সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের ভিড়
সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের ভিড়ছবি: প্রথম আলো

ছোবল দিয়েই চলছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। তবু স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফেরার চেষ্টা। করোনাভীতি দূর করতে তাই শরীরটাকে ঝরঝরে আর মনটাকে করা চাই উচ্ছল। কিন্তু উপায় কী? দেশের বাইরে বেড়ানোর উপায় নেই। আবার দেশের ভেতরে মনমতো জায়গায় সহজে-স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতও করা যায় না। তাই চিরচেনা জায়গাগুলোই নতুন করে বেছে নিচ্ছেন অনেক ভ্রমণপিয়াসী।

default-image

প্রথম পছন্দে সে কারণে চলে আসছে কক্সবাজার সৈকত। শীতের আমেজ শুরু হওয়ায় এই সৈকত-শহর পর্যটকদের ভিড়ে ঠাসা। দূরদূরান্ত থেকে কেউ বাসে আসছেন, কেউ আসছেন ব্যক্তিগত বাহনে, কেউবা আবার আকাশপথে আসছেন কক্সবাজার। হোটেল–মোটেলগুলোতে পর্যটকদের আসা-যাওয়া বেড়েছে, ঠিক যেন করোনা-পূর্ববর্তী সময়ের মতো।

কক্সবাজারে বেড়ানোর এমনই এক সুযোগ মেলে ২২ নভেম্বর, রোববার। কর্মব্যস্ত দিনে দুপুর সাড়ে ১২টায় ইউএস–বাংলার ফ্লাইট। ঢাকার কোলাহল ঠেলে সেদিন সকালবেলা চলে আসতে হয় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। দেড় শ যাত্রী নিয়ে সময়মতো উড়াল দেয় ইউএস–বাংলার বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ। ৪০ মিনিটে আকাশপথ পাড়ি দিয়ে উড়োজাহাজটি ছুঁয়ে ফেলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে।

বিজ্ঞাপন

আগে থেকেই ঠিক করা হোটেল ওশান প্যারাডাইসে বিমানবন্দর থেকে চলে আসি বেলা আড়াইটায়। সাজানো-গোছানো হোটেল কক্ষে নিজে পরিচ্ছন্ন হয়ে সোজা ডাইনিং হলে। প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। তবে ডাইনিং হলে ঢুকতেই নজরে আসে নানা পদের সমারোহ। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে আলুভর্তা, লইট্টা শুঁটকিভর্তা, কোরাল মাছ, মুরগির মাংস, আরও কত–কী। কবজি ডুবিয়ে মধ্যাহ্নভোজ।

default-image

ততক্ষণে সূর্যের তেজ কমে এসেছে। তাই মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। খানিকটা গুছিয়ে নিয়ে হোটেল থেকে সৈকতে চলে আসি। লাল টকটকে সূর্য নামছে পাটে। সময় গড়ায়। আস্তে আস্তে সূর্য অস্ত যায় বঙ্গোপসাগরের জলে আবির ছড়িয়ে।
দেখা মেলে খণ্ডিত চাঁদের। রাত গাঢ় হতেই ঝলমল করে তার আলোয়। রাত বাড়লেও সৈকতের পর্যটকদের ভিড় কমার লক্ষণ দেখা যায় না। ঘণ্টা কয়েক কাটিয়ে আবারও হোটেলে ফেরা। নানা পদে রাতের আহার সেরে দ্রুত বিছানায় চলে গড়িয়ে পড়ি। কারণ, পরদিন সূর্য ওঠার আগে নিজেকে জাগাতে হবে। সাগর পাড়ি দিয়ে যেতে হবে নীল জলরাশির মাঝে জেগে থাকা দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে।

ভোর পাঁচটায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়া। আধঘণ্টার মধ্যে হোটেল থেকে সোজা উত্তর নুনিয়াছটা (এয়ারপোর্ট রোড) বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে। এখান থেকেই সকাল সাতটায় পর্যটকবাহী এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস নামের জাহাজে চেপে বাঁকখালী নদীর বুক চিরে সেন্ট মার্টিনের দিকে এগোই। বিশাল জাহাজ কর্ণফুলী। কয়েক হাজার যাত্রী। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১২ নটিক্যাল মাইল গতিতে ছুটতে পারে। ৫৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১১ মিটার প্রস্থের জাহাজটিতে আছে ১৭টি ভিআইপি কেবিন ১৭টি, তিন ধরনের ৫০০টি আসন আর সি ভিউ ব্যালকনি।

default-image

কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ। জানালেন জাহাজের নাবিক মুহাম্মদ বদরুল আলম। জাহাজ চালানোর মাঝে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বয়স এখন তাঁর ৬৩। এর মধ্যে ৩৯ বছর টানা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) বিভিন্ন ধরনের নৌযান চালিয়েছেন।

বদরুল আলম বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিসির এমন কোনো জাহাজ নেই, যা আমি চালাইনি। ১৯৭৮ সালে চাকরি শুরু করি। ২০১৬ সালের শেষে অবসরে যাই। এ বছর জানুয়ারি থেকে এমভি কর্ণফুলী চালু হয়। ২১ মার্চ পর্যন্ত চালু ছিল। করোনায় লকডাউনের জন্য এরপর থেকে বন্ধ ছিল এই জাহাজ। আবার ১১ সেপ্টেম্বর থেকে চালু হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

বদরুল আলম জানান, জোয়ার-ভাটার কারণে অনেক সময় কমবেশি হয়। কিন্তু দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। আবার আবহাওয়া খারাপ থাকলেও সময় বেশি লাগে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে বিপদ তেমন হয়নি। কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস যদি জাহাজ ছাড়ার চার ঘণ্টা আগে পাওয়া যেত, তাহলে ভালো হতো। তবে শীত পড়ায় এখন লোকজন অনেক আসছে। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার যাত্রীর চাপ থাকছে।’

default-image

প্রতিদিনই এখন সেন্ট মার্টিনে আসা-যাওয়া করতে হয় বদরুল আলমকে। কিন্তু দ্বীপ ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ মেলে কম। তবে সময় মিললেই পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখার চেষ্টা করেন। বদরুল আলমের মতো ২৩ নভেম্বর আমারও সেন্ট মার্টিন ঘুরে দেখার সুযোগ তেমন মেলেনি। বেলা একটায় দ্বীপের জেটিতে নোঙর করে এমভি কর্ণফুলী। বেলা সাড়ে তিনটায় আবার ফিরতি পথে কক্সবাজার যাত্রা করতে হবে। সময় মিলল মাত্র আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু এই অল্প সময়ের স্মৃতি মনে গেঁথে থাকবে আজীবন। নীল জলরাশি। নারকেল বীথি। দ্বীপের চারপাশে অসংখ্য নৌযান। আর ঘাট থেকে দ্বীপের ভেতরে ঢোকার পথে দেখা গেল, হোটেলগুলোতে মাছ ও শুঁটকির পসরা সাজিয়ে বিক্রেতাদের হাঁকডাক। অতিথি বরণে কত না চেষ্টা তাঁদের।

কথা হলো সোহেল রানা নামে এক পর্যটকের সঙ্গে। সেন্ট মার্টিনে আসার কারণ জানতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, ‘সেন্ট মার্টিনে আগেও বহুবার এসেছি। এবারও স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে এলাম। কিন্তু এবার যেন অন্য রকম লাগছে। সবাই মনে হচ্ছে বন্দিদশা থেকে বের হয়ে একটু স্বস্তি নিতে এসেছে। আমিও করোনার কারণে ঢাকায় লকডাউনে ছিলাম। করোনা কবে যাবে জানি না। তবে কাজ তো করতে হবে। কাজের মধ্যে সুযোগ মিলতে তাই সেন্ট মার্টিনে চলে এসেছি। রাত থাকব। রাতে দ্বীপটি ঘুমিয়ে থেকেও সাগরের গর্জন শুনিয়ে আমাদের জাগিয়ে রাখবে।’

default-image

সোহেল রানার সঙ্গে কথা বলে দুপুরের আহার সেরে ফিরে যেতে হলো কর্ণফুলী জাহাজে। যেতে হবে কক্সবাজারে। আমার সঙ্গে অনেকেই ফিরলেন। অনেকেই হয়তো কক্সবাজার থেকে ছড়িয়ে যাবেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, যাঁর যাঁর গন্তব্যে।

মন্তব্য করুন