default-image
বিজ্ঞাপন

এক মাস পরের কথা।

কড়া গন্ধে মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে। ঘ্রাণটা সস্তা দেশি বিড়ির মতো হলেও, এগুলো আসলে বিশেষ ধরনের রিসার্চ সিগারেট। তারই বড় এক কার্টন খুলে একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ধরছি। সাদা ধোঁয়া সাপের মতো নিঃশব্দে এঁকেবেঁকে ঢুকছে স্মোকিং চেম্বার নামের বাক্সটার ফুটো গলে। ধূম্রজালের আড়ালে মিশকালো ‘ব্ল্যাক সিক্স’ জাতের ইঁদুরগুলোর অবয়ব প্রায় অস্পষ্ট।

default-image

ল্যাবের কজন আমরা প্রতিদিন পালা করে ইঁদুরকে বিড়ি টানানোর কাজ করি। এই বিড়ি ফোঁকা কার্যক্রম আমার পিএইচডি থিসিসের একটা অংশ। সিগারেট কোন উপায়ে ফুসফুসের কী ক্ষতি করে, তা দেখাই উদ্দেশ্য। নিয়ম করে দিন কতক পরপর কিছু ইঁদুরকে ছুরি-কাঁচির নিচে ফেলে পাঁজর খুলে ফুসফুস কেটে বের করে আনতে হয়। কিন্তু এই উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে নিজেদের ফুসফুসই আবার ফোঁপরা হয়ে যাচ্ছে কি না, কে জানে। কারণ, স্মোকিং চেম্বার পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র না। তাই কিছুটা ধোঁয়া ইঁদুরে খায় বটে, কিন্তু বাকিটা আমাদের পেটেও যায়।

বিড়ি পর্ব সে বেলার মতো চুকিয়ে বেরিয়ে এলাম। সাদা অ্যাপ্রোনের ভাঁজে নিকোটিনের রেশ। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে লোকে নিশ্চিত চেইন স্মোকার ভেবে ভুল করবে। যাহোক, ডেস্কে ফিরতে অ্যাটম বোম ফাটল যেন। ল্যাবের লোকজন হই হই করে জানাল, গত মাসে নেওয়া পরীক্ষার ফল চলে এসেছে। সেটা নাকি সেমিনার রুমের নোটিশ বোর্ডে ঝুলছে। চাপা আতঙ্ক নিয়ে পড়িমরি করে ছুটলাম সেদিকে। আশঙ্কা আর বাস্তবতা মিলিয়ে দেখার চরম মুহূর্তটা ঘনিয়ে এসেছে বুঝি।

default-image

দুরুদুরু বুকে দেয়ালে সাঁটানো নামগুলো পড়ছি। ২৪ জনের তালিকা পড়তে পড়তে মাঝ বরাবর এসে আনা আর আন্দ্রেয়ার নাম দেখে হোঁচট খেলাম। এরা তো দেখছি ভালোয় ভালোয় উতরে গেছে। অথচ সেদিন বিনা গ্লিসারিনেই কত কেঁদে ভাসাল দুজন। আরও নামতে নামতে নিজের নামটা মিলল ঠিক ২২ নম্বরে। শেষ থেকে তৃতীয় হওয়ার দুঃখে এবার একটা ভ্যাক কান্না দেব, নাকি শোকে পাথর হয়ে নট নড়নচড়ন, দাঁড়িয়ে থাকব, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। পরীক্ষায় ফেল নামের রিয়ালিটি চেক যেন বিরাশি শিক্কার চড় হয়ে গালে আছড়ে পড়ল ঠাস্। মাথাটা ভোঁ চক্কর দিয়ে উঠল এক পাক।

‘অ্যাই, কী হলো, খারাপ লাগছে নাকি?’। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পাশের ল্যাবের চায়নিজ ছেলেটা। শ্যান জো, যার নাম দিয়ে লিস্টি শেষ হয়েছে। ‘এই সব ফালতু পরীক্ষা-ফরীক্ষার ফল নিয়ে মন খারাপ করে ফায়দা কী? রাখো তো ওসব। তার চেয়ে চলো তোমাকে একটা দুর্দান্ত চায়নিজ চা বানিয়ে খাওয়াই।’ হাত ধরে ল্যাবের কিচেনে জোর করে টেনে নিয়ে যেতে লাগল শ্যান জো।

বিজ্ঞাপন

জার্মানির উচ্চশিক্ষার পাট আমার চুকেবুকে গেছে। এখন কোন বিমান থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার টিকিট কাটলে খরচ কত কম পড়বে, তারই হিসাব কষছি মনে মনে। কাতার না আমিরাত—এই নিয়ে যখন ভাবছি, তখন শ্যান জো কতগুলো কমলালেবুর খোসা চায়ের কাপে ফেলছে গুনে গুনে। তাতে ইলেকট্রিক কেটলির গরম পানি ঢালতেই মিষ্টি সতেজ ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। স্বচ্ছ কাপে কমলা-চা দেখতে লাগছে তরল সোনার মতন। দেখতে দেখতে দুকাপ উড়িয়ে দিলাম অনায়াসে।

তৃতীয় কাপটা সন্তর্পণে হাতে নিয়ে ‘অনুভূতি কী?’ জাতীয় প্রশ্ন ছুড়লাম শ্যান জোকে। ‘২৪ জনের ভেতর ২৪ নম্বর হয়ে কেমন লাগছে? টোবিয়াস তোমাকে আস্ত রাখবে তো?’। টোবিয়াস শ্যান জোর পিএইচডি সুপারভাইজার। শেয়াল মার্কা খ্যাঁক খ্যাঁক হাসি হেসে ছেলেটা জবাব দিল, ‘টোবিয়াস কোন **... (টুট্ টুট্)। সে আমাকে আস্ত রাখার কে? চায়নিজ সরকারের বৃত্তি যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ কোনো টুট্ টুট্ আমার চুল পর্যন্ত ছুঁতে পারবে না।’

শ্যান জোর থোড়াই কেয়ার ভাবচক্করের রহস্য পরিষ্কার হলো তাহলে। কিন্তু আমার বৃত্তি তো আর চায়নিজ সরকার দেয়নি। দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেন্টার। সুতরাং, আজ যে অবশ্যম্ভাবী খারাবি কপালে লেখা আছে, সেটা এড়ানোর উপায় নেই। আমার সুপারভাইজার আলি ইলদ্রিম আমাকে বাগে পেলে কচ্‌কচ্ শব্দ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। বিষণ্ন মনে জানালার বাইরে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললাম, ‘বিদায় পৃথিবী’ গোছের কিছু একটা বললাম বোধ হয়।

কমলা-চা খেয়ে উঠে যাচ্ছি। শ্যান জো কমলালেবুর খোসাগুলো কাপ থেকে তুলে টিস্যুতে মুড়িয়ে পকেটে নিয়ে নিল। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছি দেখে নির্বিকার উত্তর দিল, ‘এগুলো আমার পকেটেই থাকে সব সময়। রোদে শুকিয়ে আবার চা বানাব। তিন মাস ধরে তা-ই করছি। প্রতিবার স্বাদ যেন আরও খুলছে। বুদ্ধিটা কেমন বলো তো।’
শুনে ভিরমি খেলাম। শ্যান জো ছেলেটার ট্রাউজারের পকেটে বাস করা তিন মাসের পুরোনো কমলালেবুর খোসার চায়নিজ চা এবার উগরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

কোনোমতে ঢোক গিলে কেটে পড়লাম কিচেন থেকে। ‘পরের বারে আপেলের খোসার চা বানিয়ে খাওয়াব, কেমন?’ বগলের কাছে বুকপকেট থেকে অতিপ্রাচীন কিছু ফসিল দেখিয়ে বলল শ্যান জো। নেমন্তন্নটা হ্যাঁ-হুঁ করে এড়িয়ে গেলাম সাবধানে।

default-image

পা টিপে টিপে ল্যাবে ফিরছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সুপারভাইজারের খাড়া কানের রাডারে ধরা পড়ে গেলাম। আলী ইলদ্রিম জাতে তুর্কি। ঝাড়া ছয় ফুট পেটানো চেহারা নিয়ে অনায়াসে কোনো ঐতিহাসিক তুর্কি সিরিয়ালে সেনাপতির রোল পেয়ে যেতেন। ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার ঘুরিয়ে শত্রু ঘায়েল করার দৃশ্যেই তাকে বেশি মানায়। তবে এই মুহূর্তে সে ঘোড়া-তলোয়ার ছাড়াই হা রে রে করে তেড়ে এসে তিড়িং লাফে পালিয়ে যাওয়া আমাকে খপাৎ আটকে ফেলল। তারপর অফিসরুমে টেনে নিয়ে বিকট শব্দে দরজা লাগিয়ে দিল। প্রাণটা আজকে বেঘোরেই যাবে।

বিজ্ঞাপন

পরের ১০ মিনিট ১৫৫ ডেসিবেল গলা চড়িয়ে যা যা হুমকি-ধমকি দেওয়া হলো, তাতে কানের পর্দা সিরামিকের পেয়ালার মতো ফেটে চৌচির। পরের পরীক্ষায় নাম যদি ওপর থেকে তিনজনের মাঝে না থাকে, তাহলে যেন যেই চুলো থেকে এসেছি, সেই চুলোয় বিদায় হই। ফেল্টুশ, ডাব্বা খাওয়া, মাথামোটা গবেট তার দরকার নেই। পারলে পিএইচডির কাজ ছেড়ে অন্য ল্যাবে টেকনিশিয়ানের কাজ সন্ধান করি, সে পরামর্শও দেওয়া হলো।

বাক্যবাণে জর্জরিত হওয়া বুঝি একেই বলে। ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে এসে কথার বাণগুলো গেঁথে যাওয়া তিরের মতোই একটা একটা করে টান মেরে ওপড়াতে হলো। কিন্তু মন খারাপের সময় নেই। দ্রুত হাতে ব্যাগ গুছিয়ে গ্রোসহাডের্ন ক্যাম্পাসে ছুটলাম। রাত ৯টা অবধি ক্লাস সেখানে। সুতরাং, শো মাস্ট গো অন।

দেড় ঘণ্টা বাস-ট্রেন ঠেঙিয়ে ক্লাসে এসে পৌঁছে দেখি, একি কাণ্ড। ক্লাস কোথায়, ভুর ভুর ম ম সুঘ্রাণে চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। পরীক্ষার রেজাল্ট উপলক্ষে বিশাল খানাদানার আয়োজন। ইতালিয়ান পিৎজা অর্ডার করা হয়েছে। মোজ্জারেলার উষ্ণ, আর্দ্র সুবাস আর অলিভ অয়েলের ঝাঁ ঝাঁ আঘ্রাণ একেবারে কাবু করে ফেলল যেন সবাইকে। গ্র্যাড স্কুলের কো-অর্ডিনেটর এসে জানিয়ে গেল, পিৎজা পার্টির পর রেজাল্ট নিয়ে দুকথা আলোচনা হবে। আর তারপর ক্লাস যথারীতি।

default-image

কিসের দুকথা। যে দশ কথা শুনে এসেছি, তার কাছে দু-চার কথা যে বেজায় মামুলি। আর বাড়তি ঘাবড়ে না গিয়ে ভীষণ মনোযোগে তিন কোনা এক টুকরা পিৎজা গালে পুরে দিলাম। অরেগানো আর রোজমেরির মেডিটারিয়ান স্বাদে চোখ বুজে এল আবেশে। এমন বেশরম ছাত্র জার্মান দেশে এর আগে আর এসেছে কি না, সন্দেহ। (চলবে)

লেখক: পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক: ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, স্কুল অব মেডিসিন,
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন