ছবি: উইকি মিডিয়া কমনস
ছবি: উইকি মিডিয়া কমনসকোলাজ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

জেইন ডবরে, জু মুভিশ পান পো আংগ্লিয়েসকু (সুপ্রভাত! স্যার, আপনি কি ইংরেজি বলতে পারেন?) হোস্টেলের সামনে ছোট্ট একফালি বাগানে শোভা পাচ্ছে বিচিত্র বর্ণের ফুল আর লতাপাতা। চেনা-অচেনা গুচ্ছ গুচ্ছ হলুদ ফুল দোল খাচ্ছে আমার চোখের কার্নিশে! সেই সঙ্গে রোজমেরির ঝাড়। প্রচণ্ড প্রতাপে হোস্টেলের দেয়াল-মেঝেতেও অবস্থান নিয়েছে নানা রঙের ফুলেল চিত্রশৈলি! তাতে এই যে ক্ষণমুগ্ধতা, পোলিশ জাতির ফুলপ্রিয়তা সম্পর্কে যেন আর কোনো সংশয় থাকে না!

default-image

ঝাঁকড়া সোনালি কেশ আর পরনে পোলিশ নারীদের চির-ঐতিহ্যের পোলিশ স্কার্ট সঙ্গে গোলাপি রঙের টপস। সপ্রতিভ তরুণী ক্যারোলিনা কিচিন্সকা। এই কম দামি হোস্টেলটির ম্যানেজার। চমৎকার ইংরেজি বাৎচিতে জানালেন, দুপুর ১২টায় রুম খালি হবে। এর আগে আমাকে রিসেপশনে অপেক্ষা করতে হবে। চাইলে ক্যানটিনে ফ্রি খাবারের বন্দোবস্ত আছে। সুযোগ নেব কি না? নাকি শহরটি ঘুরে দেখব!

বিজ্ঞাপন

শহরটি ঘুরব ভেবে দরজার বাইরে বেরোতেই তীব্রতম শীত দুমড়েমুচড়ে দিল শরীর! ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ। পোল্যান্ডে বসন্ত আসতে তখনো বেশ দেরি। ঝিকিমিকি চোখের তারায় ক্যারোলিনা হাসি চওড়া করে বলে, ফিরেই যখন এসেছ, ব্রেকফাস্টের সমাপ্তি টানো! সদ্য রান্না করা ধোঁয়া-ওঠা পরিজ, আলুর প্যানকেক, লালচে গম দিয়ে তৈরি একধরনের পোলিশ বনরুটি, যা গলায় দিতেই কিনা কটু স্বাদ! ভাবলাম, এর চেয়ে আপেল, পাউরুটি, মাখন, দুধ আর বুনো ফুলের মধুই ভালো। টমেটো চিনতে ভুল হলো না; আস্ত একটা টমেটোও নিলাম সঙ্গে।

ঝাঁকড়া সোনালি কেশ আর পরনে পোলিশ নারীদের চির-ঐতিহ্যের পোলিশ স্কার্ট সঙ্গে গোলাপি রঙের টপস। সপ্রতিভ তরুণী ক্যারোলিনা কিচিন্সকা। এই কম দামি হোস্টেলটির ম্যানেজার।

শেষে কফি নিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে সিগারেট ধরালাম স্মোকিং জোনে। এখানেও ভারতীয়দের থেকে মুক্ত হওয়া গেল না! সারা পৃথিবী তন্ন তন্ন করে চষে বেড়াচ্ছেন এই ভারতীয় দাদারা। তার আগেই দাদাদের কাছে ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ এবং শহরটির যাতায়াতব্যবস্থা সম্পর্কে অবশ্য বিস্তর জেনে নেওয়া গেল!

ট্রাম থেকে নেমে চোখে-মুখে অদম্য কৌতূহলে হাঁটছি ওল্ড টাউন স্কয়ারে। পায়ে ঠেলছি তুষারের শুভ্র আভিজাত্য। রাস্তাঘাট ঝকঝকে-তকতকে। ভিস্তলা নদীর তীরে অবস্থিত ওয়ারশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগপর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক শহরগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হতো। যত দূর জানি, পর্যটকেরা তখন একে ‘উত্তরের প্যারিস’ বলেই মনে করতেন। চমৎকার একটি মূর্তি দেখে চোখ ফেরানো দায়। আবার বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, এটাই তো সেই মূর্তি! ওয়ারশ শহরে আসার আগেই পড়েছিলাম বাল্টিক সাগরে দুটি মারমেইডের গল্প।

default-image

একবার দুই বোন তাদের শারীরিকভাবে অর্ধমহিলা, অর্ধমৎস্য সত্তা নিয়ে জলজ জীবনের প্রতি বিরক্ত হয়ে তীরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। মানবসমাজে পৌঁছাতে গিয়ে এক বোন ড্যানিশ জলদস্যুর লক্ষ্যে পরিণত হয়। অন্য বোন ভিস্তলা নদী পেরিয়ে গডাঙ্ক বন্দরে পৌঁছে ওল্ড টাউনের পাদদেশে বিশ্রাম নিতে চলে এসেছিল। এখানকার জেলেরা যখন দেখতে পেল নদী থেকে শিকার করা মাছ কেউ একজন ছেড়ে দিচ্ছে, তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়ে অপরাধীকে খুঁজতে থাকে। অবশেষে তাঁরা যখন বুঝতে পারল, এটি একটি মারমেইড ছাড়া আর কেউ নয়। অতঃপর গ্রামবাসী তাঁর আচরণে পুলকিত হয়ে থাকতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রামবাসীর এই উদারতার জন্য রোজ সন্ধ্যায় জলজসংগীত লিলিংগানে মারমেইডটি সবাইকে বিনোদিত করতেন।

বিজ্ঞাপন

যেকোনো দেশ ভ্রমণে ট্র্যাডিশনাল খাবারের প্রতি আমার বাড়তি ঝোঁক রয়েছে। রেস্তোরাঁর নামেও বৈচিত্র্য আছে ‘রেস্টোরাকজা প্রিজি জামকু’! ‘আপেটিটো’ নামে খাবারটি সস্তার জন্য মধ্যাহ্নভোজনে এখানে বেশ জনপ্রিয়। কারিভুর্স্টের সঙ্গে আলুভাজা বা মুচমুচে চিপসের রাজযোটক! টমেটো কেচাপ এবং কারি পাউডার এটাকে আরও মজাদার করে তোলে। ‘পিয়েরোগি’ ওখানকার আরেকটি সুস্বাদু পদ, কিন্তু তুলনামূলক ব্যয়বহুল। ক্রিসমাসে এটি পোল্যান্ডের লোকেরা প্রচুর পরিমাণে ভক্ষণ করে, আর স্বাদ-গন্ধে অতুলনীয়।

default-image

ওয়ারশ শহরে এই নিয়ে আমার দ্বিতীয়বার আসা। প্রথমবার আমি অবশ্য ‘গোবকি’ নামে অনবদ্য খাবারের সন্ধান পেয়েছিলাম। মনে পড়ে, আমি সেটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছিলাম, যেটা ছিল মূলত মাংস, চাল, মাশরুম ও পেঁয়াজের সমাহারে তৈরি রোল। মোড়ে মোড়ে ক্যাফে, মানি এক্সচেঞ্জ, প্রসাধনীর দোকান, সুপার শপ। পৃথক রাস্তায় বাইসাইকেলে ছুটছেন শ্বেতবর্ণের মনোহারিণী পোলিশ নারীরা। তাঁরা কিন্তু ইউরোপের মধ্যে রূপে, গুণে, আচরণে অনন্যা। অনেকে মনে করেন, পোল্যান্ডে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ের পেছনে এটাও অন্যতম অনুঘটক।

ইউক্রেন থেকে আসা পর্যটক ভিক্টর ইয়াঙ্কোভিচ। তিনি জানান, বিশ্ববাজারে পোলিশ নারী আর পোলিশ প্রসাধনী বা পারফিউম—দুটিরই বেশ সুখ্যাতি।

সে রকমই একজন ইউক্রেন থেকে আসা পর্যটক ভিক্টর ইয়াঙ্কোভিচ। তিনি জানান, বিশ্ববাজারে পোলিশ নারী আর পোলিশ প্রসাধনী বা পারফিউম—দুটিরই বেশ সুখ্যাতি। যদিও ইউরোতে কেনা যায় না তাদের, পোলিশ মুদ্রার অন্য নাম ‘ঝলটি’। তিনি আরও জানালেন, জার্মান খাবারের সঙ্গে পোলিশদের বেশ মিল। পেশায় এই চিত্রশিল্পী পঞ্চমবারের মতো দেশটিতে এসেছেন। কথায় কথায় তিনি জানাতে ভুললেন না পোলিশ ভদকার রাজসিকতা। কয়েকটি ব্রান্ডের নামও দেখি তাঁর বেশ মুখস্থ! একনিশ্বাসে বলে গেলেন, জুব্রোকা, জোলাডকোয়া গর্জকা, বেলভেদার! মনে পড়ল, বহুদিন আগে পঠিত নোবেলজয়ী পোলিশ কবি চেসোয়াভ মিউশের লেখা কয়েকটি কয়েকটি পঙ্‌ক্তি, ‘কেউ কেউ আশ্রয় খোঁজে নিরাশায়, যা কিনা/ কড়া তামাকের মতো মিষ্টি/ যেন বিনাশের সময় পান করা এক গেলাস ভদকা’।

চটজলদি বিছানায় কুঁকড়ে-মুকড়ে না গিয়ে বরং ভাব জমিয়ে ফেলাই ভালো! হাত বাড়িয়ে পরিচয়পর্ব সারতে সারতেই বলি, বলুন তো, ‘পৃথিবী কি গোল?’ উভয়ে বলেন ‘হ্যাঁ’, ‘তাহলে তো আমরা সেই দেশটিতেই চলে এসেছি, যারা বলেছিল ‘পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে!’ হো হো করে হেসে ওঠে সবাই।

ডরমিটরিতে ফিরেছি; একজন বাঙালি আগন্তুক দেখে খাটিয়ার নিচতলা, তৃতীয় তলার লোকেরা তাকিয়ে রইলেন সন্দিগ্ধ চোখে। মনে হলো রুমের মানুষগুলো যেন অ্যাকুয়ারিয়ামের ভেতর থাকা একেকটি খলবলে রঙিন মাছ, জ্বলে উঠেছে দুই জোড়া চোখ! চটজলদি বিছানায় কুঁকড়ে-মুকড়ে না গিয়ে বরং ভাব জমিয়ে ফেলাই ভালো! হাত বাড়িয়ে পরিচয়পর্ব সারতে সারতেই বলি, বলুন তো, ‘পৃথিবী কি গোল?’ উভয়ে বলেন ‘হ্যাঁ’, ‘তাহলে তো আমরা সেই দেশটিতেই চলে এসেছি, যারা বলেছিল ‘পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে!’ হো হো করে হেসে ওঠে সবাই। অট্টহাসি ছাদ স্পর্শ করে! গাম্ভীর্য ভেদ করে ওদের মৃত, হিমশীতল আবেগটা জেগে ওঠে। একজন চেক প্রজাতন্ত্রের, অপরজন রাশিয়ার। রেড স্কয়ারের ভদ্রলোক অবশেষে রেড ওয়াইনের বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে আমন্ত্রণ জানালে, অন্তরের ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আসে ধন্যবাদ নিকোলাস কোপারনিকাস!

ওয়ারশের রাস্তার দুধারে বিশাল বিশাল প্রাসাদতুল্য বাড়ি। প্রতিটির বৈশিষ্ট্যযুক্ত আকার আর স্বতন্ত্র রংই মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। শীতসকালের মনোরম তেজি রোদ ঠিকরে ওঠে। ঝলসে দেয় চোখ। কিন্তু প্রাসাদগুলোর একটা মজা আছে। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, বাইরেরটা অনেকটা প্রাচীরের মতো। ভেতরে মাঝখানে বিশাল উঠোন বা পার্ক। সেটা ঘিরে আবার ছোট বহুতল।

default-image

হাঁটতে হাঁটতে গুগল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে চলে এসেছি, পোল্যান্ডের সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞান প্রাসাদটি পরিদর্শনে। ২৩৭ মিটার উচ্চতা নিয়ে এটি যেমন পোল্যান্ডের সবচেয়ে উঁচু ভবন, তেমনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পঞ্চম দীর্ঘতম ভবন। এই ৪২ তলা ভবনে আসলে কী নেই? সিনেমা, থিয়েটার, গ্রন্থাগার, স্পোর্টস ক্লাব, বিশ্ববিদ্যালয় অনুষদ, পোলিশ একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃপক্ষের অফিস। এখানেই পরিচয় হলো পোলিশ তরুণী লিনা সুচোকার সঙ্গে। ওয়ারশ স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে জীববিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে জাতিতে ক্যাথলিক এই নারী এখন কর্মরত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে। স্বেচ্ছায় মানবতার কাজে। ছেলেবেলায় বই ঘেঁটে আমাদের জানা পৃথিবীর কিছু ঐতিহাসিক সত্যের পুনরুক্তি যেন তাঁর কণ্ঠে: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ওয়ারশের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল ইহুদি।

বিজ্ঞাপন

নাৎসিদের পরিকল্পিত গণহত্যার শিকার হয়ে এদের সিংহভাগ মৃত্যুবরণ করলেও শহরে এদের সংস্কৃতির ছাপ পর্যটক হিসেবে নিশ্চয়ই তোমার চোখে পড়েছে!

-হ্যাঁ, ইহুদিরা যে জ্ঞানী জাতি সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। পৃথিবীতে তাদের সংখ্যা ১৫ মিলিয়ন, মানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ২ শতাংশ অথচ নোবেল পুরস্কারের ২২ শতাংশ কিন্তু তাদেরই দখলে।

-ফেসবুক, গুগলের প্রতিষ্ঠাতাও কিন্তু ইহুদিরা!

-হ্যাঁ, আমি তা জানি, কিন্তু আমি যেটা জানি না সেটি হলো, হিটলার কেন ইহুদিদের মানুষের প্রতি এতটা বিক্ষুব্ধ ছিলেন?

-এর পেছনে হিটলারের ইহুদি তরুণীর প্রতি একতরফা প্রেম, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা নয়। বা ইহুদি ডাক্তার কর্তৃক হিটলারের মায়ের অপচিকিৎসা বা জার্মান জাতির প্রতি তীব্রতর ভালোবাসাও নয়। বিষয়টা ছিল অর্থনৈতিক। ইহুদিদের অর্থনৈতিক উন্নতিকে হিটলার দেখতেন অসূয়া প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে। জিঘাংসা থেকে হিটলার ওদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করেছিলেন। এমনকি ভূমি মালিকানার ক্ষেত্রে ইহুদিদের আলাদা রেজিস্ট্রেশনও নিতে হতো।

হুদিদের অর্থনৈতিক উন্নতিকে হিটলার দেখতেন অসূয়া প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে। জিঘাংসা থেকে হিটলার ওদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করেছিলেন। এমনকি ভূমি মালিকানার ক্ষেত্রে ইহুদিদের আলাদা রেজিস্ট্রেশনও নিতে হতো।

-বাহ্, শেষের বিষয়টি তো আমার জানা ছিল না!

-হিটলারের কাণ্ডকীর্তিতে যতটা না বদনাম জার্মানির, তার চেয়ে বেশি ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট হয়েছে পোলিশদের।

-হ্যাঁ, এর জন্য তোমাদের আইনসভায় বিলও পাস হয়েছে বোধ হয়, হিটলারের ইহুদি নিধনের সঙ্গে পোলিশদের নাম যুক্ত করা যাবে না!

-হ্যাঁ, ঠিক তাই। এখন বলো পর্যটক হিসেবে ওয়ারশ শহর তোমার কেমন লাগল?

-ইউরোপ যতটা দেখার সুযোগ হয়েছে, তোমাদের ওয়ারশ বা ভারশাভার মতো এত উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত শহর আর দ্বিতীয়টি দেখিনি!

-শোনো হে রূপমুগ্ধ, এই শহরের পুরোটাই কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল!

-তারপর কী দারুণ অধ্যবসায়ে ধ্বংসস্তূপের ভেতর তোমাদের সরকার সেটাকে পুনর্নির্মাণ করে নিল।

লিনার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে নানা রকম গল্প হয়। সঙ্গে খুনসুটি। রোমান পোলানস্কি পরিচালিত অসাধারণ ছবি ‘দ্য পিয়ানিস্ট’-এর কথাও আলোচনায় বাদ থাকে না। কথায় কথায় লিনা জানতে চায়, তোমাদের দেশ তো গ্রীষ্মপ্রধান, শীত কি একেবারে নেই? স্তব্ধতা ভেঙে বলি, ঢাকার শীতবিলাস হারিয়ে গেছে সেই কবে! মনে মনে বলি, তুমি তো জানো না হে শীতকন্যা, মানুষের তাপমাত্রায় আমার দেশে শীত এখন লেপ-তোশক মুড়িয়ে নিজে নিজেই কাতরাচ্ছে!

default-image

ওয়ারশ রয়্যাল প্রাসাদটির নন্দনশৈলীও অপরূপ। এটি ছিল মাজোভিয়ান রাজকুমারীদের বাসস্থান। সেই কবে রাজধানী ক্রাকো থেকে ওয়ারশতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকেই দুর্গটিকে পোলিশ রাজারা সিংহাসন, রাজদরবার বানিয়েছিলেন। দুর্গে গ্রন্থিত আছে একটি জাতির শৌর্য-বীর্যের ইতিহাস। মুগ্ধ হয়ে ভাবছি, জীবনের সব অনুষঙ্গ পূর্ণ করে একদিন তাঁরা হয়েছিলেন রাজরাজড়া। শারীরিকভাবে অস্তিত্বহীন হয়েও শত শত বছর পরে এখনো তাঁরাই সিংহাসনবিহীন রাজা; কারণ সাধারণ্যে তাঁদের দাপটের তো কোনো কমতি নেই!

বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তুষারের দুধসাদা রং রাজপ্রাসাদের জানালাকে খাতা বানিয়ে যেন প্রলেপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখছে! শীতের দেশের এই শীত-প্রাচুর্য মনের কোনো এক গভীরে আনন্দ দেয়। স্বপ্নালু ভঙ্গিতে মন উতলা হয়।

default-image

সাহস করে লিনার গোলাপি আঙুলে দিই টোকা, ডাকছে বাইরের পৃথিবী! পরম মায়া। বরফের কণা ছুঁয়ে তাড়াব হাজার বছরের গ্লানি! বিস্ময়ানন্দে দেখব, পত্রবিহীন সারি সারি বৃক্ষ, সবুজ ঘাসের উদ্যান, তামাটে রঙের ঘরবাড়ি, তার মাঝে ত্বরিতগতিতে ছুটে চলা চকচকে একেকটা নতুন গাড়ি! আরও দেখব সবকিছু ভেদ করে ওই উঁচুতে; কীভাবে কুয়াশারঙের শুভ্রতায় হাসছে গির্জার সাদা চূড়া!

লেখক: আইনজীবী

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন