বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কেন? উত্তরে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘ভ্রমণে নারীদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি ফ্যামিলি থেকেও নিরাপত্তার জন্য চাপ আসে। ঘুরতে পারবে না, কাদের সঙ্গে যাচ্ছ? যেতে পারবে না। একা একা কীভাবে ঘুরবে? এমন নানা প্রশ্ন আসে পরিবার থেকে। আমার বিয়ে হলো, বাচ্চা হলো। ওই সময় আমি দেখলাম, কলেজের যে বন্ধুরা ছিল, তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই। তখন আমার চিন্তা এল, আমি কী করতে পারি? কীভাবে আমরা নিরাপদে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারি। কীভাবে সুন্দরভাবে কোথাও যেতে পারি।’

default-image

তখন কী করলেন? ‘তখন আমি ফেসবুকে প্রথমে একটি পোস্ট করি নারীদের একটি গ্রুপে। সেখানে লিখি—‘আমি নারীদের জন্য ভ্রমণের একটি গ্রুপ করতে চাই। যেখানে আমার একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব। একসঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাব। ছেলেরা যেভাবে গ্রুপ করে ঘোরে, আমরাও সেভাবে গ্রুপ করে ঘুরব। তখন প্রচুর সাড়া পেলাম। প্রথম দিন এক হাজারের মতো নারী আমাদের গ্রুপে জয়েন করেছিলেন। এখন এই গ্রুপের সদস্যের সংখ্যা ৭৬ হাজারের বেশি। এ  পর্যন্ত আসতে আমাদের চার বছর সময় লাগল। এভাবেই আমার পথ চলা শুরু হলো।’

এখান থেকে ব্যবসা করেন কীভাবে? মেহজাবীন বলেন, ‘বুঝলাম ভ্রমণ নিয়ে নারীদের ভীষণ আগ্রহ। তখন আমি এটাকে বাণিজ্যিকভাবে শুরু করলাম। যখন আমি মানুষকে ভালো সেবা দেব, তখন এখান থেকে আমার আয় আসতে হবে। বিষয়টি ভালোভাবে দেখাশোনা করতে হলে আমাকে আয়ের বিষয়টিও চিন্তা করতে হবে। তখন আমি পুরো ব্যাপারটিকে ব্যবসায় হিসেবে নিলাম, দেখলাম এটা সুন্দরভাবেই পরিচালনা করতে পারছি। সবকিছু নিয়েই সুন্দরভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।’

পার্থ শংকর সাহা জানতে চান, ‘আপনি একটি প্রতিষ্ঠান করেছেন। উত্তরায় আপনার অফিস। পুরো বিষয়টির সঙ্গে তো নারী-পুরুষ মিলিয়ে অনেক মানুষ আছেন। তাঁরা এখানে কাজ করে আর্থিকভাবে ভালো আছেন। কীভাবে দেখছেন বিষয়টি?’ উত্তরে মারজীয়া মেহজাবীন বলেন, শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও আমাদের অনেক এজেন্সি আছে। আমরা প্রায় ১২টি দেশে নারীদের ভ্রমণ করিয়েছি। করোনায় অনেক এজেন্সি ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন হোটেল ও রিসোর্ট থেকে আমার কাছে অনেক অনুরোধ আসতে থাকে। আপনার যদি একটি–দুটি টিমও দেন, তাহলে আমরা খেয়ে–পরে থাকতে পারব। করোনার সময় আমিই প্রথম ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছি। বেশ ভালো সাড়া পেয়েছি।’


‘প্রতিবন্ধকতার কথা শুনলাম। এবার আপনার প্রেরণার কথা শুনি। কারা ছিলেন আপনার এ কাজের প্রেয়ণা হিসেবে?’ এমন প্রশ্নে উত্তর এল ‘আমি যখন এটা শুরু করি, তখন কারও কোনো ধারণাই ছিল না যে এটা একটি বাণিজ্যিক বিষয় হতে পারে। এটা দিয়ে ব্যবসা করা যেতে পারে। আমি প্রথমে অনেকেই বলতেই সাহস পাইনি, আমি কী করছি। আমার মা-বোন কাউকে জানাইনি। শুধু স্বামী জানতেন। একসময় তিনি আমাকে বলেন, এখান থেকে তো কোনো টাকা আসছে না। তাহলে এটা করছ কেন? তারচেয়ে ভালো তুমি কোথাও চাকরি করো। এ কথা শুনে আমি আস্তে আস্তে এটাকে কনভার্ট করলাম একটা বিজনেস সেক্টরে। তখন পুরো জিনিসটাই হয়ে গেল অন্যরকম। তাই বলব, শুরুর দিকে নিদি৴ষ্ট করে বলতে গেলে আমার তেমন কোনো প্রেরণা ছিল না। আমি বিশ্বাস করি, আপনি মন থেকে যদি ভালো কিছু করেন, তাহলে অনেকেই আপনাকে প্রেরণা দেবেন। এখন ভালো করার পর প্রেরণা পাই আমার পরিবার থেকে। এখন সারা বাংলাদেশের যত নারী আছেন, সবাই আমার প্রেয়ণা। প্রেরণা কখনো একজনের হয় না। এখন পুরো পৃথিবীটাই আমার প্রেরণা।’
নারীদের ভ্রমণের গ্রুপের সঙ্গে শিশুদের কি নেওয়ার ব্যবস্থা আছে? মারজীয়া মেহজাবীনের এককথায় উত্তর ‘আছে’। নারীদের সঙ্গে তাদের সন্তান যেতে পারবে। তবে যেখানে ছোটদের জন্য সমস্যা, সেখানে তাদের নেওয়া যাবে না। এছাড়া বরফাচ্ছন্ন এলাকায় বয়স্করা যেতে পারেন না।


ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলতে গিয়ে মারজীয়া মেহজাবীন বলেন, ‘আমার পরিকল্পনা একটু ভিন্ন ধরনের। আমি বাংলাদেশের নারীদের জন্য কিছু করে রেখে যেতে চাই। নারীদের একা ভ্রমণ বা পরিবার নিয়ে ভ্রমণ নিরাপদ হয়। এটা নিয়ে আমার কাজ করছি। দেশের বাইরে গেলে প্রক্রিয়াগুলোর জন্য হয়রানি পোহাতে হয়। সেই হয়রানি দূর করার জন্য আমরা কাজ করছি। সবচেয়ে বড় কথা, নারীদের নিরাপদে ভ্রমণ করানোই আমার লক্ষ্য। অ্যাসিডদগ্ধ নারী ও বন্যাকবলিত এলাকার মানুষকে সাহায্য করাসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকার চেষ্টা করছি।’

আপনার গ্রুপে সমাজের কোন শ্রেণির নারীরা সেবা নিতে আসেন? সঞ্চালক এ বিষয়ে জানতে চাইলে মারজীয়া মেহজাবীন বলেন, ‘আমার গ্রুপে প্রথম দিকে আসতেন করপোরেট নারী বা যাঁরা পড়াশোনা করছেন তাঁরা। পরবর্তী সময়ে যাঁদের বয়স ৪০ বছরের বেশি তাঁরাও আসতে শুরু করেন। এখন ৪০ শতাংশের বেশি আসেন যাঁরা অবসরে গেছেন বা ব্যস্তজীবন থেকে দূরে আছেন এমন নারীরা। যাঁদের স্বামী–সন্তান সময় দিতে পারছেন না, তাঁরা এখন বেশি আসছেন। গৃহিণীরাও প্রচুর আসছেন। এখন সব পেশার মানুষই আসছেন। আমাদের রেসপন্স খুবই ভালো। এমনকি ফ্যামিলি থেকেও আমরা বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। স্বামী, স্ত্রী ও বাচ্চাসহ একটি যৌথ গ্রুপে আনন্দ পান না। তাঁরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলাদা করে ভ্রমণে যেতে চান। বিদেশের ভ্রমণে আমরা ফ্যামিলি নিচ্ছি; আর দেশের মধ্যের ভ্রমণ শুধুই নারীদের জন্য।

default-image

করোনাকালে ভ্রমণ খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। সে সময় আপনার অবস্থা কেমন ছিল? উত্তরে মারজীয়া মেহজাবীন বলেন, ‘২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় আট মাস নিজের কাছে খুব অসহায় লাগছিল। মনে হচ্ছিল এটিকে আর চালাতে পারব না। করোনার মধ্যে আমার গ্রুপের সদস্যাদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখতাম। তখন আমি উৎসাহমূলক পোস্ট দিতাম। পৃথিবী যখন স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তখন আমরা আবার ভ্রমণে যাব। আমার সবাই আশাবাদী ছিলাম। আমরা লিখতাম, করোনা শেষ হলে কোথায় কোথায় যাব, কী খাব। কোন কোন পোশাক পরব। এর ফলে করোনার প্যানিক থেকে কিছুটা হলো দূরে থাকা যেত। ফলে আমাদের গ্রুপের মেম্বাররা করোনার সময় কিছুটা ভালো সময় কাটিয়েছে। এভাবেই সেপ্টেম্বরেই ঝুঁকি নিয়ে আমি প্রথম ট্রিপ শুরু করি। নিরাপত্তার বিষয়টি তীক্ষ্ণ নজরদারিতে রাখি। আমার যাঁরা পরিচিত এবং সব নিয়মকানুন মেনে চলবেন, এমন একটি দল নিয়ে একটা ট্যুরের প্ল্যান করি। সেবার আমরা কক্সবাজারে গিয়েছিলাম। যাওয়া–আসার সময় গাড়িতে কাউকে মাস্ক খুলতে দিইনি। এরপর থেকে শুরু হলো আমাদের কাজ। সেপ্টেম্বরের পরে আর আমাদের বসে থাকতে হয়নি। এ বছরের যে কয়েক মাস জরুরি অবস্থা ছিল, তখন ভ্রমণ বন্ধ রেখেছিলাম। তবে তখনো প্রি-বুকিং নিচ্ছিলাম। একই সময় কিছু বিদেশ ট্যুরেরও বুকিং নিয়েছি।’

default-image

এখন তো পর্যটন এলাকা উন্মুক্ত। সবাই ঘুরতে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতি কেমন সাড়া পাচ্ছেন? সেটা কি করোনার আগের সময়ের চেয়ে বেশি নাকি কম? উপস্থাপক পার্থ শংকর সাহার এমন প্রশ্নে বর্তমান পরিস্থিতি জানাতে গিয়ে মারজীয়া মেহজাবীন বলেন, ‘আগের চেয়ে অনেক বেশি সাড়া পাচ্ছি। কোভিডের সময় আমাদের কাজ তো থেমে ছিল না। আমরা কিছু কাজ করেছি। কারণ এটা তো অনলাইন বেস গ্রুপ। আমি কিন্তু গ্রুপের সদস্যদের জন্য অনলাইনে কাজ করে গেছি। গ্রুপে প্রমোশন অফার ঘোষণা করাসহ অনেক কাজ করেছি। আমাদের অনেক কিছু চিন্তা করে পোস্ট দিতে হয়। কারণ, এটা মেয়েদের গ্রুপ। এখানে অনেক কিছু মেনে কাজ করতে হয়। আমরা করোনার মধ্যেও কাজ করেছি ঘরে বসে। আমরা কোনো কিছু থামিয়ে রাখিনি, কাজগুলো এগিয়ে নিয়েছি।’

এত সময় আপনার কথা শুনে মনে হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করেই আপনার কাজটা এগিয়েছে। সেক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভালো ব্যবহারগুলো আর কী কী ভাবে করা যায়? এর উত্তরে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এত দূরে আসা যায়? প্রথম থেকে যদি আপনি প্ল্যান করে চলেন, তাহলে ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের ওয়েবসাইট তৈরি হচ্ছে। আমার অফিস আছে। যদিও আমি অফিসকে কেন্দ্র করে এসব করিনি। আমি অনলাইনেই বেশির ভাগ কার্যক্রম করেছি। পেমেন্ট থেকে শুরু করে আমি সবকিছু ডিজিটালি করেছি। ঘরে বসেই বুকিং ও পেমেন্ট করার সুযোগ রয়েছে। আর এটার জন্য সময় দেওয়া খুবই জরুরি। সাড়ে চার বছরে আমরা মেধা খাটিয়ে ও পরিশ্রম করে এ আস্থা অর্জন করেছি। সামাজিক মাধ্যমে সুফল-কুফল দুটিই আছে। নিজেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমি কী করব! আগে আস্থা অর্জন করতে হবে। এরপর আপনি যেভাবে চান, সেভাবেই হবে। একই সঙ্গে ভালো কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে।’


সাড়ে চার বছরে আপনার এ কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কী কী? উদাহরণ দিয়ে মারজীয়া বলেন, ‘গাড়ি বা বাহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি আমি। গাড়ি দেখানোর সময় দেখায় একটা আর ভ্রমণে যাওয়ার সময় দেয় আরেকটা। শেষ মুহূর্তে তখন আমাদের আর কিছু করার থাকে না। এক্ষেত্রে আমরা ভোক্তা অধিকার বা আইনি ব্যবস্থার শরণাপণ্ন হলেও ভালো কোনো সমাধান পাই না। একবার বিজনেস ক্লাস দেওয়ার কথা বলে দিল ইকোনমি ক্লাস। এটা দেখার পর আমরা পুলিশের কাছে অভিযোগ দেওয়ার জন্য থানায় যাই। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আসলে আমাদের দেশে এ বিষয়গুলো দেখার জন্য কোনো সংস্থা নেই। এটা আমাদের জন্য বড় একটি প্রতিবন্ধকতা। এ ছাড়া অন্য প্রতিবন্ধকতাগুলো তেমন কোনো বড় ইস্যু নয়।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন