করোনাকালে বরেণ্য মানুষদের দেশে

অ্যাক্রোপোলিসের ভেতরে প্রবেশ করতে ২০ ইউরো দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়, তবে বিশেষ কিছুদিনে কোনো ধরনের টিকিট ছাড়া অ্যাক্রোপোলিসের ভেতর যাওয়া যায়। আমরা যেদিন অ্যাক্রোপোলিস পরিদর্শনে গিয়েছিলাম সেদিন ছিল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ডে; এ কারণে আমরা কোনো টিকিট ছাড়া অ্যাক্রোপোলিস ভ্রমণের সুযোগ লাভ করি।

default-image

অ্যাক্রোপোলিস থেকে আমরা আবার ফিরে যাই সিনতাগমা স্কয়ারের দিকে। জুয়েল মামা আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন। আমাদের পরবর্তী এবং শেষ গন্তব্য ছিল প্যানাথেনাইকো স্টেডিয়াম। মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম অলিম্পিক আয়োজিত হয়েছিল এথেন্সে, আজ থেকে আনুমানিক তিন হাজার বছর আগে। খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু করে চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পশ্চিম পেলোপোনিস উপদ্বীপে এ অলিম্পিকের আয়োজন করা হতো। মূলত সে সময় অলিম্পিক উৎসব ছিল গ্রিক দেবতা জিউসকে সন্তুষ্টির একটি মাধ্যম।

default-image

ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক যে স্টেডিয়ামে আয়োজিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় তার নাম হচ্ছে প্যানাথেনাইকো স্টেডিয়াম। ১৮৯৬ সালের প্রথম আধুনিক অলিম্পিকের যাত্রাও এখান থেকে শুরু, আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য ছিল এ স্টেডিয়াম। আসলে কিছু কিছু বিশেষ স্থান আছে যেখানে মানুষ যায় মূলত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শিকড়ের সন্ধানে। প্যানাথেনাইকো স্টেডিয়ামটিও সে রকম, স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে পাঁচ ইউরো দিয়ে টিকিট কিনতে হয়, তবে শিক্ষার্থী বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থীর বয়স ২৫ বছরের নিচে, তারা অর্ধেক দামে সেখানে প্রবেশ করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

স্টেডিয়ামের ভেতরে একটি ছোট গ্যালারি রয়েছে যেখানে বিগত বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত অলিম্পিক টুর্নামেন্ট চলাকালীন ধারণ করা কিছু ছবির সংগ্রহ রয়েছে। প্যানাথেনাইকো স্টেডিয়ামটি মার্বেল পাথরে নির্মিত। একটু একটু করে স্টেডিয়ামের ভেতরের দিকে হেঁটে যাবেন আর আপনার কাছে মনে হবে যেন অতীতের কোনো একদিনে আপনি চলে যাচ্ছেন, হয়তো-বা গ্ল্যাডিয়েটর কিংবা ট্রয়ের মতো বিখ্যাত সিনেমাগুলোর দৃশ্যপট আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকবে।

default-image

স্টেডিয়ামটি পরিদর্শন শেষে সাদ্দাম ভাইয়ের অনুরোধে আমরা আবার যাই আখরানুনে; সেখানে এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে সবাই মিলে একসঙ্গে লাঞ্চ করি। এরপর বিদায়ের পালা; সাদ্দাম ও সাইফুল ভাইয়ের আন্তরিকতা আমাকে এতটা মুগ্ধ করেছিল যে তাঁদের বিদায় জানাতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল। বারবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সে বিখ্যাত কবিতার বিখ্যাত চরণের কথা মনে আসছিল:
‘যেতে নাহি দিব। হায়, তবু যেতে দিতে হয়,
তবু চলে যায়।।’

ওদের বিদায় দিয়ে জুয়েল মামার সঙ্গে তাঁর বাসার পথ ধরি। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এরপর এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দেওয়ার পালা। রাত সাড়ে আটটার দিকে মামা আমাকে তাঁর নিজের গাড়িতে করে সিনতাগমা স্কয়ারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন। সিনতাগমা স্কয়ার থেকে এথেন্স এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর জন্য সরাসরি বাস রয়েছে। প্রতি ৪০ মিনিট অন্তর বাস ছেড়ে যায়। বাসে সিনতাগমা স্কয়ার থেকে এয়ারপোর্ট যেতে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে। ভাড়া সাড়ে ৫ ইউরোর মতো।

এথেন্সের এয়ারপোর্ট নিঃসন্দেহে এ ইউরোপের অন্য সব এয়ারপোর্টের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার দাবি রাখে। ২০০৪ সালের এথেন্স অলিম্পিকের জন্য এ এয়ারপোর্টের নির্মাণ। করোনা পরিস্থিতিতে পুরো এয়ারপোর্ট যেন ছিল এক বিরানভূমি। মানুষের পদচারণ ছিল না বললেই চলে। হয়তো-বা মনে হবে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি এসে সমগ্র এয়ারপোর্ট থেকে সব মানুষকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে।

default-image

এয়ারপোর্টের যাত্রীদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য এখানেও দেখলাম বসার সিটগুলো মার্ক করা হয়েছে। থেসালুনিকি থেকে এথেন্সে যাওয়ার সময় যেভাবে আমাদের ট্রেনে আসন বিন্যাস করা হয়েছিল, এয়ারপোর্টেও দেখলাম অনুরূপভাবে যাত্রীদের বসার আসনের বিন্যাস করা হয়েছে।

তবে গ্রিসে যে বর্তমানে বর্ণবাদ সমস্যা অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করছে, সেটা বুঝতে বেশি সময় লাগল না। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যখন ফ্লাইটে ওঠার জন্য নির্ধারিত গেটের সামনে এসে বসি, আচমকা পুলিশের দুজন অফিসার এসে আমার পাসপোর্ট, রেসিডেন্ট পারমিট এবং ফ্লাইটের টিকিট দেখতে চান। আমি যথারীতি তাঁদের আমার পাসপোর্ট, রেসিডেন্ট পারমিট এবং ফ্লাইটের টিকিট দেখাই। এরপর আমি এবং আমার আশপাশের আরও কিছু যাত্রী, যাঁদের কেউ ইউরোপিয়ানদের মতো দেখতে সাদা নন, আমাদের সবাইকে আলাদা একটা রুমে নিয়ে যান। এক বয়স্ক পুলিশ অফিসার আমাদের সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করতে শুরু করেন যেন আমরা কোনো বন্য প্রাণী।

বিজ্ঞাপন

আমার পাশে এক ছেলে ফোনে কথা বলছিল। তাঁর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। আমাদের সবাইকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করলেন মধ্যবয়স্ক সাদা পোশাকধারী অন্য এক অফিসার। তাঁর আচরণ সত্যি আমাকে মর্মাহত করে। আমার টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট নিয়ে তিনি বারবার বলছিলেন, এটা আসল ডকুমেন্ট নয়। এমনকি আমি তাঁকে আমার ইউনিভার্সিটির কাগজও দেখালাম কিন্তু তিনি আমার কথা কানে তুলছিলেন না। এথেন্স থেকে বলোনিয়া হয়ে লুবলিয়ানা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যে টিকিট ছিল, তা দেখিয়েও তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি ছিলেন অনড়। পরে তাঁর সঙ্গে থাকা মধ্যবয়সী এক ভদ্রমহিলা আমাকে স্লোভেনিয়া সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করলেন। আমি প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন। তারপর যথারীতি আমি আমার পাসপোর্ট, টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট ও ফ্লাইটের টিকিট নিয়ে আবার গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম।

default-image

এবার আরও এক পুলিশের হাতে হেনস্তার শিকার হতে হলো। আমি এবার তাঁদের সব ঘটনা খুলে বললাম এবং তাঁদের সরাসরি বললাম যে দেশটি পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রসূতি হিসেবে বিশ্বনন্দিত এবং যে দেশে অ্যারিস্টটল, প্লেটো, সক্রেটিস, আর্কিমিডিসের মতো মানুষের জন্ম হয়েছে, সে দেশের মানুষের কাছে এ রকম আচরণ প্রত্যাশা করা যায় না।
আমার কথা শোনার পর এঁদের মধ্যে একজন অফিসার অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বললেন, সম্প্রতি তাঁদের দেশে অবৈধ অভিবাসীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে এবং এসব অবৈধ অভিবাসীর অনেকে গ্রিস থেকে ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়ার জন্য নকল পাসপোর্ট কিংবা নকল রেসিডেন্ট পারমিটের আশ্রয় নিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁরা এত নিখুঁতভাবে কোনো একটা ডকুমেন্ট তৈরি করে যেটা আসল নাকি নকল, সেটা নিরূপণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রায়ই অনেকে তাঁদের হাতে গ্রেপ্তার হন ডকুমেন্ট জালিয়াতির অভিযোগে।

যা হোক, এরপর যথারীতি নির্ধারিত সময়ের ফ্লাইটে আরোহণ করলাম। মাত্র ৯ ইউরোতে এথেন্স থেকে ইতালির বলোনিয়া। ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইট শেষে বলোনিয়াতে যখন আমাদের ফ্লাইট অবতরণ করল, তখন স্থানীয় সময় রাত প্রায় সোয়া ১২টা।

default-image

বলোনিয়ার এয়ারপোর্টটি নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত ইতালিয়ান আবিষ্কারক গুগলিয়েলমো মার্কোনির নাম অনুসারে। গুগলিয়েলমো মার্কোনি ইতিহাসের প্রথম বেতারযন্ত্রের আবিষ্কারক হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর জন্ম এ বলোনিয়াতে। বলোনিয়ার এয়ারপোর্টে আমাদের কাউকে সেভাবে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। বলোনিয়ার এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে সরাসরি ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম সেন্ট্রাল বাসস্টেশনে। সেখান থেকে রাত ২টা ৪০-এর বাসে লুবলিয়ানা, ফ্লিক্স বাসে বলোনিয়া থেকে স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানা যাওয়ার জন্য ২৫ ইউরো ভাড়া গুনতে হয়েছিল। করোনার পরিস্থিতি বিবেচনায় বাসে ওঠার আগে সব যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা শেষে ২৮ সেপ্টেম্বর লুবলিয়ানা পৌঁছাই।

স্লোভেনিয়া থেকে অস্ট্রিয়া প্রবেশের সময় বর্ডারে যেমনভাবে চেক করা হয়েছিল, ইতালি থেকে স্লোভেনিয়াতে প্রবেশের সময় তেমন একটা বর্ডার পুলিশের দেখা মেলেনি কোনো সীমান্তেই। এমনকি বর্ডারেও চেক করা হয়নি বললেই চলে।

এ ছিলও করোনাকালে আমার গ্রিস ভ্রমণের গল্প। এ রকম একটি মুহূর্তে নতুন কোনো একটি দেশ ভ্রমণ করাটা ছিল অনেক বড় একটি অর্জন। অনেক অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়েছে, পাশাপাশি নতুনভাবে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে। একই সঙ্গে এথেন্স ও অ্যাক্রোপোলিস—এ দুইটি স্থানের ওপর কোনো এক অজানা কারণে আলাদাভাবে ভালোবাসা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া গ্রিসের আরও একটি জিনিসের প্রতি আমার দুর্বলতা তৈরি হয়েছে আর সেটা হচ্ছে সুভ্লাকি, গাইরো, ইয়োগার্টসহ সেখানকার খাবার। তাই পরবর্তী সময়ে বিশ্বের যেখানে যাই না কেন, গ্রিসের প্রতি সব সময় আলাদাভাবে অন্য এক ধরনের দুর্বলতা থেকে যাবে, অবচেতন মনে তাই বারবার ইচ্ছে করবে এথেন্সে ফেলে আসা সে মুহূর্তগুলোকে পুনরায় ফিরে পেতে।

লেখক: শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0