ট্যাম্পা ক্লিয়ার ওয়াটার বিচে কয়েক দিন

আমার দীর্ঘদিনের বান্ধবী পরিকল্পনা করছে কীভাবে শিশুদের ব্যস্ত রাখা যায় এদের স্প্রিং ব্রেকে। এরা অতিথি পাখি। মানে কেনেডিয়ান, ছুটিতে কানাডায় মাসের পর মাস কাটায়। যদিও ঠিকানা আমেরিকা, বহু বছর ধরে।

default-image

করোনায় আটকে গেছে। তা-ও তার ভাইবোন যা আছে এখানে, সেখানেই সময় কাটায় সময় পেলেই। কীভাবে যেন এবার আমাদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা ভেবেছে।
আমাদের শিশুরা চোখ খুলে একজন আরেকজনকে দেখে বড় হচ্ছে। ঝগড়াঝাঁটি, খুনসুটি প্রতিদিন লেগেই আছে। একদম পুঁচকেটাকেও বেস্ট ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞেস করলে হয় আমার মেয়ের নাম বলবে নয়তো মেয়ের বাপের! যদিও নিজেই ক্লাসে শিখছে, এখন বয়ঃপ্রাপ্ত লোকেরা শিশুদের বন্ধু হতে পারবে না! সে যা-ই হোক, এখনো তারা বেস্ট ফ্রেন্ড।

মাসখানেক পরিকল্পনা চলছে, এখনো ঠিক করতে পারেনি কী কী করবে? যদিও হোটেল বুক হয়ে গেছে। ফোন দিয়ে বেড়াচ্ছে কী কী করবে তার জন্য। আমাদের সময়ে মেলেনি। কী করছে, করতে থাকুক! জেনেছি, আমাকেও সঙ্গে নেবে, নেবে তো আমায়?

বিজ্ঞাপন

জিজ্ঞেস করলে বলতে পারব না কোথায় যাচ্ছি। গত বছরের পর এই প্রথম ঘর ছেড়ে বেরোব। প্রাপ্তবয়স্ক সবার কোভিডের টিকা দেওয়া হয়েছে। আমারগুলো শেষ, এদের অন্তত প্রথমটা। আমার মেয়েরও। তাই সাহস একটু করেই ফেলেছি। মেয়েটা এরপর কলেজে যাবে। আমি তো তার খোঁজখবরও রাখার সময় পাই না।

default-image

সাধারণত আমি সব গোছগাছ করে একেবারে প্রস্তুত থাকি, ছেলেরও গোছগাছ করে দিই। এবার মতিভ্রমে দেখি আমিই সবার শেষে। সকালে ঘুম থেকেও উঠতে পারি না। পুরোনো স্বভাব! সবাই প্রস্তুত হয়ে আমার জন্যই অপেক্ষা করছে। একবার ভাবলাম বলে ফেলি, তোমরা চলেই যাও, আমি আর একটু ঘুমাই। কীভাবে যেন প্রথমভাগ না বলে, শুধু দ্বিতীয় ভাগ বলেছি!

দেখি বলছে, গাড়িতে ঘুমিও, উঠে পড়ো। ঠিকঠাক হয়ে নিচে নামতেই দেখি, ঘর খালি, সবাই গাড়িতে। নিজেরাই হালকা দাবারও প্যাক করে নিয়েছে। গাড়িতে উঠে বললাম, দরজাগুলো চেক করে আসি? ও সিডি, বলে লক করেছ, আর চেক করতে হবে না।
সেই সকালবেলা এমন অত্যাচার সহ্য হয়?

আমি ঘুমাব বলে সানগ্লাস পরে নিয়েছি। কম্বলও প্যাক করেছি, গায়ে দিয়ে নিয়েছিও। বলে, ব্রেক ফাস্ট? নাহ্ এখন না। বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলাম।

default-image

ঘুম ভাঙতেই দেখি সাড়ে ১০টা। বললাম, গাড়ি থামাও ব্রেক ফাস্ট তুলে নাও। খেয়েদেয়ে মেয়ে বলে, সে গাড়ি চালাবে। আমি পেছনে চলে এলাম। পেছনের সিটে আরাম করে ঘুমাব বলে বড় গাড়ি কেনা। এই বদগুলো এত বছর জবরদখল করে আছে। আমি একটুও হাত-পা মেলে ঘুমাতে পারি না। কী যে শান্তি লাগল পেছনে এসে! ফাইনালি ওর সঙ্গে দেখা, হাত-পা ছড়িয়ে আয়েশ করে কম্বল মুড়ি দিয়ে গল্পের বই খুলতে না খুলতেই আবার ঘুম! ইশ্‌! গল্পের বই যে এমন ঘুমের ওষুধ হিসেবে কাজ করবে বুঝিনি। এখন থেকে প্রতিদিন তার সঙ্গে সখ্য হবে। যদিও দুষ্ট লোকেরা বলে, আমি সন্ধ্যা হলেই ঘুমিয়ে পড়ি! সেই ঘুম ভাঙতেই আমরা পৌঁছে গেছি ফ্লোরিডার ট্যাম্পায়। আমাদের প্রিয় ভ্যাকেশন ডেস্টিনেশন!

রাস্তায় গাড়ির বহর দেখে মনে হয় না অতিমারি চলছে। আমরা ভাই মাস্ক পরা লোকজন। মাস্ক না পরলে মনে হয়, সুপারম্যানের আন্ডারওয়্যার মিসিং।

বিজ্ঞাপন

প্রথম দিন

বান্ধবীর পরিবার আমাদের পরে রওনা দিয়েছে। এসেছেও পরে। এসেই আমার আবারও ঘুমের ঘোর না কাটায়, ঘুমাতে গেছি। ওরা বাসা থেকে আনা খাবারের সদ্ব্যবহার করে বসে আছে। আমিও ভাবলাম, না উঠি! গায়ে রোদ লাগানোর দরকার। যদিও দুর্মুখেরা বলে ফেলেছে, আমি সানট্যান হয়ে যাব, দেখে চেনা হয়তো যাবে না। বলেছি, যেন ফ্লোরিডাতেই ফেলে যায়, প্রকৃতির সঙ্গেই না হয় মিশে থাকব।

default-image

ছেলে তার গেমস রেখে এসেছে। ইন্টারনেটের সংযোগ পেয়ে হোটেল থেকে বেরোতে রাজি নয়। মেয়েকে নিয়ে আমরা কাছের বিচে গেলাম।

মানুষ বিচে যায় হল্লা করতে! আমরা যাই সেক্লুশনের জন্য। পরিচ্ছন্ন, নির্জন বিচে হাঁটাই সার। সঙ্গে পুকুরের পানি, থুক্কু, সমুদ্রের পানিতে পা ভেজানো উপরি পাওনা। পানিতে নামানামির মতো পাগল কেউ না। বিকেলের ঠান্ডা বাতাসে একটু ফুর্তি ভাব আসতেই বান্ধবীর ফোন, কই তোমরা?

হোটেলে ফিরে এলাম। এরা সব ক্ষুধার্ত। গেলাম খেতে। ইরানি খাবার পেটে যেতেই সবার যে রাম এনার্জি হলো, সে এনার্জিতে অন্ধকারেই চলে গেলাম পরিচিত ক্লিয়ার ওয়াটার বিচে।

আমাদের শিশুরা পারলে অন্ধকারেই পানিতে নেমে যায়! আকাশের তারা গোনা আর পরিষ্কার বিচে দৌড়াদৌড়ি করে এনার্জি খরচ করে ফিরে এলাম হোটেলে। বান্ধবী সুইট বুক করেছে, সে জন্য আমার ভাগে ছোট রুম! শিশুরা ঠিক করতে পারছে না, কে কোথায় ঘুমাবে। আমার দুই রুমের রুম ছেড়ে ছেলেমেয়ে দুজনই নাচতে নাচতে চলে গেছে ওদের কাছে। যদিও বলেছি মন চাইলে ফিরে তাদের বেডে ঘুমাতে পারে। জানি আসবে না। ওরা রাতজাগা পাখি, আমরা ঘুমকাতুরে, জেগে থাকার চান্স মিস করবে না তারা। বান্ধবী আবার পরিকল্পনাকারী, হাজারো আনন্দের পরিকল্পনা করবে শিশুদের সঙ্গে, সেই সব ফেলে তারা আসবে? মনে হয় না।

default-image

আমি ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরোতেই দেখি, আমার কর্তাও গায়েব! মানে বুঝলাম না। সে-ও কি বন্ধুদের সঙ্গে ঘুমাতে গেল?

যাক। সমস্যা নেই। আমার চতুর্থবারের মতো ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাতে ঘুমাতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে শুনি, তোমার টুথব্রাশ নিয়ে এলাম গাড়ি থেকে। থাক সকালেই চেক করব, এখন আপাতত ঘুমাই। বলে বেড়াচ্ছে আমি কোনো কিছুই খেয়াল করছি না, ঘুমটাই পুরো হচ্ছে না মনে হয়! ঘুমিয়েই নিই ঠিকমতো!

চারটা দিন কীভাবে স্বপ্নের মতো কেটে গেল! প্রথম দিন আমাদের স্বভাবমতো প্রাইভেট বিচে সন্ধ্যা কাটালাম। লোকজন কম, নাথিং হ্যাপেনিং কাইন্ডা প্লেস। আমরা লোকজন থেকে দূরেই থাকতে পছন্দ করি।

দ্বিতীয় দিন

তবে পরের দিন অবশ্য শিশুদের জন্য হ্যাপেনিং প্লেসে যেতে হলো। বিচে প্রচুর লোকজন। ভাগ্যিস আমাদের বন্ধু টেন্ট নিয়ে এসেছিল! চেয়ার, ম্যাট জম্পেশ আড্ডা আর রিলাক্সিং, সূর্যের নিচে।

ছেলেগুলো লো মেইনটেন্যান্স। বয়স কম বলে কাউকে সঙ্গে লাগবে জেট স্কিয়িংয়ের জন্য। ওরা ঠিক করল, দুজনে মিলে নৌকা চালাবে।

default-image

অফকোর্স, মেয়েরা সবাই গ্রুপে হেড স্ট্রং, জেট স্কিয়িং ইট ইজ! জলকেলি, জেট স্কি, ক্যানুয়িং করার পর মনে হলো থ্রিল তখনো শেষ হয়নি, গ্রুপ মিলে ব্যানানা বোটিং। মনে হয়, বেকার জিনিস, তবে থ্রিলিং কম নয়! জনসংখ্যার বিস্ফোরণে, দুবারে করা হলো। শিশুরা প্রথমবার গিয়েও দ্বিতীয়বার যাওয়ার নেশা ছাড়তে পারেনি।

default-image

এরপর খোঁজ পড়ল প্যারাসেইলিংয়ের। ওরা বুকড বলে সেদিনের মতো বাদ দিয়ে হোটেল ফিরতে হলো। দিনও শেষ। ফ্রেশ হয়ে ডিনার করতে গিয়ে মনে হলো, কাছেই হোটেল, যারা গাড়িতে যেতে চায়, তারা যেতে পারে। আমরা কয়েকজন হেঁটেই ফিরব। সাইন্টোলজি চার্চের ওপর দিয়ে, সুন্দর এক ছোট পার্কে সময় কাটিয়ে ঘরে ফেরা। আই মিন হোটেলে। হোটেলে আসা অবধি আমার ছেলেমেয়ে আর আমার না। এরা বাকিদের সঙ্গে থাকা, ঘুমানো সব করছে! আমরা যখন খেতে বসি, ফুডোগ্রাফি রেয়ার। খাবার খেয়ে মনে পড়ে, গ্রুপ ছবি তোলা মিস হয়ে গেছে। গ্রুপ ছবি তখন তোলা হয় ঠিকই, তবে খাবার অলরেডি উদরে!

বিজ্ঞাপন

তৃতীয় দিন

পরের দিনের পরিকল্পনা ছিল আগেই। বোট রাইডিং ডলফিন দেখতে যাবে সকালে, সেখান থেকে যাওয়া হবে এক দ্বীপে, সেখানে যার সাঁতার, স্নোরকলিং করতে ইচ্ছে হলে করবে। সকাল সকাল তৈরি হয়ে চলে গেলাম পিয়ার এ। সেখানে মিলল পেলিকান আর স্টর্ক! আমি স্বভাবমতো তাদের কাছাকাছি চলে গেলাম। প্রচুর ডলফিনের দেখাও মিলল, সঙ্গে মিলিয়নিয়ারদের ম্যানশনও।

ভেবে দেখলাম এই ম্যানশন কেনার বাসনা ঊহ্য রাখতে হবে। কয়েকজন মিলিয়নিয়ার মিলে হয়তো হবে, তবে তার জন্য গণবিবাহ করতে হবে, একটা ম্যানশন অ্যাফোর্ড করতে। যে বয়স একজনও রাজি হবে না বলে রায় হয়েছে। তাই শখ–আহ্লাদ আপাতত বাদ। চোখের দেখাই সার।

default-image

আপাতত বিচে আবারও সারাটা দিন কাটাবে বলে বান্ধবী ঠিক করেছে। পিয়ার ৬০- হাজারো তাঁবু, হাজারো মানুষ! আমরা ভাগ্যবান। কারণ ছেলেরা আমাদের শেড ফেলেছে! ওরা গোছগাছ করতে করতে স্ট্রিপ মলে ঘোরাঘুরি চলছে আমাদের। খাবার অর্ডারও করেছি, যাওয়ার পথে তুলে বিচে যাব বলে।

ঘোরাঘুরি শেষে খাবার, ড্রিংকস, প্লেট, কাপ-মায়ের কাজ করছি। বিচে গিয়ে টেন্টের পজিশন পছন্দ হয়নি। তবে তাই বলে খাওয়া মিস? নাহ সে অসম্ভব।

default-image

সবাই পেট ভরে খেয়ে ঠিক করলাম, পিয়ারে হাঁটা হয়নি গতকাল। হাঁটতে চলে গেলাম। আসলে আমাদের পুরোনো জায়গায় বসার ইচ্ছা, প্রাইভেসির জন্য। পিয়ারের মাঝবরাবর গিয়ে দেখলাম, একেবারে শেষে যাওয়ার জন্য মণিকাঞ্চন যোগ করতে হবে। এ জন্য মাথা গরম মেয়েরা আছি। এর মাঝে পতিদেবতাকে জায়গাও দেখিয়েছি; আমরা কোথায় বসতে চাই। ভদ্রলোকের মতো মেনে নিয়ে আমাদের টেন্ট সরাতে গেছে সে, ছেলেদের নিয়ে।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন