বইঠা বাওয়া যে সহজ কর্ম নয়, তা যেন হাড়ে হাড়ে টের পেলেন রাজ আর অর্পিতা। তাঁদের অনেকটা ধরে বেঁধে কায়াকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সারি নদীর গভীর জলে সেই কায়াক ভাসিয়ে দিয়ে মূল নৌকাটা ধীরে ধীরে যখন সরে এল অনেকটা দূরে, তারপর আলোকচিত্রী কবির হোসেনের নির্দেশে দুজনে কায়াক ঘোরানোর জোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুর মতো কায়াক চলতে থাকল অন্য দিকে!

default-image

প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল বেড়ানো ২০২০–এর প্রচ্ছদ ছবি তুলতে দলবলে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকা লালাখালে যাওয়া। ছবির স্বার্থে দিনভর পাহাড় ডিঙানো, কায়াকিং থেকে শেষ বিকেলে নদীর কূল ঘেঁষে তাঁবু খাটানো—পর্যটকের কোনো কাজই বাদ যায়নি। যেমন বাদ যায়নি তাঁদের কায়াক চালানো রপ্ত করা। দীর্ঘ চেষ্টার পর সেদিন দুজন কায়াককে কথা শোনাতে পেরেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তবে ছবি তোলার ফাঁকে চোখ জুড়িয়ে দিয়েছিল সারি নদীর নীলজল। সারি নদী কারও কাছে লালাখাল, আবার কারও কাছে নীল নদ নামেই পরিচিত। পাহাড়ঘেরা স্বচ্ছ এই নদীর পানির রং নীল। নদীর গভীরতা যেখানে বেশি, পানির রং সেখানে গাঢ় নীল।

সেদিন রথ দেখা আর কলা বেচা যেন দুই-ই আমাদের পূরণ হয়েছিল। নৌকায় ঘোরা, পাহাড়ি কালিঞ্জিবাড়ি গ্রামের এদিক-সেদিক ঘুরে দেখা। ওই যে নদীর ওপারের নিশ্চিন্তপুর, সেই পাহাড়ি গ্রামটাও কী আমাদের টানেনি? টেনেছিল বলেই তো নাজিমগড় ওয়াইল্ডারনেস রিসোর্টের অবস্থান যে পাহাড়ের বুকে, সেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখেছি নদীর ওপারের বসতি। সারি নদীর প্রতিবেশি এই রিসোর্টেই উঠেছিলাম আমরা।

default-image

আগের দিন সন্ধ্যায় পৌঁছে কালিঞ্জিবাড়ি গ্রামের সারি নদীর নীল রূপ খুব একটা দেখা হয়নি। তাই অপেক্ষা ছিল ভোরের আলো ফোটার। পরদিন সকালের সূর্য চোখ মেলতেই নৌকা নিয়ে তাই বেরিয়ে পড়া। কনকনে শীতের সঙ্গে সফেদ কুয়াশার আস্তরণ। তারই মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে আমরা থামি জিরো পয়েন্ট এলাকায়। চলতে হয় হাঁটুপানিতে (কোথায় ঊরু পর্যন্ত ঠেকে) হেঁটে।

সেখানে নেমেই অনতিদূরের অতিকায় পাহাড়টা আমাদের স্বাগত জানিয়েছিল। পাশ থেকে একজন জানাল, এটি ভারতের মেঘালয়। আর এই যে নীল পানির সারি নদী, এটি চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের কাছে জানলাম, শীতের শুরু থেকে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি পর্যন্ত নদীর নীল স্বচ্ছ জল চোখে পড়ে। শুকনা মৌসুমে নদীর অনেক স্থানে ভেসে ওঠে চর। আমরা সেই মোক্ষম সময়ে হাজির হয়েছিলাম। তাই তো লালাখালের পূর্ণ রূপ উপভোগ করার সুযোগটাও হয়েছিল।

default-image

সেই পূর্ণ রূপ দেখতেই নীল পানির নদীর বুকে নৌকায় করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন পর্যটকেরা। বেলা বাড়তেই পর্যটকবাহী নৌকার দেখা মিলল জিরো পয়েন্টে। এই নৌকাগুলো ছাড়ে কয়েক কিলোমিটার দূরের সারিঘাট থেকে। অবশ্য সারিঘাট ছাড়াও কালিঞ্জিবাড়িসহ সারি নদীর কয়েকটি পয়েন্ট থেকেই নৌকায় ওঠা যায়। দরদাম জিজ্ঞেস করতেই এক মাঝি বলেছিলেন, ‘এখানে নৌকার হিসাব ঘণ্টাপ্রতি।’ তিনিই জানালেন, দরদাম করে নিতে পারলে প্রতি ঘণ্টায় মাঝারিমানের নৌকা ৬০০ টাকায় ভাড়া নেওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

তবে লালাখাল বা সারি নদী কিন্তু ভরবর্ষায় রূপ বদলে ফেলে। সারি তখন হয়ে ওঠে ভয়াল। পাহাড়ের দিকে আঙুল নির্দেশ করে তিনি বললেন, ‘ওই যে পাহাড়ের গায়ে দাগটা দেখেন, ওই পর্যন্ত পানি উঠে যায়।’ নদী থেকে প্রায় ২০ ফুট উঁচুমতো ওপরে পাহাড়ের গায়ে দাগ দেখিয়ে কথাটি তিনি বলেন। আমাদের কল্পনা করতে অসুবিধা হলো না, সারি নদীর সেই অন্য রূপ!

default-image

সিলেটি প্রকৃতির এমন নানা রূপ দেখতেই সেদিন যেতে চেয়েছিলাম সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের পর্যটন স্থান জাফলংয়ে। মেঘালয় পাহাড়ের কোলে পিয়াইন নদ ষড়্ঋতুর বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে—জাফলংয়ের প্রধান আকর্ষণ এই নদের কথা কে না জানে! কিন্তু সেই যাত্রায় ইস্তফা দিতে হয়েছিল।

ইস্তফা দিতে হয়েছিল স্রেফ সময়ের অভাবে। ফটোশুটের কাজ করতেই সেদিন সন্ধ্যা ঘনিয়েছিল সারি নদীর কূলে। তারপর তো রাতেই পাততাড়ি গুটিয়ে ঢাকার পথ ধরা। তাতে কি, জাফলংয়ের সান্নিধ্য না হয় সারি নদীর স্নিগ্ধতাতেই ভুলে থাকি!

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন