বেন নেভিস পাহাড়ের স্পিন ব্রিজ
বেন নেভিস পাহাড়ের স্পিন ব্রিজছবি: লেখক

ফোর্ট উইলিয়ামের পাঠ চুকিয়ে ধীরে ধীরে যাত্রা শুরু করলাম সারি সারি পাহাড়ের গা ঘেঁষে হাঁটাপথে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ বেন নেভিসের উদ্দেশে। চোখ মেললেই পাহাড়শ্রেণি, সবুজে ঘেরা অরণ্য আর ছোট–বড় জলের ধারা। খুবই সংকীর্ণ ট্রেইল ধরে দুপাশের সীমাহীন অপার সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে ক্লান্তিবিহীন হাঁটছি। আপাতত এই পদযাত্রা আড়াই ঘণ্টার। তবে মনে হচ্ছে এই রাস্তায় হাঁটা যাবে অনন্তকাল। ঝকঝকে সোনা রোদ, আদুরে বাতাসে বুনো ফুলের ঘ্রাণ, হুটহাট হরিণছানার ছোটাছুটি আর হাজারো পাখির মুহুর্মুহু কাকলি।

default-image

এমন অপার্থিব মুহূর্তে কানে ভেসে এল স্কটিশ ব্যাগপাইপের আওয়াজ। এসব মুহূর্তে বুকের জমিনজুড়ে একধরনের শূন্যতা অনুভূত হয়, যা হয়তো একমাত্র গীতিকবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তাঁর গানে ধরতে পেরেছিলেন। সত্যিই মনে হচ্ছিল ঠিক যেন ওই মহা সিন্ধুর ওপার থেকে কেউ কাতর প্রাণে ডেকে বলছে, আয় ছুটে আয় আমার কাছে। ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হওয়া এই স্কটিশ পাহাড়ি বাঁশির প্রেমে পড়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সেই সঙ্গে মজেছিলেন স্কটিশ লোকগানে। অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছিলেন অনেক গান। সেই সব ভাঙা গানের গল্প অনেকেই জানেন। তবে অব্যর্থভাবে আজকের এই উদাস দুপুরে সত্যিই কি জানি কিসের লাগি প্রাণ হায় হায় করে উঠল।

বিজ্ঞাপন

প্রায় আড়াই ঘণ্টা উঁচু–নিচু পাহাড়ি রাস্তা ধরে ক্লান্তিহীন হাঁটার পরে পৌঁছালাম লখাবার এলাকায়। ধীরে ধীরে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠল প্রায় ৪ হাজার ৪১৩ ফিট উঁচু ব্রিটিশ মুলুকের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ বেন নেভিস। ভরপুর গ্রীষ্মে পাহাড়ের গায়ে বরফের আস্তরণ না থাকলেও বেন নেভিস যেন ঠিকই তাঁর রাজকীয় সত্তা বজায় রেখেছে। একেবারে চূড়ায় এমনভাবে বরফের আস্তরণ রয়েছে দেখলে মনে হবে কোনো মহাযোদ্ধা মণিমানিক্য শোভিত শিরস্ত্রাণ পরে মাথা উঁচু করে আছে আকাশ ছুঁয়ে।

default-image

হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত না হলেও পেটের ইঁদুরগুলো দৌড় শুরু করল। সিদ্ধান্ত হলো একটি ছোট টংগোছের ক্যাফেতে নাশতা সেরে যাত্রা শুরু করব গ্রেট গ্লেনকো ভ্যালির দিকে। নাশতার টেবিলে ট্রাডিশনাল স্কটিশ টারটান পরা বেয়ারা নিয়ে এল কাপ কেকের মতো দেখতে একধরনের খাদ্যবস্তু। যার নাম বিখ্যাত স্কটিশ পাই। দেখতে কাপ কেকের মতো হলেও চাপ দেওয়ার পর ভেতর থেকে হড়হড় করে বেরিয়ে এল তুলতুলে নরম মাটনকুচি দিয়ে তৈরি সুস্বাদু পুর। খিদে পেটে স্কটিশ পাই আর গরম কফিতে মনের আনন্দে মজে গিয়ে রসনার তৃপ্তি বাড়িয়ে নেওয়া গেল কয়েক গুণ।

এবার আর হাঁটা নয়, আগে থেকে ঠিক করা গাড়িতে করেই যাব গ্রেট গ্লেনকো ভ্যালি আর কো নদীর রূপমাধুর্য উপভোগ করতে। প্রাচীন স্কটিশ গ্যালিক ভাষায় গ্লেন মানে হচ্ছে উপত্যকা বা ভ্যালি। সাম্প্রতিককালে গ্রেট ব্রিটেনের সবচেয়ে রোমান্টিক এলাকার খেতাব পেয়েছে ইউনেসকো হেরিটেজ সাইটের তালিকাভুক্ত এই গ্রেট গ্লেনকো। দুই পাশে উঁচু পাহাড়ি গ্লেনের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে নদী কো (coe), সম্ভবত এই কারণেই এলাকার নামকরণ হয়েছে।

default-image

ভারতবর্ষের যেমন আছে পর্বতকন্যা বিপাশা, তেমনি স্কটল্যান্ডের Buachaille Etive Beag নামে এক পাহাড়ি কোলে জন্ম নিয়ে গ্লেনকো পাশ দিয়ে মাদার ইন মেনভিল গল্পের জিমের প্রেমিকার খোলা চুলের মতো ঝরনাধারায় বহে গেছে ক্ষুদ্রকায় অথচ সব থেকে মনোলোভন সৌন্দর্যে সুশোভিত নদী ‘কো’।

বিজ্ঞাপন

সিলেটে হলে হয়তো নাম হতো কো-ছড়া। তারপর ধীরে ধীরে জনশ্রুত হতো ‘খছড়া’ নামে, কারণ আমরা সিলেটিরা মহাপ্রাণ আর অল্পপ্রাণ অক্ষরকে ওলটপালট করে উচ্চারণ করতে ভালোবাসি। ঠিক আমার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দুটো ছড়ার মতো। একটার নাম তিলুছড়া আর আরেকটার কোনো নাম নেই। এমন নামহীন ছড়া সম্ভবত আর কোথাও নেই। দুধারে শ্রীমতি টিলা আর সেই টিলার এষণায় ঘন জঙ্গল আর বেতের ঝোপের মাঝ দিয়ে কাকচক্ষু নিয়ে বয়ে যাওয়া বালুময় ছড়ায় পা ভিজিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কেটেছে আমার স্কুলবেলা।

default-image

ঠিক তেমনি দুপারে উঁচু পাহাড়কে ধারণ করে পাথুরে ভ্যালি দিয়ে শান্ত শীতল কো হেলেদুলে চলতে চলতে গ্লেনকো মেসাকার এলাকা এবং গ্লেনকো ভিলেজ পাড়ি দিয়ে নিজেকে সমর্পণ করেছে ইনভারকো নামে এক জায়গায় অবস্থিত লখ লেভেনে। আগেই বলেছি, স্কটল্যান্ডে লখ মানে লেক অর্থাৎ হ্রদ। গোটা গ্লেনকো ভ্যালি ইউনেসকো হেরিটেজ সাইটের আওতায় নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে পরম মমতায় প্রকৃতির নীরবতা আর লাবণ্যকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে সদ্যোজাত শিশুর মতো।

এই পবিত্র প্রকৃতিকন্যা ‘কো’-এর কোলে ১৬৯২ শতাব্দীর ১৩ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হয়েছিল এক নৃশংস গণহত্যা। ব্রিটিশ ইতিহাসে যাকে বলে গ্লেনকো ম্যাসাকার। যে ম্যাসাকারে আর্গিলের দশম আর্ল আর্চিবাল্ড ক্যাম্পবেলের সৈন্যরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল গ্লেনকো এলাকার ম্যাকডোনাল্ড ক্লেন নামের একটি গোত্রের পাহাড়ি আদিবাসী মানুষদের। তিন শ বছর পরও যেমন দেশে অকাতরে ধর্ষণ, নির্যাতন আর জবরদখল করা হয় আদিবাসী মানুষদের।

default-image

সেই ম্যাকডোনাল্ড ক্লেনদের অপরাধ ছিল ১৬৮৯ সালে কিং দ্বিতীয় জেমসকে অপসারণ করে কিং তৃতীয় উইলিয়াম ক্ষমতা গ্রহণ করা সত্ত্বেও তারা আগের রাজার অনুগত ছিল। সে এক বিরাট গল্প। সে না হয় হবে অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।

লেখক: পিএইচডি গবেষক ও প্রভাষক, ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, এংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটি, কেমব্রিজ

মন্তব্য করুন