প্যারিস পর্ব

বিজ্ঞাপন
default-image

দুবাইয়ে ৫ ঘণ্টার বিরতিসহ প্রায় ১৪ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রায় একটু ক্লান্তই লাগছিল, তাই সকালে রুমে প্রবেশ করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ১১টার দিকে ঘুম ভাঙল মেসেঞ্জারে শ্রেয়সীর ফোন পেয়ে। শ্রেয়সী আমার সতীর্থ, নাচের স্কুলে নাচ শিখত, তবে অনেক বছর ধরে প্যারিসবাসী। একটা ফরাসি প্রতিষ্ঠানে হিসাব বিভাগে কাজ করছে। ১ িডসেম্বর, রোববার, প্যারিসে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। একটা নাগাদ শ্রেয়সী হোটেলে এসে উপস্থিত। ঠিক হলো দুজনে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাব। তারপর ল্যুভর মিউজিয়াম, নটর ডেম ক্যাথেড্রাল, সেন নদী, আইফেল টাওয়ার—একে একে সব ঘুরব। 

হোটেলের পাশেই একটা ফরাসি রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ সেরে নিলাম স্যামন মাছ দিয়ে। এখানে রেস্তোরাঁয় মিনারেল ওয়াটার ব্যবহারের প্রচলন নেই। খাওয়ার পানি এরা বিনা মূল্যেই দেয় এবং সেটা কাচের বোতলে, টিস্যু পেপার ব্যবহারেও ভীষণ মিতব্যয়ী। ব্যাপারটা আমার বেশ ভালো লাগল।

শহরের মানুষেরা সুশিক্ষিত এবং পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসচেতন। মেট্রো স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বাইরে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। নাক আর ঠোঁট প্রায় সাদা হয়ে গেছে। ঠান্ডায় জমে যাই কি না, সেই সংশয়ে আমি প্যারিসের রাস্তায় নাচতে আরম্ভ করে দিলাম। একটু নাচি, একটু দৌড়াই—এভাবেই মাটির নিচে মেট্রো স্টেশনে পৌঁছালাম, কাউন্টার থেকে একবারে চার দিনের টোকেন কিনলাম। ফরাসিদের যাতায়াতব্যবস্থা বেশ সুবিন্যস্ত। গণপরিবহনগুলো অভিন্ন টিকিট ব্যবহার করে, স্মার্টকার্ডের ব্যবস্থাও আছে। এর দুটি সুবিধা—বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হয় না আর মানুষের নিত্য যাতায়াতের খরচের একটা নির্দিষ্ট হিসাব রাখা সম্ভব হয়। 

দুটি মেট্রো লাইন ব্যবহার করে ল্যুভরে পৌঁছালাম। অসাধারণ অনুভূতি। শিল্পকে আগলে রাখার কী অসাধারণ রাজকীয় আয়োজন। এর সঙ্গে জুড়ে গেছে পর্যটন, জাতীয়তাবোধ আর অর্থনীতির মতো ব্যাপারগুলোও। হিমশীতল প্যারিসের বুকে উষ্ণতা জোগাতে শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্যাফে। কফি আর হট চকলেটের বিপুল চাহিদাই এগুলোর চালিকাশক্তি। ক্যাফেগুলো খাবারের সুঘ্রাণের পাশাপাশি মানুষের প্রাণবন্ত আড্ডায় মুখরিত। নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমাবেশ ঘটেছে এই শহরে, আর এ কারণে ফরাসি খাবারের পাশাপাশি থাই, চীনা, ইতালীয়, ভারতীয়, স্প্যানিশ, মেক্সিকান—সব ধরনের খাবারের দোকানই ছড়িয়ে আছে শহরজুড়ে। 

default-image

দ্বিতীয় দিনে আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন, খুব সকাল থেকেই আকাশে রোদ, ঠান্ডাও কম লাগছে। হোটেলের ঠিক পাশেই মার্টিন লুথার কিং পার্ক। ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য সুন্দর পার্কটির ভেতরে ছবি তুলতে গেলাম। আমি আর প্যারী স্মৃতি আর ক্যামেরার ফ্রেমে শরতে বন্দী হয়ে গেলাম। বিকেলে একাই বের হলাম প্যারিস অপেরা দেখার জন্য। পথপ্রদর্শক গুগল ম্যাপস। অপরিচিত জায়গায় যেখানে কেউ আমাকে চেনে না, আমি কাউকে চিনি না, সেখানে একধরনের ঝুঁকি নিয়ে পথভোলা পথিকের মতো বেরিয়ে পড়ার মধ্যে একধরনের রোমাঞ্চ আছে, এর সঙ্গে জগতের অন্য কোনো আনন্দের তুলনা
চলে না।

প্যারিস অপেরার আকৃতিগত বিশালতা আমাকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলল। বিশালত্বের সামনে গিয়েই তো নিজের ক্ষুদ্রতাকে বুঝতে পারি আমরা, আমিত্ব থেকে মুক্তি মেলে। প্যারিস অপেরায় তখন কিং লিয়ার চলছে, টিকিটের দাম ১৬৮ ইউরো, এক সপ্তাহের মধ্যে কোনো টিকিট নেই। তাই দেখাও হলো না। 

পরদিন সকাল সাড়ে ১০টায় পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গেলাম বাংলাদেশ দূতাবাসে। প্যারিসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে আমাদের নাচের দল তুরঙ্গমীর কার্যক্রম, বাংলাদেশের নাচ, নৃত্যশিল্প, ড্যান্স থিয়েটার—এই সবকিছু নিয়ে বিশদ আলোচনা হলো। এরপর রওনা হলাম প্যারিসের অন্যতম আকর্ষণীয় চত্বর শঁজেলিজের উদ্দেশে। পথে দেখা পেলাম ফ্লেম অব লিবার্টির। ব্রিটিশ রাজবধূ ও মানুষের মনের সম্রাজ্ঞী ডায়ানার প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই এর অবস্থান, তাই অনেকেই এটিকে ডায়ানার স্মৃতিস্মারক ভেবে ভুল করেন। ফ্রান্সের বিখ্যাত সব ব্র্যান্ডের বিপণিকেন্দ্র রয়েছে শঁজেলিজে। 

ফরাসি স্থাপত্যে নান্দনিকতা আর পরিমিতিবোধের ছাপ স্পষ্ট। দালানগুলোর নকশার মধ্যে একধরনের মিল বজায় রাখা হয়েছে। অ্যাপল স্টোর থেকে শুরু করে ফ্যাশন ব্র্যান্ড লুই ভুটন কোনো দোকানের গায়েই বিকট আকারের লোগো বোর্ড চোখে পড়ে না। দালানগুলো নির্মাণে নিজেদের ঐতিহ্যকেই প্রাধান্য দিয়েছে সিটি করপোরেশন। নামীদামি ব্র্যান্ডগুলোর পরিচয় বহন করছে প্রবেশ দরজার ঠিক পাশে বসানো আনুমানিক ২ ফুট দৈর্ঘ্য আর ২ ফুট প্রস্থের ছোট একটি লোগো বোর্ড।

default-image

শঁজেলিজের সুগন্ধির দোকানগুলো ভীষণ পেশাদার। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে সুগন্ধির বোতলে ক্রেতার নাম খোদাই করে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। আমার মতো পর্যটকদের ট্যাক্স ফ্রি কেনাকাটার জন্য রয়েছে তাৎক্ষণিক ক্যাশব্যাকের ব্যবস্থা। সে রকমই একটি লাউঞ্জ ছিল গ্লোবাল ব্লু। শঁজেলিজ থেকে গ্লোবাল ব্লুয়ের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করলাম গুগল ম্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী। ভাবছিলাম, না জানি কত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়! গিয়ে দেখি পুরোনো প্রাসাদের মতো একটা দালান। আমি আশপাশের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিলাম, ঠিক জায়গায় এসেছি কি না। ভেতরে গিয়ে দেখি, কোনো লাইন নেই, এমনকি কাউন্টারও নেই। এটা রীতিমতো একটা পাঁচতারা লাউঞ্জ, যেখানে প্রত্যেক পর্যটকদের সহযোগিতা করছেন এই লাউঞ্জের একজন প্রতিনিধি, রয়েছে পানীয় ও জলখাবারের ব্যবস্থা। আমি একটা ট্যাক্স রিটার্ন ফরমে সই করলাম আর সঙ্গে সঙ্গে টাকা ফেরত (ক্যাশব্যাক) পেলাম। অবাক হয়ে ভাবলাম, যে দেশে পর্যটকদের এভাবে সহযোগিতা করা হয়, সেখানেই তো পর্যটকেরা বারবার আসবে। বেরিয়ে এসে গুগল ম্যাপ দেখে বেরিয়ে পড়লাম রদ্যাঁ মিউজিয়ামর উদ্দেশে। 

 সফরের চতুর্থ, সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। খুব ভোরে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম। ফিরোজা রঙের মসলিন শাড়ি পরে রওনা হলাম ইউনেসকো সদর দপ্তরের উদ্দেশে। যেতে যেতে ভাবছিলাম সম্মেলনে কী বলব? কীভাবে আমাদের নাচের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরব। আগে থেকে একটা খসড়া লিখে রেখেছিলাম, সেটায় আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। নিরাপত্তার তল্লাশি পার হয়ে ইউনেসকোর লবিতে দাঁড়িয়ে আছি, দেশ–বিদেশের নৃত্য সংগঠকেরা আসতে শুরু করেছেন, অনেকের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। আবার পূর্বপরিচিত দু–একজনের সঙ্গেও দেখা হলো। সম্মেলন শুরু হলো। এই সম্মেলনকক্ষেই ইউনেসকোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়, আমি খবরে দেখেছি আর আজ সেখানে নিজেই বসে আছি, একটু পর মঞ্চে গিয়ে বক্তব্য দেব। এমন সৌভাগ্য কজনের হয়!

অতঃপর আমার নাম ঘোষণা করা হলো। বক্তব্যে আমাদের নাচ, নৃত্যশিল্পী, তাদের একাগ্রতা ও নতুন কিছু শেখার আগ্রহকে পুঁজি করে বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত নৃত্য প্রযোজনা নির্মাতা সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশের নাচের অঙ্গনে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানালাম। আমার কথায় সাড়া দিয়ে অনেকেই বাংলাদেশে এসে কাজ করার আগ্রহ দেখালেন। বাংলাদেশের নাচ নিয়ে আমার স্বপ্ন ও লক্ষ্য অনেক বড়। তবে সেগুলো নিয়ে কিছু লিখতে চাই না। কারণ, আমি বিশ্বাস করি কাজে। এই সংকল্পকে আরেকটু দৃঢ় করার মধ্য দিয়েই এবারের প্যারিস সফর শেষ হলো।

লেখক: নৃত্যশিল্পী, নির্দেশক ও তুরঙ্গমীর পরিচালক 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন