বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি গ্রামে বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। পশ্চিমের এই চাকচিক্য আমার মনের এবং শরীরের উভয়ের গতি সাময়িক মন্থর করে। চারদিকের আলোর ঝলকানি। সঙ্গে তাদের দেশের আরও বিস্ময় দেখার উত্তেজনা! এয়ারপোর্টের প্রতিটি ধাপে পুলিশ। একটু বেশি বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছিল। এমনটা তো অন্য কোনো দেশে দেখিনি! তবে কি নাইন–ইলেভেনের পর থেকে এত নজরদারি? ইমিগ্রেশন অফিসার দ্রুত আমায় ছাড়পত্র দিলেন। কিছু জানতেও চাইলেন না। আমায় অবাক করল।

default-image

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসার আগমুহূর্তে একখানা সিম কার্ড কিনি এয়ারপোর্টের দোকান থেকেই। এটি ছাড়া এক কদমও ফেলা যায় না। ইন্টারনেট আমাদের একেবারে ভৃত্য বানিয়ে ছাড়ল। ইউরোপ-আমেরিকার বেশ কিছু দেশে ঘুরে আমার এয়ারপোর্ট নিয়ে যা জ্ঞান লাভ হয়েছে, তা হলো কানাডা ও আমেরিকার এয়ারপোর্টগুলো একটু বেশি চকচকে, অনেকটা গোল্ড প্লেটেড গয়নার মতো। আর ইউরোপের এয়ারপোর্টগুলি? ২৪ ক্যারেট সোনার মতো, একটু অনুজ্জ্বল হয়। যত দূর মনে পড়ে, আমার টার্মিনালটির নম্বর ছিল চার। নিঃসঙ্গ অভিযাত্রী আমি। আজ অবধি কোনো এয়ারপোর্টে কেউ আমার জন্য অপেক্ষায় থেকেছে, সে রকমটি ঘটেনি। এয়ারপোর্টের দোকানদার বেশ যত্নে আমার মোবাইলের পিঠ খুলে সিমটা বসিয়ে দিলেন। বললাম, একটা উবার ডেকে দিতে পারো কি? তিনি তাই করলেন। ট্যাক্সিক্যাবে উঠে পড়লাম। গন্তব্য ব্রুকলিন। পাক্কা একানব্বই ডলার বিল উঠলো ক্যাবের মিটারে। বুকটা আমার একেবারে খ্যাঁচ করে ওঠে ইউরো-ডলারে বিল দিতে। আমি প্রথমে এখানে আমার বান্ধবী মুন্নির বাসায় উঠি।

পরদিন সকাল। হাঁটছি নিউইউর্কের ওয়াল স্ট্রিট ধরে। গন্তব্য নাইন–ইলেভেনের স্মৃতিস্তম্ভ দেখা। এটাকে বলা হয় আমেরিকানদের ‘গ্রাউন্ড জিরো’। আমাদের যেমনটা আছে ‘জিরো পয়েন্ট’। আমাদের স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের স্মৃতিস্তম্ভ। আমার মন বলে, ‘জিরো পয়েন্ট’ বা ‘গ্রাউন্ড জিরো’ শব্দগুলো একটি জাতির ক্রান্তিকালের সাক্ষী। পথে দেখা হলো নিউইয়র্কবাসীর আদরের ষাঁড়টির সঙ্গে। যার প্রকৃত নাম ‘চার্জিং বুল’। কখনো কখনো ‘বুল অফ ওয়াল স্ট্রিট’ নামেও পরিচিত। এটি একটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। কেমন ঘাড় ত্যাড়া করে তার তেজ দেখাচ্ছে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে। পর্যটকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছেন তার সঙ্গে একখানা ফটো তোলবার নেশায়। আমিও আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য কেন দেখব? আমিও ঝাঁপিয়ে পড়লাম ওই একই কাজে।

default-image

এই ষাঁড় সমৃদ্ধির প্রতীক। ষাঁড়ের মাথা নিচু হয়ে আছে, তার নাসারন্ধ্র জ্বলছে। তার লম্বা তীক্ষ্ণ শিং আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত। সে ক্ষুব্ধ, বিপজ্জনক জন্তু। পেশিবহুল দেহ এক পাশে মোচড় দেয়। লেজটি সাপের মতো বাঁকা। ষাঁড়টি উদ্যমী, গতিশীল। ষাঁড়ের মায়া ত্যাগ করে আরেকটু সামনে হাঁটছি। খানিক পরেই দেখি রাস্তাসংলগ্ন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের ভাস্কর্য। মার্কিনরা তাঁকে তাদের জাতির জনক বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল হলের দেয়াল ঘেঁষে এক আপাদমস্তক জর্জ ওয়াশিংটন। ছবি তোলার জন্য যখন কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, দেখলাম আমার সম্পূর্ণ শরীর তাঁর পদতলে। বড় মানুষের কাছে গেলে সম্মানে মনপ্রাণ বিচলিত হয়। তিনি জীবিত অবস্থায় পরম পূজনীয়, মৃত্যুর পরও পরম পূজনীয় আমেরিকানদের কাছে।

রাস্তা ধরে আরেকটু সোজা এগিয়ে গেলেই হাতের বাঁয়ে পর্যটকদের জটলা দেখলে আর বুঝতে অবশিষ্ট থাকেনা যে আমি যথাস্থানে পৌঁছেছি। বিখ্যাত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের পাদদেশে হাজির হলাম। চারিদিকে সবুজ। যেন বাগান বাড়ি। না, না, নগরের ছিটেফোঁটা সবুজ নয়, বেশি বেশি সবুজ। গাঢ় সবুজ। সবুজ ওক বাগানের মাঝে দুটি চতুর্ভুজাকৃতির বিশাল গর্ত। কালো মার্বেল পাথর দিয়ে বাঁধাই করা। সর্বক্ষণ জলপ্রপাতের মতো পানি গড়িয়ে পড়ছে। মার্বেলের ওপর খোদাই করা আছে নাইন–ইলেভেনের প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির নাম। নাইন-ইলেভেন মেমোরিয়ালের দুটি অংশ। একটি জাদুঘর আর একটি হলো এই ব্রোঞ্জের তৈরি স্মৃতিস্মারক, যা দেখতে চতুর্ভুজাকৃতির। দুটি গর্ত বা চতুর্ভুজ দেখতে দুটি জলপ্রপাতের মতো। আশপাশে নগরের সব সুউচ্চ ভবন, মাঝে এই স্মৃতিস্তম্ভ। ঠিক এই স্থানটিতে টুইন টাওয়ার ছিল। না, এই উন্মুক্ত স্থান পরিদর্শনের জন্য পর্যটকদের কোনো ডলার গুনতে হয় না। সংখ্যায় দুটি গর্ত করার তাৎপর্য হলো, ট্রেড সেন্টারের দুটি ভবন ধ্বংস হয়েছিল, তাই উত্তর ও দক্ষিণ দুটি ভবনের জন্য আলাদা গর্ত।

default-image

দুটি চতুর্ভুজাকৃতির বিশাল এই গর্তের অর্থ শূন্যতা। এই শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়; তাই এই গর্তের ভেতর অনর্গল প্রবাহিত পানিতেও গর্তের ফাঁকা অংশটুকু কখনো পূরণ হয় না। আর দেয়াল থেকে গড়িয়ে পড়া পানিকে চোখের জলের সঙ্গে তুলনা দিয়েছেন এর স্থপতি। গুগলের বিভিন্ন নথি বলছে, প্রায় পাঁচ হাজার স্থপতি আবেদন করেছিল এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রতিযোগিতায়। তার মধ্য থেকে মাত্র একজন নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি মাইকেল আরাদ। ৪০০টি ওকগাছ দিয়ে ঘেরা এই স্মৃতিসৌধ এলাকাটি। ২০০১ সালের এই দিনটিতে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ভবন ধ্বংসের ঘটনা ঘটে নিউইয়র্কে। ধূলিসাৎ হয়ে যায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। এটি কি কেবলই হামলা, নাকি যুদ্ধ? হিসেব অনেক দীর্ঘ, অনেক জটিল। এই বর্বরতা এখন বিশ্ববিদিত নাইন-ইলেভেন নামে।

স্মৃতিস্তম্ভের পাশে তৈরি করা হয়েছে একটি জাদুঘর। জাদুঘর দেখতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ালাম। টিকিটের মূল্য কত ছিল, এখন আর মনে করতে পারি না। জাদুঘরের আবার দুটি অংশ, মাটির ওপর আর মাটির নিচে। জাদুঘরের ভেতরে নামতেই আধো অন্ধকার, বৃহৎ দীর্ঘ কক্ষ। বড় বড় আয়তকার বোর্ডে বিভিন্ন ঘটনা, তথ্যচিত্র, আর চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী। বিভিন্ন ভাষায় ক্রমাগত প্রচারিত হচ্ছে। প্রদর্শিত হয়েছে ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা নানান স্মৃতিচিহ্ন। ভারমুক্ত মন নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছিলাম, ভারাক্রান্ত হয়ে বেরিয়ে এলাম।

default-image

এই এলাকার একাংশে পার্কের মতো স্থানে অনেকগুলো খাবারের দোকান। আমি একটা টার্কিশ রেস্তোরাঁর সামনে গিয়ে থামি। শরমার মতো কিছু একটা খেয়েছি। আমায় এবার ফিরতে হবে। ঠিক যে পথ দিয়ে এসেছি, সে পথ ধরে চলে যাব। গন্তব্য স্টাটেন আইল্যান্ড। আমার দেবর শিবলী আর জা রুমকি অপেক্ষা করছে। আবারও জর্জকে পাশ কাটিয়ে ষাঁড়ের গোঁয়ার্তুমি দেখতে দেখতে এলাম ফেরিঘাটে। এখানে যে ফেরিটি চলে স্টাটেন আইল্যান্ড যাওয়ার জন্য, সেটি পারাপারে কোনো ডলার খরচা করতে হয় না। মার্কিন মুলুকে এই একটা জিনিসই ফ্রিতে পাওয়া যায়।

ফেরিটি স্ট্যাচু অব লিবার্টির প্রায় গা ঘেঁষে আসা-যাওয়া করে। আমি ফেরির ভেতর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াই। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। এই কাঁদবে কাঁদবে করছে। স্ট্যাচুর শিখরের ওই নারী কেমন মেঘের মধ্যে ঘাড় উঁচিয়ে আমায় দেখছে!

লেখক: গবেষক ও পরিব্রাজক
ছবি: লেখক

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন