বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ প্রায় ৫০০ বছর বলকান পেনিনসুলার শাসনভার অটোমান সালতানাতের হাতে ন্যস্ত ছিল। এ কারণে এ অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে অটোমানদের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আলবেনিয়া, কসোভো ও বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এ তিনটি দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম। অন্যদিকে বলকান উপদ্বীপের অন্য তিন দেশ মেসিডোনিয়া, বুলগেরিয়া ও মন্টিনিগ্রোতে ইসলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম না হলেও জনসংখ্যা অনুপাতে দেশটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো। অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটির পর এসব দেশে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের ধর্ম ইসলাম। মেসিডোনিয়াতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা দেশটির মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ। বুলগেরিয়ার মোট জনসংখ্যার শতকরা ১২ ভাগ এবং মন্টিনিগ্রোতে মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৮ ভাগ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। বলকান পেনিনসুলার অন্যান্য দেশের মধ্যে গ্রিসে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর পরিমাণ শতকরা ২ থেকে ৩ ভাগ, সার্বিয়াতে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর পরিমাণ শতকরা ৩ ভাগ এবং ক্রোয়েশিয়াতে শতকরা ২ ভাগের কাছাকাছি মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন।

default-image

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা জাতিগতভাবে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত। আলবেনিয়া ও কসোভোর পাশাপাশি মেসিডোনিয়া এবং মন্টিনিগ্রোতে বসবাসরত ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের বেশির ভাগই জাতিগতভাবে আলবেনিয়ান। অন্যদিকে বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনাতে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা নিজেদেরকে বসনিয়ান হিসেবে পরিচয় দেন। জাতিগত দিক থেকে তাঁরা হচ্ছেন স্লাভ। বুলগেরিয়া ও মেসিডোনিয়াতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলমান রয়েছেন, যাঁরা জাতিগতভাবে স্লাভ। এদের প্রায় সবাই স্থানীয় বুলগেরিয়ান কিংবা মেসিডোনিয়ান মুসলমান। এ ছাড়া বলকান উপদ্বীপের দেশগুলোতে পোমাক নামক আরও একশ্রেণির মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। পোমাকরাও জাতিগত দিক থেকে স্লাভ। অন্যদিকে নোভি পাজারসহ সার্বিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করা স্থানীয় অধিবাসীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন। যদিও তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁরা এথনিকাল সার্ব মুসলিম, তবে সার্বিয়ার রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলগুলো তাদেরকে সার্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।

default-image

সার্বিয়ানরাও জাতিগতভাবে স্লাভ হিসেবে পরিচিত। আলবেনিয়ান ও স্লাভদের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তুর্কি ও রোমা নামক এক বিশেষ শ্রেণির জাতিসত্তার মানুষের বসবাস রয়েছে। তুর্কিদের প্রায় সবাই ধর্মীয় দিক থেকে মুসলমান এবং রোমা জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যেও কিছুসংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গ্রিস, বুলগেরিয়াসহ বলকান উপদ্বীপের দেশগুলো থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের ব্যাপক স্থানচ্যুতি ঘটে। উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান গ্রিস ও বুলগেরিয়ার মতো দেশগুলোতে বসবাস করা মুসলিমদের তুরস্কে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করে। অনেকে আবার ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনে বাধ্য হন। সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসী হিসেবে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক নাগরিক দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছেন, যাঁদের মধ্যে অনেকে ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

জাতিগত দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বসবাস করা ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ চার ভাগে বিভক্ত হলেও ধর্মীয়ভাবে এদের প্রায় সবাই সুন্নি এবং তাঁরা হানাফি মাজহাবের অনুসরণ করেন।

আগেই বলেছি, দক্ষিণ-ইউরোপের দেশগুলোতে ইসলামের আবির্ভাব মূলত অটোমানদের হাত ধরে। তাই এ অঞ্চলের মুসলমানরা যেকোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে তুর্কিদের সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখা যায়। ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের মুসলমানরা তুর্কি ভাষায় ব্যবহৃত শব্দগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যেমন বাংলাদেশে আমরা একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে ‘ঈদ মোবারক’ শব্দটি বেশি ব্যবহার করি। কিন্তু বলকান দেশগুলোর অধিবাসীরা ঈদ মোবারকের পরিবর্তে ‘বায়রামিক মোবারেক ওলসুন’ শব্দটি ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তুর্কি ভাষায় ঈদকে বায়রাম বলা হয়। এমনকি এসব দেশের মসজিদগুলো তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের স্থাপত্যশৈলীকে অনুসরণ করে নির্মিত।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে বসবাসরত মুসলামনদের মতো বলকান দেশগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলিমদের কাছেও ঈদ একই সঙ্গে প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব হিসেবে পরিচিত। ঈদ উপলক্ষে বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, আলবেনিয়া, কসোভো, মেসিডোনিয়া ও মন্টেনিগ্রোতে সরকারি ছুটি থাকলেও বলকানের অন্য দেশগুলোতে ঈদের দিন অন্য সাধারণ দিনগুলোর মতো বিবেচিত হয়। বলকানের অন্যান্য দেশের বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা তাই নিজ উদ্যোগে ঈদ উৎসবের আয়োজন করে।

default-image

ঈদের দিন খুব সকালে সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পরে দল বেঁধে মুসল্লিরা ঈদের জামায়াতে হাজির হন। নামাজের আগে নাশিদ বা ধর্মীয় গজল পরিবেশনের রীতি রয়েছে। ঈদের জামাতে বলকান দেশগুলোর মুসলিমরা মাতৃভাষায় খুতবা পরিবেশন করতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যথাযথ নিয়ম পালনসাপেক্ষে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ঈদ জামায়াতে শরিক হতে পারেন। উপমহাদেশের মতো এসব দেশের মুসলিমদের মধ্যেও ঈদের নামাজ ও খুতবা শেষে কোলাকুলির রেওয়াজ রয়েছে।

রোজার ঈদের দিন নামাজের আগে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে মুসল্লিদের উদ্দেশে বিভিন্ন মিষ্টিজাতীয় খাবার বিতরণ করা হয়। অন্যদিকে ঈদুল আজহার দিন নামাজ শেষে মুসল্লিরা সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করে থাকেন। ঈদুল আজহার পশু কোরবানি হওয়ার আগপর্যন্ত কেউ কোনো ধরনের আহার গ্রহণ করেন না।

default-image

আমাদের এ উপমহাদেশের মতো বলকান দেশগুলোতে সেভাবে পশুর হাটের প্রচলন দেখা যায় না। তাই আমাদের দেশের মতো নিজের পছন্দ অনুযায়ী পশু নির্বাচনের সুযোগ এসব দেশে সীমিত। বেশির ভাগ শহর কিংবা মফস্বল অঞ্চলে নির্দিষ্ট কিছু স্থান ছাড়া জনসম্মুখে পশু জবাই করা হয় না। যাঁরা সামর্থ্যবান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা নিকটস্থ কোনো মসজিদের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অথবা কোনো মাংসের দোকানের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোরবানির ব্যবস্থা করে। তবে তুরস্ক, আলবেনিয়া, মেসিডোনিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার মতো দেশগুলোতে স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকে খামারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী পশু বাছাই করতে পারে। খামারের ভেতরে পশু কোরবানি করার সুযোগ রয়েছে। পছন্দের পশু হিসেবে বেশির ভাগ মানুষ ভেড়া বেছে নেন, অনেকে অবশ্য গরু কোরবানিও করেন।

ঈদ উপলক্ষে ছোট বাচ্চাদের ঈদ সালামি দেওয়াটা মনে হয় গোটা পৃথিবীর মুসলিমদের একটি কমন সংস্কৃতি। বলকান দেশগুলোতে এ ধরনের সংস্কৃতিকে বলা হয় ‘বায়রাম বাংকা’, যার বাংলা অনুবাদ হচ্ছে ঈদ ব্যাংক। ছোট বাচ্চারা ঈদের দিন দলবেঁধে আশপাশের মুরব্বিদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে মুরব্বিরা তাদের নগদ অর্থের পাশাপাশি চকলেটসহ বিভিন্ন ধরনের উপহার প্রদান করেন। বিনিময়ে শিশুরা বড়দের ডান হাতে চুমু দেয়। অর্থাৎ অটোমান সংস্কৃতির ছাপ বলকান দেশগুলোতে বসবাস করা মুসলিমদের মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে পরিবারের মৃত আত্মীয়স্বজনদের উদ্দেশে দোয়া করা ও তাঁদের কবর জিয়ারত করাটা বলকান দেশগুলোতে বসবাস করা মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের ঈদ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ।

default-image

সাধারণত ঈদের দিন বেশির ভাগ মানুষ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন, বলকান দেশগুলোতেও এর ব্যতিক্রম নয়। পাশাপাশি অনেকে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বাসায়ও যান। অন্ততপক্ষে বছরের দুই ঈদে সবার লক্ষ্য থাকে কাছের মানুষদের নিয়ে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করা। বাকলাভা ছাড়া ঈদের দিন বলকান হেঁশেল কোনোভাবে পূর্ণতা পায় না। মধ্যপ্রাচ্যের এই ডেজার্ট আইটেমটি অটোমানদের হাত ধরে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে ঈদুল আজহার দিনে বলকান হেঁশেলে বাকলাভের পাশাপাশি মাংসের তৈরি বিভিন্ন পদ দেখা যায়। বায়রাম চরবা নামে এক বিশেষ ধরনের স্যুপ সেখানে দারুণ সমাদৃত। পাশাপাশি রয়েছে বুরেক ও বিভিন্ন ধরনের কাবাব। বুরেক হচ্ছে একধরনের বিশেষ পাই। বিভিন্ন ধরনের বুরেক আছে। যেমন মিশ বুরেক, চিজ বুরেক, আলু ও পালংশাকের বুরেক ইত্যাদি। তবে ঈদুল আজহার দিনে মাংসের তৈরি মিশ বুরেক সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা ও সার্বিয়াতে চেভাপি নামে এক বিশেষ ধরনের কাবাব খুব জনপ্রিয়। চেভাপি বর্তমানে বসনিয়ার জাতীয় খাবারে হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। চেভাপি তৈরি করতে হলে প্রথমে মাংসের কিমার সঙ্গে রসুনকুচি, পরিমাণমতো লবণ ও গোলমরিচের গুঁড়া মিশিয়ে ম্যারিনেট করা হয়। নির্দিষ্ট সময় ব্যবধানে ম্যারিনেট করা মাংসের কিমা থেকে সামান্য অংশ হাতে নিয়ে চকের মতো শেপ দেওয়া হয়। এরপর গ্রিলে ঝলসিয়ে প্রস্তুত করা হয় চেভাপি। সাধারণ চকের তুলনায় চেভাপি অবশ্য আকৃতিগত দিক থেকে বেশ মোটা হয়ে থাকে। চেভাপি পরিবেশন করা হয় ফ্ল্যাটব্রেডের ভেতরে, এক টুকরো ফ্ল্যাটব্রেডে একসঙ্গে পাঁচ কিংবা দশ পিস চেভাপি থাকে। সঙ্গে থাকে পেঁয়াজকুচি, ক্রিম, চিজ এবং বেল পেপার ও গোল বেগুনের তৈরি একধরনের বিশেষ সস, যা আয়ভার নামে পরিচিত। ঈদুল আজহার দিনে বসনিয়ানদের অন্যতম প্রধান খাবার চেভাপি। ঈদ উপলক্ষে বলকান দেশগুলোতে আরও কিছু মাংসের তৈরি পদ রয়েছে, যেগুলো তৈরি করতে বিশেষ ওভেনের প্রয়োজন হয়। আমরা যে রকম ঝাল ও মসলাদার খাবারে অভ্যস্ত, বলকান দেশগুলোর অধিবাসীরা সেভাবে ঝাল ও মসলাদার খাবারে অভ্যস্ত নন, যদিও ইউরোপের মধ্যে তুরস্ক ও বলকান দেশগুলোর খাবারকে সবচেয়ে স্পাইসি খাবার হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

default-image

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলকান উপদ্বীপে বসবাস করা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ঈদ উদযাপনসহ বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের কমিউনিস্ট শাসন এসব দেশের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসেও ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করে। অন্যদিকে এসব দেশে বসবাস করা তরুণ প্রজন্মের একটি বৃহৎ অংশ পশ্চিম ইউরোপের নাগরিকদের জীবনধারা অনুসরণ করতে ভালোবাসেন। এসব কারণে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও আলবেনিয়া কিংবা বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার একটি বড় অংশের মানুষ ধর্ম থেকে অনেক দূরে।
লেখক: শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন