোপোলিস অন্য সব অ্যাক্রোপোলিসের থেকে আলাদা। আক্রোপোলিস মূলত প্রাচীন কিছু স্থাপত্যকর্ম এবং ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বেশ কিছু ভবনের ধ্বংসাবশেষের জন্য প্রসিদ্ধ। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শনটির নাম পার্থেনন। গ্রিক পুরাণ অনুসারে এ স্থানের নাম সেক্রোপিয়া। গ্রিক পুরাণে উল্লেখিত কিংবদন্তি সেক্রোপসের নাম অনুসারে এ স্থানের নাম রাখা হয় সেক্রোপিয়া। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী সেক্রোপসের হাত ধরে এথেন্সসহ গোটা গ্রিক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। সেক্রোপসের শরীরের অর্ধেকটা ছিল মানুষের মতো এবং বাকি অর্ধেক ছিল সাপের মতো।

default-image

বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ থেকে এ স্থানে মানুষের বসবাস ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে স্থানীয় শাসক পেরিক্সের হাত ধরে পার্থেননসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়। একজন সুবক্তা এবং একই সঙ্গে একজন সেনাপতি হিসেবে সে সময় পেরিক্সের সুনাম ছিল সর্বজনবিদিত। পার্থেনন মূলত গ্রিক দেবী এথেনার স্মরণে নির্মিত একটি মন্দিরের স্থাপনা। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী এথেনা হচ্ছেন জ্ঞানের দেবী। বাইজেনটাইন শাসন আমলে পার্থেননকে ভার্জিন মেরির চার্চে রূপান্তর করা হয়। এরপর অটোমান শাসনাধীন গ্রিসে পার্থেননকে ব্যবহার করা হতো সেনাদের সদর দপ্তর হিসেবে। বর্তমানে গোটা অ্যাক্রোপোলিস অঞ্চলে ১৪টির মতো স্থাপনার অবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। পার্থেনন ছাড়া উল্লেখ করার মতো অন্যান্য স্থাপনার মধ্যে রয়েছে এথেন্সের প্রাচীন মন্দির, ইরেসিথেয়াম, প্রপিলাইয়া, ইলিউসিনিউন ইত্যাদি। এসব স্থাপনার বেশির ভাগই নির্মিত হয়েছিল মন্দির হিসেবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0