বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্ল্যান শেষ। অ্যাকশন শুরু। কীভাবে যাব? অপশন অনেক। ফেরিভ্রমণে পূর্ব অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। স্ত্রী-কন্যা চাইছে উড়ালযোগে যাওয়া যেত যদি। নাহ, সে উপায় নেই। চুম্পন, সামুই, ফুকেট, ক্রাবি বা সুরাত থানি পর্যন্ত আকাশযানে যাওয়া যায়। বাকি পথ ফেরি। তার মানে, ফেরি নিতেই হবে।

তার চেয়ে রেলভ্রমণ আনন্দদায়ী মনে হলো। পরদিন সন্ধ্যায় রেলযোগে যাত্রা, ব্যাংককের ছয়া লামফং স্টেশন থেকে। খুব দ্রুতগতির নয়, তবু রাত তিনটে নাগাদ চুম্পন পৌঁছে গেলাম। নেমেই ফেরির টিকিট নিয়ে নিলাম।

default-image

আমাদের সঙ্গেই ট্রেন থেকে নামলেন নানান বয়সী জনাবিশেক পর্যটক। দু-একটি পরিবারও আছে, তবে আমাদের পাঁচ বছরের রোদেলার চেয়ে ছোট কেউ নয়।

স্টেশনে পর্যাপ্ত আলো নেই। বেরিয়ে এলাম আমরা। তিন রাস্তার মোড়। আচমকা এক কোণে আলো জ্বলে উঠল। ছোট্ট এক দোকান। খাবারের। মাল্টিপারপাস শপ বলা যায়। খাবার, ব্যাটারি, চার্জার, সানগ্লাস, চপ্পল—অনেক কিছুই আছে। আর আছে শৌচাগার—এক নম্বর পাঁচ বাথ আর দুই নম্বর দশ। খেতে খেতে, মানুষের হাঁটাচলা দেখতে দেখতে, গল্প শুনতে শুনতে, কন্যাদের সঙ্গে খেলতে খেলতে সকাল হয়ে গেল। ফেরিওয়ালাদের গাড়িতে, না মানে ফেরি কোম্পানির গাড়িতে আধা ঘণ্টায় পৌঁছে যাই থোক মাথাম নোই পিয়ারে। এখান থেকেই ফেরি ছাড়বে সাড়ে নয়টার দিকে।

default-image

এখানেও নানান কিসিম আর গতির ফেরির সমারোহ। যারা সন্ধ্যারাতে পৌঁছাবেন, তাঁদের জন্য নাইট জেট সার্ভিস। ডেকে তোশক বিছিয়ে দেওয়া হয়, ব্যাকপ্যাকাররা ঘুমিয়ে সাত-আট ঘণ্টায় পাড়ি দেন সমুদ্র। আর দিনে আছে সংসার্ম আর লমপ্রায়া। সংসার্ম অনেকটা আমাদের লঞ্চের মতো, ঘণ্টা তিন লাগে। আর লমপ্রায়া দেখতে কেতাদুরস্ত, সময়ও লাগে পৌনে দুই ঘণ্টা, ভাড়া একটু বেশি। সময়ের কথা ভেবে লমপ্রায়াতেই যাওয়া সাব্যস্ত হলো।

default-image
থাইল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে ছোট্ট দ্বীপ। ২১ বর্গকিলোমিটার মতো হবে। ফি বছর লাখ খানেক পর্যটক নিয়ে কারবার। স্বল্প বা মধ্য বাজেটের পর্যটক, দু-পাঁচ দিনের জন্য যাঁরা আসেন, তাঁরা হয়তো ব্যাংকক, ফুকেট, চিয়াং মাই ছাড়িয়ে বড়জোর সামুই দ্বীপ পর্যন্ত যান। তাও দ্বীপে পা পড়ে না।

সময়মতোই ছেড়ে দিল অত্যাধুনিক ক্যাটামারান বোট। ততক্ষণে আকাশজুড়ে মেঘ আর ঝাঁপিয়ে নেমেছে বৃষ্টি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হলো দুলুনি। বোটের সামনের দিকেই বসেছিলাম চারপাশের সৌন্দর্য দেখব বলে। ক্রমে বাড়ছে দুলুনি। বোটের এক স্টাফ বললেন, পেছনের দিকে হয়তো একটু কম দুলবে। আমি, রূপা আর রোদেলা গিয়ে বসলাম পেছনে। তাও পরিত্রাণ নেই। হঠাৎ যেন বোট পড়ল এক ট্রায়াঙ্গেলে। দুলে উঠল বেশ জোরে, কাত হয়ে গেল অনেকটা। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে অনেকেই। বনবন করে ঘুরছে মাথা। একটু পর কন্যারাও। অনেকেরই একই দশা। দুঘণ্টাকে দুদিনের মতো দীর্ঘ লাগছে।

default-image

অবশেষে প্রায় ঠিক সময়েই কো তাওয়ের মেই হাদ পিয়ারে পৌঁছাই। রিসোর্ট থেকে গাড়ি পাঠানোর কথা, খুঁজে পেতে দেরি বিশেষ হয়নি। সমুদ্রের তীরঘেঁষা আঁকাবাঁকা পথে খোলা পিকআপে বসে মিনিট বিশেকে পৌঁছাই দ্বীপের উত্তর মেরু, দুসিত বাঞ্চা রিসোর্টে।

আমাদের বলা হলো, কটেজ এখনো ঝাড়পোঁছ চলছে। চাইলে পুলের ধারে সময় কাটাতে পারেন। ওখানে অপেক্ষা করছিল বিস্ময়। ইনফিনিটি পুল। পুল চেয়ার, সোফা, বর্ণিল গদি আর দোলনা এখানে-ওখানে। কন্যা দ্বয় পত্রপাঠ দুই দোলনার দখল নিল। আমরা সামনে তাকিয়ে দেখি, অভূতপূর্ব এক দৃশ্য। সমুদ্রের মাঝখানে ছোট তিনটি পাহাড়। সাদা বালুর সৈকত বা পথ যুক্ত করেছে তিন দিকে। ঘনশ্যাম পাহাড়, চারপাশে ঘন নীল জলরাশি, মাঝে শ্বেতশুভ্র বালুকারাজি। অকবিও কবি বনে যাবেন এমন অনন্যসাধারণ নৈসর্গিক শোভা দর্শনে। অনেকক্ষণ কথা নেই আমাদের মুখে। দুজনেই গভীর বিস্ময় আর আনন্দ নিয়ে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছি।

default-image

পুলপাশের বিশ্রামের জায়গা যে বিশাল, তা নয়। তবে বেশ সাজানো। একপাশে সোজা, বেশ কয়েকটি সিঙ্গল আর ডাবল সিটার। বেতের গোল ঝোলানো চেয়ারও আছে। দুটি দোলনা, পাশাপাশি। যেন এই ভেবেই তৈরি, বিভোর আর রোদেলা ‘বহে কিবা মৃদু বায়’।

সেই হাদ পিয়ার, দ্বীপের মধ্যাংশে আর দুসিত বাঞ্চা উত্তরে। আমরা এখন রিসোর্টের ইনফিনিটি পুলের পাশে। পাহাড়ের ঢালে এই রিসোর্ট। এখান থেকে দৃষ্টি সামনে, অর্থাৎ পশ্চিমে প্রসারিত করলেই আপনি দেখবেন সেই দৃশ্য—নাঙ ইউয়ান দ্বীপ। আসলে তিনটি দ্বীপখণ্ড বলা যায়, শিশু ব্যাঙকে যেমন বলি ব্যাঙাচি। এই তিন টুকরো সবুজ আবার পরস্পর যুক্ত শ্বেতশুভ্র বালুপথ দিয়ে। আরেকটু গভীরভাবে দেখি, লোকে এক ভূখণ্ড থেকে হেঁটে পাড়ি দিচ্ছে অন্যটিতে। রূপার সঙ্গে মুহূর্তে দৃষ্টিবিনিময় হয়ে গেল, যেভাবেই হোক, ওখানে যেতে হবে।

default-image

ততক্ষণে আমাদের বাংলো তৈরি, জানাল অ্যাটেনডেন্ট। পাহাড়ের ঢাল বরাবর সিঁড়ি করা হয়েছে, পাথর দিয়ে। ফটক খুলে দেখি, দুটি ঘর। একটি ওপরে, মাস্টার বেড। আরেকটি কয়েক ধাপ নিচে। মাস্টার বেড যথাযথ, যেমন হয়। কিন্তু অন্য ঘরটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ঘরের ভেতরেই তিন থেকে চারটি বিশাল পাথরের চাঁই। মানে পাহাড়ের আকৃতি না বদলেই ঘরটি তৈরি। ঘরের এক পাশে বিছানা, অন্যদিকে পাথর, মাঝে চেয়ার-টেবিল। যেন তস্করের মতো হামলে ঘরে ঢুকে পড়েছে পর্বতরাজি। বিভোরকে বলতেই ওর জিজ্ঞাসা, পাথরের কি প্রাণ আছে?

: নেই। তবে অনেক পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর বিশ্বাস, আছে। সেসব গল্প অন্যদিন।

default-image
ঘরের ভেতরেই তিন থেকে চারটি বিশাল পাথরের চাঁই। মানে পাহাড়ের আকৃতি না বদলেই ঘরটি তৈরি। ঘরের এক পাশে বিছানা, অন্যদিকে পাথর, মাঝে চেয়ার-টেবিল। যেন তস্করের মতো হামলে ঘরে ঢুকে পড়েছে পর্বতরাজি।

দুই ঘরের সামনে ছোট্ট উঠোন। এখানেও গার্ডেন চেয়ার আর টেবিল পাতা। ছোট্ট একটি পুলও আছে। আদর্শ ইকো রিসোর্ট বোধ হয় একেই বলে।

default-image

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেই দুপুর গড়িয়ে গেল। দুপুরের খাবার খেলাম ‘সূর্যাস্ত’ রেস্তোরাঁয়। বাচ্চারা ফ্রায়েড রাইস ও চিংড়ি, আর আমরা নিলাম প্লা থোত, মানে প্যান ফ্রায়েড ফিশ, সঙ্গে সালাদ। ক্যাটফিশ, ম্যাকরেল বা স্ল্যাপার ভাজা, সঙ্গে ঝাল ঝাল স্পেশাল সস, আর কাঁচা পেঁপের সালাদ। অমৃত যেন। শেষে ওরা আইসক্রিম, আমরা কফি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, সুস্বাদু খাবার আর উত্তম পরিবেশনা নয়নাভিরাম দৃশ্যকেও হার মানায়। তা না হলে খেতে খেতে সূর্য যে পশ্চিমাকাশে অনেকটা নেমে এসেছে, সেদিকে খেয়াল থাকবে না কেন?

মনে হতেই বেরিয়ে এলাম! পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে কাঠের বোর্ডওয়াক বানিয়ে রেখেছে সযত্নে। সেসব ধরে নামতে থাকি। বেশ অনেকটা ওপরে একের পর এক প্রস্তরখণ্ড বসিয়ে তৈরি হয়েছে চারকোনা ছোট্ট ঘর। লাল-হলুদ-নীল কাপড়ে সাজানো। সন্ধ্যা নামার আগেই সাঁঝপ্রদীপ জ্বলেছে সেখানে। বুঝলাম, ওটা রেস্তোরাঁর এক্সটেনশন। ক্যান্ডললিট ডিনারের আয়োজন চলছে।

default-image

কাঠের বোর্ডওয়াক হয়ে আমরা শেষ মাথায় চলে আসি। গোল বাঁধানো জায়গা। হেলানচেয়ার রাখা কয়েকটি। সমুদ্র শান্ত। তবু এখানটায় মৃদু ঢেউ। এ কূলভাঙা ঢেউ নয়, বরং পা ভেজানো মোলায়েম আর আদুরে ঢেউরাজি যেন। জলরাশির সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলা আর উচ্ছ্বাসে মেতে ক্লান্ত আমরা একটু ওপরে পাথরচাঁইয়ের ওপর বসি, নিঃশব্দ সূর্যাস্ত দেখব বলে। থাইল্যান্ড উপসাগরের ওপর সূর্য সাদা থেকে হলুদ হয়ে লাল, সেই সঙ্গে রাঙিয়ে দিল গোটা আকাশকে। আমরা চারজন নৈঃশব্দ্যে উপভোগ করছি রংবদল। সন্ধ্যার রাগে প্রস্তরখণ্ডের সঙ্গে ঢেউয়ের জলকেলি।

লেখক: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সচিব

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন