করোনাকালে বরেণ্য মানুষদের দেশে

তবে একটা কারণে গ্রিস ইউরোপের অন্য সব দেশের চেয়ে আলাদা।

আমাদের দেশের শহরগুলোতে রাস্তার দুই ধারে যেমন ঘন ঘন দোকানের দেখা মেলে, গ্রিসেও দেখলাম অনেকটা তেমন। বিশেষ করে এথেন্স আর থেসালুনিকি—এ দুটি শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবস্থায় প্রচুর খাবারের দোকানের দেখা মেলে। গ্রিসের রন্ধনশৈলীর কদর বিশ্বব্যাপী। ইয়োগার্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের চিজ বা পনির, অলিভ অয়েল, সালাদ, বিভিন্ন ধরনের সসেজ, বাকলাভাসহ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিজাতীয় খাবারের জন্য গ্রিস বিখ্যাত। গ্রিসের জনপ্রিয় দুটি খাবারের আইটেমের মধ্যে রয়েছে গিরোস ও সুভ্লাকি।

বিজ্ঞাপন

গাইরোর সঙ্গে আমাদের দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড আইটেম শর্মার কিছুটা মিল পাওয়া যায়। অনেকটা শর্মার আদলে গাইরোতে ব্যবহৃত মাংসের প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তবে আমাদের পরিচিত রুটির পরিবর্তে পিটা নামক এক বিশেষ ধরনের রুটি এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও বিভিন্ন ধরনের সালাদ এবং একধরনের বিশেষ সসসহযোগে তৈরি হয় গাইরো। প্রতিটি কামড়ে হারিয়ে যেতে চাইবেন। কোনো কারণে গ্রিসে বেড়াতে গেলে অবশ্যই গাইরো ও সুভ্লাকির স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করবেন। এ ছাড়া সামুদ্রিক মাছ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবারের জন্যও গ্রিসের খ্যাতি দুনিয়াজুড়ে।

default-image

এ ছাড়া গ্রিসের আবহাওয়া অনেকটা উপভোগ করার মতো। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় গ্রীষ্মকাল কিংবা শীতকালের কোনোটি সেখানে খুব বেশি একটা চরমভাবাপন্ন নয়। গ্রীষ্মকালে তেমন একটা বৃষ্টিপাত না হলেও শীতকালে হরহামেশাই বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। গ্রিসের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র তুরস্কের বৈরিতার অন্যতম কারণ হচ্ছে এ দুই দেশের খাবার। দীর্ঘদিন তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার কারণে গ্রিস ও তুরস্ক—এ দুই দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। আবার বর্তমান তুরস্কের অনেক অংশ ছিলও প্রাচীন গ্রিক সাম্রাজ্যের অধীনে।

বুকিং ডটকম ব্যবহার করে থেসালুনিকিতে এক রাত থাকার জন্য হোটেল বুক দিয়ে রেখেছিলাম আগেভাগেই। এক রাতের জন্য ভাড়া পড়েছিল ৫৯ ইউরোর মতো। থেসালুনিকির সেন্টারের কাছে হওয়ায় প্রয়োজনীয় সবকিছু ছিল হাতের নাগালে। চেক ইন করার পরপর আমার পিঠের ব্যাগটা রেখে একটু ফ্রেশ হয়েই হোটেলের পাশের এক রেস্টুরেন্ট থেকে সুভ্লাকি দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। দাম মাত্র ৩.৮০ ইউরো। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় গ্রিসে খাবারের খরচ তুলনামূলক কম। যেহেতু গ্রিসে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সবাইকে এক দিনের কোয়ারেন্টিনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, তাই সেদিন আর কোথাও বের হলাম না।

পরদিন তাই সময় নষ্ট না করে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। এরপর গোসল সেরে হোটেলের রুমে বসে সময় অতিবাহিত করতে থাকলাম। করোনার কারণে এ বছর গ্রিসে বাইরের দেশগুলো থেকে খুব একটা পর্যটক আসতে পারেননি। ফলে হোটেলগুলোতে বলতে গেলে পর্যটকের উপস্থিতি তেমনটা চোখে পড়েনি। হোটেলের পক্ষ থেকে সকালের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চটজলদি সকালের খাবার শেষ করে একেবারে চেক আউট করে হোটেলের রিসিপশন থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পুরো শহরটা দেখার জন্য।

বিজ্ঞাপন

এ পর্যায়ে এসে খানিকটা বিরক্তি লাগছিল। একা একা ঘুরতে জন্য মন সায় দিচ্ছিল না। অল্প একটু হাঁটার পর হঠাৎ যেন পরিচিত একটা আওয়াজ ভেসে এল। মনে হচ্ছিল কেউ যেন নিজের চিরচেনা ভাষায় কথা বলছে। এ সময় মনে খানিকটা আশার সঞ্চার হলো। অবশেষে সাহস করে এগিয়ে গেলাম এ আওয়াজের সন্ধানে। নিজ দেশের একজনকে শেষ পর্যন্ত পেয়েও গেলাম। তাঁর নাম মনিউর রহমান সুমন। তিনি সিলেটের অধিবাসী, তবে প্রায় ১৩ বছর ধরে তিনি থেসালুনিকিতে বসবাস করছেন। তিনি আমাকে সময় দিলেন এবং তাঁর সঙ্গে মূলত আমি থেসালুনিকি ঘুরে দেখলাম। মানুষটির আন্তরিকতা আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে।

default-image

থেসালুনিকি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি বিরোধপূর্ণ শহর। যদিও ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত লুজার্ন চুক্তির ফলে থেসালুনিকিসহ সমগ্র পশ্চিম থ্রেসের ওপর গ্রিসের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আদতে শহরটি এখনো গ্রিস, তুরস্ক, মেসিডোনিয়া ও বুলগেরিয়ার বিবাদের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে অবশ্য বুলগেরিয়া গ্রিসের সঙ্গে তাদের বিবাদ অনেকটা মিটিয়ে ফেলেছে। গ্রিসের মতো বুলগেরিয়াও বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের জনক মোস্তফা কামালের জন্ম এ থেসালুনিকি শহরে।

এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের প্রায় সংগমস্থলে অবস্থিত এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নাম থ্রেস। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত এ অঞ্চলের উত্তরে রয়েছে বলকান পর্বতমালা, দক্ষিণে রয়েছে ইজিয়ান সাগর এবং পূর্ব দিক বরাবর রয়েছে ব্ল্যাক সি বা কৃষ্ণসাগর। ১৩৫২ সালে সমগ্র থ্রেসের ওপর তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে অটোমান সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। বিশেষ করে এ সময়কার অটোমান সুলতানদের মধ্যে সঠিক নেতৃত্বের অভাবের কারণে একে একে অনেক অঞ্চল তাদের অধিকার থেকে আলাদা হয়ে যায়। থ্রেস এ সময়ে এসে বুলগেরিয়া ও গ্রিসের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। তুরস্কের স্বাধীনতাযুদ্ধে আনাতোলিয়ার পর তুর্কিরা মনোযোগ দেয় থ্রেসের ওপর পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য।

এদিরনেসহ সমগ্র পূর্ব থ্রেসের ওপর পুনরায় তুরস্কের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলেও পশ্চিম থ্রেসের মালিকানা থেকে যায় গ্রিসের হাতে। আর উত্তর থ্রেস বর্তমানে বুলগেরিয়ার মানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে গ্রিসের অন্তর্গত একটি প্রদেশ হচ্ছে ম্যাকাডোনিয়া। ইংরেজিতে বলা হয় মেসিডোনিয়া। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের জন্মস্থান ম্যাকাডোনিয়ায়। ম্যাকাডোনিয়া বা মেসিডোনিয়া নামে একটি রাষ্ট্র রয়েছে, যেটি গ্রিসের উত্তরে অবস্থিত। মেসিডোনিয়া একসময় লিবারেল কমিউনিজমের ভিত্তিভূমি হিসেবে পরিচিত যুগোস্লাভিয়ার অংশ ছিল।

১৯৯২ সালে মেসিডোনিয়া এক গণভোটের মধ্য দিয়ে যুগোস্লাভিয়ার ফেডারেশন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। ‘মেসিডোনিয়া’ নামটির প্রতি সব সময় গ্রিকরা আপত্তি জানিয়ে এসেছিল। গ্রিকদের দাবি হচ্ছে, ঐতিহাসিকভাবে সমগ্র মেসিডোনিয়া হচ্ছে গ্রিসের অংশ, অন্যদিকে মেসিডোনিয়ার অধিবাসীরা মনে করে, গ্রিসের অধীনে মেসিডোনিয়া নামের যে অংশটি রয়েছে, সেটিও তাদের অংশ। মেসিডোনিয়ার অনেক মানুষ বিশ্বাস করে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট আদতে কোনো গ্রিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মেসিডোনিয়ান স্লাভিক। এমনকি মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কুপিয়েতে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের স্মরণে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। মেসিডোনিয়া নামটি নিয়ে গ্রিস ও মেসিডোনিয়া—এ দুই দেশ অনেকবার বাগবিতণ্ডায় জড়িয়েছে। সম্প্রতি ২০১৮ সালে গ্রিসের চাপে অবশ্য মেসিডোনিয়া বাধ্য হয়ে তার নাম পরিবর্তন করে উত্তর মেসিডোনিয়া রেখেছে।

গ্রিসের অধীন মেসিডোনিয়া নামের প্রদেশটির রাজধানী এ থেসালুনিকি। এমনকি পশ্চিম থ্রেসসহ গোটা গ্রিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক শহর হচ্ছে থেসালুনিকি। ইজিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত এ শহর গ্রিসের অন্যতম প্রধান বন্দরনগরী এবং রাজধানী এথেন্সের পর এটি দেশটির বৃহত্তম নগরী।

থেসালুনিকি একসময় ইউরোপের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল। গ্রিক, তুর্কি ও বুলগেরিয়ান—তিনটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের পদচারণে মুখর থাকত এ শহর। পাশাপাশি আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত অনেক মানুষও এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। শহরটির অধিবাসীরা অর্থোডক্স খ্রিষ্টান, ইসলাম ও ইহুদি—এ তিন ভিন্ন ধর্মে বিভক্ত ছিল। একসঙ্গে এতগুলো ভিন্ন জাতি ও ভিন্নধর্মালম্বী মানুষের সহাবস্থান সে সময় ইউরোপে খুব কম শহরে দেখা যেত।

default-image

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত লুজার্ন চুক্তির ফলে থেসালুনিকিসহ গোটা পশ্চিম থ্রেসের ওপর গ্রিসের একক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় থেসালুনিকিসহ গোটা গ্রিসে বসবাস করা ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের তুরস্কে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এসব ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে যেমন তুর্কি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ছিল, ঠিক তেমনি অনেক গ্রিক ও বুলগেরিয়ান মুসলিমকে এ অঞ্চল ছেড়ে তুরস্কে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। তবে উত্তর-পূর্ব গ্রিস, বিশেষ করে তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে এখনো ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস রয়েছে, যারা গ্রিসের মোট জনসংখ্যার ১.২ শতাংশ। এদের অনেকে আবার জাতিগতভাবে তুর্কি। অন্যদিকে সে সময় তুরস্কে বসবাস করা অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের বেশির ভাগই চলে আসে গ্রিসে।

বিজ্ঞাপন

এমনকি একসময় থেসালুনিকিসহ গোটা পশ্চিম থ্রেসে যেসব ইহুদির বসবাস ছিল, তাদের লুজার্ন চুক্তির পর গ্রিস ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। আর বুলগেরিয়ান জাতিগোষ্ঠীর যেসব মানুষের বসবাস ছিল এ অঞ্চলে, তারাও গ্রিস ছেড়ে বুলগেরিয়াতে পাড়ি জমায়। কথিত আছে, লুজার্ন চুক্তির পর গ্রিক ছাড়া অন্য জাতিগোষ্ঠীর যেসব মানুষ এখানে থেকে গিয়েছিল, তাদের সবাইকে সে সময়কার গ্রিক সরকার তাদের পরিচয় পরিবর্তনে বাধ্য করেছিল। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চায় নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়। এমনকি তাদের মধ্যে যারা অন্য ধর্মাবলম্বী ছিল, তাদের সবাইকে বলপূর্বক অর্থোডক্স খ্রিষ্টানে দীক্ষিত করা হয়। যদিও এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা কঠিন।

থেসালুনিকির সিটি সেন্টারের মূল চত্বরভূমিটি ‘অ্যারিস্টটেলাস স্কয়ার’ নামে পরিচিত। থেসালুনিকির অন্যান্য অংশের তুলনায় এ অংশ অপেক্ষাকৃত নতুন। পুরো শহরের মধ্যে বলতে গেলে কেবল এ অংশেই চাকচিক্যময় দালানের দেখা মেলে। ১৯১৮ সালে বিখ্যাত ফরাসি স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আর্নেস্ট হাবরার্ড এ স্কয়ারের নকশা প্রণয়ন করেন। যদিও তাঁর প্রণীত নকশা অনুযায়ী পুরো অ্যারিস্টটেলাস স্কয়ারকে আজকের রূপ দিতে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ১৯১৭ সালের দিকে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে এ শহর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৩২ ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী হওয়া এ অগ্নিকাণ্ডের ফলে সাড়ে ৯ হাজারের মতো ঘরবাড়ি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। থেসালুনিকির বসবাসরত ইহুদিদের একটা বড় অংশের স্থানচ্যুতির কারণ হিসেবে এ ঘটনাকে দায়ী করা হয়।

১৯১৭ সালের এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সে সময়কার গ্রিস সরকার থেসালুনিকিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ডাক পড়ে আর্নেস্ট হাবরার্ডের। ২০০০ সালের পর আরও একবার অ্যারিস্টটেলাস স্কয়ারকে সংস্কার করা হয়। একটু আগে বলেছি যে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর তুলনায় গ্রিস এবং বলকান অঞ্চলে যেসব দেশ রয়েছে, সেগুলো অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেকটা রুগ্ণ প্রকৃতির। থেসালুনিকিও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই পুরো শহরটি একবার ঘুরে আসার পর যখন কেউ এ অ্যারিস্টটেলাস স্কয়ারে এসে দাঁড়াবে, তখন তার কাছে হয়তোবা মনে হবে আশপাশের সমগ্র শহরতলি থেকে জোঁকের মতো রক্ত শোষণ করে এ অংশ ফুলেফেঁপে এ রকম জৌলুশ অর্জন করেছে।

default-image

অ্যারিস্টটেলাস স্কয়ার থেকে উত্তর-পশ্চিম বরাবর ইজিয়ান সাগরের তীর ঘেঁষে কয়েক শ মিটার হাঁটার পর চোখে পড়বে হোয়াইট টাওয়ার। এ টাওয়ার থেসালুনিকির ল্যান্ডমার্ক হিসেবে পরিচিত। বাইজেনটাইন শাসনামলে এ টাওয়ারের স্থানটিতে একটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়। মূলত সে সময় স্থানীয়ভাবে প্রতিরক্ষার কাজে এ দুর্গ ব্যবহার করা হতো। ১৪৩০ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের নেতৃত্বে অটোমানরা থেসালুনিকি জয় করে। অটোমান শাসনামলে এ দুর্গকে কিছুটা সংস্কার করে লাল রঙের একটি টাওয়ারের আকৃতি দেওয়া হয়। অটোমান শাসনামলে মূলত কারাগার হিসেবে এ টাওয়ার ব্যবহার করা হতো। সে সময় মৃত্যুদণ্ডের সাজা পাওয়া অনেক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো এ টাওয়ারে।

১৯১২ সালে প্রথম বলকান যুদ্ধের পর টাওয়ারটি লাল থেকে পরিবর্তন করে সাদা করা হয়। তখন থেকেই টাওয়ারটি হোয়াইট টাওয়ার নামে পরিচিত। বর্তমানে এ হোয়াইট টাওয়ার একটি মিউজিয়াম এবং একই সঙ্গে আর্ট গ্যালারি। সাধারণত এ টাওয়ারের ভেতরে প্রবেশ করতে ছয় ইউরো প্রয়োজন হয়। হোয়াইট টাওয়ার থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক বরাবর কয়েক গজ হাঁটলে চোখে পড়বে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য। গ্রিস থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিম ভারত, এমনকি উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।

default-image

থেসালুনিকির আরও একটি পর্যটন নিদর্শন হচ্ছে রটোন্ডা। রটোন্ডা হচ্ছে একধরনের বেলনাকৃতি স্থাপনা, যেটি আনুমানিক ৩০৬ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল। এটি মূলত একটি রোমান স্থাপনা। প্রথমে সমাধি হিসেবে এ স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে এ স্থাপনা ব্যবহার করা হতো। পরবর্তী সময়ে বাইজেনটাইন সম্রাট প্রথম কনস্টান্টিন একে অর্থোডক্স চার্চে রূপান্তর করে। রটোন্ডা থেকে সিটি সেন্টার বরাবর দেড়-দু মিনিট হাঁটার পর ডান দিকে লক্ষ করলে চোখের সামনে একটি তোরণ ভেসে উঠবে। এ তোরণ ‘আর্ক অব গ্যালারিয়াস’ নামে পরিচিত। মূলত চতুর্থ শতাব্দীতে যখন থেসালুনিকি রোমানদের অধীনে আসে, তখন তারা তাদের এ বিজয়কে স্মরণ করতে এ তোরণ নির্মাণ করে। যেহেতু থেসালুনিকি একসময় রোমান শাসনের অধীনে ছিল, তাই শহরটির বিভিন্ন স্থানে রোমান শাসনামলের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।

default-image

থেসালুনিকির যে বাসভবনে মোস্তফা কামালের জন্ম হয়েছিল, সেটি বর্তমানে তুরস্কের কনস্যুলেট ভবন এবং একই সঙ্গে একটি জাদুঘর। আমরা চেষ্টা করেছিলাম সে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে এবং এ মুহূর্তে যেহেতু গ্রিসের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনা চলছে, তাই আমাদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পুরো ভবনের সামনে সব সময় স্পেশাল পুলিশ ফোর্স পাহারায় থাকে। এ ছাড়া থেসালুনিকির অন্যান্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে জিউস মিউজিয়াম ও বাইজেনটাইন মিউজিয়ামসহ বেশ কিছু জাদুঘর ও অর্থোডক্স গির্জা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিসা, স্লোভেনিয়া।

মন্তব্য পড়ুন 0