বিজ্ঞাপন

কৌতূহল থেকেই বাজারটি ঘুরে দেখার ইচ্ছা পোষণ করি। ‘দামনয়েক সাদুয়াক’ নামের বাজারটি বেশ বিচিত্র। থাইদের প্রথম দিককার ঐতিহ্যবাহী সব তৈজসপত্র যেমন আছে, তেমনি রয়েছে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য কাঠের তৈরি সামগ্রী। সেখানে স্তরে স্তরে খুঁজে পাওয়া গেল স্যুভেনির, স্থানীয় শিল্পীদের পেইন্টিং, কাঠের হুঁকা থেকে শিশুদের খেলনা। কচ্ছপ থেকে কানের দুল।

default-image

মেঘহীন আকাশ, উষ্ণ সমুদ্র মিলিয়ে ব্যাংককের অক্টোবর মাসটা সত্যিই অসাধারণ। এই মাসেই থাইরা জলদেবতার উৎসবে মেতে ওঠেন। এখানকার লোকজন প্রথমে পদ্মের আকারে একটি ছোট নৌকা কলাপাতা দিয়ে তৈরি করেন। তারপর সেই নৌকায় জুড়ে দেওয়া হয় দীপ্তিমান সব বাতি, যা জলে ভেসে নদীর দেবতাদের শ্রদ্ধা জানায়। থাইদের পৌরাণিকগাথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে আজ রাতে যেন আমি ফিরে যাচ্ছি আমার শৈশবে। সেই কবেকার দাদিমার গল্প! মনে পড়ে যেখানে ‘সৈকত ছাড়িয়ে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে বেরিয়েছিল যে জেলে, অনেক দূরে...অনুজ্জ্বল তার নৌকায় রাখা লণ্ঠনের শেষ আলোকবিন্দু...!’

বিকেলে সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্টে নেমেই একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে পৌঁছেছিলাম সুকমভিট রোড। যেখানে এক হাজার বাথে তিন তারকা একটি হোটেলে দুই রাতের নৈশযাপন চুক্তি সম্পন্ন করি। ব্যাংকককে বলা হয় ‘প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শহর’ বা ‘নিষিদ্ধ বিনোদনের শহর’। এর বাইরে আছে এর আদুরে মেজাজ আর মায়াবী প্রকৃতির হাতছানি। পর্যটকেরা লোভ সামলাতে হিমশিম খান, ছুটে আসেন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে।

default-image

সুপিনকে জানালাম, আমার হাতে সময় কম। সে জন্য এবারে শুধু ব্যাংকক শহরটাই ঘুরে ঘুরে দেখব। মুচকি হাসিতে হাত নেড়ে বিদায় নিল সুপিন। পরের দিনও অপার বিনোদনের বাক্স খুলে আনন্দ দেখাতে জগৎ চেনাতে সে হচ্ছে আমার যাত্রাসঙ্গী। ক্লান্ত যুগপৎ রোমাঞ্চিত আমি বিছানায় শরীর এলিয়ে দিই।

ফুটপাতে এক মধ্যবয়সী নারী কড়াইয়ের ভেতর কী যেন গরম করছেন। সামনে ছোট ছোট টেবিল-চেয়ারের আধিক্য। পর্যটকেরা দেখি সমানে গোগ্রাসে গিলছেন। জানলাম, এখানে থাইদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার ‘প্যাড থাই’ রান্না হচ্ছে। ‘প্যাড থাই’ কথাটির অর্থ চালের নুডলস। প্রতি প্লেটের দাম ৬০ বাথ। এতই পরিচ্ছন্ন পরিবেশ যে মনে হলো স্ট্রিট ফুড গ্রহণে এখানে স্বয়ং দেবতারাও আপত্তি করবেন না!

default-image

চমৎকার শারীরিক গঠনের অধিকারী প্রায় স্বল্পবসনা পরিবেশিকার বয়স অত্যন্ত কম মনে হলো। মুক্তার মতো হাসি ছড়িয়ে তিনি যখন খাবার নেড়ে একটু-আধটু সস মিশিয়ে দিলেন, তখন কিন্তু আন্তরিকতার উষ্ণতায় পরিবেশটা আরও মহার্ঘ হয়ে উঠল। বুঝলাম, থাই খাবার মানেই সেদ্ধ কোনো কিছু আর তাতে অনিবার্য সস!

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর সিনেমা ‘দ্য বিচ’ যেখানে শুটিং হয়েছিল, সেই খাওসান রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে সুপিন জানাল, দেশটিতে কর্মজীবীর ৫৭ শতাংশই নারী। পুরুষেরা এখানে অলস প্রকৃতির হলেও থাই নারীরা অত্যন্ত কর্মঠ। পুরুষেরা জানেন শুধু কেরানিগিরি, দালালি আর গাড়ির ড্রাইভিং। বাচ্চা লালন-পালনসহ সংসার পরিচালনার আর্থিক দায়িত্ব একজন থাই নারী স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেন।

default-image

চলতি পথে চোখ জুড়াচ্ছে নানা রকমের পাব, নাইট ক্লাব, সস্তা বিয়ার, ইতালিয়ান ক্যাফে, মানি এক্সচেঞ্জ, ফলের দোকান আর ফুটপাত ধরে হেঁটে যাওয়া বেশ কিছু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে দেখে। ব্যাংকক এসেছেন অথচ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের দেখা পাননি, এটা ঘটে থাকলে তা হবে দুর্লভ ঘটনা। দূর থেকে এদের রূপ আপনাকে আকৃষ্ট করবে, কিন্তু কাছে গেলে দেখবেন ‘লেডি বয়’!

খাওসান রোডে হঠাৎ পেশিবহুল পুরুষদের একটি বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে গেলে, সুপিন উচ্চারণ করল ‘মুয়াই থাই’! ব্যাংককে এসে মায়াবী চেহারার নারীদের কোমলতায় অনেকেই হারিয়ে যান, ভুলে যান থাইদেশে বক্সিংও যে একটি শিল্পকলা! ‘মুয়াই থাই’ মূলত কিক বক্সিং। ব্যাংকক বা থাইদেশের এই ‘মুয়াই থাই’ সম্পর্কে আরও জানতে দেখতে পারেন একটি মুভি, নাম ‘ঙ-বাক: মুয়াই থাই ওয়ারিওর’। ভাগ্য ভালো হলে খাওসান রোডের প্রশস্ত রাস্তায়ও দেখা মিলবে ‘মুয়াই থাই’ যোদ্ধাদের। তুলে নিতে পারবেন নগদ সেলফি।

default-image

‘মুয়াই থাই’ যোদ্ধাদের গল্প মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সুপিন জানতে চায়, রাজা, রানি, রাজ্যসভা দেখার মতো ধৈর্য আছে কি না? ইতিহাসের প্রতি দায় এবং ঐতিহ্যের প্রতি অবিচল আগ্রহ থেকেই জানালাম, হ্যাঁ। এবারে হোক তাহলে ‘গ্র্যান্ড প্যালেস’ দর্শনের পালা। একটানা দেড় শ বছর যা ছিল থাই সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু।

সে সময়কার প্রতিপত্তিশালী রাজা প্রথম রমা এর নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন ১৭৭২ সালে। ১৮০০ সালের শেষের দিকে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া এই আলিশান প্রাসাদ সম্পর্কে জানতে পর্যটকের আগ্রহের কোনো কমতি নেই; বেশ ভিড়। এই প্যালেসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ‘টেম্পল অব দ্য এমারল্ড বুদ্ধ’। দুটি দৈত্যকার মূর্তি নয়, এ যেন অতন্দ্রপ্রহরী! ভালোবেসে মূর্তিদ্বয় চীনা বণিকেরা উপহার হিসেবে থাই রাজাকে দিয়েছিল।

default-image

মূর্তিদ্বয় এই মন্দিরের আধ্যাত্মিক প্রকৃতি আর চির ঐতিহ্যের স্থাপত্যশিল্প থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখান থেকে এগোতেই দেখা হলো ‘ওয়াট অরুণ’ বা ‘ভাট অরুণ’, যাকে বলা হয়ে থাকে ‘সূর্যোদয়ের মন্দির’। এর ঠিক উল্টো দিকে, ওয়াট ফো, শায়িত বুদ্ধমূর্তি। জনশ্রুতি, এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তি।

default-image

আমার ভেতরে খেলা করে প্রতিটি ধর্মের গভীর ছুঁয়ে ফেলার কৌতূহল। তাই এগিয়ে গিয়ে সুপিনকে জিজ্ঞেস করি, বলো তো বৌদ্ধধর্ম কেন পৃথিবীর অন্য ধর্ম থেকে আলাদা? পরক্ষণেই ওর বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর শুনে হতবাক। সে জানায়, আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা এবং মহৎ জীবনব্যবস্থা, যা সূক্ষ্ম নীতিবোধের ওপর তৈরি। বুদ্ধ তাঁর ধর্ম গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে যাবতীয় বিশ্বাসকে বর্জন করেছেন, তাই বৌদ্ধধর্ম হচ্ছে জগতের একমাত্র যুক্তিনির্ভর ধর্ম।

বিদেশে বেড়াতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা সব সময়ই কম। আবার বাঙালিদের ভ্রমণ পরিসংখ্যানে তাকালে দেখবেন, দেশের অন্দরেই সবাই ভ্রমণপর্ব সারতে ওস্তাদ। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশিরা ভ্রমণপ্রেমী জাতি হলেও পকেটের দিকে কিন্তু সবাই সাবধান! তবে বাংলাদেশিদের ব্যাংকক ভ্রমণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। এখানেই পরিচয় হলো সিলেটের বিয়ানীবাজারের বাসিন্দা নাজমুল আলবাব ভাইয়ের সঙ্গে। জানালেন, সপরিবারে বেড়াতে এসেছেন। উঠেছেন এখানকার ‘অ্যাম্বাসেডর’ হোটেলে।

default-image

বামরুনগ্রাদ হাসপাতাল কাছে, তাই আশপাশের হোটেলেও ব্যাপকসংখ্যক বাংলাদেশিরা অবস্থান করছেন। এখানে অবৈধভাবে থাকা যায় না, তবে সংখ্যায় অন্য দেশের চেয়ে স্বল্প হলেও অনেকেই ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নিয়ে কাজ করছেন। আবার বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সংখ্যাও নগণ্য নয়, এক সুকুমভিট এলাকাতেই সাত থেকে আটটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ। দোকান খুলতে এসে থাই নারীদের ভালোবাসায় অনেকেই আবার সংসারও পেতে বসেছেন! ‘অ্যাম্বাসেডর স্কয়ার’-এর সামনেই রয়েছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ভেতরেই স্যুট ডেলিভারি দিতে সক্ষম বাংলাদেশি ‘স্কয়ার ইন্টারন্যাশনাল টেইলর’। প্রতিষ্ঠানের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান জানালেন, পুরো ব্যাংককে দশটির মতো টেইলরিং শপ রয়েছে।

ব্যাংকক এক ব্যস্ত মহানগর। মানুষ এখানে হাঁটে না, ছোটে। এই যেমন রাত গাঢ় হচ্ছে ক্রমে, অথচ সন্ধ্যা সাতটা আর রাত বারোটার মধ্যে কোনো তফাত খুঁজে না পাওয়া! এখানকার প্রসিদ্ধ নাইট ক্লাবের উত্তেজনা ছুঁতে, টিকিট কেটে একটি ক্লাবে ঢুকলাম। গ্রাউন্ড ফ্লোরের পুরোটাই চকমকে আভিজাত্যে মোড়া। সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা ঝাড়বাতিটার আলো পৌঁছাচ্ছে ঘরটার প্রতিটি কোনায় আর সর্পিল সুন্দরীদের শরীরের প্রতিটি ভাঁজে। সঙ্গে হালকা ভলিউমে চলছে থাই গান। চোখমুখের গড়ন আর গায়ের রং বলে দিচ্ছে কেউ রাশিয়ান, কেউবা ভূমিকন্যা।

default-image

ছাদের ওপরে উঁকি দিয়ে দেখি, মহা হুলুস্থুল, চলছে লাইভ মিউজিক। অ্যালকোহলের মাতোয়ারা গন্ধ, শরীরের শিরশিরানিতে একটা লোক টলছে। লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো যেন ঝিমিয়ে পড়ল কিছুটা। ভাবলাম, লোকটা আবার উল্টে পড়ে যাবে না তো! এর মধ্যেই দেখি, হড়হড় করে বমি করে ফেলল লোকটা!

সকালটা ঝকঝকে স্বচ্ছ। কয়েক ঘণ্টা শপিংমল হাতড়ে বাংলাদেশ থেকে বয়ে আনা ঝোলাটা ইতিমধ্যে অর্জন করেছে পূর্ণতা। হোটেল চেক আউট, গুছিয়ে নিচ্ছি জরুরি মালপত্তরগুলো। শেষবারের মতো আমাকে বিদায় জানাতে এসেছে সুপিন। কিন্তু একি! উচ্ছলতায় ভরপুর এত মিষ্টি একটি মেয়ে আজ এত বিমর্ষ কেন? শিরদাঁড়া বেয়ে আমাকে গ্রাস করে ঠান্ডা স্রোত। নিষ্পলক দৃষ্টি মেলে কাঁপা কাঁপা হাতে হ্যান্ডশেক!

default-image

এর অন্তর্নিহিত কারণ একটাই, গত রাতে মারা গেছেন থাই জনগণের প্রাণের রাজা ভূমিবল। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা এই রাজার জন্য পান খাওয়া লাল ঠোঁটের শ্যামদেশের লোকেরা আজ শোকে মুহ্যমান। সেই শোকের প্রতিধ্বনি যেন এসে বিঁধল বঙ্গোপসাগরের উপকূলে। বাঙালির লাল-সবুজের মানচিত্রে। লঘুগামী গলার স্বরে তাই সমব্যথী আমিও!

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন