চেরির রাজ্যে অন্য ভাবনা

এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ চেরি ফোটার সর্বোচ্চ সময়। গত বছর ‘চেরি ব্লসম’ দেখতে আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়েছিলাম। চেরি ব্লসম দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা ওয়াশিংটন ডিসিতে এসে ভিড় জমান। না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করা কঠিন হতো।  ওয়াশিংটন ডিসিজুড়েই চেরির সমারোহ। তার মধ্যে দুটি জায়গায় এই সমারোহের দৃশ্য ভাষায় বর্ণনাতীত!

বিজ্ঞাপন

একটি জায়গার নাম কেন উড। হাজার হাজার শ্বেত শুভ্র চেরিফুলের গাছে মাইলের পর মাইল আলোকিত হয়ে আছে। রাস্তার এধার থেকে ওধার এমন ভাবে ঢেকে আছে, মনে হয় যেন হাজার হাজার ফুলেল চেরিগাছ দিয়ে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে!আরেকটি হলো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ‘হোয়াইট হাউসের’ পাশের হ্রদের চারধারজুড়ে চক্রাকারে লাগানো সাদা আর গোলাপি চেরির বাহার। বিশাল হ্রদ।

default-image

পুরোটা এক চক্কর দিতে দুই-তিন ঘণ্টা লেগে যায়। হাজার হাজার চেরির ডাল ফুলের ভারে হ্রদের পানিতে ডুবে আছে। অপরূপ সে দৃশ্য। এই চেরি গাছগুলো নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের দেওয়া উপহার। মনে হয় হিরোশিমা আর নাগাসাকি শহরে আমেরিকার পারমাণবিক বোমায় ক্ষতবিক্ষত জাপানকে আর যেন পারমাণবিক বোমার যন্ত্রণা ভোগ না করতে হয়, সে জন্যই চেরির শুভ্রতায় পারমাণবিক শক্তিধর আমেরিকার মনভোলানোর চেষ্টা! রাজনীতি আর কূটনীতির চাল বোঝা সত্যিই দুরূহ।

শীতের দেশে শীত চলে যাওয়ার কথা থাকলেও এবার যেন শীত যাবে না বলেই শপথ নিয়েছে। নিউইয়র্কে তাপমাত্রা দুই-তিন দিন আগেও হিমাঙ্কের নিচে নেমে গিয়েছিল। দুদিন আগেও হালকা তুষারপাত হয়ে গেল। মে মাসে তুষারপাত! বিস্ময়করই বটে। তিন বছর ধরে দেখলাম, ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তুষারপাত হতে। শুধু তুষারপাত নয়, তুষার ঝড়—যেটাকে বলে ব্লিজার্ড।

এই শীতে নিউইয়র্কের মানুষ দুটোর একটাও উপভোগ করতে পারেনি। কিন্তু শীত যাচ্ছে না। কলকারখানা, বাস, ট্রেন, ব্যক্তিগত যানবাহন সবই তো বন্ধ। নিউইয়র্কের ট্রাফিক জ্যাম ঢাকার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সাবওয়ে বা পাতাল রেলে কোথাও যেতে যেখানে সময় লাগে ২০ মিনিট, বাসে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে সেখানে যেতে সময় লাগে ওক থেকে দেড় ঘণ্টা। করোনাভাইরাসের কারণে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নির্গমন কমে যাওয়াই হয়তো দীর্ঘায়িত শীতের কারণ। বাতাসে দূষণ নেই।

মাস দেড়েক পর কয়েক দিন আগে ‌অনেক সতর্কতার সঙ্গে সাত-আট মিনিটের জন্য ছাদে গেলাম। উদ্দেশ্য, কিছু ফুল ফোটা হয়তো এখনো অবশিষ্ট আছে, তা-ই দেখা। প্রায় চার বছর ধরে গ্রীষ্মের প্রায় পুরো সময়টাতেই দেড়-দুই ঘণ্টা ছাদেই কাটাতাম অথবা ইস্ট রিভারের পাড় ধরে হাঁটতাম। করোনার ভয়ে দুটোই বন্ধ।

default-image

ছাদে গিয়ে খুবই হতাশ হলাম। এ বছর চেরির ফোটা শেষ! এবার ওরা নীরবে, নিঃশব্দে যেন অভিমানভরেই ঝরে গেছে। শ্বেতশুভ্র চেরির সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো প্রফুল্ল মন এবার হয়তো কারোরই হয়নি। হলুদ ড্যাফোডিলের ফোটাও শেষ। তবে সব ফুলের ফোটা এখনো শেষ হয়ে যায়নি, কারণ প্রকৃতি থেমে নেই। সে নিঃশব্দে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে হাজির হয়েছে। ফুটতে শুরু করেছে রং-বেরঙের অসংখ্য বাহারি রং আর আকারের গোলাপ, ক্যামেলিয়া, রডোডেনড্রন, ম্যাগনোলিয়া, ডেইজি ছাড়াও নাম না জানা আরও হাজারো ফুল। শুকনো, পাতাবিহীন মরা গাছগুলো সবুজে সবুজে ভরে গেছে। শীতের দেশের ফুলে গন্ধ নেই। শুধুই রঙের বাহার।

বিজ্ঞাপন

আমাদের গরম দেশের ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয় চারিদিক। আমাদের গোলাপ, বেলি, গন্ধরাজ, কামিনী, কাঁঠালিচাঁপা, হাসনাহেনা, জুঁই, চামেলি আর বকুলের মোদির গন্ধে সুরভিত হয় চারপাশ। বহুদূর থেকেই মানুষের মনকে আবিষ্ট করে কাছে টানে এই পুষ্পরাজি। কার সাধ্য এদের আহ্বানকে উপেক্ষা করে, এদের ঘ্রাণ না নিয়ে চলে যায়। আমাদের কদম, জারুল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর নাম না জানা কতশত ফুলের রঙের বাহার কি কম বিমোহিত করে সৌন্দর্যপিপাসু মনকে!

আসলে প্রকৃতি কার্পণ্য করে না কারও সঙ্গে। পাহাড়ের জন্য এক সৌন্দর্য তো সমতলের জন্য আর এক, উষ্ণ অঞ্চলের জন্য এক, তো শীতল আবহাওয়ার জন্য পৃথক ব্যবস্থা। প্রকৃতি অকৃপণ হাতে তার দান ঢেলে দিয়েছে। আমরা ধরে রাখতে পারছি না। আমাদের ঢাকা শহর। আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগের ঢাকা। আমরা ভাড়া বাসায় আছি প্রায় ৩০ বছর। মালিবাগ এলাকায়। পাশেই টি অ্যান্ড টি কলোনি। কলোনির পাশেই ছিল বিশাল একটা খাল। নৌকা চলত। লোকজন স্নান করত। আশপাশের গরিব লোকজন এই খালের পানি দিয়েই বাসন ধোয়া, কাপড় কাচার মতো প্রাত্যহিক কাজকর্ম করতেন।

default-image

আমার দক্ষিণমুখী তিন তলার ফ্ল্যাট এত আরামদায়ক ছিল যে গরমের সময়ও ঠান্ডায় জানালা বন্ধ রাখতে হতো। সেই খাল ভরাট করে অসংখ্য খুপরি তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, সরকারি জায়গা দখল করে বানানো হয়েছে মসজিদ। এখন পাশের ফ্ল্যাটের এসির গরম থেকে বাঁচতে জানালা বন্ধ রাখতে হয়! বাড়ির মালিকের বিশাল জমি আম, কাঁঠাল, নারকেল প্রভৃতি ফলদ গাছের পাশাপাশি ছিল বড় বড় কৃষ্ণচূড়া, কদম, বকুলসহ আরও নানান গাছ-গাছালিতে ভরা। প্রতি গ্রীষ্মে শুরুই হতো কৃষ্ণচূড়ার আগুন লাল ফুল ফোটা আর চলত বর্ষার মাঝামাঝি পর্যন্ত। বর্ষায় কদমগাছটি হলুদ ফুলে ভরে যেত। বারান্দায় বসে এই সৌন্দর্য উপভোগ করেছি প্রাণভরে।

কৃষ্ণচূড়া আর কদমগাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে আর সেখানে উঠেছে বহুতলবিশিষ্ট অট্টালিকা। এই ঢাকা, যার চারদিক ঘিরে ছিল চার চারটি বড় নদীর আশীর্বাদ, যা বিশ্বের আর কোনো শহরেরই নেই। ছিল ধানমন্ডি আর গুলশান লেকের মতো প্রাকৃতিক লেক, ছিল ধোলাই খালের মতো অসংখ্য খাল। সব চলে গেছে লোভী মানুষের গ্রাসে।

default-image

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা শহরে দেখেছি তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম হ্রদ। লন্ডনের টেমস নদীকে ঘিরে চলছে তাদের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। নিউইয়র্ক শহরের আর্থিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হচ্ছে হাডসন আর ইস্ট রিভারকে ঘিরে। সুইজারল্যান্ডে দেখেছি জেনেভা লেকের ‌অন্তর বিমোহিত করা সৌন্দর্য। মনটা হাহাকার করে ওঠে যখন দেখি আমরা প্রকৃতির দেওয়া সব আশীর্বাদ ধ্বংস করার মরণ খেলায় মেতেছি। নদী গ্রাস করে, সবুজ বনানী উজাড় করে গড়ে চলেছি প্রাসাদসম আকাশচুম্বী সব অট্টালিকা। আসছে নগদ কড়কড়ে নোট। স্ফীত হচ্ছে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট। আর কী চাই! টাকার পাহাড়ে শুয়ে থাকার মতো সুখ তো মনে হয় আর কিছুতেই নেই।
ঘুরে ফিরে আবারও রবির আলোয় ‌অবগাহন করি,

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ
তুমি কি বেসেছ ভালো?

লেখক: আইনজীবী, প্রাক্তন উপপরিচালক, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি

মন্তব্য পড়ুন 0