নেপাল

পাহাড়ের পাহারায়

বিজ্ঞাপন
default-image

‘আপনি কখনো ট্র্যাকিংয়ে গেছেন?’ প্রশ্নটা করা যে ভুল হয়েছে, বুঝলাম উত্তর পাওয়ার পর।

আমাদের গাড়ির চালকের নাম রাম। কথা বলে খুব কম। হিন্দিতে, নির্বিকার ভঙ্গিতে সে যা বলল তার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘নাহ। তবে আমার বাড়ি যেখানে, সেখানে অনেকেই ট্র্যাক করতে আসে।’

প্লেন থেকে নেপাল দেখছিলাম ভয়–ভয় চোখে। মনে হচ্ছিল, যে দেশে এত উঁচু–নিচু পাহাড়, সেখানে উড়োজাহাজ অবতরণ করার মতো একটা দীর্ঘ সমতল জায়গা আছে তো? রানওয়েটা ছোট। বিমানবন্দরটাও। তবে বিমান থেকে নামলেই যে একটা ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগে, সেটাই বলে দেয় এই দেশ হিমালয়ের।

ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমাদের জন্য ফুল নিয়ে অপেক্ষা করছিল নেপালি বন্ধু দুর্গা অধিকারী। তাঁর মুখের হাসি হাতের ফুলগুলোর চেয়েও সুবাস ছড়াচ্ছিল বেশি। এত সহজে আমাদের আপন করে নিল যে যাত্রার শুরুতেই এ দেশের মানুষ সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা তৈরি হলো। পাঁচ দিনের এই ভ্রমণে যত
দিন গড়িয়েছে, ধারণাটা দৃঢ় হয়েছে আরও।

গাড়ি আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। বিমানবন্দরে একটা সাত আসনের এসইউভি নিয়ে অপেক্ষা করছিল গাড়ির চালক রাম। পেছনের তিন আসন চলে গেল ব্যাগের দখলে। আর সামনে চারটি আসনে গাদাগাদি করে বসলাম আমরা পাঁচজন, দুর্গাসহ। ঠিক হলো, প্রথমেই একটা জুতসই জায়গা দেখে আমরা ডলারগুলো নেপালি রুপিতে বদলে নেব। নেপালি মমো খেয়ে তারপর রওনা হব গন্তব্য—পোখারার দিকে।

কাঠমান্ডু শহরটার সঙ্গে ঢাকার বেশ মিল। কোন রাস্তায় গেলে যানজট কম হবে, সেটা নিয়ে রাম আর দুর্গা খানিকটা আলাপ–আলোচনা সেরে নিল। ওদের কথাবার্তার এক বর্ণও আমরা বুঝলাম না। তবে বুঝলাম, অতিথিদের তারা কাঠমান্ডুর যানজট দেখাতে চায় না। ঢাকা থেকে যাওয়া আমরা চার পর্যটক দুদিকে মাথা নেড়ে এমন একটা ভাব করলাম—এই ধুলো, যানজটের শহরে তোমরা থাকো কী করে!

default-image

নেপালে গিয়ে লোকে সাধারণত এক দিন কাঠমান্ডুতে থেকে পরদিন সকালে পোখারা রওনা হয়। আমরা সেটা চাইনি। চেয়েছিলাম যত রাতই হোক, রাতের অন্ধকারেই পোখারা পৌঁছে যাব। সকালে ঘুম ভেঙে যখন হোটেলের বারান্দায় দাঁড়াব, পোখারা শহর যেন আমাদের চমকে দেয়।

পাহাড় ও পোখারা
সকাল চমকে দিয়েছিল সত্যি। সময়টা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। তীব্র শীত। ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমরা প্রথমেই যে শব্দটা বললাম, সেটা হলো—ওরেব্বাপরে! হাত দুটোকে পকেটবন্দী করতে হলো দ্রুত। নাশতার টেবিলে বসার আগ পর্যন্ত আমরা কেউই জ্যাকেটের পকেট থেকে হাত বের করার সাহস পাচ্ছিলাম না। এমনকি সেলফি তোলার জন্যও নয়।

আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সেটি অবশ্য অত্যন্ত সেলফিবান্ধব। বারান্দায় দাঁড়িয়েই চোখে পড়ে ফেওয়া লেক। লেকের ওপারে উঁচু উঁচু পাহাড়। জায়গাটার নামও খুব সুন্দর—হ্যাপি ভিলেজ। সুখী গ্রাম। এই গ্রামের সকালগুলো এতটাই নিরিবিলি যে একটু জোরে কথা বললেও অপরাধ বোধ হয়।

পোখারা শহরের মূল আকর্ষণ মূলত এই ফেওয়া লেক। হোটেলগুলো প্রায় সবই লেকের আশপাশে, তাই পোখারা গিয়ে ফেওয়া লেক না দেখার উপায় নেই। এ ছাড়া পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় বেশ কয়েকটি জায়গা আছে। এক দিনেই আমরা ঘুরে দেখেছি পিস প্যাগোডা, ডেভিস ফলস, গুপ্তেস্বর কেইভ, শেতি রিভার এবং বারাহি টেম্পল।

যদি স্রেফ চোখের শান্তি আপনার চাহিদা হয়, তাহলে এই সব জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন। আর সঙ্গে যদি খানিকটা ‘অ্যাডভেঞ্চার’ চান, তাহলে বাঞ্জি জাম্প আর প্যারাগ্লাইডিংয়ের অভিজ্ঞতা না নিলে বড় ভুল হয়ে যাবে।

কোথায় কী পাবেন
নেপালের ছোট–বড় প্রায় সব হোটেলেরই ফেসবুক পেজ আছে। গুগল আর ফেসবুকে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলে আপনি হোটেল থেকে শুরু করে বাস সার্ভিস, রেন্ট–এ–কার, প্যারাগ্লাইডিং, বাঞ্জি জাম্প, সবার সঙ্গেই যোগাযোগ করার উপায় পেয়ে যাবেন। ফোন নম্বর তো আছেই, ফেসবুকের মেসেঞ্জারে লিখলেও উত্তর আসে দ্রুত। তাই যাওয়ার আগেই সবকিছু ঠিকঠাক করে নেওয়া ভালো। হোটেল আর গাড়ির ক্ষেত্রে একটু দামাদামি করে নিলে লাভবান হবেন। ঢাকা থেকে নেপাল প্রতিদিন বাংলাদেশ বিমানের একটাই ফ্লাইট। আগেভাগে বুকিং না দিলে টিকিট পাওয়া দুষ্কর হতে পারে। নেপাল ভ্রমণের দলটা চার–পাঁচজনের হলে সবচেয়ে ভালো। সুবিধামতো একটা গাড়ি ভাড়া করে নিলে খরচ কম পড়বে, ভ্রমণটাও আয়েশে কাটবে। ঈদের ছুটিতে হিমালয়ের দেশ আপনার জন্য হতে পারে দারুণ একটা সময় কাটানোর জায়গা।
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন