বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পর্যটকেরা কেমনে যেন জানে, এইটা সাধারণ কোনো ফোয়ারা না। এ জন্য এই ফোয়ারার চারপাশে গিজগিজ করা এখন তাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। ফোয়ারার মাথায় ত্রিশূল হাতে সুঠাম এক পুরুষ মূর্তি। এই পুরুষটা নেপচুন। রোমানদের সমুদ্র দেবতা।
পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন সভ্যতা বা পুরানে বিভিন্ন নামের সমুদ্র দেবতা থাকলেও গিদাইন্সকবাসী রোমান দেবতা নেপচুনকেই গ্রহণ করেছে তাদের দেবতা হিসেবে। এই প্রশ্নটা আমি গাইডকে করেছিলাম। গাইড ভিক্টোরিয়া উলমা বেশ চৌকস। কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর সে দিতে পারেনি।

গিদাইন্সকের আইকন নেপচুন ফোয়ারা। আপনি গিদাইন্সক গেলে নেপচুন ফোয়ারার সঙ্গে ছবি তুলতে ভুলবেন না। পুরোনো ভবন বা নদী ইউরোপের অন্যত্রও পাবেন। কিন্তু নেপচুনের সঙ্গে কিছুটা সময় না কাটালে আপনি যে গিদাইন্সক ভ্রমণ করেছেন, তার প্রমাণ রাখতে পারবেন না।

default-image

আহামরি কোনো ফোয়ারা নয়। এই ফোয়ারা নির্মাণের আগেই পুরোনো শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও ফটক নির্মিত হয়ে গেছে। ফোয়ারা করার ধারণা আসে স্রেফ সৌন্দর্য বাড়ানোর চিন্তা থেকে। যেহেতু গিদাইন্সক সমুদ্রবন্দর, সে জন্য এই ফোয়ারায় সমুদ্র দেবতা নেপচুনের স্থান পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।

আমাদের গাইড ভিক্টোরিয়া উলমা হড়বড় করে এসব তথ্য দিয়েছে। আর তা মনে রাখা হয়তো সহজ। কিন্তু এরপর সে বিভিন্ন রকম সংখ্যা দেওয়া শুরু করে, যা মনে রাখা খুব কঠিন। পরে একটা ট্যুরিস্ট বুকলেট জোগাড় করে কিছু কিছু তথ্য আমার স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে লিখছি।

১৬০৩ সালে নির্মাণ শুরু হলেও নেপচুনের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটি শেষ হয় ১৬৩৩ সালে। তার মানে ৩০ বছর ধরে নির্মাণকাজ চলতে থাকে। এর নকশা ও নির্মাণ—দুই-ই করেন ফ্লেমিশ ভাস্কর পিটার হুসেন।

অনুমান করা হয়, যেহেতু টাউন হলটি শহর ও রাজ্য প্রধানের প্রতীক, সেহেতু নেপচুনের ভাস্কর্যটি এমনভাবে নির্মিত হয় যেন নেপচুন মহোদয় টাউন হলের দিকে মাথা নত করে থাকেন।

মন্দ নয়। দেবতারা সর্বত্রই তো মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছেন। গিদাইন্সকও এই নমুনা প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। নেপচুনের ডান হাতে একটি ত্রিশূল কিন্তু তা মাটির দিকে তাক করা, আর বাঁ হাতে একটা ঝিনুক।

দেব-দেবীদের ভাস্কর্যের বেলায় সাধারণত যা হয়, গিদাইন্সকের নেপচুনও শুরুতে তেমন নগ্ন ছিলেন। ১৯৮৮ সালে ডুমুরগাছের একটা পাতা ভাস্কর্যের সঙ্গে যোগ করে তার সম্ভ্রম রক্ষার চেষ্টা করা হয়।

গাইডের কাছে শুনেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে এই ভাস্কর্যকে রক্ষা করার জন্য তা সরিয়ে রাখা হয়েছিল এবং নেপচুন মহোদয়কে নিজের আদি জায়গায় ফিরে আসতে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

default-image

নেপচুনের উচ্চতা সাড়ে ছয় ফুটের ওপর। বাঁ পায়ের নিচে একটা ডলফিন এবং একটা সিন্ধুঘোটকজাতীয় প্রাণী। পুরো ভাস্কর্য ১৫ ফুট ব্যাসের একটা পাথরের গামলার ওপর স্থাপিত। গামলাটা মাটি থেকে ২০ ফুট উঁচু। একটা পুরু খাড়া স্তম্ভের ওপর গামলাটা বসানো। নিচে লোহার রেলিং ধরে অনেকগুলো সামুদ্রিক প্রাণীর প্রতিকৃতি রয়েছে।
ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটির ওজন ৬৫০ কেজি। যুদ্ধের সময় একজন দুজনের পক্ষে তো এই বিশাল ভাস্কর্য সরানো সম্ভব নয়। তাহলে সেই কাজটি কীভাবে হলো, আমি তা গাইডকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। এবারও কোনো সদুত্তর পাইনি।

তবে এমন উদ্ভট (!) প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলেও ভিক্টোরিয়া উলমা আমাদের পুষিয়ে দিয়েছে নেপচুন ফোয়ারা নিয়ে দুটো মজার গল্প বলে। সে যেভাবে বলেছে সেভাবেগল্পটা বলতে গেলে প্রথমে বলতে হবে গোল্ডবাসার সম্পর্কে।

গোল্ডবাসার একটা জার্মান লিকার বা মদের নাম, যার উৎপত্তি হয়েছিল গিদাইন্সকে। ১৫৯৮ সালে ডাচ ব্যবসায়ী এমব্রোসিয়েন ভারমোলেন গিদাইন্সক এসে বসতি গাড়েন। একই বছর তিনি এমন একটা লিকার তৈরি করেন, যার ভেতরে ২৩ ক্যারেট সোনার গুঁড়া মিশিয়ে দেন। নাম দেন গোল্ড বাসার—সোনা জল।

default-image

অল্প সময়ের মধ্যে এই পানীয়ের কদর বেড়ে যায়। জানা যায়, ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই, রাশিয়ার সম্রাট পিটার এবং তাঁর পত্নী ক্যাথরিনের প্রিয় পানীয় ছিল এটি। তখন গিদাইন্সক পরিচিত ছিল দানজিগ নামে। লং স্ট্রিটের সমান্তরাল সেরোকা স্ট্রিটে ডাচ ব্যবসায়ী ভারমোলেন একটা ব্রুয়ারি শুরু করেন। নাম দেন, ‘দের লাস’—দি স্যামন।
স্যামন মাছের নামে নাম হলেও এই ব্রুয়ারিই গোল্ডবাসার উৎপাদন করত। গাইডের মতে, স্যামন নামটা হয়তো বাল্টিক সমুদ্রের কারণে এসেছে। ভারমোলেনের মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতিষ্ঠা করা ব্রুয়ারি গোল্ডবাসার উৎপাদন করা থামায়নি। ‘দের লাখ জু দানজিগ’ অর্থাৎ ‘দানজিগের স্যামন’ নামে যে প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে গিদাইন্সকে এই পানীয় উৎপাদন করত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা জার্মানিতে চলে গিয়ে সেখানে সেই পানীয় উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। পরবর্তী সময়ে গোল্ডবাসারের ট্রেডমার্ক কিনে নিয়ে এখন জার্মান কোম্পানি কার্ল গ্রাফ ভন হার্ডেনবার্গ তা বাজারজাত করছে।

গিদাইন্সকে স্যামন নামের একটা রেস্টুরেন্ট এবং গোল্ডবাসার নামে অপর এক রেস্টুরেন্ট নিয়মিত গোল্ডবাসার সংগ্রহে রাখে। সুযোগ পেলে গোল্ডবাসার চেখে দেখতে পারেন। কেবল সম্রাট লুই বা সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিনের স্মরণে না, গোল্ডবাসার চেখে দেখার আরও কিছু কারণও লিখছি। দানজিগ বা গিদাইন্সক সম্পর্কে যাঁরই অল্পবিস্তর জানাশোনা আছে, তাঁরা বিশ্বাস করেন ভদকা গোত্রের এই পানীয়ের ভেতরে ঝিলমিল করা স্বর্ণচূর্ণ আপনার জীবনে সৌভাগ্য এনে দিতে পারে। ভাববেন না, গোল্ডবাসার নির্জলা মাদক পানীয় না। এর ভেতরে জিরা, ধনে, দারুচিনি, মেথি, ল্যাভেন্ডার, কমলা, লবঙ্গসহ ২০ ধরনের ভেষজ মসলা আছে। যাঁরা খাবার বা পানীয়ের মধ্যে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান খোঁজেন, তাঁরা গোল্ডবাসার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। একেবারে ভেগান, নিরামিষ বা অরগানিক পানীয়।

আমাকে আবার নেপচুন ফোয়ারাতে ফিরে যেতে হবে। ঘটনাক্রমে গোল্ডবাসার পানীয়ের উৎপত্তির সঙ্গে নেপচুনের একটা সম্পর্ক রয়ে গেছে। ভিক্টোরিয়ার ভাষ্যমতে, ষোড়শ শতাব্দীতে রোমের ট্রেভি ফোয়ারার মতো নেপচুন ফোয়ারাতেও স্থানীয় লোকজন পয়সা ছুড়ে মারত। এসব ধাতব মুদ্রা গামলার মধ্যে পড়ে থাকত। রোদেলা দিনে সূর্যের আলো ধাতব মুদ্রায় প্রতিফলিত হয়ে নেপচুনের চোখেমুখে লাগত। নেপচুন মহোদয় হয়তো বিরক্ত হতেন।

কোনো এক দিনের কথা। নেপচুন সেদিন হয়তো সূর্যের প্রতিফলিত আলোতে খুব বেশি বিদ্ধ হয়েছেন। রাতের বেলা পুরো শহর যখন অন্ধকারে, নেপচুন তখন তার দেবতারূপে আবির্ভূত হন। প্রতিশোধ নেওয়ার তাড়নায় প্রথমে তাঁর ত্রিশূল দিয়ে আঘাত করে ফোয়ারার পানিতে প্রবল ঘূর্ণি তৈরি করেন। ছুড়ে দেওয়া ধাতব পয়সাগুলো তখন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।

উপলক্ষটাকে আরও কিছুটা নাটকীয় করার জন্য নেপচুন ফোয়ারার পানিতে ভদকার মতো কোনো এক অ্যালকোহলিক পানীয় যুক্ত করেন। অথবা তাঁর ত্রিশূলের আঘাতেই সেই কাজটি হয়ে যায়। সেই পানীয় নিজেও পান করেন। আশপাশে যত ভাস্কর্য আছে, তাদেরও নিমন্ত্রণ করেন। অনেকটা ‘মিউজিয়াম অব নাইটস’-এর গল্পের মতো।
বিভিন্ন ভবনের মাথায় যেসব প্রাণী ও জন্তু-জানোয়ারের ভাস্কর্য বা রিলিফ কাজ ছিল, তারা সবাই জ্যান্ত হয়ে নেমে আসে নেপচুনের এই উৎসবে যোগ দিতে। ফোয়ারার পেছনের ভবন আর্তুজ কোর্ট থেকে বিভিন্ন রাজা-রানি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও আসেন, যাঁদের ভাস্কর্য বা আবক্ষ মূর্তি সেখানে ছিল। ধাতব মুদ্রার বিচূর্ণ অংশ পানীয়ের সঙ্গে যোগ হয়ে স্বর্গীয় এক পানীয় তৈরি করে।

স্বর্গীয় পানি পানে যে যতই মাতাল হোক না কেন, রাত শেষ হওয়ার আগে ভাস্কর্যগুলো নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যায়। দেবতা নেপচুনও তাঁর দেবত্ব ত্যাগ করে ত্রিশূল হাতে আগের জায়গায় স্থির হয়ে পড়েন। কিন্তু ফোয়ারায় রয়ে যায় সেই স্বর্গীয় পানীয়। পানীয়ের ভেতর সোনার চূর্ণগুলো তখন ভাসতে থাকে।

স্থানীয় লোকজন কৌতূহলবশে সেই পানীয় পান করে প্রায় অমৃতের স্বাদ পায়। এভাবে একসময় বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় এই পানীয় প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া।

দ্বিতীয় একটা গল্পও চালু আছে। এই গল্পটাও আগেরটার মতোই। কেবল রাগান্বিত নেপচুনের বদলে এখানে নেপচুনকে খুবই দরদি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। গল্প অনুযায়ী গিদাইন্সকবাসীর প্রতি রাগ না, বরং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নেপচুন এই স্বর্গীয় পানীয় উৎপন্ন করেন এবং তাঁর পছন্দের ভক্ত ভারমোলেনের ব্রুয়ারির ব্যারেলে তা ঢুকিয়ে রাখেন।

অনেকে বলেন, গোল্ডবাসারের ভেতর স্বর্ণচূর্ণ থাকায় তা নাকি আর্থরাইটিস বা অস্থিসন্ধির ব্যথা নিরাময়ে ফলদায়ক। সত্য-মিথ্যা যা–ই হোক, ৪০০ বছর আগে এই নিরাময়ের কথা না জানতেন ভারমোলেন, না জানতেন কোনো পানকারী। নেপচুন জানতেন কি না, কে জানে।

default-image

গোল্ডবাসার পান করার সময় তাই সব সময় নেপচুনকে মনে রাখবেন। পানে মুগ্ধ হলে বা আপনার আর্থরাইটিস নিরাময় হলে নেপচুনকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলবেন না। আমি গিদাইন্সককেও ধন্যবাদ দিয়েছি। গিদাইন্সক সফরের কারণে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমি দেবতার এই বর উপভোগ করতে পেরেছি।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন