ছবি: লেখক
ছবি: লেখককোলাজ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

মাত্রই আধা কিলোমিটার ঘন কচুরিপানার দঙ্গল ঠেলে নদীর প্রসারিত অংশটায় এসেছি। চারটি কায়াকের মধ্যে সবার সামনে আমার আর সাগর ভাইয়ের কায়াক। একেবারে পেছনে রানা ভাই। আচমকা তিনিই ফোন করে জানালেন, সামনে কোথাও অপেক্ষা করতে। কেন থামব জিজ্ঞেস করার আগেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। বাধ্য হয়ে পেছন ফিরে দেখি, কাপ্তাই জেটিঘাটের দিকে কায়াক ঘুরিয়েছেন রানা ভাই। ওদের কায়াকের ঠিক সামনে অভিযানে আমাদের সাহায্য করার জন্য যে ট্রলার নেওয়া হয়েছে, সেটিও আছে।

default-image

তিনটা কায়াকসহ নদীর এক কোণে বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পরও তাদের দেখা নেই। কিছুটা অধৈর্য হয়েই কয়েকবার ফোন দিলাম। রানা ভাই ফোন কেটে দেওয়ায় উৎকণ্ঠা বাড়ল আরও।

বিজ্ঞাপন

এত দিনের পরিকল্পনা এই অভিযান নিয়ে। তবু শুরুতেই এমন বিড়ম্বনা! তার ওপর অভিযানে যোগ দেওয়া অধিকাংশ সদস্যই কায়াকিংয়ে নতুন। গুগল আর্থে নানা ফাঁকফোকর গলিয়ে কর্ণফুলী নদী আর কাপ্তাই হ্রদের মধ্যে জলপথে ট্রেইলটা আঁকার পর সেটার পূর্ণদৈর্ঘ্য দাঁড়াল প্রায় ৩০ কিলোমিটার। আপাত অনভিজ্ঞ এই দলটা নিয়ে এই বিশাল এই পথ কীভাবে পাড়ি দেব, সেটা নিয়েও খানিকটা শঙ্কিত। তার ওপর আজকের দিনের শুরুটাও করেছি যথেষ্ট দেরিতে।

default-image

আমাদের পরিকল্পনা ছিল সকাল সাতটা নাগাদ কর্ণফুলীর টলটলে জলে কায়াক ভাসানোর। নানা হ্যাপায় সেটা গিয়ে ঠেকল সাড়ে আটটায়। এপ্রিলের সূর্য ততক্ষণে মাথার ওপর তেজোদ্দীপ্ত আলো আর গরম দুটোই ছড়ানো শুরু করেছে। দেরিতে শুরুর আরও একটা কারণ আছে। আগের অভিযানগুলোতে আমরা শুরুর আরের দিন রাতে সাধারণত কায়াকিং শুরুর জায়গাটাতে ক্যাম্পিং করি। আগের অভিযানগুলো বলতে মূলত কাপ্তাই-বিলাইছড়ি কায়াক অভিযানের কথাই উল্লেখ্য এখানে। এবার নানা ঝক্কি-ঝামেলায় সেটা আর হয়ে ওঠেনি। চার কায়াকের মোট আটজন কায়াকার আর সাহায্যকারী ট্রলারে থাকা বাকি তিনজন দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসে হাজির হয়েছেন। এর মধ্যে লং রুটে কায়াক চালানোর অভিজ্ঞতা আছে গৌরব, রানা ভাই আর আমার।

আমার সব সময়ের কায়াক সঙ্গী জিতু থাকবে অভিযানে, এই ভেবেই পরিকল্পনা করতে শুরু করেছিলাম। শেষ মুহূর্তে ও অপারগতা জানানোয় আমি মনে মনে যে খানিকটা শঙ্কিত হইনি তা নয়। বাকিদের মধ্যে নাদিয়া, মিসবাহ ও আরিফের টুকটাক কায়াকিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও সাগর ভাই আর শান্ত একেবারেই নবীন। জীবনে কখনো কায়াকের প্যাডলই হাতে নেয়নি। যেহেতু আমাদের কায়াকগুলোতে একসঙ্গে দুজন বসতে পারে, তাই অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ মিলিয়ে একটা করে পারফেক্ট জোড়া বানানোর দিকেই মনোনিবেশ করলাম আমি আর রানা ভাই। বরাবরের মতো কায়াকিংয়ের শুরু হলো কাপ্তাই নতুন বাজারের ঠিক কাছেই এ কে খানদের নির্মিত হাউস বোটের পাশ থেকে।

default-image

আর শুরু হতেই তো এই বিপত্তি। খানিক বাদেই নিস্তরঙ্গ নদীর জলে প্যাডেল মেরে রানা ভাইকে আসতে দেখে খানিকটা নির্ভার হলাম। কাছে আসতেই জানলাম, ভাড়া করা সাহায্যকারী ট্রলারটা নিয়েই বিপত্তিটা বেধেছে। এই ট্রলারটা আমাদের সঙ্গে যাবে কাপ্তাই থেকে একদম রাঙামাটি অবধি। কাপ্তাইয়ের ঘাটের ট্রলারগুলো বেশি টাকা দাবি করায় আমরা ট্রলার ভাড়া করেছিলাম রাঙামাটি থেকে। ‘কেন কাপ্তাই থেকে ট্রলার ভাড়া করলাম না?’ এই মর্মে রুল জারি করে এতক্ষণ হেনস্তা করা হয়েছে রানা ভাই আর ট্রলারচালককে। সিন্ডিকেটের দাপটে এই সব পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আসা মানুষ যে কী পরিমাণ অসহায়, তারই একটা খণ্ডচিত্র মঞ্চস্থ হলো এবেলা। শেষে সমিতিকে ‘খুশি করা’ স্বরূপ পাঁচ শ টাকা দিয়ে এ যাত্রায় রক্ষা। একই সঙ্গে মাঝিকেও মুচলেকা দিতে হলো আর কখনো রাঙামাটি থেকে এসে কাপ্তাইয়ের ভাড়া ধরবে না বলে।

বিজ্ঞাপন

শুরু হলো যাত্রা

রানা ভাইয়ের বর্ণনা শেষ হতেই আমরা প্যাডেল চালালাম। এখনো আমরা আছি কর্ণফুলী নদীতে। একটা বাঁক ঘুরতেই দেখা দিল লেক ভিউ আইল্যান্ড। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই ছোটখাটো দ্বীপ এখন ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র। আছে আমোদ-প্রমোদের সব ব্যবস্থা। হাতের ডানে দৃষ্টিসীমার ভেতরেই কাপ্তাই বাঁধের একটা স্লুইসগেট। এই অংশে কর্ণফুলীর পানি বেশ স্থির। যদিও লোকে একে কাপ্তাই হ্রদ বলে ভুল করে। হ্রদের মূল অংশে ঢুকতে হলে কাটা খাল পেরিয়ে যেতে হবে আরও সামনের দিকে। পানিতে ছোট ছোট ঢেউ তুলছে আমাদের কায়াকগুলো।

পথচলতি দুই পাশে সঙ্গী উঁচু-নিচু দারুণ সব টিলা। বেশির ভাগই জনমানবহীন। জুমচাষে ব্যস্ত কৃষকের দেখা মিলছে কদাচিৎ। তা–ও হয়তো পুরো একটা টিলায় কাজ করছেন মোটে একজন কৃষক। গ্রামের দেখা মিলছিল অনেকক্ষণ বাদে বাদে।

পাশ দিয়ে বড়সড় ইঞ্জিন বোট গেলে হালকা ঢেউ এসে লাগে কায়াকের গায়ে। সেসব ঢেউ আমরা ভালোভাবেই সামাল দিচ্ছি। এই সব দুলুনি বেশ ভালোই লাগে। পথচলতি দুই পাশে সঙ্গী উঁচু-নিচু দারুণ সব টিলা। বেশির ভাগই জনমানবহীন। জুমচাষে ব্যস্ত কৃষকের দেখা মিলছে কদাচিৎ। তা–ও হয়তো পুরো একটা টিলায় কাজ করছেন মোটে একজন কৃষক। গ্রামের দেখা মিলছিল অনেকক্ষণ বাদে বাদে। মাঝেমধ্যে হয়তোবা টিলার চূড়ার জুমঘরের টিনে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যেই কায়াকের প্যাডেলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে পানি কেটে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস।

কাটা খাল

সাহায্যকারী ট্রলারে থাকা তিন সদস্য নানা উৎসাহ বাণী ছড়িয়ে যাচ্ছেন আমাদের উদ্দেশ্যে। মাঝেমধ্যে পানি কিংবা এটা-ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। আরও দুই-তিনটা মোড় ঘুরতেই বিলাইছড়ি যাওয়ার বাঁকটার দেখা মিলল। এবার গন্তব্য অন্য দিকে বলেই সোজা পথ ধরলাম আমরা। কিছুটা এগিয়েই মূল নদীর গতিপথ ছেড়ে কাটা খালের মতো অংশে কায়াক ঘোরালাম। মূল গতিপথ ধরে গেলে ঘুরতে হবে অনেকটা পথ। কাটা খালের মতো জায়গাটার নামও আক্ষরিক অর্থে কাটা খাল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই দুই পাহাড়ের মাঝের একটা সরু অংশে আবিষ্কার করলাম নিজেদের।

default-image

দুদিকের পাহাড় যেন চেপে ধরেছে সরু এই জলপথকে। যান চলাচলের জন্য দুই পাহাড়ের সরু অংশে স্থাপন করা হয়েছে সরু সেতু। তার ফাঁক গলে বেরিয়ে বাঁয়ে চোখ পড়তেই দেখা মিলল লেকশোর রিসোর্টের। সেনাবাহিনীর অন্যান্য সব রিসোর্টের মতোই ঝাঁ-চকচকে। পাশেই স্নান সেরে নিচ্ছিল বনভোজনে আসা একদল শিক্ষার্থী। তাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করে জোরে প্যাডেল লাগালাম। আমার সঙ্গী সাগর ভাইকে নিয়ে আমি কিছুটা বেকায়দায় আছি। ভদ্রলোক কায়াকিংয়ে একেবারে নতুন। কয়েকবার প্যাডেল মেরেই মিনিট কয়েকের জন্য ঝিমিয়ে যাচ্ছেন। বললাম, এভাবে চললে রাঙামাটি পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। সেটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ টানা প্যাডলিং করে আবার বেশ খানিকক্ষণের জন্য নিস্তেজ। তাঁকে মোটামুটি বিশ্রামের সুযোগ দিলেও আমি অব্যাহত রাখছিলাম প্যাডলিং। বিশ্রামের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে তার সংবিৎ ফেরাতে প্যাডেল চোয়ানো পানির ফোঁটা গায়ে ফেললেই তৎক্ষণাৎ শুরু করেন চালানো। আমাদের সঙ্গে সমান তালেই চালাচ্ছে মিসবাহ আর আরিফ। বাকি দুই কায়াক খানিকটা পেছনে। কাপ্তাইয়ের দিকে এগোনো যাত্রীবাহী ট্রলারের যাত্রীরা বিস্মিত নয়নে দেখছে আমাদের।

দুপাশের হলদে টিলা আর যাত্রীদের অবাক চাহনি দুটোকেই পাশ কাটিয়ে আমরা চলছি গন্তব্যের পানে। মাঝে ছোট একটা টিলার পাড়ে অস্থায়ী একটা চায়ের দোকান পেয়ে একটা চা-বিরতি হয়ে গেল। সূর্যের ক্রমাগত তাপ বিকিরণে প্রাণ রীতিমতো ওষ্ঠাগত। গামছা ভিজিয়ে মাথায় দেওয়ার মিনিট বিশেকের মধ্যেই শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য প্রচুর পান করছি সবাই। ট্রলারে পর্যাপ্ত পানির মজুত করা হয়েছে যাত্রার পূর্বেই। আমাদের উৎসাহ দিতে থাকা সাহায্যকারী দলের তিনজনই ট্রলারের ছাউনির নিচে বেঘোর ঘুমে। খানিক চালিয়ে বেশ কটা টিলার প্যাঁচানো পথ অতিক্রম করে চলে এলাম প্রশস্ত একটা অংশে। এখান থেকে টিলাগুলো আর নেই হাতছোঁয়া দূরত্বে। বেশ দূরে এদের অবস্থান। এখানেই কর্ণফুলী নদী আর কাপ্তাই হ্রদ এসে মিশেছে। কর্ণফুলীর গতিপথ এবার খানিকটা বাঁ ঘেঁষে কাপ্তাই-রাঙামাটি সড়ক লাগোয়া। আর কাপ্তাই হ্রদের প্রশস্ত অংশেই এবার আমরা কায়াক ছোটাব।

default-image

একটু এগিয়েই অনেক দূরে রাঙামাটির ডিসি বাংলোর ঘাট ও তৎসংলগ্ন বিশাল গাছটার আবছা একটা চিত্র চোখে পড়ল। বাকিদের জন্য খানিকটা সময় অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই সাগর ভাইয়ের মৃদু নাক ডাকার শব্দ কানে এল। বাকি তিনটা কায়াক আসতেই শুরু করলাম একসঙ্গে চালানো। লেকের এই অংশটায় প্রচুর পানকৌড়ি। একই সঙ্গে দেখা মিলছে মাছ ধরার নৌকাও।

দুপাশের টিলাগুলোর অবস্থান বেশ দূরে হওয়াতে মাঝেমধ্যেই ঝিরঝির হাওয়া দিচ্ছে। শরীর, মন দুটোই ছুঁয়ে যাচ্ছে এই হাওয়া। লেকের মাঝামাঝি একটা জায়গায় গিয়ে সবার গতি খানিকটা কমে যাওয়াতে আমিই প্রস্তাব করলাম কিছুটা দূরত্ব রেসের মতো করে চালাতে। সবাই বেশ উদ্দীপনা নিয়ে কিছুক্ষণ টানা চালাল। দূরত্ব কমানোতে ব্যাপারটা বেশ ভালো কাজে দিল। তবে এই ভরদুপুরের কড়া রোদে দূরের ডিসি বাংলোর ঘাটটাকে কেমন যেন মরীচিকার মতো লাগছে। যতই কাছে এগোচ্ছি, ততই যেন দূরে সরে পড়ছে। ব্যাপারটা কি শুধু আমার কাছেই অদ্ভুত লাগছে কি না, সেটা বুঝতে না পেরে বাকিদের জিজ্ঞেস করতেই ওদের কাছ থেকেও একই উত্তর এল।

বিজ্ঞাপন

পলওয়েল পার্কের অদূরেই ডিসি বাংলো। দূর থেকে মরীচিকা মনে হওয়া এই বাংলো এখন একেবারে প্যাডেল ছোঁয়া দূরত্বে। এদিকে প্রচুর ট্রলার-নৌকার ভিড়। বিনোদনের উদ্দেশ্যে লেকে ঘুরে বেড়ানো পর্যটকের সংখ্যাই বেশি। ডিসি বাংলো ছাড়িয়ে পাশের ঘাটগুলোতে স্নানরত অসংখ্য মানুষ পেরিয়ে থামলাম চন্দ্রিমা পার্ক অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ঘাটে। কাপ্তাই থেকে রাঙামাটির এই যাত্রা আমাদের অনুমিত সময়ের আগেই শেষ হয়েছে। এন্ডোমন্ডো অ্যাপ জানান দিচ্ছে প্রায় ২৫ কিলোমিটারের এই পথ অতিক্রম করতে বিশ্রামসহ আমাদের সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। ঠিক ভরদুপুরেই এসে পৌঁছে যাওয়াতে খানিকটা নির্ভারই এখন। বাকিরা তখনো অল্প পেছনে। একে একে এসে ভিড়ল মিসবাহ-আরিফ, গৌরব-নাদিয়া আর রানা ভাই-ফরিদ ভাইয়ের কায়াক। আর সবার পেছনে সাপোর্ট টিমের তিন সহযাত্রীসহ ট্রলার।

default-image

চন্দ্রিমা পার্কের ঘাটেই আছে বেশ কিছু কায়াক। কায়াকিংয়ের সুব্যবস্থা আছে এখানে। সেগুলোরই গায়ে গা লাগিয়ে আমাদের কায়াকগুলো রেখে সবাই লেকের পানিতে। খানিক বাদেই বুঝলাম আশেপাশের লোকজনের যথেচ্ছ ব্যবহারে পানি যথেষ্ট নোংরা। ক্ষণে ক্ষণে নানা প্লাস্টিক সামগ্রী পায়ে এসে লাগছিল। এসব দেখে গোসল পর্ব সংক্ষিপ্ত করে ছুটলাম দুপুরের খাবারের উদ্দেশ্যে। গৌরব নিয়ে গেল শহরের একটা রেস্টুরেন্টে। ভরপেট খেয়ে বিদায় নিল গৌরব। ওর বাড়ি রাঙামাটি শহরেই। আমরা বাকিরা চন্দ্রিমা পার্কের সামনের জেটিটায় ক্যাম্পিং করে থাকব।

রাতভর রাঙামাটিতে

প্রত্যাশিত সময়ের আগেই রাঙামাটি পৌঁছে যাওয়াতে বিকেলে আমাদের হাতে অফুরন্ত সময়। সেটার সদ্ব্যবহার করতে দলবলসহ ঢুকে পড়লাম পলওয়েল পার্কে। এক ফাঁকে দেখা করে নিলাম রাঙামাটির অধিবাসী রুবেলদার সঙ্গে। কায়াক চালিয়ে বেশ ক্লান্ত হওয়ায় পলওয়েল পার্কের বেঞ্চিতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল আমাদের কয়েকজন। সারা সন্ধ্যা এদিক-সেদিক টো টো করে ঘুরে রাতের খাবার সেরেই একদম লেকের পাড় ঘেঁষেই তাঁবু লাগানো হলো।

default-image

কোনো এক বিচিত্র কারণে পুরো রাত খুব একটা ভালো ঘুম হলো না। প্রচণ্ড গরমই মূল কারণ। একদম লেকের পাড়ে ক্যাম্পিং করব, এই ভাবনাতে স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে এসেছিলাম আমি। কিন্তু হায়! স্লিপিং ব্যাগ খোলা তো দূরের কথা গরমের চোটে তাঁবুর আউটার খুলে দরজাও খোলা রাখতে হলো। শেষ রাতে আবছা ঘুমটা যখন ভেঙেছে তখনো অন্ধকার। শুয়ে শুয়েই বাইরের পৃথিবীর রং পাল্টানো দেখলাম।

ফিরতি যাত্রা

ভোরে নাশতা সেরে হ্রদের জলে কায়াক ভাসালাম। উদ্দেশ্য একটাই, গরমের হাত থেকে বাঁচা। গতকাল চারটা কায়াকে কায়াকিং হলেও আজ জলে ভাসল তিনটা কায়াক। গতকালের তিন কায়াকার আজ স্বেচ্ছা বিশ্রামে। সাগর ভাই আজ ইস্তফা দেওয়াতে আজ সঙ্গী হিসেবে পেলাম শান্তকে। সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া শান্তও কায়াকিংয়ের জগতে নতুন। তাকে সামনে বসিয়ে প্যাডলিং শুরু। বেশ ভোরে শুরু করায় আমাদের চলার গতি বেশ ভালো আজ। মাছ ধরার নৌকাগুলো এখনো বের হয়নি। চলতে চলতেই আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতে দেখলাম কাপ্তাই হ্রদকে। ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল পাখির কলতান। দূরে দিগন্তে আবছা আবছা দেখা দিতে লাগল নৌকার আদল। যত এগোচ্ছি ততই কানে আসছে মাছ ধরার নৌকার পেটে সেঁধিয়ে থাকা মানুষের হাঁক-ডাকের শব্দ। শান্ত প্রথমবার কায়াকিং করলেও প্রচুর উৎসাহ ওর। কমতি নেই আগ্রহেরও। কম বয়সী হলেও ওর স্ট্যামিনা দারুণ।

default-image

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সূর্যের ঔজ্জ্বল্য। আর একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গরমও। দূরের কাপ্তাই-রাঙামাটি সড়কও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। দিন শুরুর প্রাণচাঞ্চল্য এখন সেখানেও বিদ্যমান। ভারী পণ্যবাহী ট্রলারগুলো যাওয়ার সময় দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমাদের। সাহায্যকারী ট্রলারটা আছে আমাদের ঠিক পেছনেই। গতকালের তুলনায় ট্রলারে লোকসংখ্যা আজ বেশি হওয়ায় আড্ডা জমে উঠেছে ছাদে। এই রোদে আমরা পুরোপুরি শুঁটকি হতে কত সময় লাগবে এই সবের গাণিতিক হিসাবেও মেতে উঠতে দেখা গেল কয়েকজনকে! আমরা সেসবকে থোড়াই কেয়ার করে আরেক দফা গামছা ভিজিয়ে মাথায় দিলাম। রোদ আরও তীব্র হওয়ার আগেই হ্রদ ছেড়ে কর্ণফুলী নদীর অংশে ঢুকে পড়ার ইচ্ছে আমাদের। নদীর অংশটায় দুপাশে টিলা থাকায় টিলার একেবারে পাশ ঘেঁষে চললে কিছুটা হলেও ছাওয়া মেলে।

স্বচ্ছ নীল জলে পানকৌড়ির অবাধ বিচরণ দেখতে দেখতে হ্রদের অংশ ছেড়ে টিলায় ঘেরা অংশে চলে এলাম। রোদ ঝলমলে আকাশের এক কোণে ঝুলে থাকা সূর্যটা হলদে আলো বিকিরণ করে চারপাশটা আশ্চর্য রকম আলোকিত করে ফেলেছে। ঠা ঠা রোদে খালি চোখে বেশিক্ষণ তাকানোই মুশকিল। সানগ্লাস পরলেও বিপত্তির শেষ নেই। খানিক বাদে বাদেই কায়াকের প্যাডেল চোয়ানো পানি এসে ঠাঁই নিচ্ছে সানগ্লাসের গায়ে। মাথায় বাঁধা গামছা দিয়ে মুছতে হয় নিয়ম করে। কাটা খালের কাছে এসে এক দফা থামতে হলো। কোঁচকানো পাউরুটির মতো ভাঁজওয়ালা গালের এক বৃদ্ধ অগভীর অংশটা দিয়ে পার করাচ্ছিলেন তার মহিষগুলোকে। এরা শ্লথগতির হওয়ায় এই ফাঁকেই ট্রলার থেকে খাবার চেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করা হলো। কাটা খালের সরু অংশটা আবারও আসল একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে।

default-image

একটু বাদেই আমার পায়ে হঠাৎ করে বেশ জ্বালা হতে শুরু করল। খেয়াল করে দেখলাম হাফ প্যান্ট পরে থাকায় হাঁটুর নিচ থেকে অনাবৃত অংশ এই তীব্র রোদে পুড়ে কালচে হয়ে গেছে। এখান থেকেই জ্বলা পোড়ার সূত্রপাত। হাতে অবশ্য ফুলস্লিভ থাকায় রক্ষা। ছোট ছোট টিলাগুলোর ফাঁকে একেবারে সাপের মতো এগিয়েছে এই জলপথ। বিলাইছড়িগামী ট্রলারগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করল আরও কয়েকটা বাঁক ঘুরতেই। চরের মতো একটা জায়গা পেয়ে কায়াকগুলো এক পাশে ভিড়াতেই সবাই পানিতে নেমে পড়ল। পানি এখানে হালকা সবুজাভ আর খুবই পরিষ্কার। জলের নিচে একজন অপরজনের চেহারা দেখতে পারে অনায়াসেই। আমার পায়ের জ্বালাপোড়া খানিকটা প্রশমন হলো এই গোসলে।

স্বচ্ছ নীল জলে পানকৌড়ির অবাধ বিচরণ দেখতে দেখতে হ্রদের অংশ ছেড়ে টিলায় ঘেরা অংশে চলে এলাম। রোদ ঝলমলে আকাশের এক কোণে ঝুলে থাকা সূর্যটা হলদে আলো বিকিরণ করে চারপাশটা আশ্চর্য রকম আলোকিত করে ফেলেছে।

ফের কায়াকে উঠে জোর প্যাডেল ঘোরালাম। শেষ অংশটুকু বেশ জোরে চালিয়ে বাঁয়ে দৃশ্যমান কাপ্তাইয়ের জেটিঘাট পেরিয়ে প্রবেশ করলাম কচুরিপানার রাজত্বে। এখান থেকে আর জোরে চালানোর উপায় নেই। কচুরিপানা সরিয়ে ধীরে ধীরে প্যাডেল ঘোরাতে হলো। আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য এ কে খানদের হাউস বোটে যখন আমাদের শেষ কায়াকটা ভিড়ল তখন সবে দুপুর সাড়ে বারোটা। কায়াকগুলোকে আমাদের কাপ্তাই কায়াক ক্লাবের ম্যানেজার শাহীন ভাইয়ের জিম্মায় রেখে আমরা ছুটলাম কাপ্তাই নতুন বাজারের নোয়াখালী ভাতঘরে।

লেখক: চিকিৎসক ও পর্বতারোহী

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন