লুই ডি ক্যামোয়েসের মনুমেন্ট
লুই ডি ক্যামোয়েসের মনুমেন্টছবি: উইকিপিডিয়া

১১.
‘এ্যাঁ, হ্যালো, হ্যালো...’। অল্প বয়সী ট্যুর গাইড ছেলেটা মাইক্রোফোন হাতে নড়েচড়ে বসেছে। এতক্ষণে তার অস্তিত্ব জানা গেল। ‘আমরা প্রায় চলে এসেছি। আর মাত্র মিনিট পনেরো। এই ফাঁকে লিসবনের টুকটাক ইতিহাস জেনে ফেললে কেমন হয়? বাই দ্য ওয়ে, আমার নাম পেদ্রো।’ পুরো রাস্তায় কোনো খবর নেই, আর এই দশ-পনেরো মিনিটে সে আমাদের পুরো লিসবনের ইতিহাস গিলিয়ে দেবে, হুঁহ।

default-image

পেদ্রোকে দুপয়সা পাত্তা না দিয়ে ঠিক আগের মতোই গল্প-আড্ডায় বাস কাঁপাতে লাগলাম আমরা। তা ছাড়া, মাত্রই ভিভার কাছ থেকে ‘সাফল্যের সহজ পাঁচ তরিকা’ জাতীয় ক্যারিয়ার টিপস নেওয়া শুরু করেছিলাম। তার বদলে পর্তুগালের অতীত কেচ্ছাকাহিনি শোনার তেমন খায়েশ নেই আপাতত। ছেলেটা কিন্তু একটুও দমে না গিয়ে তার গাইডগিরি শুরু করে দিল।

‘লিসবন তখন ঐশ্বর্য আর ক্ষমতায় লন্ডন-প্যারিসের কাতারে। হবেই-বা না কেন। ব্রাজিলে কলোনির সুবাদে সেখানকার সোনার খনির মালিকানার বদৌলতে পর্তুগিজ সাম্রাজ্য পেট মোটা সোনার কুমির। সেই সময়ের কথা বলছি। সালটা ১৭৫৫।’ পেদ্রোর অতি চতুর ধরনের কথাবার্তা বিরক্তিকর ঠেকছে। তবুও শুনছি আরকি।

বিজ্ঞাপন

‘চমৎকার, রোদেলা এক শীতের সকাল। শহরজুড়ে সাজ সাজ রব। কী যেন একটা ধর্মীয় উৎসব সেদিন। বেশুমার মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে ঘরে-বাইরে। অলিগলি, রাজপথে ছেলে-বুড়োর হল্লায় টেকা দায়। ঠিক এমন সময়ে ঘটল অদ্ভুত ঘটনা। পায়ের নিচের মাটি দুলে উঠল আচমকাই। প্রবল ভূমিকম্প। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই গির্জার ঘণ্টাগুলো আপনা থেকেই বেজে উঠল, ঢং ঢং ঢং ঢং। লাল টালির বাড়িগুলোর দেয়ালে চিড়চিড় শব্দে ফাটল ধরতে লাগল। ইট-কাঠ খসে খসে পড়ল লোকের মাথায়। জ্বালিয়ে রাখা মোমবাতি-মশাল উল্টে পড়ে আগুন ধরিয়ে দিল মুহূর্তেই। আতঙ্ক আর আর্তচিৎকারে নরক নেমে এল শহরজুড়ে।’

default-image

গল্পে ডিজাস্টার মুভির অ্যাপোক্যালিপ্টিক ঘ্রাণ পেয়ে সবাই সোজা হয়ে বসেছি। খেয়াল করে পেদ্রো মুচকি হাসল। সে বলেই চলল, ‘কেউ জানল না যে লিসবনের কাছেই আটলান্টিকের গভীরে অজগরের মতো ঘাপটি মেরে আছে এক ফল্ট লাইন। যেখানে মিশেছে বিশাল দুটো টেকটোনিক প্লেট। সেদিন ঘড়ি ধরে সকাল সাড়ে নয়টায় প্লেট দুটোর একটা আরেকটার ওপর উঠে গিয়েছে। সুতরাং, লিসবনবাসীর দুঃস্বপ্ন সবে তো শুরু।

‘লোকজন দিগ্‌বিদিক ছুটতে ছুটতে টাগোস নদীর বন্দরে এসে ভিড় জমিয়েছে। শান্ত টাগোসের তীরেই লিসবনের গড়ে ওঠা। আজকে এই নদী পেরোলেই বুঝি শহর ছেড়ে পালানো যাবে। কিন্তু শান্ত নদী থেকে ধেয়ে এল চল্লিশ ফিট উঁচু এক সুনামি। মুহূর্তেই হাঁ করে গিলে নিল মানুষগুলোকে। তারপর মাটি কামড়ে ছেঁচড়ে নিয়ে গেল সামনে আর যা কিছু পেল। দালানকোঠা কাগজের নৌকা হয়ে ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে লাগল। তাতে যাত্রী হলো হাজারো লাশ। সুনামির ঢেউ নেমে গেলে আগুন আরও তাতিয়ে উঠল। পাঁচ দিন ধরে জ্বলল সে আগুন। তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গেল হাজার ডিগ্রি। বাঁচার আর কোনো উপায়ই থাকল না। জমকালো লিসবন রাতারাতি পাল্টে গেল গনগনে চারকোল আর কঙ্গালের অঙ্গারে ঝলসানো বীভৎস এক নরককুণ্ডলীতে।’

default-image

নরক কুণ্ডলীর ধোঁয়ার ঝাঁজ যেন আমাদের নাকেও ঠেকল। মনের ভুলেই খকখক কেশে উঠলাম কয়েকজন। এদিকে আলতো ঝাঁকি তুলে বাস এসে থেমেছে লিসবন সিটি সেন্টারে। পেদ্রো রাজপথের ভিড়ভাট্টা দেখিয়ে তার গল্পের ইতি টানল, ‘কে বলবে ইউরোপের ইতিহাসে ভয়ংকরতম ভূমিকম্পের সাক্ষী এই লিসবন। এক ধাক্কায় ত্রিশ-চল্লিশ হাজার মানুষ ভ্যানিশড ইনটু থিন এয়ার। ভাবা যায়?’
বাস থেকে নামতে গিয়ে হাত-পাগুলো ঝেড়ে নিলাম ভালো করে। এতক্ষণের নট নড়নচড়নে সেগুলোও চারকোলের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

১২.
পেদ্রো আমাদের হাতে দুটো অপশন দিয়েছে। শপিং অথবা ঘুরেফিরে শহর দেখা। ইতস্তত করছি কী করব, আর তার মধ্যেই ছোকরাটা প্রায় সবাইকে নিয়ে হাই-এন্ড ফ্যাশন স্ট্রিটগুলো আছে, সেদিকে পা চালাল। বাকি রইলাম হাতে গোনা কজন। সে কজনেরও কেউ কেউ দ্রুত হেঁটে এদিক-ওদিক সটকে পড়ল নিজের মতো ঘুরবে বলে। এবার ডানে-বাঁয়ে দাঁড়িয়ে শুধু ভিভা লামা আর মরিশিও। মরিশিওর মতো আমুদে লোক বাকিদের সঙ্গে গেল না দেখে অবাকই হলাম একটু।

default-image

‘শপিং, না কচু! জামা-জুতোর গুষ্টি কিলাই। চলো, এগোই।’ কারণটা বুঝলাম এবার। ভিভা আর আমি নিঃশব্দে তার পিছু নিলাম। ভিভা তার হাতব্যাগটা খুব করে বগলে চেপে ধরেছে। আমিও কাঁধের ব্যাগটা ঘুরিয়ে সামনে নিয়ে এসেছি। অবশ্য মরিশিওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অথচ পেদ্রো বিদায় নেওয়ার আগে পইপই করে সাবধান করেছে। ‘হঠাৎ দেখবে সুশ্রী দেখতে কোনো তরুণ বা তরুণী এসে রাস্তা কিংবা দোকানের হদিস জানতে চাইবে। যেই না হাতের ইশারায় দেখাতে যাবে, অমনি পেছন থেকে তার স্যাঙ্গাৎ তোমার ফোন-মানিব্যাগ-ক্যামেরা সরিয়ে চম্পট। মনে রেখো, লিসবন কিন্তু পকেটমারদের স্বর্গ।’

কিন্তু তেনাদের দেখা আর মিলল কই। বেশ নির্বিঘ্নেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। এর ভেতর অ্যান্টি-শপিং মরিশিওর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভিভা এক বাক্স মামুলি টাইপ কাচের থালাবাটি কিনে ফেলেছে। এখন তার চোখ সুগন্ধী সাবান আর কাঁটাচামচের সেটের দিকে। পর্তুগিজ সাবান নাকি ফরাসি পারফিউমের সঙ্গে ডুয়েল লড়তে পারে অনায়াসে। আর পর্তুগালের কাটলারি শিল্পও নাকি জগদ্বিখ্যাত ছিল এককালে। সেই নমুনা মিশিগান অবধি বয়ে না নিলেই নয়।

default-image

অ্যান্টিক চেহারার একটা ঘষামাজা চেহারার ছুরি তুলে পরখ করে দেখলাম। বাবা রে, হাতুড়ির মতো ভারী আর বাটালির মতো ভোঁতা। এক টুকরো পনিরও কাটা যাবে কি না সন্দেহ। মরিশিওর সঙ্গে একটা চোখাচোখি হয়ে গেল। ভিভা এখন কাটলারি সেট কিনলে সেটা তাকে কিংবা আমাকেই আলগাতে হবে।

খানিক পরে দেখা গেল মরিশিও আর আমি মুখ ভচকে বেজার হাঁটছি পাশাপাশি। তার কোলে কাঁটাচামচের বাক্স আর আমার হাতে সুগন্ধী সাবানের বিরাট প্যাকেট। আর আগে আগে চলছে আমাদের বস। কাচের ঘটিবাটি হাতে ভিভা লামা।

সবারই যখন হাত জোড়া, ঠিক সেই মোক্ষম সময়ে আকাশ থেকে নেমে এল ছোট্ট একটা পরি। সাদা লেইসের ঝুল ফ্রকে মেয়েটাকে আসলেই ফুটফুটে পরির মতো লাগছে। এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল, ‘হাই, এদিকটায় কোথাও কফিশপ দেখেছ তোমরা? কিংবা স্টারবাকস কি ম্যাকডোনাল্ডস?। সঙ্গে সঙ্গে মরিশিও কাটলারির বাক্সটা আমার আরেক হাতে ধরিয়ে দিয়ে লেগে গেল কফিশপের খোঁজ দিতে। পরির কফির তেষ্টা পেয়েছে বলে কথা!

default-image

পেদ্রোর হুঁশিয়ারি মনে পড়ে গেল হঠাৎ। কনুই দিয়ে একটা ইশারার গুঁতো দিতে চাইলাম। মরিশিও ততক্ষণে মেয়েটার সঙ্গে দুই পা এগিয়ে গলির মধ্যে। কোত্থেকে এক ঢ্যাঙা ভূত উদয় হয়েছে মরিশিও ঠিক পেছনে। লম্বা ছেলেটা দুই আঙুল বাড়িয়ে যেই না ব্যাগ ছুঁয়েছে, অমনি খ্যাক করে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘এইইইই! হচ্ছেটা কী? পুলিশ ডাকব

পুলিশ ওঝার নাম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢ্যাঙা ভূত এক লাফে তার সাদা পরিকে নিয়ে ভিড় ঠেলে মিলিয়ে গেল ভোজবাজির মতো। লিসবন দেখছি ছিঁচকে চোরের রাজ্য। যা হোক, আপদ বিদায় দিয়ে ভিভা আর আমি হাঁপ ছাড়লাম। খালি মরিশিওকে কিছুটা মন মরা দেখাচ্ছে পরি উড়ে যাওয়ায়।কিন্তু!’

বিজ্ঞাপন

বাক্সপেটরা নিয়ে লিসবনের উঁচু-নিচু অলিগলি ডিঙোতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এক দফা কফি-কেকের বিরতি নিয়ে বাকিটা সময় উড়িয়ে দিলাম গাছতলার বেঞ্চিগুলোয় ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে। ফিরে গিয়ে বাস ধরার তাড়া আছে। নইলে ঝিরিঝিরি বাতাসে বেকার বসে থাকতে বেশ লাগছিল। এই তো আর কিছুক্ষণ, তারপরই পর্তুগাল অধ্যায়ের শেষ। পৃথিবীটা আসলে একটা বিরাট বই। আর একেকটা দেশ যেন তার একেকটা পাতা। ইশ্, পাতার পর পাতা উল্টিয়ে যদি পুরো বইটা পড়ে নেওয়া যেত এক বসায়, কী দুর্দান্তই না হতো!

default-image

চোখ ভরে আরেকবার দেখতে দেখতে ফিরতি পথ ধরলাম। ঠিক তখনই আরও একটা দৃশ্য চোখে আটকে গেল। দারুণ রূপবান এক তরুণ এসে দাঁড়িয়েছে মাঝবয়সী ভদ্রমহিলার সামনে। ছেলেটাকে বিপন্ন স্বরে বলতে শুনলাম, ‘স্টেশনটা কোন দিকে বলতে পারেন? বাস-ট্রাম যা হোক কিছু ধরতে হবে। খুব তাড়া আমার।’ বিচলিত ভদ্রমহিলা হাতের ইশারায় রাস্তা বাতলানো শুরু করলেন। আরেকটা হাতসাফাইয়ের কেস ঘটতে যাচ্ছে বোধ হয়। কিন্তু পকেটমারির মতো স্বাধীন ব্যবসায় বাধা দেওয়ার আমরা কে? তা ছাড়া পকেটটা যখন নিজের না, তাই একগাল নির্বিকার হেসে মহানন্দে রাস্তা মাপলাম। (শেষ)

লেখক: গবেষক, ইনস্টিটিউট অব প্যাথোলজি, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি

মন্তব্য করুন