বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি যখন আমার ড্রাইভারকে ট্রেন স্টেশনে নিয়ে যেতে বললাম আগাম টিকিট কেনার জন্য, সে সব শুনে বলল গাড়িতে যেতে। গাড়ি মানে প্রাইভেট কার। চার শ কিলোমিটার রাস্তা। হাইওয়ে দিয়ে গেলে সাড়ে তিন বা চার ঘণ্টা। আমি ভাবলাম, মন্দ না। গিদাইন্সকে গিয়ে তাহলে আর ট্যাক্সি ভাড়া করতে হবে না।

সেপ্টেম্বর মাস। পোল্যান্ডে তখন হেমন্ত। অটাম। পোলিশরা বলে ‘ইয়েশ্যেন’। এই সময়ে গাছের পাতার রং হলুদ–কমলা আর লাল হয়। দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। ভাবলাম, সারা রাস্তা প্রকৃতি দেখতে দেখতে যাব। খুব রঙিন কোনো জায়গা পেলে ড্রাইভারকে দাঁড়াতে বলব। লাল-কমলা পাতার সঙ্গে ছবি তুলব। আমার সঙ্গে তখন ভাড়া করা একটা বিএমডব্লিউ থ্রি সিরিজের সেডান ছিল।

default-image

ড্রাইভারকে আগের দিন আমার শিডিউল জানিয়ে দিলাম। ১০ বছরের ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিতে হবে। ছেলের কাপড়চোপড় গুছিয়ে একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলাম। সে তার পছন্দমতো ইলেকট্রনিক গ্যাজেট নিয়ে নিল। গেম বয়, মিনি আইপ্যাড, পোকেমন কার্ড—এই সব। আমিও আমার স্যুটকেস গুছিয়ে গাড়ির ডিকিতে রাখলাম।

সমুদ্রতীরবর্তী শহর। শীতের জন্য অতএব বাড়তি সতর্ক হলাম। সকালে ইনটারনেট ঘেঁটেছি জুতসই একটা হোটেলের জন্য। বিদেশে হোটেল আগেভাগেই ঠিক করতে হয়। হোটেলভাড়া ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে দিয়ে রুম বুক করে ফেলতে হয়। বড় বড় হোটেলে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে রুম পাওয়া যাবে কিন্তু দেখা যাবে তা লেফট-ওভার খাবারের মতো প্রায় অচ্ছুত রুম। আর ছোটখাটো হোটেলে অনেক ক্ষেত্রে হোটেলের মালিক বা সেলস বিভাগের কাউকে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও ভাড়া নির্ঘাত বেশি হবে।

অনলাইন বুকিংয়ের ক্ষেত্রে আমি সাধারণত বুকিংডটকম ব্যবহার করি। বুকিংডটকমে আমি যতটা সম্ভব শহরের কেন্দ্রস্থলে হোটেল খুঁজতে থাকলাম, যেন হেঁটে হেঁটে মূল শহরটা দেখা যায়। একটা শহরের নাড়ি বুঝতে গেলে হাঁটার বিকল্প নেই। ভাড়া, সুযোগ-সুবিধা, রুমের প্রাপ্যতা আর স্থান বিবেচনায় নিয়ে আমি যে হোটেলটাকে বেছে নিলাম, সেটা হলো হল্যান্ড হাউস রেসিডেন্স।

খুঁত খুঁত একটা থাকল। তার নাম নিয়ে। পোল্যান্ডে এসে হল্যান্ড নামের কোন হোটেলে কেন থাকব! কিন্তু ভাবলাম, নামের মাহাত্ম্য নাহয় পরে কখনো জেনে নেব। আপাতত সুবিধাজনক বিচারে যা উত্তীর্ণ হয়েছে, তাতেই স্থির থাকি।

আমার ড্রাইভার সিলভাস্টার আদাখ। বয়স ষাটের বেশি। একসময় কাতার দূতাবাসে চাকরি করতেন। বয়সের কারণে সেখান থেকে অবসরে যাওয়ার পর আমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। টুকটাক ইংরেজি বলতে পারে। ইয়েস নো ভেরিগুডের মতো। বেশি বলতে গেলে সব গুবলেট করে ফেলে। যাত্রা শুরুর আগে তাকে জিজ্ঞেস করে নিলাম সব ঠিক আছে কি না। সব মানে আমার কোথায় কখন প্রোগ্রাম সেই শিডিউল জানা; গাড়ির পেট্রোল, ব্যাটারি, টায়ারের বায়ুচাপ, তার পোশাক–আশাক, থাকার জায়গা। তিনি ইয়েস ইয়েস বলে দরজা খুলে দিল। দুবার যখন হ্যাঁ-সূচক শব্দ করেছে, তখন নিশ্চিত হয়ে গাড়িতে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম কোন পথে যাবে। সে বলল, ‘হাইওয়ে। এ-টু, এ-ওয়ান।’

হাইওয়ে দিয়ে চার ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। ৪২৫ কিলোমিটার। আমি জানি বিকল্প পথ আছে। সেই পথে গেলে অন্তত ১০০ কিলোমিটার কমে যাবে। কিন্তু সেই পথে নাকি দুর্ঘটনা ঘটার রেকর্ড অনেক বেশি। পেশাদার চালকেরা তাই সেই অভিশপ্ত পথে নিতে চায় না। চার ঘণ্টায় আমার আপত্তি নেই। ড্রাইভার যেভাবে স্বচ্ছন্দ হয়, আমাদের তাতেই সায় থাকা উচিত।

পাঁচ বছরের পুরোনো গাড়ি। তবু ড্রাইভার স্বচ্ছন্দে ১৬০ কিলোমিটার গতিবেগে ছুটছে। হাইওয়ের দুই পাশে মাঝেমধ্যে ঘন বনরাজি। কিছু দূর পর পর বাদামি রাই বা গমখেত। হেমন্তে গাছের পাতা বদলে এখনই কিছুটা হলুদ হয়ে গেছে। এগুলো ওকে, পপলার, বার্চ বা মেপল। সূর্যের আলো পড়ায় কাণ্ডগুলো পুরো সোনালি দেখাচ্ছে। ছবি তুলতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু যে গতিবেগে গাড়ি চলছে, তাতে নিছক ছবি তোলার জন্য থামতে বলা নির্বুদ্ধিতা। তা–ও আবার গাছের ছবি। গাড়ির ভেতর থেকে চলন্ত অবস্থায় যে রকম ছবি আসে, সে রকমভাবেই কিছু ছবি তুললাম।

এ-টু থেকে এ-ওয়ান হাইওয়েতে ওঠার পর ড্রাইভারকে বললাম কোন পেট্রোল স্টেশন এলে থামতে। আমাদের হাত-পা কিছুটা নাড়ানো দরকার। দুপুর তখন দুইটা। লোটাস পেট্রলস্টেশনে আমরা থামলাম। সঙ্গে সাবওয়ে আছে একটা। লোটাস পোলিশ মালিকানাধীন ফুয়েল কোম্পানি। পোল্যান্ডের উত্তরে এদের দাপট বেশি। ছেলেকে জিজ্ঞেস করায় সে সাবওয়ে থেকে একটা চিকেন রোল নিল। আমি তাঁকে আরও কিছু মুসেলি বার এবং চুইংগাম কিনে দিলাম। বিকেল পাঁচটায় আমরা গিদাইন্সক পৌঁছে গেলাম।

আশপাশে যেদিকে তাকাই, অধিকাংশ গথিক রীতিতে তৈরি লাল ইটের ভবন। সরু সরু। পাঁচ-ছয়তলা উঁচু। গথিক রীতির সহজ পরিচয় হলো ভবনের মাথাগুলো সুচালো হয়। সূর্যের আলোতে লাল ইটগুলো আগুনের মতো উজ্জ্বল রং ধারণ করেছে। আমাদের গাড়িটা ইটের রাস্তায় কতগুলো বাঁক নেওয়ার পর থেমে গেল। আমি ভাবলাম ভুল রাস্তায় এসে পড়েছে কি না। কিছু বলার আগে ড্রাইভারই জানাল যে বাকি রাস্তাটুকু পায়ে হেঁটে যেতে হবে।

ডানে–বাঁয়ে তাকিয়ে বুঝলাম হোটেলের সামনে ঠিক আসিনি। আমাদের হোটেলটা ‘দলুগা’ স্ট্রিটে। ইংরেজিতে বলে লং স্ট্রিট। যেখানে থেমেছে সেই স্ট্রিটটা, কালো ছোট ছোট উঁচু–নিচু ইট বিছিয়ে করা। এ রকম স্ট্রিটকে বলে কবলস্টোন স্ট্রিট। পায়ে হাঁটাই দায়। তার ওপর আবার স্যুটকেস টানতে হবে। আমি বিরক্ত হলাম। স্যুটকেস নিয়ে এই পথে যাব কীভাবে?

হোটেল বুকিংয়ের সময় এমন কোনো তথ্য তো পাইনি যে গাড়ি ঢুকবে না। ড্রাইভার নিশ্চই কোনো ভুল করেছে। কিন্তু ততক্ষণে সে গাড়ির ডিকি খুলে স্যুটকেস নামিয়ে ফেলেছে। আমি কিছু বলার আগে সে স্যুটকেস হাতে নিয়ে তাকে অনুসরণ করার জন্য আমাদের অনুরোধ করে বলে, ‘টোয়েনটি মিটার অনলি।’

default-image

দেখলাম, ইটের রাস্তার মাঝখানে তিন ফুটের মতো উঁচু লোহার এক সারি পোস্ট। বুঝলাম, গাড়ি যাতে ঢুকতে না পারে, সে জন্য এই ব্যবস্থা। অগত্যা না জানি কত ‘টোয়েনটি মিটার’ হবে, এমন ভাব নিয়ে সিলভাস্টারের পিছু পিছু এগোলাম।
হল্যান্ড হাউস রেসিডেন্স চারতারকা হোটেল। পাঁচতলা উঁচু। গ্রাউন্ড ফ্লোরে কেবল একটা রেস্টুরেন্ট। রিসেপশন তিনতলায়। সরু একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হচ্ছে। আমাদের রুম চারতলায়। কিন্তু রুমে ঢুকে মন ভালো হয়ে গেল। জানালা দিয়ে বাইরের যেটুকু দৃশ্য গোচর হলো, তা দেখে চমৎকৃত হলাম।

সন্ধ্যায় রিসেপশনে হোটেল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জানলাম, একসময় গিদাইন্সকে ডাচ ব্যবসায়ীদের যাতায়াত ছিল। তাঁরা নৌপথে আসত। সওদাগরি ব্যবসা করত। কেউ কেউ নাবিক ছিল। অনেকে স্থায়ীভাবে থেকে গেছে। গিদাইন্সকের গোড়াপত্তন ও বিকাশেও ডাচরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। এখনো গিদাইন্সকে যা কিছু আদি, তার বেশির ভাগই ডাচ–সংশ্লিষ্ট। সে জন্য গিদাইন্সকের কেন্দ্রে প্রথম সারির হোটেল প্রতিষ্ঠা করতে হলে ডাচ নাম জরুরি। এই হোটেলের ডাচ কানেকশন এতই জোরালো যে ১৯৯৭ সালে ডাচ রানি বিয়েট্রিক্স গিদাইন্সকের সহস্রাব্দ উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন এবং তখন এই হোটেলও পরিদর্শন করেছিলেন। ২০১৪ সালেও ডাচ রাজা ও রানি গিদাইন্সক সফর করেছেন।

কিন্তু হল্যান্ড হাউস রেসিডেন্সের বর্তমান হোটেল ম্যানেজার পোলিশ। মার্চিন কবালবস্কি। মার্চিন বন্ধুবৎসল। তিনি জানালেন, পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ডাচরা গিদাইন্সকে আসা শুরু করে।

পরে জেনেছি, পোলিশ সরকার ইচ্ছে করেই গিদাইন্সকের সঙ্গে ডাচ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের অতীত সম্পর্ক ঝালাই করতে তৎপর—এটা বোঝাতে যে গিদাইন্সকের কেবল জার্মান অতীত ছিল তা না, বরং অমন সম্পর্ক অনেকের সঙ্গেই ছিল। মার্চিন হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাই অ্যানি চান্স, ডু ইউ হ্যাভ আ ডাচ কানেকশন?’

আমি বললাম, ‘ওরকম শক্ত কিছু না। তবে এই হোটেলে যখন পা রেখেছি, তখন কানেকশন তো একটা তৈরি হয়েই গেল।’

মার্চিন হাসছে। বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে আমাকে থাম্বস আপ দেখিয়ে বলল, ‘যদি সন্ধ্যায় পান করতে নিচে নামো, তবে প্রথম ডাচ বিয়ারটা আমিই অফার করব।’
আমি বিয়ারের ভক্ত নয়, তবে মার্চিনের সঙ্গ পেতে একসময় নিচে নামতে মনস্থির করলাম। এবার তাকেই তার প্রশ্ন ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘তোমার ডাচ কানেকশন কী?’
সে জানাল, অল্প কিছুদিন আগেও সে আমস্টারডামের এক হোটেলে চাকরি করত। ডাচ ও ফ্লেমিশ ভাষা বলতে পারে। সুতরাং ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে ডাচ এই হোটেলে চাকরি নিয়েছে। আমি গুডনাইট বলে মার্চিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে দেখলাম বারের নাম ‘ফ্লাইং ডাচম্যান রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’।

আমাদের হোটেলটা লং স্ট্রিটে। লং স্ট্রিটটা পুব-পশ্চিমে ছয় শ মিটার লম্বা। এই স্ট্রিটটাই গিদাইন্সকের প্রাণ। এটাই গিদাইন্সকের পুরোনো শহর—ওল্ড টাউন। জানালা দিয়ে দেখলাম এই স্ট্রিটে সারাক্ষণ মানুষ হাঁটছে। হাঁটছে মানে ঘোরাঘুরি করছে। এত মানুষ আসে কোথা থেকে! বেশির ভাগই নাকি পর্যটক। আমার ধারণা ছিল, পর্যটকেরা গিদাইন্সকে এলে সমুদ্রসৈকতে যায়। পুরোনো শহরে যে হারে লোকজন ঘোরাঘুরি করছে, সমুদ্রসৈকত কি তাহলে খালি পড়ে আছে!

পরদিন সকালে হোটেল থেকে নিচে নেমে ডান দিকে চোখ যেতেই দেখি উঁচু একটা ক্লক টাওয়ার। দশ–বারো তলার সমান হবে। হোটেল রিসেপশন থেকে গিদাইন্সকের একটা ম্যাপ নিয়েছিলাম। ম্যাপ দেখে বুঝলাম এটি পুরোনো টাউন হলের টাওয়ার। বাঁ দিকে রাস্তার শেষ মাথায় লাল রঙের একটা তিনতলা বিল্ডিং। লাল হলেও ম্যাপে এই বিল্ডিংয়ের নাম দেওয়া গ্রিন গেট। বিল্ডিংয়ের নিচতলায় তিনটা আর্চওয়ে আছে। সুতরাং গেট তো হতেই পারে। কিন্তু লাল রঙের হয়েও নাম কীভাবে সবুজ হলো, তা আমাকে কৌতূহলী করে তুলল। ঠিক করলাম, হোটেলে ফিরে গিয়ে মার্চিনকে এসব জিজ্ঞাসা করতে হবে।

টাউন হলের কাছেই একটা ফোয়ারা। এটা নেপচুন ফোয়ারা। এই সাতসকালেও ফোয়ারার সামনে পর্যটকদের ভিড় কম নেই। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ছবি তোলায় ব্যস্ত তাঁরা। কিছু দূর হাঁটলেই সেখানে যাওয়া যেত। ছবিও তোলা যেত। ভোরের সূর্য পূর্ব দিক থেকে এসে টাউন হলের টাওয়ারটিকে সোনালি করে রেখেছে। ছবি তোলার জন্য লোভনীয়। কিন্তু আমার ছেলে তখনো ঘুমাচ্ছে হোটেল রুমে। বের হয়ে কোথাও গেলে তাকে নিয়েই বেরোব।

হোটেলে ফেরার আগে হঠাৎ দেখলাম আমি স্ট্রিটের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, ঠিক তার উল্টো দিকে আট-দশ ফুট উঁচু একটা স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে লোকজন সেলফি তুলছে। ভিড় খুব বেশি না সেখানে।

কাছে গিয়ে দেখি, কাচ দিয়ে ঘেরা একটা বাক্সের ভেতরে বড় আকারের একটা থার্মোমিটার ধরনের জিনিস। বাক্সটার গায়ে পোলিশে লিখা ‘১৭৫২ সালে নির্মিত অরিজিনাল ফারেনহাইট থার্মোমিটার ও ব্যারোমিটার।’
আমি জানি, থার্মোমিটারের জনকের নাম ফারেনহাইট। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় প্রশ্ন ছিল, থার্মোমিটারের আবিষ্কারক কে? আমি উত্তরটা জানতাম না। কিন্তু স্কোর করার আশায় আন্দাজে বললাম, ‘মিস্টার ফারেনহাইট।’

বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু একটা ছিল, যা শুনে সবাই হাসলেও বিচারক দেখি রায় ঘোষণা করলেন, ‘কারেক্ট।’

সেই থেকে আমার নামটা মুখস্থ হয়ে আছে। পুরো নামটা তখন জানতাম না। ড্যানিয়েল গ্যাব্রিয়েল ফারেনহাইট। আমি জানতাম তিনি জার্মান নাগরিক। খোঁজ নিয়ে জানলাম, ১৬৮৬ সালে যখন তাঁর জন্ম, সেই সময়টায় গিদাইন্সক ছিল জার্মান শহর দানজিগ।
তাঁর মা–বাবা ভুলক্রমে বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে মারা গেলে মাত্র ১৬ বছর বয়সে এতিম হয়ে যান ফারেনহাইট। এই মাশরুম খাওয়া বা জোগাড় করা পোলিশদের বা এ অঞ্চলের লোকজনের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় একটা সংস্কৃতি। এ সম্পর্কে পরে বলব।

এতিম হয়ে যাওয়ায় ফারেনহাইট তখন এক ডাচ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন এবং কর্মসূত্রে বাকি জীবন প্রায় হল্যান্ডেই কাটান এবং মারাও যান সেখানে। তবে দানজিগের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো মুছে যায়নি। ১৭২৪ সালে তিনি প্রথম থার্মোমিটার আবিষ্কার করেন। তিনি পারদ ব্যবহার করেন এবং পানির বরফ হয়ে যাওয়া ও বাষ্প হয়ে যাওয়া—এই দুটি তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে থার্মোমিটার ডিজাইন করেন। কাচে ঘেরা থার্মোমিটারটি ফারেনহাইটেরই বানানো। সুতরাং এর সামনে একটা সেলফি তোলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।

ছবি তুলে হোটেলে ফিরে যাওয়ার সময় দেখলাম হোটেলের পাশে হার্ড রক ক্যাফে। আর তারপর ফারেনহাইট ক্লাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। অবাক হলাম। বাহ, ফারেনহাইটের নামে রেস্টুরেন্টও আছে! ভাবলাম, এই ক্যাফেতে এক বেলা খাব।

মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলোর নামে ওয়ারশতে একটা রেস্টুরেন্ট আছে। পিয়ানিস্ট শপাইনের নামে বার আছে। পাবলো পিকাসোর নামেও আছে। ফ্রানৎস কাফকার নামে আছে। এখানে অন্তত একজন বৈজ্ঞানিকের নামে যখন রেস্টুরেন্ট আছে, তখন একবার তো যাওয়াই উচিত। কিন্তু গিদাইন্সকের সেই সফরে শেষ পর্যন্ত আর ফারেনহাইট রেস্টুরেন্টে যাওয়া হয়নি।

বছরখানেক পর যেবার গিয়েছি, অভিজ্ঞতা হয়েছে মিশ্র। হতাশ হয়েছি, যখন দেখেছি ফারেনহাইটের কেবল নামটাই আছে। মূলত জ্যাক ড্যানিয়েলভিত্তিক আমেরিকান রেস্টুরেন্ট সেটি। টিস্কি নামের পোলিশ বিয়ারও আছে, আবার জ্যাক ড্যানিয়েলের ওপর ভর করে একাধিক ককটেলও আছে। হতাশা পুষিয়ে গেছে যখন বিফ স্টেকের প্রথম টুকরা মুখে দিয়েছি। এই স্বাদ একবার মুখে লেগে গেলে ঘুরেফিরে ফারেনহাইটে আসতেই হবে।

অ্যালকোহল যাঁরা এড়াতে চান, তাঁদের জন্যও নানা রকম ককটেল আছে। পান করার ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়, পানের চেয়ে সঙ্গী অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার সঙ্গী না থাকে, তবে অসুবিধা নেই। বারটেন্ডাররা ভালো সঙ্গী। আপনাকে গিদাইন্সকের ইতিহাস এরাই ভালো বলে দেবে। রাজনীতি নিয়েও কথা বলতে পারেন। এমনকি চিত্রকলা, দর্শন। যদি কারও গায়ে ট্যাটু থাকে, তবে সেই ট্যাটু নিয়েও গল্প জুড়তে পারেন। নিজের নিজের ট্যাটু নিয়ে সবারই গর্ব থাকে, গল্প থাকে।

বারটেন্ডারের সঙ্গে আমার গল্পও শুরু হয় তাঁর ট্যাটু নিয়ে। ডান ঘাড় আর হাত মিলে তাঁর ট্যাটু। সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে, যেখানে ঘড়ির একটা অংশ দেখা যায়। স্পষ্টতই গিদাইন্সক টাউন হল টাওয়ারের প্রতিকৃতি। নিচে পোলিশে লেখা, ‘পতসাউই তুতাই, জবাঞ্চ নাগরোদে’—এখানে চুমু দাও আর বিনিময়ে পুরস্কার নাও।

চুমু দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারিনি। আমি বরং রাজনীতি নিয়ে কথা বলা নিরাপদ মনে করলাম। কিন্তু শুরুতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার এখানে ফারেনহাইটের কিছু না পেয়ে হতাশ হয়েছি।’

উত্তরে সে বলেছে, ‘ফারেনহাইট কেন? গিদাইন্সকে আরও অনেক কিছু আছে। ওয়ালেসাকে ভুলে যাও। ডোনাল্ড টুস্ককে ভুলে যাও। আর্থুর শপেনহাওয়ারের নাম শুনেছ? ২৫ বছরে বই লিখেছে—‘অন দ্য ফোর ফোল্ড রুট অব দ্য প্রিন্সিপাল অব সাফিসিয়েন্ট রিজন’।

শপেনহাওয়ারের নাম শুনেছি। কিন্তু বারটেন্ডারের মুখে তাঁর নাম শুনব ভাবিনি। সে বলতে লাগল, ‘শপেনহাওয়ার দার্শনিক বিবেচনায় ফ্রয়েড আর আইনস্টাইনের সমান। আচ্ছা, বাদ দাও তাঁর কথা। পল বানেকির নাম শুনেছ?’
এই নামটি শুনিনি। বারটেন্ডার বলতে লাগল, নাবিক ছিল। ব্রিটেন থেকে হ্যান্স মিমলিংয়ের আঁকা ‘দ্য লাস্ট জাজমেন্ট’ চুরি করে এনেছে। এখন গিদাইন্সক জাদুঘরে আছে।

এত সব কথা বললেও তাঁর হঠাৎ মনে হলো আমি হয়তো সন্তুষ্ট নয়। আমি হয়তো জ্যোতির্বিদ বা পদার্থবিদ। হয়তো কেবল ফারেনহাইটেই আগ্রহী। সে জন্য সে বলল, ‘উল্টো দিকে ওগারনা স্ট্রিটের ৯৫ নম্বর হোল্ডিং ফারেনহাইটের আদি বাড়ি। সেখানে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে কিছু থেকে থাকবে। মাত্র এক শ মিটার দূরে।’

আমি বললাম, ‘ফাইন। ফারেনহাইটের খোঁজে এসে আমি তো প্যান্ডোরা বক্স পেয়ে গেছি। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। এত তথ্য আমাকে গাইডও দিতে পারেনি।’

সত্য কথা। বারটেন্ডাররা তথ্য জাহাজ। মুড এলে সব উগরে দেবে তারা। কিন্তু খেয়ে নেবে আমার রাতের ঘুম। সেদিনের মতো তাই গুডনাইট বলে হোটেলে ফিরলাম।

default-image

গিদাইন্সকে পরে যেহেতু অনেকবার আসা হয়েছে, ধীরে ধীরে জেনেছি ফারেনহাইট নামে একটা হোটেলও আছে। পুরোনো শহর থেকে আধা কিলোমিটারের মতো দূরে। মতওয়াভা নদী থেকে মাত্র পঞ্চাশ মিটার ভেতরে। ইন্টারনেটে হোটেলটার ছবি দেখেও কৌতূহল জেগেছে। লাল রঙের পোস্ট মডার্ন ধরনের একটা বিল্ডিং। গিদাইন্সকে এমন উত্তর আধুনিক স্থাপনা থাকবে, ভাবিনি। বিল্ডিংটাকে বাইরে থেকে দেখলে বড় একটা ফুল পাপড়ি ছড়িয়ে আছে বলে মনে হয়। ইতিমধ্যে সেখানে চার–পাঁচবার থাকা হয়ে গেছে। কিছুটা বুটিক টাইপ হোটেল। নতুন হওয়ায় ফিটিং ফিক্সচার সব টিপটপ। তবে হতাশ এখানেও হতে হয়েছে, কারণ হোটেলের মধ্যে ফারেনহাইটের স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো আলামত নেই।

ম্যানেজারকে বললাম, ‘নাম যখন ফারেনহাইটই রেখেছ, ফারেনহাইটের একটা ছবি বা জীবনী কিছু তো রাখতে পারো।’

ম্যানেজার অপ্রস্তুত ও লজ্জিত হয়ে বলল, ‘তুমিই প্রথম বোর্ডার যে এই প্রশ্ন তুলেছ। আমি নিশ্চয়ই মালিকপক্ষকে জানাব।’
আমি মন্তব্যের খাতাতেও এ কথা লিখে দিলাম। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারকেও একই কথা বলেছিলাম।

স্পেনে একাধিক রেস্টুরেন্টে দেখেছি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কোনো না কোনো স্মারক রেখে দিয়েছে। উদরপূর্তির পাশাপাশি তখন আমাদের মননেরও কিছু খোরাক জোটে।
ভবিষ্যতে যদি কোনো দিন এই হোটেলে বা সেই রেস্টুরেন্টে ফারেনহাইটের স্মারক কিছু পেয়ে যান, জানবেন, আমি একবার এই লক্ষ্যে আমার মনোভাব ব্যক্ত করেছিলাম।

ছবি: লেখক

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন