ছবি: লেখক
ছবি: লেখক

যেভাবে যাবেন

প্রথমে দেশের যেকোনো স্থান থেকে বান্দরবান যেতে হবে। তারপর বাস অথবা জিপে থানচি। সেখান থেকে বোটে রেমাক্রি। রেমাক্রি থেকে অল্প কিছুদূর যেতে পারবেন বোটে। তারপর হেঁটে যেতে হবে লিক্ষিয়াং। অথবা রেমাক্রি থেকে লিক্ষিয়াং পর্যন্ত হেঁটেই যেতে পারেন। দলবল নিয়ে গেলে জনপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ পরবে।

লিক্ষিয়াং এর দুর্ধর্ষ পথে

default-image

রেমাক্রি থেকে নৌকায় গ্রুপিংপাড়ায় এলাম। গ্রুপিংপাড়া থেকে শুরু হলো আমাদের লিক্ষিয়াং ঝরনায় যাওয়ার আসল ট্রেকিং। পাড়া থেকে ভেতরে ঢুকে যেতেই জঙ্গল শুরু হলো। জঙ্গল মানে আসলেই জঙ্গল, বেশ গভীর জঙ্গল যাকে বলা যেতে পারে। সকালের মিষ্টি রোদ আর অরণ্য, এই দুইয়ে মিলে এক অদ্ভুত আলোছায়ার খেলায় মেতে উঠেছিল। শুরুর পথটা ছিল একদম মুগ্ধ করা। দারুণ ছন্দে সবাই একে একে লাইন ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম একজন লোকাল গাইডের নির্দেশনা মেনে। সেই ঘন আর বড় বড় গাছের অরণ্য অবশ্য খুব বেশি সময় আমাদের সঙ্গে থাকেনি। অল্প কিছু সময় পরই বড় গাছের শুকনো বন পেরিয়ে আমরা আগের চেয়ে আরও ঘন গাছপালা, ঘাস, লতাপাতায় একদম জঙ্গল হয়ে থাকা পথে চলতে শুরু করেছিলাম।

১৫ মিনিটের মতো কিছুটা সমতল পথে চলার পরে ধীরে ধীরে একটু একটু করে উঁচুতে উঠতে শুরু করলাম। প্রায় ১০ মিনিট ওপরে উঠে যাওয়ার পরে, ঠিক যতটা ওপরে উঠেছিলাম, আবার ততটাই নিচে নেমে গেলাম। তবে নিচে নেমে যাওয়ার পরে আগের মতো শুকনো আর সমতল পথ না পেয়ে প্রথমবারের মতো ঝিরিপথে চলতে শুরু করলাম। বেশ স্বচ্ছ পানির ঝিরিপথ ছিল যদিও, কিন্তু নিচে কাদাযুক্ত ছিল বলে আমরা সে পথে চলতে শুরু করতেই পানি ঘোলা হয়ে গেল মুহূর্তেই।

বিজ্ঞাপন

মোটামুটি ২০ মিনিট নিজেকে কাদাজল আর ভেজা থেকে রক্ষা করতে পারলেও একটা পিচ্ছিল পাথর লাফ দিয়ে পার হতে গিয়ে আর শেষ রক্ষা হলো না। ধপাস করে পিচ্ছিল পাথর থেকে কাদা আর হাঁটুজলে পপাতচ! শরীরের একপাশ মোটামুটি মাখামাখি অবস্থা। পাথরের সঙ্গে হাত দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে হাতে হালকা ব্যথাও লাগল। তাই নিজেকে আর শুকনো পথের দিকে না নিয়ে এরপর থেকে সোজা ঝিরি আর মাঝের জলে ভরা পথে এগিয়ে যেতে শুরু করলাম।

এ অংশে যে ঝিরিপথ শুরু হলো, তা শুরুতে যেমন নিরাপদ, আলো–ঝলমলে আর কিছুটা বিস্তৃত ছিল, ১৫ মিনিটের মধ্যেই সেই পথ ঘন অন্ধকার, একদম সরু, গাছ, ঘাস, লতাপাতা দিয়ে বন্ধ হয়ে থাকা গা–ছমছমে একটা পথে রূপ নিল। গাছের ডাল কেটে, ঘাস–লতাপাতা দা দিয়ে কেটে কেটে এগিয়ে যেতে হচ্ছিল।

default-image

মোটকথা, ভীষণ রকম রোমাঞ্চকর একটা পথে চলতে শুরু করেছিলাম একজন একজন করে। আমাদের সঙ্গে মোটামুটি তিনজন গাইড ছিল সেদিন। একজন আমাদের থানচির মূল গাইড, একজন গ্রুপিংপাড়ার লোকাল গাইড আর একজন ছিল ইন্টার্ন গাইড, যে মূল গাইডের সঙ্গে এসব জায়গা চিনে নিতে আর কীভাবে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, সেই নির্দেশনা মেনে এগিয়ে চলছিল। লোকাল গাইড একদম সামনে, আমাদের গাইড মাঝে আর ইন্টার্ন গাইড একদম পেছনে পেছনে আসছিল।

প্রায় ৩০ মিনিট ঝিরিপথে চলার পরে বিশাল একটা পাহাড়ের গোড়ায় গিয়ে সবাই এক জায়গায় হলাম। যদিও শুরুতে বুঝতে পারিনি যে এত বড় আর খাঁড়া একটা পাহাড় আমাদের ট্রেক করতে হবে। ভেবেছিলাম আগের পাহাড়ের মতোই হবে বুঝি।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু না, ট্রেক শুরু করেছি, আর শেষ হচ্ছে না দেখে কিছুটা হাঁপিয়ে উঠলাম আমরা। একটু সময়ের জন্য একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের লোকাল গাইড একজন একজন করে বাঁশ বা গাছের মজবুত ডাল কেটে দিতে শুরু করায় বুঝতে পারলাম, আসলে পাহাড়ে চড়া সবে শুরু হলো। কারণ, এরপর আরও ২০ থেকে ২৫ মিনিট একদম খাঁড়া আর ভীষণ সরু পাহাড়ি ট্রেইল ধরে, বাঁশের সহায়তা নিয়ে, গাছের ডাল, শিকড়ের সাহায্য নিয়ে বেশ অনেকটা কষ্ট করে, হাঁপিয়ে উঠে, ঘেমে–নেয়ে কাহিল অবস্থা হয়ে সেই পাহাড়ের একদম চূড়ায় গিয়ে সবাই প্রথমবারের মতো বিশ্রাম নিতে বসে পড়লাম। এখানে সবাই হালকা খাবার—পানি, চা, খেজুর আর চকলেট—দিয়ে নিজেদের চাঙা করে নিয়ে আবারও উঠে পড়লাম।

default-image

এবার নামার পালা। হ্যাঁ, ঠিক যতটা উঠেছি, ততটা তো বটেই, আরও কিছুটা নেমে যেতে হয়েছিল আমাদের। তবে সেই পাহাড় বেয়ে নামা ছিল ওঠার চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর। এখানে মশার চরম উৎপাত, সেই সঙ্গে ছিল বড় বড় ধারালো ঘাসের ছোবল, জংলি নানা রকম পোকামাকড়ের আনাগোনা। প্রায় ২০ মিনিট টানা নেমে গিয়ে আবারও ঝিরিপথ। ১০ মিনিটের মতো ঝিরিপথে এগিয়ে যাওয়ার পরে একটা কাজুবাগান, দারুণ একটা জুমঘর, কিছুটা জুমের পাহাড় পেরিয়ে আবারও শুরু হলো ঝিরিপথ।

বিজ্ঞাপন

এরপর লিক্ষিয়াং পর্যন্ত সবটুকুই ঝিরিপথ। কখনো সরু, কখনো চওড়া, কখনো হাঁটুজল, কখনো কোমরসমান। তবে প্রায় পুরো ঝিরিপথই ছিল নানা রকম ছোট, বড়, মাঝারি পাথর, ঘন অরণ্য, ঘাস–লতাপাতায় অন্ধকার করে রাখা।

কখনো ভেজা পথ, কখনো কিছুটা শুকনো পথে, কখনো পাহাড়ি ট্রেইল ধরে, কখনো গভীর অরণ্য দিয়ে, গাছের শিকড় আর লতাপাতা ধরে এগিয়ে যেতে যেতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় কেটে গেছে শুধু ঝিরিপথেই। একটা সময় সবাই যখন বেশ ক্লান্ত, প্রায় তিন ঘণ্টার কাছাকাছি সময় ট্রেক করা হয়ে গেছে ততক্ষণে, তখন একজন গাইড আর সঙ্গে আরেকজনকে দেখা গেল, যারা লিক্ষিয়াং দেখে ফিরে আসছে।

default-image

তাদের কাছে জানা গেল, আর মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট পথ চললেই পৌঁছে যাওয়া যাবে কথিত দেশের সবচেয়ে উঁচু ঝরনাধারা লিক্ষিয়াংয়ের কাছে। কিন্তু সামনের পথটুকু আগের চেয়ে গভীর পানির, কোথাও কোথাও বড় বড় পিচ্ছিল পাথর আবার কোথাও ঘন ও প্রাচীন স্যাঁতসেঁতে অরণ্যের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সবাই বেশ সতর্কতার সঙ্গে, সাবধানে, পিচ্ছিল পাথরে পড়তে পড়তেই বেঁচে গিয়ে, একটা সময় বিশাল বিশাল পাথর আর পাথরের ওপরে নানা রকম পুরোনো লতাপাতা ছড়িয়ে থাকা ফাঁকফোকর দিয়ে কিছুটা দূরে অবাক বিস্ময়ে দেখলাম দেশের উচ্চতম ঝরনা লিক্ষিয়াং ঝরে ঝরে পড়ছে সুউচ্চ পাহাড়চূড়া থেকে!

সে এক অন্য রকম অনুভূতি, অদ্ভুত শিহরণ!

বিজ্ঞাপন

লিক্ষিয়াং সুউচ্চ ঝরনায়!

যাকে দেখতে দীর্ঘ তিন ঘণ্টার বেশি পথ পাহাড়, অরণ্য, ঝিরি, পাথর, কাদা মাড়িয়ে ট্র্যাক করে এসেছি, তাকে এক নজর দেখার পরে সামনের পিচ্ছিল পাথর, ঘন গাছে ছেয়ে থাকা বনপথ, পথের ওপরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা গাছের ডাল, লতাপাতার বাধা নিমেষেই ঠুনকো হয়ে গেল। যেখান থেকে প্রথম দেখা হলো, সেখান থেকে মূল ঝরনা আরও প্রায় পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। ট্রেকিংয়ের সময় পাঁচ মিনিট বেশ দীর্ঘই মনে হবে। এই পাঁচ মিনিটের পথ উত্তেজনায় আমরা মাত্র দুই মিনিটে পাড়ি দিয়ে রোদ–ঝলমলে পাথরের ওপরে গিয়ে বসলাম। সেখান থেকে লিক্ষিয়াং দেখা যাচ্ছে পুরো।

default-image

অবশ্য এখানে পাথর দিয়ে প্রকৃতি যে চমৎকার আয়োজন করে রেখেছে, হুট করে এই জায়গা এড়িয়ে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়া হয়ে ওঠে না। দারুণ কিছু পাথরের বিশ্রামস্থল পেয়ে সবাই সেখানে সাময়িক আবাস করে নিলাম যার যার সুবিধামতো।

বিজ্ঞাপন

সবার ছোট ব্যাগ, পানির বোতল, শুকনো খাবার আর অন্য সবকিছু পাথরের ওপরে রেখে প্রশান্তি অনুভব করতে শুয়েই পড়লাম। ওদিকে সকালে আমাদের জন্য রান্না করা খিচুড়ি নিয়ে আসা হয়েছিল ব্যাগে করে, সঙ্গে ডিমভাজি, পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ। গাইড তাঁর থলে বের করলেন, আর থলের ভেতর থেকে আমাদের খাবার।

default-image

একজন কলাপাতা কেটে নিয়ে এসেছেন। সেগুলো ঝরনার শীতল জলে ধুয়ে সবাই যার যার প্রয়োজনমতো খিচুড়ি আর ডিম নিয়ে সকালের নাশতা করতে শুরু করলাম। আহা কী অপূর্ব সে নাশতা! বিশাল পাথরের ওপর বসে, আকাশ আর পাহাড় থেকে ঝরে পড়া ঝরনার রূপ দেখতে দেখতে, মাঝেমধ্যে তার শীতল স্পর্শ নিয়ে নাশতা শেষ করলাম সবাই মিলে। এর আগে পাহাড়চূড়ায়, পাহাড়ের বারান্দায় নাশতা করলেও এমন ঝরনাধারার নিচে বসে নাশতা খাওয়া এই প্রথম। সে এক অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি।

নাশতা শেষ করে পাথরের ওপর কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে, বিশ্রাম নিয়ে, ধীরে ধীরে লিক্ষিয়াংয়ের খুব কাছে চলে গেলাম সবাই মিলে।

বিজ্ঞাপন

বলা হয়ে থাকে এটাই নাকি দেশের উচ্চতম ঝরনা। চারদিকে বিশাল ছাদের মতো পাথরের পাহাড়, কোথাও মাটির আর কোথাও সবুজে ছাওয়া। চারদিকেই সুউচ্চ পাহাড়ের একদম মাঝ দিয়ে ঝরে পড়ছে জলের স্রোত, যাকে আমরা ঝরনাধারা বলে থাকি। তিন চার শ ফুট উঁচু থেকে বাতাসের ঝাপটা খেয়ে মাঝেমধ্যেই এদিক-ওদিক সরে গিয়ে, কখনো সরু, কখনো বিস্তৃত হয়ে সে ঝরে পড়ছে নিচের পাহাড়ের খাঁজে, আর সেই খাঁজ থেকে আরও নিচের পাথরের ওপরে জমে থাকা জলের মধ্যে।

প্রায় আধা ঘণ্টা চুপচাপ লিক্ষিয়াংয়ের ঝরে পড়া দেখেছি যে যার মতো। মাঝেমধ্যে ছবি তুলেছি, তারপর আবার ঝরনার ঝরে পড়া উপভোগ করেছি আয়েশ করে। মাঝেমধ্যেই বাতাসে ঝরনার ছাট এসে ছুঁয়ে দিচ্ছিল আমাকে, আমাদের। অদ্ভুত সে অনুভূতি, পাথরের ওপরে, রোদের মধ্যে বসে আছি, কিন্তু শীতল ঝরনার ছুঁয়ে যাওয়া আমাদের মাঝেমধ্যেই শীত শীত একটা অনুভূতি দিয়ে যাচ্ছিল, একটু করে ভিজিয়ে দিচ্ছিল তার দুষ্টু পরশে।

default-image

চারদিকে পাথর আর অরণ্যঘেরা পাহাড়ের ঠিক মাঝে পাথরের ওপরে বসে বসে কখনো রোদ, কখনো একটুখানি মেঘ, কখনো গাছের ছায়া আর সবচেয়ে বেশি আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছিল লিক্ষিয়াং ঝরনার ধারা। মনের ইচ্ছেমতো, প্রাণের তৃষা মিটিয়ে, সময়ের দিকে না তাকিয়ে কতটা সময় যে বসে বসে, পাহাড়ে হেলান দিয়ে, পাথরে গড়িয়ে, গাছের ওপরে বিছানা বানিয়ে, আধশোয়া হয়ে সবচেয়ে উঁচু ঝরনার দিকে তাকিয়ে থেকেছি আর তার স্পর্শ নিয়ে শিহরিত হয়েছি হিসাব করিনি, সেই ইচ্ছাই হয়নি।

শুধু এভাবেই দূর থেকে নয়, তাকিয়ে থেকে নয়, একটু একটু তার স্পর্শ পেয়ে নয়, আমাদের বাঁধ ভেঙে দিয়ে, আমাদের উন্মাদ করে তুলেছিল তার ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে যাওয়া। আর আমরাও বাধ্য হয়েছিলাম সবকিছু ভুলে তার কাছে নিজেদের সঁপে দিতে, তার সুখের অশ্রুতে সুখের অবগাহনে!

সে অন্য জীবনের গল্প!

মন্তব্য পড়ুন 0