রাতের ট্যাম্পা
রাতের ট্যাম্পাছবি: লেখক

আমরা পিয়ারের ভেতরে ঢুকে লোকজনের মাছ ধরা দেখি। ভয়হীন পেলিকান আর স্টর্কের পিছে লাগি! মানুষজনও ফ্রি এন্টারটেইনমেন্টের জন্য পেলিকানকে খেতে দিচ্ছে! যারা মাছ ধরছে, ফ্রেশ বড়শি থেকে নিয়েই পেলিকানের মুখে তুলে দিচ্ছে! আমিও এবার পেলিকানকে ছাড়িনি। সকাল থেকে একটা ধরব বলে ঘুরছি—এটা ভদ্রবেশী বলে সাহস করে পেট করে ফেলেছি!

default-image

পিয়ার থেকে নামার পথে মনে হলো আমাদের চেয়ারগুলো ছেলেরা সরিয়ে যেখানে বসাতে বলেছি; বসিয়েছে! খুশি হয়ে বসতে গিয়ে কনফিউশনে পড়ে গেলাম, এগুলো আসলেই আমাদের কি না ভেবে! বাবারা শেড আনতে ব্যস্ত! ছেলেদের আপাতত পানিতে নামার ইচ্ছা নেই বলে গাড়িতে ফিরে গেছে। আমরা পুরোনা জায়গায় ফিরে শুনি, সেগুলো আমাদেরই চেয়ার ছিল!

আবার ফিরে এসে বান্ধবীর মেয়েকে নিয়ে পানিতে ওয়াটার বল, ফ্রিজবি খেলতে নেমে গেলাম। একে একে সবাই তাদের মনমতো, সময়মতো যোগ দিল! দেখি সেই অগভীর পানিতে বড় বড় মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছে; দেখলাম, খেলা কিছুক্ষণের জন্য মুলতবি করে আমরা সেই মাছের পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছি সবাই মিলে। বান্ধবী বলে, ওরা মনে হয়, পিয়ার থেকে ভয়ে দূরে যেতে গিয়ে আমাদের পাল্লায় পড়েছে! আমাদের সঙ্গে বিচের আরও বাচ্চারা মাছগুলোর পেছনে পেছনে। তাড়িয়ে দিয়ে আবার খেলায় মনোযোগ দিলাম।

বিজ্ঞাপন

কয়েক ঘণ্টা পর মনে হলো, ছেলেগুলোকে টেনে পানিতে নামানোর দরকার; তাদের খুঁজে পানিতে নামানো হলো। খেলা শেষে টায়ার্ড হয়ে, বিচেই শরীর ধুয়ে নিয়ে পাশের রেস্টরুমে সবাই ভিজে কাপড় বদলে ফিরে এলাম। কিন্তু তখন মনে হলো, বিশ্রাম না নিলে চলবে না। বান্ধবী মেয়েদের নিয়ে থেকে গেল। আমি ছেলেদের সঙ্গে ফিরে এলাম হোটেলে! সন্ধ্যায় আবার ডিনারে সেখানেই যেতে হবে! ছবি পাঠাচ্ছে, মেয়েরা হল্লা করে বেড়াচ্ছে; আইসক্রিম হাতে!

default-image

সন্ধ্যায় পিয়ারের রুফটপে ডিনার! মেয়েরা টায়ার্ড বলে খাওয়া শেষ করেই চম্পট দিল। আমরা ঠিক করলাম হাঁটব! দশ মিনিটের ড্রাইভ, তবে ঘণ্টাখানেকের হাঁটাপথ! যদি টায়ার্ড হয়ে যাই, বন্ধুর বর তুলে নেবে রাস্তায়!

দোমনা করে প্রায় মাঝরাতে দুজনে আধঘণ্টা হেঁটেও ফেলেছি। আসলে আবহাওয়া এত ভালো ছিল, লাইটের রিফ্লেকশন, আর কেউ উটকো ঝামেলা করে না সেই স্বস্তিতে হেঁটে বেড়ালাম—দুটো ব্রিজ ক্রস করে ফেলেছি এরই মধ্যে, দেখি বন্ধুর বর ব্রিজের ওপর আমাদের জন্য গাড়ি থামিয়েছে! পা–টাও ব্যথা শুরু করি করি করছে, আমরা তা আর বাড়তে না দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম!

চতুর্থ দিন

আজ সকালে বান্ধবী ছেলেমেয়েদের নিয়ে ব্রেকফাস্টে যাবে; আমার খাবারে আগ্রহ কম! বিশেষত ব্রেকফাস্টে! প্যারাসেইলিংয়ের টিকিট গতকালও পাওয়া যায়নি। আজ অনলাইনে রিজার্ভ করতে গিয়ে দেখে একটিমাত্র স্লট ওপেন বিকেলে। সকালে একটা আছে, তবে তাতে সবার ফ্যান্সি ব্রেকফাস্ট মিস হয়ে যাবে; সেটা করা যাবে না! দুদিন ধরে এরা ওয়েট করছে! তো সেই একটিমাত্র স্লটই সই! আমাদের দুজনের একটি করে মেয়ে তাতে যাবে—আমি শিওর এই দুই মেয়ে বিবাহযোগ্য পাত্র পাবে না! সুপার হাই মেইনটেন্যান্স আর স্পয়েল্ড! বান্ধবীকে বলে দিলাম, ওই স্লট নিয়ে নিতে আর ব্রেকফাস্ট করে ফিরলেই আমরা বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাব।

default-image

এরা ফিরতে ফিরতে মিড ডে। বোটানিক্যালে এলিগেটর থাকার কথা চোখে পড়েনি। বাচ্চারা প্রজাপতির পেছনে ঘুরল কতক্ষণ। অ্যালোভেরা দেখে তার এক পাতা সবাই মিলে গায়ে সানবার্নে ঘষল। আমরা আমের, লিচুর মুকুল দেখে এক্সাইটেড! তবে গাছ থেকে ছিঁড়ে বড় বড় পাকা পাকা ব্লুবেরি খাওয়ার মতো এক্সাইটমেন্ট মনে হয় কমই হয়।

বিজ্ঞাপন

মার্লবেরিও দেখলাম, পাকা। তা–ও তুললাম! ব্লাকবেরি, স্ট্রবেরির সংকর যেন। সাইজে ছোট, বিচি নেই আর সুমিষ্ট। প্রথমে সবাই নিমরাজি হলেও পরে চেয়ে নিয়ে খেয়েছে। সেখান থেকে বের হতেই ইরানি ফুড অর্ডার করে, যাত্রাপথে পিক করে হোটেলে ফেরা! খেয়েদেয়ে সব রেডি আবার! শুধু মেয়ে দুটো বিচে যাবে প্যারাসেইলিং করতে সঙ্গে বাবারা আর আমি। অনিবার্য কারণবশত প্যারাসেইলিং ঘণ্টাখানেক পেছাল। আমার বোর লাগায় হোটেলে ফিরে এলাম! সন্ধ্যায় আবার সূর্যাস্ত দেখতে আসতে হবে। এ কদিন না ঘুমোনো, সানবার্ন আমরা সবাই; একটু বিশ্রাম সবার প্রাপ্য। বান্ধবী তার ছোটটাকে নিয়ে পুলে। আমি আমার ছোটটাকে নিয়ে নখরামি করছি!
কীভাবে যে সময় চলে গেল বলতে পারলাম না। বান্ধবীর ফোনে আবারও নিচে নেমে বিচের উদ্দেশে। আমরা সূর্যাস্ত দেখব!

default-image

তারপর আমার হাজব্যান্ড তার হাইস্কুলের বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবে! ডিনারে আজ আলাদা হব, তবে বান্ধবী জানাল ওরা হয়তো একই রেস্টুরেন্টেই চলে আসবে।
ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি আবারও ব্রিজের ওপরে হাঁটছি; আধা ঘণ্টা পর পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত রেস্টুরেন্টে। এই বন্ধুরা ভিন্ন সিটি থেকে আসছে; মনে হয় ৩০ বছর পর দেখা দুই বন্ধুর। এই প্রথম আমার সাথে দেখা দুই পরিবারের। টেবিলে বসতেই দেখি আমার অন্য বান্ধবীর পরিবারও চলে এসেছে। আমার স্বামীর বন্ধুভাগ্য ঈর্ষণীয়; দু–একজন বন্ধু তার, তবে সবাই ভীষণ ভালো মানুষ।

ওর স্ত্রী মিসরীয়, বাচ্চা দত্তক নিয়েছে লেবানন থেকে, কিউট তিন বছরের অনাথ ছেলে। জীবন তাদের এখন এই ছেলে নিয়ে। কোনো লুকোচুরি নেই, বাচ্চা অ্যাডাপ্টেড; আমরা হলে কোনো দিনও স্বীকার করতাম না।

ওদের দেখে মনে হলো, বিয়ের পর হাজব্যান্ডকে জিজ্ঞেস করতাম, যদি আমাদের বাচ্চা না হয় কী করবে? না, বলেনি, আরেকটা বিয়ে করবে! বলেছিল, বাচ্চা অ্যাডাপ্ট করবে দরকার হলে। বাচ্চা হতেই হবে সে ভাবনা এদের নেই। এই যে ঘরহীন একটা বাচ্চাকে সর্বোচ্চ দিয়ে ভালোবাসা, সেটা দিতে পারাটাই মুখ্য! প্ল্যান করছে ছেলে বড় হলে, অরিজিন মানে লেবাননে ঘুরতে যাবে, যাতে সে তার শিকড় জানে।

আমি বড় হয়েছি অনেক দত্তক শিশুর সঙ্গে। ভালোবাসা সেখানে ষোলো আনা ছিল, শুধু ভুলেও কখনো বলত না তারা দত্তক, শিকড় উপড়ানো ছিল। হয়তো আমাদের পরিবেশ সেটা করতে বাধ্য করে। মানুষজন বাঁকা মন্তব্য করে, জীবন অতিষ্ঠ করে, তাই সে ব্যবস্থা!

সে যাহোক। ডিনার শেষে ঠিক করেছি আমরা দুজন বিচে রাতে হাঁটব। বাচ্চারা হাঁটতে অস্বীকার করেনি, তবে ডিনার শেষে টায়ার্ড, হোটেলে ফেরার তাড়া তাদের। ওদের এক গাড়িতে তুলে দিলাম বন্ধুর বর তাদের নিয়ে গেল। দেখি আমার বরও হোটেলে যেতে চায়। সেও দ্বিতীয় গাড়ি নিয়ে গেল।

default-image

শেষমেশ আমরা দুই নারী, প্রায় মাঝরাতে, প্রায় জনশূন্য রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আবারও বিচে। পিয়ারে যাব আবারও ভেবেছিলাম; দেখি গেট বন্ধ; মনে হয় আত্মহত্যা বন্ধের জন্য এই ব্যবস্থা। না আমরা সুইসাইড করতে যাইনি। হাঁটুপানিতে ঝাঁপ দিলে বড়জোর ঘাড় ভাঙবে। ভাবছিলাম আশপাশে নাইটক্লাবে ঢুঁ মারব কি না। বান্ধবী বলে, আমাদের দেখে খালাম্মা ডাকবে আর ভাববে কী করছি সেখানে। তো সে প্ল্যানও বাদ দিয়ে বিচেই তারার নিচে আর হোটেলগুলোর মৃদু আলোয় দুই মানবী হেঁটে বেড়ালাম! সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার কেউ আমাদের বিরক্ত করেনি। দেশে সবচেয়ে বড় বিচে যেটা ভীষণ সমস্যা; অনাহূত লোকজনের উটকো ঝামেলা, উদ্ভট অশালীন মন্তব্য আর হেনস্তা! ডায়মন্ড পরে মাঝরাতে দুজন মেয়ে একাকী বিচে হাঁটলে কী হতে পারে দেশে, আমি সেটা চিন্তাও করতে চাই না। কবে যে আমরা মানুষ হব?

বিজ্ঞাপন

ঘণ্টাখানেকের মাঝেই আমার বর হাজির। না এলে উবার ডাকারও সমস্যা ছিল না। আমাদের জার্নি আপাতত শেষ। আমরা সবাই এই কদিন ভীষণ আনন্দে কাটিয়েছি। প্রথম ঘরের বাইরে পুরো বছরে; এমনও হয়েছে পানিতে নেমে আধা ঘণ্টা পর আবিষ্কার করেছি, তখনো আমি মাস্ক পরে আছি!

default-image

লেট নাইটে হাঁটাহাঁটি, গল্প, বাচ্চাদের স্লিপ ওভার, আমার মেয়ে বান্ধবীর কোন মেয়েকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, বা কোনটার সঙ্গে সময় বেশি কাটাচ্ছে, তাই নিয়ে তাদের মাঝে ঝগড়া, আমাদের দুজনের দুই ছেলের মাঝে আরও দোস্তি, এদের একসঙ্গে বেড়ে ওঠা আমরা খুবই অ্যাপ্রিশিয়েট করি। আমরা দুই বান্ধবী যেন দুই মায়ের পেটের দুই বোন। আমাদের স্বামীরাও বেস্ট ফ্রেন্ড, ভাই! বাড়ি পৌঁছে আবারও দেখা হবে; আমরা কাছাকাছি থাকার জন্য বলতে গেলে পাশাপাশিই থাকি।
ওরা বাসার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে সকালেই। আমার ছেলে এখনো ওদের রুমে ঘুমাচ্ছে।

default-image

আমরা এই তো বিছানা ছেড়ে, নাশতা করেই ঘরের পথে যাব। ছেলে নতুন ড্রাইভ করছে; এসে নিজেই জানাল প্রথমে সেই চালাবে। যে–ই চালাক, আশপাশের গার্ডেন সেন্টারে আমাকে একটু নিয়ে গেলেই খুশি হব; আমার একটা রজনীগন্ধার ঝাড় চাই। গতবার পাইনি। এবারও না–ও পেতে পারি! আমাদের ওখানে হয়ই না। পাওয়াও যায় না। আনটিল নেক্সট টাইম—বিদায় ফ্লোরিডা। বিদায় ক্লিয়ার ওয়াটার বিচ, বিদায় গালফ অব মেক্সিকোর সাদা পরিষ্কার বালুকণা! যতবারই আসি, ততবারই আমি এই পরিষ্কার সাগরবেলার প্রেমে পড়ি।

কানে কানে বলি, রজনীগন্ধা এবারও পাইনি, দুদুটো গার্ডেন সেন্টারে থেমেও!

লেখক: চিকিৎসক

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন